শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২০

সম্পাদকের কথা


 
উৎসবের অঙ্গ যখন সাহিত্য, উৎসবকে উপলক্ষ করে যখন তার প্রকাশ, তখন তা একটু জাঁকজমকপূর্ণ হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। বাঙালি সংস্কৃতির এরূপ নান্দনিক প্রকাশ আমাদের কাছে নিঃসন্দেহে শ্লাঘার বিষয়। বড়, মাঝারি, ছোট যে কোনও আকারই হোক না কেন উদ্যোক্তাদের শারদশক্তি মহা সমারোহে বাইরের আনন্দের সঙ্গে আমাদের অন্দরকেও সুঠাম ও সামর্থ্যযুক্ত করে তোলে। একটা সময় ছিল যখন শারদ সাহিত্য নিয়ে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু -বান্ধবদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার রেশ থাকত। ইদানীং অবশ্য সে সব দেখা যায় না। হতে পারে অন্যান্য পার্থিব সুখ ও আনন্দ যেমন আমরা গোপনে উপভোগ করতে শিখে গেছি, সাহিত্যের আস্বাদনও তেমনি রপ্ত করতে শিখেছি নিতান্ত ব্যক্তিগত স্তরে। কিন্তু ভোগ আর উপভোগ তো এক জিনিস নয়। বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর "শুভ উৎসব" প্রবন্ধে লিখেছেন, " ...আমাদের উৎসবে ভাবের প্রাধান্য---- বাহিরের সমারোহ তাহার প্রধান অঙ্গ নহে।" বর্তমানে অবশ্য বাইরের সমারোহে অন্তরের ঐশ্বর্য্য শূন্য হতে বসেছে। সেই শূন্যতার টিলায় তৈরি আমাদের আকাশচুম্বি অট্টালিকা প্রকৃতির বুকে শোভা পাচ্ছে । নিত্য নতুন উপাচার আর তার প্রকরণে আমরা আশ্চর্য করতে চাইছি একে অপরকে। তাক লাগিয়ে দিচ্ছি। তার মধ্যেও উঁকি মারছে রাস্তার শিশু আর আশ্রমের বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা। উঁকি মারছে নীতিভ্রষ্ট সেই সব ঘটনা যেগুলো মানব সভ্যতাকে প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে মানব সভ্যতার ইতিহাস মূলত তার জিঘাংসার ইতিহাস। বর্বরতাকে অতিক্রম করে যা-কিছু সুন্দর তারও নিহিতার্থে ফণা উঁচিয়ে আছে কোনও না কোনও ভোগলিপ্সা। আমাদের উৎসব আমাদের সমাজ -সভ্যতার অনেক ইঙ্গিত বহন করে। মনের ভেতরের জৈবিক প্রবৃত্তিগুলিকে, ক্ষমতা প্রদর্শনের উচ্ছৃঙ্খল জিঘাংসাগুলিকে যতক্ষণ না সাম্য, সম্ভ্রম ও সহানুভূতির দুর্গে বলি দিতে পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের উৎসবের খসড়া চলবে, উৎসব নয়। সাহিত্যচর্চা সমস্ত শিল্পের মধ্যে আত্মশুদ্ধিকরণের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। প্রকৃত সাহিত্যের মুখোমুখি হলে মনের যাবতীয় গ্লানি ঝরে যায়। মনসমীক্ষণের সেই সব শারদ সম্ভার এখন প্রিন্ট ও ওয়েব--- দুই মাধ্যমেই পাওয়া যাচ্ছে। আসুন, আমরা একটু নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসি।


চিত্র গ্রাহক: অনিরুদ্ধ মান্না

বিশেষ রচনা ।। সুপর্ণা দেব


 


চণ্ডী কথা 


 সুরথ সমাধি  আখ্যান

রাজ্যহারা রাজা সুরথ ঘুরতে ঘুরতে  মেধামুনির আশ্রমে এলেন । ভাগ্যহারা বিষণ্ণ  রাজা । কিন্তু ফেলে আসা রাজ্য ও বৈভবের মোহ তখনো যায় নি । তাই প্রশ্ন রাখলেন মুনির কাছে ।  এ মোহ যাবে কীভাবে ? ঘটনাচক্রে সেই আশ্রমেই দেখা হয় বৈশ্য সমাধির  সঙ্গে । তার সব ধন সম্পদ স্ত্রী ও পুত্রেরা কেড়ে নিয়ে তাকে  ছেড়ে চলে গেছে । ভাগ্যহত এক নৃপতি ও এক বনিক মেধা মুনির আশ্রমে মিলিত হলেন  জীবন দর্শনের প্রশ্ন নিয়ে । 

রাজা সুরথ জানতে চাইলেন মেধা মুনি  বারবার মহামায়ার  কথা বলছেন । এই  মহামায়া  কে ?  

মুনিবর বললেন , পৃথিবী একসময় মদিরা সমুদ্রে পরিনত হল । কারণসাগর ।  ভগবান বিষ্ণু অনন্তনাগের ওপরে  শয়ন করে  যোগনিদ্রায় চলে গেলেন । এক কথায়  পৃথিবী হয়ে পড়লো তমসাচ্ছন্ন   , সত্ত্বগুণ নিষ্ক্রিয়  হয়ে পড়ল । তখন বিষ্ণুর কানের ময়লা থেকে মধু ও কৈটভ এই দুই অসুরের জন্ম হল । মধু কৈটভের গল্প দেবীভাগবতেও আছে । এই দুই অসুর  আকাশে  একটি  বীজমন্ত্র শুনতে পায় ও নিবিষ্ট মনে  দুজনে সেই মন্ত্র জপ করতে থাকে । দীর্ঘকাল  তপস্যার পর  পরমা দেবী চিৎ রূপিনী শক্তি প্রসন্ন হন । তারা ইচ্ছা মৃত্যুর  বর প্রার্থনা  করে । বরপ্রাপ্ত হয়ে বলীয়ান দুই অসুর  কারণ সমুদ্রে , মদিরা সাগরে প্রচন্ড আস্ফালনে নিজেদের ইচ্ছামত দিন কাটাতে থাকে । এইভাবে জলের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে  বেড়াতে তারা  যোগনিদ্রামগ্ন বিষ্ণুর কাছে এসে বিষ্ণুর নাভিতে ব্রহ্মাকে  দেখল । ব্রহ্মা , অসুরদের দেখে  ভয় পেয়ে বিষ্ণুকে কে জাগিয়ে তোলার জন্য যোগনিদ্রার স্তব করতে শুরু করলেন । “ হে দেবি , আপনি ভগবান বিষ্ণুর ঘুম ভাঙিয়ে  এই দুই অসুরকে বধের একটা ব্যাবস্থা করুন ।“  বিষ্ণুর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ  থেকে  তামসী দেবী দেখা দিলেন তার মধ্যে রয়েছে সত্ত্ব  রজ আর তম, তিন গুণের  সমাহার  । মহাকালী মহালক্ষ্মী  মহাসরস্বতী । ভগবান বিষ্ণু নিদ্রাভঙ্গের পর অসুরদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে গেলেন বহু বহুদিন । 

মধু কৈটভ তখন আচ্ছন্ন হচ্ছে মহামায়ার জালে। মোহে  আচ্ছন্ন অসুরদ্বয় বিষ্ণুকে বলল আমরা  আপনার যুদ্ধে খুবই প্রীত হয়েছি । আপনার হাতে আমাদের মৃত্যু হোক তবে । যে স্থান জলপ্লাবিত নয় এমন স্থানে । অসুর দুজনের মাথা নিজের জঙ্ঘায় রেখে সুদর্শন চক্র দিয়ে মাথা কেটে নিলেন মধুসূদন বিষ্ণু ।  সমগ্র ঘটনার নেপথ্য চালিকা শক্তি  ছিল অঘটন ঘটন পটিয়সী  মহামায়ায় মায়াজাল । মধু কৈটভ হল অজ্ঞানতা , তমস , অন্ধ মোহ । উগ্র । কুৎসিত । 

এরপর প্রবল পরাক্রান্ত  মহিষাসুরের নেতৃত্বে অসুররা পরাজিত করে দেবসৈন্যদের । স্বর্গ  থেকে হটিয়ে দেওয়া হল দেবতাদের । পরাস্ত ও অসহায়   দেবতার দল ব্রহ্মাকে সামনে রেখে চললেন শিব আর বিষ্ণুর কাছে । স্বর্গ  থেকে খেদিয়ে দেওয়া হয়েছে তাবড় তাবড় দেবতাদের । সূর্য ইন্দ্র অগ্নি বায়ু যম বরুণ ও অন্যান্য  ।  শিব ও বিষ্ণু খুবই রুষ্ট হলেন । ব্রহ্মা , বিষ্ণু মহেশ্বরের থেকে মহাতেজ বেরিয়ে এলো । তিন মহাতেজের সংমিশ্রন । তিন গুণ । স্বত্ত্ব , রজ , তম । দেবী তাই ত্রিগুণা । অন্যান্য দেবতাদের দেহ থেকেও তেজ নির্গত হল  । 

সেই তেজঃ পুঞ্জকে দেখা গেল জ্বলন্ত পাহাড়ের মত ।বিশাল ।  দিগন্ত ব্যাপী । দেখা গেল হিমালয়ের কোলে   মহর্ষি কাত্যায়নের আশ্রমে । 

সেই জমাট বাঁধা তেজঃপুঞ্জ  এক নারী মূর্তির  আকার নিতে থাকল । বিভিন্ন দেব দেবীর তেজে এক এক করে সেই নারীমূর্তিটির একটি একটি করে  অঙ্গ গড়ে উঠল । শুধু তাই নয় তাঁকে নানান অস্ত্র সাজিয়ে দেওয়া হল । তাঁকে সিংহ বাহন দেওয়া হল । তাঁর  দৈব অঙ্গে একের পর এক অলঙ্কার শোভা পেতে থাকল ।  

“ সমস্ত রোমকূপেষু   নিজরশ্মীন্ দিবাকরঃ” ,  দেবীর সমস্ত লোমকূপে দিবাকর নিজের কিরণ রাশি ঢেলে দিলেন । সুতরাং  সেই দেবীর গাত্রবর্ণ সূর্যের আলোর মত উজ্জ্বল । সমুদ্রের   অম্লান পদ্ম মালায়  অনুপম সাজ সমাপ্ত করে সেই দেবী কী করলেন ? অট্টহাস্য করে উঠলেন । হুঙ্কার দিলেন ঘনঘন । পৃথিবী পর্বত  সমুদ্র কাঁপানো সেই গর্জন ! তারপর শুরু হল সে এক অতি  ভয়ানক যুদ্ধ ! মহিষাসুর নানান মায়াবী রূপ ধারণ করতে থাকে । যুদ্ধে মত্ত সেই দেবী এবারে ভয়ঙ্কর  রেগে গিয়ে সুরাপান করতে থাকেন । তাঁর  চোখদুটি লাল হয়ে উঠেছে । আকাশ চুম্বী  দেবী অট্টহাস্য করে উঠছেন । যুদ্ধে মত্ত দেবী সুরা পান  করে রজ গুণ প্রাপ্ত হলেন । তখন দেবী কী বললেন ? বললেন “ “গর্জ গর্জ ক্ষণং  মূঢ় মধু যাবৎ  পিবাম্যহম্ । “ ওরে মূঢ় অসুর ,  তুই গর্জন করতে থাক  । আমি ততক্ষণ  মধু পান করি । তারপর তোকে বধ করব ।  সব দেবতারা আনন্দ ধ্বনি করবেন ।“  দেবী চন্ডিকা লাফ দিয়ে মহিষাসুরের  ওপরে  উঠে  তার গলায় পা দিয়ে বুকে ত্রিশূল বিঁধিয়ে দিলেন  । এদিকে মহিষাসুর নিজের মুখ দিয়ে অন্য মহাসুর রূপ ধরে একটু উঁকি দেওয়া  মাত্রই দেবী খড়্গ দিয়ে তাঁকে মেরে ফেল্লেন ।  মহিষাসুর উদগ্র ক্রোধ , লোভ লালসা , অহমিকার প্রতীক ।  

মেধা ঋষি রাজা  সুরথকে বললেন সমস্ত দেবতারা মাথা নত করে দেবীর স্তব করতে লাগল । 

এরপর শুরু হল শুম্ভ নিশুম্ভের পালা ।  তারা ইন্দ্র সূর্য চন্দ্র কুবের যম বরুণ সবাইকে বিতাড়িত করে সকলের ক্ষমতা দখল করে আস্ফালন করতে লাগল । এই দুই অসুর ব্রহ্মাকে তুষ্ট করে বর প্রার্থনা করেন যে দেব ও মানব জাতির কোনো পুরুষ তাদের মারতে পারবে না । কিন্তু এখানে  একটা  শর্ত ছিল যা হয়তো শুম্ভ নিশুম্ভের কষ্ট - কল্পনার বাইরে ছিল । বলা হয়েছিল গর্ভজাত নন অর্থাৎ অযোনিজা এবং পুরুষ  স্পর্শ করে নি  এমন নারীর প্রতি যদি তারা আসক্ত হয়ে পড়ে সেই নারীই যুদ্ধে তাদের পরাস্ত করতে পারবেন ।

দেবতাদের এই ঘোর সঙ্কটকালে  দেবী পার্বতীর দেহকোষ থেকে নির্গত  হলেন কৌশিকী । শুম্ভ নিশুম্ভের অনুচর চন্ড ও মুন্ড অতি মনোহর রূপিণী কৌশিকী কে দেখতে পেল । তারা দৌড়ে গিয়ে শুম্ভকে গিয়ে বলল মহারাজ এক পরমা সুন্দরী  পর্বত  আলোময় করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন । 

এরমধ্যে স্বর্গ  থেকে কী কী ছিনিয়ে এনেছে শুম্ভ , একবার দেখা যাক । ইন্দ্রের কাছ থেকে গজশ্রেষ্ঠ ঐরাবত , দেববৃক্ষ পারিজাত , অশ্বশ্রেষ্ঠ উচ্চৈঃশ্রবা । ব্রহ্মার হংস চালিত বিমান । কুবেরের কাছ থেকে  এনেছে নবরত্নের অন্যতম নিধি মহাপদ্ম ।সমুদ্রের  কাছ থেকে অম্লান পদ্মের মালা কিঞ্জল্কিনী  । নিশুম্ভ , তার ভাইও যম , বরুণ , সমুদ্রের কাছ থেকে প্রচুর মূল্যবান সামগ্রী ও অস্ত্র নিয়ে এসেছে । সুতরাং এই অপরূপ স্বর্গীয় রমণীটিকেও তাদের  নেওয়া উচিত । 

শুম্ভের দূত হয়ে দেবী কৌশিকীর কাছে গেল মহাসুর সুগ্রীব  । কৌশিকী উত্তর  দিলেন যিনি  তাঁকে যুদ্ধে পরাস্ত করবেন , যিনি তার মতই বলশালী তিনিই  হবেন তাঁর  পতি । সুতরাং শুম্ভ আসুন যুদ্ধ করতে । 

সুগ্রীব  বলল এ আপনি কী বলছেন? । কোনো দেবতা শুম্ভের  সামনে দাঁড়ানোর সাহস পায় না  আর আপনি একা একা  কী করবেন ? 

দেবী বললেন  , এই আমার প্রতিজ্ঞা  । তুমি দৈত্য রাজকে জানাও সে কথা  । 

এরপর অসুর  সেনাপতি ধূম্রলোচন  ও তার অসুর বাহিনীকে হুঙ্কার দিয়ে পরাস্ত করলেন দেবী  । দেবীর বাহন সিংহ  যুদ্ধে দেবীকে সাহায্য করল বিপুল ভাবে । 

মেধা ঋষি  রাজা সুরথকে বললেন , শুম্ভের আদেশে এবারে দেবীর কাছে গেল শুম্ভের দুই অনুচর  চন্ড ও  মুন্ড । পর্বত  চূড়ায় সোনার বরণ দেবী সিংহের পিঠে  বসে আছেন  । জগদম্বা  দেবী তাদের দেখে খুবই বিরক্ত হলেন এবং  তাঁর  মুখ রাগে কালো হয়ে গেল । তাঁর  ললাট থেকে বেরিয়ে এলেন ভীষণ দর্শন চামুন্ডা কালী করালবদনা  । কালী তারপর চন্ড মুন্ডকে হত্যা করে তাদের কাটা মুন্ডু নিয়ে জগদম্বাকে গিয়ে বললেন ,  এই নিন আপনার উপহার । আপনি নিজে শুম্ভ নিশুম্ভকে বধ করবেন । 

শুম্ভ নিশুম্ভ যখন যুদ্ধে নেমেছে,  প্রত্যেক দেবতার থেকে একটি  করে শক্তি নির্গত  হয়ে দেবীকে সাহায্য করতে এসেছেন  । যে দেবতার আকার ভূষণ বাহন যেমন তার শক্তির ও সেই রকম রূপ । 

এরপর মাহেশ্বরী , ঐন্দ্রী নারসিংহী  , ব্রহ্মাণী কৌমারী  এই রকম অষ্ট মাতৃকা অসুরদের   নাজেহাল করে তুল্লেন  । ভয়ানক অসুর রক্তবীজের শরীরের  থেকে একবিন্দু রক্ত পড়লেই বলশালী অসুরের জন্ম হয় । যার ফলে বিপুল পরিমানে অসুর সৃষ্টি হবার জন্য  দেবতাদের মাথায় হাত ! তাঁরা  খুব  ভয় পেলেন । দেবী চন্ডিকা তখন কালীকে বললেন,  মুখ হাঁ কর । রক্ত মাটিতে  পড়তে  দেওয়া যাবে না । 

চামুন্ডা কালী  সেই রক্ত পান করতে থাকলেন । রক্তবীজ , এক বাসনা থেকে সহস্র বাসনার প্রতীক । বাসনাজাল । অথবা যোগ কালে মনের মধ্যে নিরন্তর অস্থির চিন্তার আনাগোনা । 

দেবী চন্ডিকার সঙ্গে শুম্ভ নিশুম্ভের প্রবলতম  যুদ্ধ হল ।শুম্ভ হল অহং , সর্বদা  আমি আমি আমি , নিশুম্ভ হল আসক্তি ।  অসুর নিধন ও দেবত্বের পুনরুদ্ধারে সবাই দেবী চণ্ডীর আরাধনা করতে লাগলেন । 

“ দেবী প্রচন্ড দোর্দণ্ডে দৈত্যদর্পনিষুদিনী “ 


২ 

চন্ডী কথা ।। দেবী মাহাত্ম্য 

দেবীসূক্ত বেদ । অম্ভ্রৃণ ঋষির মেয়ে বিদুষী বাক । ঋষি বাক , আটটি  মন্ত্র নিয়ে রচনা  করেন দেবীসূক্ত । দেবী চন্ডীর মাহাত্ম্য নিয়ে যে দেবীমাহাত্ম্য  লেখা হয়েছিল , দেবীসূক্ত তার  মূল উপাদান । চন্ডী এক গূঢ় দর্শনের শক্তিবীজ । মানবাত্মার পরমাশ্রয় সচ্চিদানন্দ পরমাত্মা । দেবীসূক্তের পরমাত্মা আর মহামায়ায় কোন ভেদ নেই । 

“ আমি এই ব্রহ্মান্ডের একমাত্র অধিশ্বরী “ ।

“ আমি জগত পিতাকে প্রসব করি” 

“ আমি যখন বায়ুর  মত প্রবাহিত হই তখনিই এই ভুবনের সৃষ্টির সূচনা হয় “ । 

দেবী মাহাত্ম্য পাঠের আগে মনে অর্গল বা খিল দিতে হয় । কারণ বিক্ষিপ্ত অশান্ত বহির্মুখী মন নিয়ে চন্ডীতত্ত্বে প্রবেশ করা সম্ভব নয় । সেই জন্য অর্গল ,কীলক ,দেবীকবচ পাঠের কথা বলা হয় । রূপ দাও , জয় দাও । যশ দাও । শত্রু দমন কর । অথবা বল দাও , মনোবৃত্তি  অনুযায়ী মনোরমা  ভার্যা দাও  । সৌভাগ্য দাও । আরোগ্য দাও । 

জগন্মাতার কাছে চাইতে নিষেধ নেই । কিন্তু প্রার্থনা গুলির আপাত অর্থের গভীরে অন্য ব্যাঞ্জনা নিহিত আছে । চন্ডীতত্ত্বে  প্রবেশের আগে সমস্ত মনোবৃত্তি মায়ের কাছে প্রকাশ করে আত্মস্থ হতে হয় । এই প্রয়াসটি যত  সুশৃঙ্খল ও গভীর হবে ততোই চন্ডীমাহাত্ম্য চন্দন সুগন্ধের মত মননে লিপ্ত হবে । 

চণ্ড শব্দের অর্থ কোপন , অতিশয় কোপ । 

মেধা ঋষি রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধিকে যে  চন্ডীকথা শুনিয়েছিলেন  মার্কণ্ডেয় মুনি সেই কথা তার শিশ্যদের বলেন । দ্রোণ মুনির চার শাপগ্রস্ত পুত্র পাখি হয়ে জন্মায় , তারা পিঙ্গাখ্য , বিরাধ , সুমুখ সুপুত্র । এই পক্ষী চতুষ্টয় পুরো কাহিনি জানতো । 

ব্যাসদেবের শিষ্য জৈমিনি কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে মার্কণ্ডেয় মুনির কাছে যান । মার্কণ্ডেয় মুনির হাতে সময় না থাকায় তিনি জৈমিনিকে বিন্ধ্য পর্বতে পক্ষী চতুষ্টয়ের কাছে যেতে বলেন । এই চারজন পাখি জৈমিনির কাছে দেবীর মাহাত্ম্য কীর্তন করেন । 

দেব ও দানবের যুদ্ধ । শক্তির হাতে দানবের পরাজয় ও দৈব শক্তির পুন প্রতিষ্ঠা । নানান স্তরীভূত এই যুদ্ধ । ব্যক্তিজীবনে , সমাজ জীবনে , রাষ্ট্রজীবনে , নিবিড় অধ্যাত্ম জীবনেও । 

একই ব্যক্তির মধ্যে  লুকিয়ে থাকে দেব আর দানব । একই ইন্দ্রিয়কে  ভালো ও মন্দ দুইই কাজে ব্যাবহার করা যায় । ব্যষ্টি থেকে তা যখন সমষ্টি হয়ে ওঠে তখন ভালো বা মন্দ যাই হোক না কেন তা উদগ্র ভাবে জেগে ওঠে । নারী শক্তির প্রতীক । প্রচন্ড শক্তি । চন্ড । আবার এই নারীই পরম করুণাময়ী জগজ্জননী । চন্ডী তত্ত্ব এক গভীর ও গূ ঢ় আধ্যাত্মিক রহস্য । একই নারীর বিভিন্ন রূপ ও শক্তির প্রকাশের মন্ত্র আছে চণ্ডীতে । দুষ্ট দমনের জন্য । এই দুষ্ট তো শুধু বহির্জগতে নেই । এ আমাদের অন্তরের মধ্যেও প্রতিনিয়ত যুদ্ধ ভূমি বানিয়ে চলেছে । শুধু তাই নয় প্রতিটি অসুরের নিহিতার্থ আলাদা আলাদা । তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রগুলির প্রয়োগও বিভিন্ন প্রকার । সুতরাং অসুর বা রিপু দমন যে কী সুকঠিন কাজ , দেবী মাহাত্ম্য তা বর্ণনা করেছে নিপুণ ভাবে । 

মায়ের তিনটি চোখ । ত্রিনয়না । স্থূল চক্ষু , মনশ্চক্ষু, জ্ঞান চক্ষু। গুণ তিনটি  , ত্রিগুণা , সত্ত্ব রজ তম । তিনটি ভাব , সৎ , চিদ , আনন্দ । 

ঋষি বাক রচিত দেবী সূক্তে যে আমিত্ব বা অস্মিতার কথা বলা হয়েছিল তাকে বলিদান দেওয়া অত সহজ নয় । যিনি প্রকৃত ব্রহ্মবিদ তার ভেতর থেকে অহং টি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় । 

অসুর শুম্ভ যখন দেবী চণ্ডীকে বলল , তুমি তো অনেকের বলে বলীয়ান । 

তখন মা চন্ডী বলেছিলেন , সে সব আমার বিভূতি , নানা রূপের  প্রকাশ। দেখো , আমি এক ও অদ্বিতীয় । 

শুম্ভ অসুর বধের নিহিতার্থ দেবী মাহাত্ম্যে এইভাবে বর্ণিত  আছে ,যে “আমি” কে নিয়ে লক্ষ লক্ষ জন্ম কাটিয়েছি , যে আমি কে কতবার কতরকম সাজে সাজিয়েছি , এইবারে দেখো , সেই “আমি “ আর নেই । সে নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত আত্মা ।  এখানে এসেই অদ্বৈত দর্শনের সঙ্গে চণ্ডী একাত্ম হয়ে যান ।     



 বড় ধুম লেগেছে হৃদি কমলে 

ব্রহ্মর্ষি গুরু মেধা মুনি তার কথা শেষ করলেন । পুরো বিবরণ টি অর্থাৎ দেবী মাহাত্ম্য 

 মার্কণ্ডেয় উবাচ বলে শুরু এবং শেষ ।  

রাজা সুরথ রাজ্য বিত্ত বৈভবে আসক্ত । আর বৈশ্য সমাধি স্ত্রী পুত্র সংসারের চিন্তায় মগ্ন । তারা তিন বছর সংযত মনে দেবীর আরাধনা করলেন । এই আরাধনার অন্য নাম আত্মজয় । 

রাজা সুরথ জীবাত্মা । মায়ের কাছে সে হৃত রাজ্যের পুনরুদ্ধার ও জন্মান্তরেও যেন নিষ্কণ্টক ভাবে রাজ্যসুখ ভোগ করতে পারে তাই প্রার্থনা করল । সমাধি আগে থেকেই বিষয় বিমুখ । তার ধন সম্পদ কেড়ে নিয়েছিল তার পরিবার । সে প্রার্থনা করল আত্মজ্ঞান যার ফলে সংসারে আসক্তি তার বিনষ্ট হয়ে যাক । সুরথের রাজ্য প্রার্থনা এবং সমাধির জ্ঞান প্রার্থনার অর্থ , একই  ব্যক্তির  মধ্যে এই দ্বন্দ্ব চলে । সাধক যখন মাকে পায় তখন তার মন চায় অবিরাম ভোগ আর প্রাণ চায় আত্মার সম্যকরূপে লীন হয়ে যাওয়া । এরাও রূপক । নিরবচ্ছিন্ন  সংগ্রামের আবহমান ছবি  । 

শক্তি সাধনার তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করা কঠিন । এর মধ্যে মিশে গেছে তন্ত্র সাধনা । বৌদ্ধ তন্ত্র ও এসেছে কালের গতিতে । তন্ত্রের মহামায়া তত্ত্বটি শ্রী রামকৃষ্ণ ও রামপ্রসাদ একেবারে সহজ করে বলেছেন ব্রহ্ম ই কালী , কালীই ব্রহ্ম । ব্রহ্ম ও মহামায়া অভেদ । 

বঙ্গদেশ , শক্তিসাধনার অন্যতম কেন্দ্র । এখানকার প্রবাদেই আছে জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ , অর্থাৎ চণ্ডীপাঠ নিত্য কর্মের অঙ্গীভূত । প্রতিদিনের কাজেরই একটি অঙ্গ । আর প্রত্যেক গ্রামে একটি চন্ডী মন্ডপ থাকতোই । 

ষোড়শ শতাব্দীতে মঙ্গল কাব্যের জোয়ার এসেছিল । চণ্ডী মঙ্গল কাব্যের চণ্ডী অরণ্য দেবতা অভয়া । তিনি লোকায়ত দেবী , মা মঙ্গল  চন্ডী ।

চণ্ডী এমন একটি দর্শন যার কেন্দ্রে রয়েছে নারী শক্তির জাগরণ । পুরুষের যা শক্তি সেও নারীর কাছ থেকেই । প্রকৃতি না হলে পুরুষের ভূমিকা কোথায় ? 

ঋক বেদের বাক বা দেবী সূক্তের কাছে আবার ফিরে যাই । সপ্তশতি চণ্ডী বা দেবী মাহাত্ম্যের আকর সেই আটটি সূক্ত যা মহিলা ঋষি বাক রচনা করেন তাতে বলা হয়েছে 

আদি পরাশক্তি । তিনি পরম ব্রহ্ম । দুর্গা লক্ষ্মী সরস্বতী তাঁর বিভিন্ন প্রকাশ । “ প্রথম আদি তব শক্তি "

এইখানে এসে ধরা পড়েছে সমগ্র  ব্রহ্মান্ড । সমস্ত বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি তত্ত্ব ।

অদ্বৈত বেদান্ত তো বটেই চন্ডীতত্ত্ব আমাদের গীতার কথাও মনে করিয়ে দেয় । চন্ডীর পুরো কাহিনি যেন গীতার অর্জুন বিষাদ যোগের সংশয় দুঃখ ও দ্বিধা  থেকে মোক্ষ যোগের পরম সমর্পণ ও নির্বাণে  বিধৃত । আর দুটির পটভূমিতে রয়েছে যুদ্ধ । নিরন্তর যুদ্ধ চলছে অন্তরে , বাহিরে । শুভ আর অশুভের মধ্যে ।    মধু কৈটভ নিধন সত্য প্রতিষ্ঠা ।  মহিষাসুর বধ , চৈতন্য প্রতিষ্ঠা  ।  শুম্ভ নিশুম্ভ বধ আনন্দ প্রতিষ্ঠা । 

কুলকুণ্ডলিনী জাগরণের সঙ্গেও মাতৃ আরাধনার অনুষঙ্গ চলে আসে । চরম অবস্থায় হৃদ কমলে ধুম লেগে যায় । 

মানুষের মধ্যে থাকে দুটি প্রবৃত্তি  বা প্রকৃতি । একটি নারী ও একটি পুরুষ । ইংরেজিতে যাকে বলে ফেমিনিন  ও ম্যাসকুলিন । এই দুই এর সামঞ্জস্যে একটি পূর্ণ মানুষ তৈরি হয় । 

প্রখর  তেজ ও  রুদ্র রূপের সঙ্গে ধী ও কল্যাণশ্রীর সংযোগে এক পূর্ণ মানব বা পূর্ণ মানবী ।

চণ্ডী যেন তার প্রতীক । একই হাতে সংহার করছেন , বরাভয় দিচ্ছেন , রক্ষা করছেন , পালন করছেন । নারী পুরুষ বিভাজন ব্যতিরেকে সেইই তো প্রকৃত মানুষ । 

অন্যদিকে  সম্পূর্ণ নারী প্রকৃতি বিবর্জিত যে পুরুষ সেখানে শুধুই শক্তির আস্ফালন ,  মদমত্ততা , হিংসা , লোভ মাৎসর্য ভোগ ও শঠতা । আগ্রাসন ।  সমস্ত অসুরকুল তার প্রতিভূ ।  

চণ্ডী কেন প্রাসঙ্গিক  তার উত্তর এখানেই নিহিত আছে । এমনই এক দেবী , যদি নারী বা পুরুষ বিবর্জিত অর্থে ধরি তাহলে বলতে হয় এমন এক শক্তি বা এমন এক সৃষ্টি যার মধ্যে একটি আদর্শ ও সম্পূর্ণ  এক বলিষ্ঠ স্বপ্নের মানুষকে আমরা খুঁজে পাই, যা আমাদের আরাধনা  বা অন্বেষণ  ।একই সঙ্গে  রৌদ্র তেজ ও পরম করুণা । চন্ডীর রচয়িতাগণ এক মহীয়সী দেবীর মধ্য দিয়ে মানবতার গুণগুলিই রূপায়িত করেছেন । 

তবু ধন্দ যায় না মন থেকে ,শুম্ভ দেবীকে আকাঙ্ক্ষা করল , বলল রমণী রত্ন । 

দেবীর উদগ্র শক্তি ও অনমনীয়তা দেখে সেই রমণী রত্ন হয়ে গেল দুষ্ট রমণী । 

এই হল সার্বিক দৃষ্টি ।চণ্ডী তার বাহ্যিক রূপকল্প আর গভীর আভ্যন্তরীণ তত্ত্ব দর্শন নিয়ে পুরুষ তান্ত্রিক সমাজে একটি প্রকট প্রহেলিকার মত যুগ যুগ ধরে অট্টহাস্য করে চলেছে !

 

ছবি: বিধান দেব      





গদ্য ।। রাজীব ঘোষাল

 



দুর্গাপূজা ও কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথা  

 

   আজকের দিনে দুর্গাপূজা বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব হলেও মাত্র তিন থেকে পাঁচ শত বছর পূর্বেও এই পূজার প্রচলন ছিল নিতান্তই হাতে গোনা। তবে একথা বলাই যায় যে একাদশ শতকে মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তি তরঙ্গিনীত দুর্গাবন্দনার উল্লেখ পাওয়া যায়। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় ১৫১০ সালে কোচবিহার রাজা বিশ্ব সিংহ দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। কোলকাতার বরিশায় রায়চৌধুরী পরিবারে পূজার প্রচলন ১৬১০ সালে। আবার উড়িষ্যার রামেশ্বরপুরে চারশ বছর ধরে দুর্গাপূজা চলে আসার ইতিহাস পাওয়া যায়। পাটনাতে ১৮০৯ সালের দুর্গাপূজার ওয়াটার কালার ডকুমেন্ট পাওয়া যায়। হুগলীর গুপ্তিপাড়ায় প্রথম ১৭৬১ সালে বারোয়ারি দুর্গাপজার উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৭১১ সালে অহম রাজ্যের রংপুরে নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের দূত রামেশ্বর নয়ালঙ্কার। শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব দুর্গাপূজার মধ্যে দিয়ে সিরাজের পরাজয় উদযাপন করেন। ১৯২৬ সালে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে অতীন্দ্রনাথ বোস সবাইকে পূজায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান।

   দুর্গাপূজার প্রথম প্রচলন কবে কোথায় কিভাবে হয়েছিল তার সঠিক উল্লেখ পাওয়া দুষ্কর। মূল রামায়ণে রামচন্দ্র কর্তৃক রাবণ বধের জন্য দুর্গাপূজার উল্লেখ নেই তবে কৃত্তিবাসী রামায়ণে এই অংশটি বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে চেদী রাজবংশের রাজা সুরথ খ্রীস্টের জন্মের তিনশ বছর আগে কলিঙ্গে দুর্গাপূজার প্রচলন করেছিলেন। নেপালে এই পূজা দশেরা বা দাঁসাই নামে পালিত হয়ে থাকে । দেবী দুর্গার বাসন্তী রূপের অকাল বোধন শরতে হয়েছিল বলেই এটি অকাল বোধন নামেও পরিচিত। তবে অনুমান করা যায় দ্রাবিড় সভ্যতায় মাতৃতান্ত্রিকতা থেকে অথবা শৈব সিন্ধু সভ্যতার পশুপতির অর্ধাঙ্গিনী হিসেবেও দেবী দুর্গার পূজা প্রচলন হয়ে থাকতে পারে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে কৃষ্ণকে দুর্গাপূজার প্রবর্তক বলা হয়েছে।“প্রথমে পূজিতা সা চ কৃষ্ণেণ পরমাত্মন।/ বৃন্দাবনে চ সৃষ্ট্যাদ্যৌ গোলকে/রাগমণ্ডলে।’’।দ্বিতীয়বার দুর্গাপূজার উল্লেখ ব্রহ্মা কর্তৃক মধু ও কৈটভ নামের দৈত্যদের হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্য করেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। “মধুকৈটভভীতেন ব্রহ্মণা সা দ্বিতীয়তঃ।’’।এবং তৃতীয় ও চতুর্থবার শিব ও দেবরাজ ইন্দ্র দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু মর্তে ক্ষীরোদসাগরের তীরে দেবীর মাটির মূর্তি বানিয়ে পূজার প্রচলন করেন।

  মূর্তিপূজার ক্ষেত্রে দেখা যায় দশহাতের দেবী দুর্গার মূর্তির প্রচলন এছাড়া সঙ্গে গণেশ কার্তিক লক্ষ্মী সরস্বতী মহিষাসুর এবং বাহন হিসেবে প্যাঁচা ইঁদুর হাঁস ময়ূর সিংহ ও মহিষের উপস্থিতি। লক্ষ করা যায় দেবী দুর্গার হাতে সাপ। সম্ভবত এর প্রতিটিই প্রতীকী। কোথাও দেখা যায় সাবেকি ঢঙের একচালার প্রতিমা আবার কোথাও পৃথক পৃথক মূর্তি। অনেকেই মূর্তিকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন। কেউ কেউ মূর্তি পূজার বিরোধিতাও করেন। এক্ষেত্রে বলা যায় দুই পন্থাই সঠিক। যারা অতি সাধারণ যাদের কাছে বিশ্ব চরাচরের পরিচয় এখনো রহস্যময়তার আবরণে মোড়া তারা মূর্তি পূজায় আস্থা রাখেন অন্যথায় তারা দিগভ্রষ্ট হবার আশঙ্কায় ভোগেন। যারা বিশ্বজনীনতার জ্ঞান লাভ করেছেন তারাই নিরাকার ব্রহ্মে বিশ্বাস রাখতে পারেন। এছাড়া মূর্তি পূজার মধ্যে দিয়ে শিল্পীর শিল্প সত্ত্বারও স্বীকৃতি লাভ ঘটে।

  বর্তমানে বহু চিন্তক মানুষ এইসব উৎসব অনুষ্ঠানের বদলে এই টাকা শিল্পে বিনিয়োগের পক্ষে সওয়াল করে থাকেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গীও সমাজের পক্ষে হিতকারী বলেই মনে করেন অনেকে। এক্ষেত্রে কিছু পরিসংখ্যানের দিকে নজর রাখা যেতে পারে। যদি ধরা যায় সারা বাংলায় আশি হাজার পুজো অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে তাহলে গড়ে দেড় লক্ষ টাকার হিসেবে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ১২০০ কোটি টাকা। এতে একটা দুটো বড় ইন্ডাস্ট্রি হবে ঠিকই কিন্তু তাতে কর্মসংস্থান হবে বড় জোর কুড়ি হাজার লোকের। এই পূজা নামক ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে দিয়ে সম্ভবত ছয় সাত লক্ষ লোকের তিন মাসের কর্মসংস্থান হয়ে থাকে। একে বছরে হিসেব করলে দাঁড়ায় দেড় লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান। এছাড়া বস্ত্র নির্মাণ পাদুকা শিল্প মিষ্টান্ন ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও বহু কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হয়। তাই বহু মানুষের বর্ষভিত্তিক রুজিরোজগারের কোনো স্থায়ী সমাধান না ভেবে একটি চিরাচরিত ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলার ভাবনা কতটা যুক্তিযুক্ত তাও বিবেচ্য।

  একটা সময় দুর্গাপূজাকে রাজসিক পূজা বলা হলেও বর্তমানে তা সর্ব্বজনীন পূজায় পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ সবার জন্য অনুষ্ঠিত পূজা। দুর্গাপূজা আক্ষরিক অর্থেই সর্ব্বজনীন পূজা । পুজায় প্রতিমার খড়ের যোগান দেন চাষী। কুমোর ছুতার মাটি দিয়ে বানায় প্রতিমা। এছাড়া ডোম মালি ব্রাহ্মণ থেকে ময়রা সকলেই অবদান রাখেন । কখনো কখনো লোকদেখানো আত্মপ্রচারকরা ছোঁয়াছুতের ধুয়ো তোলেন। এতে করে একই এলাকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদের বাতাবরণ তৈরী হয়। তবু এর মধ্যেই আবার সম্প্রীতির নজির গড়ে ওঠে আলিঙ্গন দৃশ্য অন্য সব স্বার্থগন্ধকে দূরে ছুড়ে ফেলে। নৌকা দোলা কিংবা গজে অথবা ঘোড়ায় দেবীর আগমন হয়। উৎসবের আনন্দে ভেদাভেদ দূর হয়। বেজে ওথে আগমনী …


ছবি:  বিধান দেব 


ধারাবাহিক গদ্য ।। দীপক হালদার


 



ডায়মন্ডহারবারেসাহিত্য চর্চার ইতিবৃত্ত 



দীপক হালদার


যে ভূমি এরকম ফলবতী হয়ে উঠছে, যার অন্তঃসলিলা উর্বরতা ক্রমশ সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রকে আরও আকর্ষণীয় আকাশের ছায়াতল বিছিয়ে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, জানতে ইচ্ছে করে তার ভৌগোলিক অবস্থান।

পরায়ত্ত পরগনার গবেষকের সিদ্ধান্ত অনুসারে 

ডায়মন্ডহারবার ভূগোলকের বাইশ ডিগ্রি এগারো মিনিট এবং বাইশ ডিগ্রি দশ মিনিট উত্তর অক্ষাংশে আর আশি ডিগ্রি এগারো মিনিট এবং আশি ডিগ্রি বারো মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত ।কলকাতা ফোর্ট উইলিয়াম থেকে চিংড়ি খাল ফোর্ট, ডায়মন্ডহারবার, হুগলি নদীপথে একচল্লিশ নটিক্যাল মাইল বা পঁচাত্তর দশমিক ছ'শ পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূরত্ব।এখান থেকে আটচল্লিশ নটিক্যাল মাইল দূরে নদীর সমুদ্র সঙ্গম স্থল ,যেখানে সাংখ্য দর্শন প্রণেতা নিরীশ্বরবাদী মহামুনি কপিল খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শ চল্লিশ অব্দে আর্য ভারতের মুনিঋষিগণ কর্তৃক নির্বাসিত হয়ে এসেছিলেন। সারা ভারতের পূজিত কপিলের আশ্রম ডায়মন্ডহারবার মহকুমার অন্তর্গত দক্ষিণ সাগর ভূখেন্ডর অংশবিশেষ ।

                          ইতিহাসের উপাদানের মতো সাহিত্য চর্চার উপাদানও যোগান দেয় দেশ জাতি সময় কাল ও মানুষ ।স্থানিক প্রাকৃতিক পরিবেশ, সামাজিক গঠন ও অবস্থা ,তার ইতিহাস ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সম্পদ, লৌকিক দেবদেবী, উৎসব, আচার আচরণ, অনুষ্ঠান,পোশাক পরিচ্ছদ ,ভাষা স- ব সমস্ত কিছু সাহিত্য চর্চার শরীরে রসদ যোগায়।যেখানে, যে ভূমিতে ওসবের আধিক্য বেশি সেখানকার সাহিত্য তত বেশি রসসিক্ত ও উপাদেয় হয়ে ওঠে ।

               ডায়মন্ডহারবারের অবস্থানে প্রকৃতি দুহাত উপুড় করে ধরে দিয়েছেন তাঁর দাক্ষিণ্য।

      এই মহকুমার দক্ষিণাংশের খাড়ি পরগনা, পাল যুগের খাড়ি মন্ডল এবং সেন যুগের ব্যাঘ্রতটি মন্ডল ।এর ভূ গঠনে অস্থিরতার ইতিহাস, নদীগুলির ভাঙাগড়ার প্রক্রিয়ায় নির্ভরশীল এগুলো ছিল সুন্দরবন । এই বন, মহাভারতের তেরটা মহাবনের একটি, আঙ্গিরিয়া অরণ্যের একাংশ । অয়নবৃত্তীয় প্রভাবিত বন। লিটোরাল ফরেস্ট । সুন্দরী বৃক্ষের আধিক্য হেতু নাম সুন্দরবন ।

        মহাভারতে, রঘুবংশে এবং কয়েকটি পুরাণে গাঙ্গেয় বদ্বীপের এই অংশের উল্লেখ আছে । টলেমি এবং পেরিপ্লাস থেকে জানা যায় গঙ্গারিদের রাজা গঙ্গে বন্দরে বাস করতেন।

           কাকদ্বীপ অঞ্চলের অধিবাসী গবেষক 

শ্রী নরোত্তম হালদার মহাশয় গঙ্গারিদ বা গঙ্গারিড নিয়ে খুব উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন ।প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনাসহ বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সংগ্রহ করেছেন ।তিনি এভাবেই তাঁর চর্চার রসদ সংগ্রহ করেছেন ।

             ডায়মন্ডহারবারের নদী তীরবর্তী দেউলপোতা প্রাচীন কাব্যের বিষয় ।এখানে প্রস্তর যুগ থেকে প্রাচীন হিন্দু যুগের পুরা উপকরণ পাওয়া গেছে বিভিন্ন সময়ে ।

প্রাচীন ভাগীরথী এবং আদি গঙ্গা ও তার শতধাবিভক্ত শাখা ও উপনদীগুলি এর সমতলভূমিকে বারবার নিয়ন্ত্রিত করেছে এবং নিজেরা তাদের প্রবাহ পথে পলি জমিয়ে ভূগঠন ক'রে নদী প্রবাহ অন্য পথ খুঁজে নিয়েছে।

      বিপ্রদাস পিপলাই এর মনসামঙ্গল কাব্যে,কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল কাব্যে,চৈতন্যভাগবতে এসমস্ত ভূখেন্ডর গ্রামগুলোর বিবরণ পাওয়া যায় ।


1845 সালে সারা বাংলার জেলাগুলোতে মহকুমা সৃষ্টি হয় ।তারই ফলশ্রুতি হিসেবে 1862 সালে ডায়মন্ডহারবার নামে মহকুমা সৃষ্টি হয়।মহকুমা সদরের প্রয়োজন মত ডায়মন্ডহারবারে চারটি মুন্সেফ কোর্ট, একটি সাব রেজেস্ট্রি অফিস, একটি নতুন ডাকঘর, ইলেক্ট্রিক টেলিগ্রাফ অফিস, একটি চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি এবং একটি হাইস্কুল গড়ে ওঠে ।ওই সমস্ত কাজের জন্য বিভিন্ন অফিসের অফিসার ও নিযুক্ত হন ।

                1864 সালে ডায়মন্ডহারবারে ভয়াবহ সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস হয়।ওই জলোচ্ছ্বাসে ও ঝড়ে জন এইটকেন নামে একজন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, তাঁর স্ত্রী এবং শিশুপুত্র মারা যায় ।

              ওই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ইংরেজ সরকার দুর্যোগকবলিত এলাকায় সেবাকার্যের সুবিধার জন্য একজন বাঙালি অফিসার পাঠানোর প্রয়োজন অনুভব করেন ।সেইমতো  যে বাঙালি অফিসার এখানে ডেপুটি ম্যাজিসেট্রটের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তিনি হলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ।তখন তাঁর বয়স ছাব্বিশ বছর ।সেসময়ে তাঁর প্রথম উপন্যাস 'Rajmohan's Wife' ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল কিশোরীমোহন মিত্র মহাশয় সম্পাদিত 'ইন্ডিয়ান ফিল্ড' পত্রিকায়। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধ্বস্ত ডায়মন্ডহারবারের জলহাওয়া তাঁর শরীরের পক্ষে অনুকূল না হওয়ায়, তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় তাঁকে তিন মাস পরে অন্যত্র বদলি করা হয়।এই অন্যত্র বারুইপুর বলে অনুমান করা হয়ে থাকে ।

              নেহাত কাকতালীয় বলে মনে হলেও,বঙ্কিমচন্দ্রের ছোঁয়া পেয়ে ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্য চর্চায় উৎসুক প্রাণ যেন নতুন করে নিজেকে ফিরে পেল।শুরু হলো আত্মপ্রকাশের পথ অন্বেষণ ।কিছুটা দেরিতে হলেও 1906 খ্রিস্টাব্দে ডায়মন্ডহারবার থেকে প্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।হরিপদ ঘোষ এর সম্পাদনায়  সাপ্তাহিক পত্রিকা 'চব্বিশ পরগনার বার্তাবহ'   আত্মপ্রকাশ করে ।নবজাতকের উচ্ছ্বাসে ডায়মন্ডহারবারে তখন  'বসন্তের দখিনা পবন বলিতেছে,পাল উড়াইয়া দেও ' অবস্থা ।মূলত সংবাদ পরিবেশন পত্রিকাটির ধর্ম হ'লেও,সেই ধর্মে দীক্ষিত মানুষজনের মধ্যে যে আলোড়নের সৃষ্টি হলো তা অভাবনীয়, অতুলনীয় ।পত্রিকার সম্পাদকীয়তে যে সব রচনা থাকতো, পত্রিকায় যেসব মতামত বিশ্লেষিত হতো, তাতে যে অনুপরিমান সাহিত্যের স্বাদ থাকতো, সেই স্বাদে যে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটত তা বলাই বাহুল্য ।

              1912খ্রিস্টাব্দে ডায়মন্ডহারবার থেকে প্রকাশিত হয় ভিন্নধর্মী একটি পত্রিকা, নাম  'মাহিষ্য সুহৃদ  '।সম্পাদক ছিলেন  হরিপদ হালদার ।মাহিষ্য শ্রেণীর মানুষজনের মধ্যে পত্রিকাটির প্রচার - প্রসার  যে আধিক্য পাবে তা স্বাভাবিক, কিন্তু অন্যান্য পাঠপিপাসু মানুষের কাছেও পত্রিকাটি বিশেষ আগ্রহের উদ্রেক ঘটিয়েছিল ।

           1913খ্রিস্টাব্দের  22 শে মার্চ পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধি সম্পাদিত  'ডায়মন্ডহারবার হিতৈষী ' পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।ডায়মন্ডহারবারের নিকটস্থ পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা মহেন্দ্রনাথকে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং 'তত্ত্বনিধি ' উপাধি প্রদান করেছিলেন ।রানী রাসমণির স্নেহধন্য মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধি সমগ্র ডায়মন্ডহারবারের গর্ব ।শোনা যায় আলামোহন দাশের সাথেও তাঁর সম্পর্ক ছিল তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় তাঁরই কর্ষিত ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সাহিত্যের ফসল ফলতে শুরু করে ।


দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা সংস্কৃতি পরিষদ্ বিগত বহু বছর ধরে পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধির নামে এক সাহিত্য পুরস্কার ও সম্মাননা চালু রেখেছে ।প্রত্যেক প্রজাতন্ত্র দিবসে হুগলি নদীর তীরবর্তী ঋষি  অরবিন্দ উদ্যানে মধ্যাহ্ন বেলায় দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কোনো কবি, গল্প লেখক, ঔপন্যাসিক ,গবেষক বা প্রবন্ধকারকে পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধি পুরস্কার ও সম্মাননা দিয়ে সম্বর্ধনা করা হয়ে থাকে ।

ঋষি অরবিন্দ উদ্যানে বটবৃক্ষের তলায় ঋষি অরবিন্দের চিতাভস্ম রক্ষিত আছে ।বিপ্লবী ঋষি অরবিন্দের নামানুসারে তাঁর জন্ম শতবর্ষে শহীদ স্তম্ভ স্থাপন এবং  ওই স্থানটির নামকরণ করা হয় ঋষি অরবিন্দ উদ্যান ।


মাটির তলায় যেমন জলের সম্ভার,তেমনই অতীতের অতলে সম্পদের অপরিমান সমাহার ।ডায়মন্ড হারবারের অতীত যে কতো হীরকদ্যুতিতে উজ্জ্বল তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয় ।

ডায়মন্ড হারবারের নিকটস্থ বড়িয়া গ্রাম সেরকম একটি স্বর্ণপ্রসু ক্ষেত্র।বড়িয়াকে সাধারণভাবে এলাকার লোকজন বোড়ে বলে ডেকে থাকে ।বোড়ের সাথে সাথে বোলসিদ্ধি নামটিও উচ্চারিত হয়ে থাকে । আসলে বোলসিদ্ধি পাশ্ববর্তী লাগোয়া একটি গ্রাম ।

এই বড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা শিক্ষা ও সংস্কৃতি জগতের এক প্রণম্য ও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ।শুধু উল্লেখযোগ্য বললে কম বলা হয় ।ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের তিনিই প্রথম ভারতীয় ভাইস চ্যান্সেলর (  1890---1892 ) ।অনেক কীর্তিতে কীর্তিমান এই মানুষটির মেধা ও মনীষার পরিচয়  তাঁর সৃষ্টিসমূহে বিদ্যমান ।তাঁর রচিত  'জ্ঞান ও কর্ম ', ' শিক্ষা ', 'এ ফিউ থটস্ অন এডুকেশন ' এবং ' দি এডুকেশন প্রব্লেম ইন ইন্ডিয়া ' বিখ্যাত । এছাড়া ঠাকুর আইন অধ্যাপক হিসেবে তাঁর প্রদত্ত বক্তৃতা  'হিন্দু ল অফ ম্যারেজ এন্ড স্ত্রীধন 'পুস্তক আকারে প্রকাশিত এবং  এ বিষয়ে একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামানুসারে ডায়মন্ডহারবারের পরের স্টেশনের নামকরণ করা হয় গুরুদাস নগর ।জানা যায় গুরুদাসবাবু পরবর্তীকালে  কলকাতার নারকেল ডাঙায় মামার বাড়িতে থাকতে শুরু করেন।

                      

    স্বর্ণপ্রসূ ডায়মন্ডহারবারের অতীত যে আরও কতো মুক্তো বুকে ধারণ করেছে তা জানলে বিস্ময়র অবকাশ থাকেনা।

ডায়মন্ডহারবারের নিকটবর্তী আরও একটি গ্রাম নেতড়া বা নিতাড়া কিংবা ন্যাতড়া। বড়িয়ার লাগোয়া বোলসিদ্ধি গ্রামও একটি রত্নপ্রসবিনী গ্রাম।

     ' হাসিখুশি  '  'খুকুমনির ছড়া ' গ্রন্থের জনক প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার ছিলেন নেতড়া বা ন্যাতড়া গ্রামের কৃতী সন্তান ও বাসিন্দা ।তাঁর রচিত তিরিশখানি ছড়াগ্রন্থ ও গল্পগ্রন্থ শিশুসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ ।এছাড়া শিশুদের উপযোগী একুশখানি পৌরানিক কাহিনী নির্ভর গ্রন্থ রচনাও তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তির সাক্ষ্য বহন করে ।ওসব ছাড়াও তের- চোদ্দ খানা স্কুলপাঠ্য গ্রন্থও রচনা করেন যোগীন্দ্রনাথ সরকার ।

            নেতড়া গ্রামের আর এক কৃতবিদ্য সন্তান যোগীন্দ্রনাথ বসু ।বাংলা সহিত্যের

 খ্যাতিমান জীবন চরিতকার এই মানুষটিকে 

সম্মাননা জানানোর জন্য স্যার আশুতোষ, স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়প্রমুখ মনীষীগণ প্রকাশ্য সভায় তাঁকে  ' কবিভূষণ ' উপাধিতে ভূষিত করেন । তাঁর রচিত 'মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন চরিত্র 'গ্রন্থটি বর্তমানকাল পর্যন্তও গবেষণামূলক  প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।এছাড়া  তাঁর উল্লেখযোগ্য অন্যান্য গ্রন্থসমূহ হলো 'অমর কীর্তি অথবা ফাদার দামিয়েনের জীবন চরিত্র  ' , 'অহল্যাবাঈ ', ' শিবাজী  ', 'পৃথ্বীরাজ ', 'তুকারাম চরিত্র ', 'দেববালা 'প্রভৃতি ।'সুরভি 'নামে একটি সাপ্তাহিকপত্রিকা ও সম্পাদনা করতেন  যোগীন্দ্রনাথ বসু । 'ভারতের মানচিত্র ' শীর্ষক একটি প্রসিদ্ধ কবিতার ও তিনি রচয়িতা ।

এই সমস্ত কৃতী মানুষজনের কর্ষিত ক্ষেত্রেসময়ে ডায়মন্ডহারবারের মাটিতে সাহিত্য চর্চার নিত্যনতুন ফসল ফলতে শুরু করে ।উদ্ভাবনা দেখা দেয় নব উদ্যমে পত্রিকা প্রকাশ করায়। যার পরিধি বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত বিস্তৃত ।


মাটির গভীরে যেমন জলের অফুরন্ত সঞ্চয় আমাদের তৃষ্ণা নিবারণে এবং প্রয়োজন মেটাতে সদা সচেষ্ট তেমনই অতীত তার অন্তর্জগতে যে অপরিসীম ভান্ডার সঞ্চিত রেখেছে তার পরিমাণও কম নয় ।

স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামানুসারে ডায়মন্ডহারবারের পরবর্তী গুরুদাস নগর স্টেশনে গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবক্ষ মর্মর মূর্তি ও ফলক স্থাপিত হয়েছে।

শিশু সাহিত্যের যাদুকররূপে খ্যাতিমান যোগীন্দ্রনাথ সরকার দারিদ্র্যের কারনে কলকাতার সিটি কলেজে এম এ পড়া অসমাপ্ত রেখে সিটি কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষকতার কাজে ব্রতী হন।পরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে  ' সিটি বুক সোসাইটি ' নামে একটি পুস্তক প্রকাশন সংস্থা গড়ে তোলেন ।শিশুদের বর্ণপরিচয় নতুনভাবে লিখতে গিয়ে লেখেন-------

'অ--- অজগর আসছে তেড়ে ,' 'আ------ আমটি আমি খাব পেড়ে ', ' ক------ কাকাতুয়ার মাথায় ঝুঁটি, ' 'খ------- খেঁকশিয়ালী পালায় ছুটি 'কিংবা  'হারাধনের দশটি ছেলে ' ইত্যাদি । আঠারো শ একানব্বই সালে প্রকাশিত 'হাসি ও খেলা' , আঠারো শ সাতানব্বই সালে প্রকাশিত হাসিখুশি প্রথম ভাগ,খুকুমনির ছড়া ছাড়াও তাঁর লেখা  'বনে জঙ্গলে ' , 'জানোয়ারে জানোয়ারণ্য' অত্যন্ত শিশুতোষ বই হিসেবে পরিচিত ।পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর প্রেরণায় তাঁর  'মুকুল ' পত্রিকায় শিশুদের উপযোগী লিখে তিনি   যথেষ্ট খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন ।

               ডায়মন্ডহারবার মহকুমার অন্তর্গত শ্যামবসুর চক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন চারুচন্দ্র ভান্ডারী ।জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই ত্যাগী অহিংস আন্দোলনের   যোদ্ধা 'সর্বোদয় 'নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন ।অর্থনীতিতে এম এ চারুচন্দ্র পরে এল এল বি পাশ করে জনপ্রিয় আইনজীবী হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন ।ঊনিশ শ তিরিশ সালে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন ।দশবছর কারাবরণও  করেন তিনি ।স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের খাদ্যমন্ত্রীর পদও অলংকৃত করেছিলেন ।পরে কংগ্রেস ছেড়ে কৃষক মজদুর প্রজা পার্টির হয়ে অংশ গ্রহণ করেন এবং বিজয়ী হন।পরবর্তী সময়ে আচার্য বিনোবাভাবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিধানসভার পদ সহ সমস্তরকম দলীয় রাজনীতি থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করেন ।

                                                                  ক্রমশ 


ছবি: বিধান দেব 


ধারাবাহিক গদ্য ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত


 

সাধনপর্বের  নির্জনতা ।। দ্বিতীয় পর্ব 



৩.

মা জানো , খেলার মাঠে ছবির খাতাটা আমি
হারিয়ে ফেলেছি । চারিদিকে কত খুঁজলাম
বকুলগাছটার নিচে অশথগাছটার  নিচে । তারপর
ওরা সব চলে গেল , অন্ধকার হয়ে এলো, আমি
ফিরে আসবার পথে কান্না এক  কী ভীষণ ভয়!
মা জানো, এখনি যেতে ইচ্ছে হয় দুরন্ত বাহিরে,--
আমি যে একটি গাছ  এঁকেছিলুম , একটি আকাশ
মাঠে বড় - বড় গাছ - আকাশের নিচে
আমার ছবিটা মা যে যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠবে ।
                                                ( ' ভয় ' )

আলোক সরকারের কবিতা ' ভয় '। কবিতাটি পাঠের  সময় একটা ছবি চোখে ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল। মিলিয়ে গেলই বা বলছি কেন। বেশ কয়েকবার তারা তুমুল আবেদন রেখে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিল। কবির বাড়িতে যাঁরা গেছেন , তাঁরা জানেন ফ্ল্যাটে ঢোকার আগে বাঁহাতে একটি মাঠ অবস্থান করছে। একধারে গম্বুজের মতো কিছু একটা পুরোনো গঠন দাঁড়িয়ে থাকে যাবতীয় রহস্য নিয়ে ।

তা কেন সেই মাঠটির প্রসঙ্গ মনে এল। যতবার পড়ছি , ঐ ' খেলার মাঠে' র শুরুর কথাতেই ফিরে ফিরে আসছে ছবিটা । তারপর সেটি কেটে যেতেই মেঘ ছায়া সরিয়ে উঁকি দিচ্ছে আরো এক শৈশব। সে শৈশব আমার । গতিপথ না জানা এক কিশোরের জোরদার নিরুদ্দেশ যাত্রা ।  সেখানে সবুজ নিয়ে লোফালুফি খেলছে আমার বন্ধুরা ।

তবে কবি আরো কিছু তন্ময় ।  ছবি আঁকার খাতা নিয়ে চলে যান খেলার মাঠে । খেলার-মাঠ কেন ?চার দেওয়ালের মধ্যে যে সীমারেখাটি  আছে , তা নেই বলে । নাকি গাছ আঁকবার বিষয়  বলেই প্রকৃতির সান্নিধ্য চাই , চাই মুক্ত বায়ু - জল - মাটি। শিল্পকর্মের শর্ত  কি একই কথা বলে না ।  তা সেই আত্মখাতাটি হারিয়ে ফেলা সত্যিই যন্ত্রণার । দীর্ণ হয়েছেন কবি ।  বহু খুঁজেছেন ।  তাঁর পরিচিত বকুল তলায় তাকে খুঁজে পাননি ।  খুঁজে পাননি অশত্থ গাছের তলাতেও। যদি বলি ,  তিনি যথেষ্ট সময়ও  পাননি খুঁজে দেখবার  । কারণ , ' অন্ধকার হয়ে এল', এমনকি ' ওরা সব চলে গেল '। কারা চলে গেল আর অন্ধকারই  বা কে ? কবির কি কোনো বন্ধু ছিল সেই প্রসন্ন যাত্রাপথে । কারো কথা আমরা পাইনি । অথবা অনাবশ্যক বিবেচনা করে কবি হয়তো উল্লেখ করেননি । এখন একা হয়ে পড়া জীবনে যে তাদের চাই ।  এই অন্ধকার তো সত্যিকারের অন্ধকার নয়। বরং এই আলোহীনতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অন্তর্নিহিত সত্য । একটি গাছ আর আকাশ আঁকা ছবির খাতাটি শুধু আঁকার খাতা নয় ।  সে যেন প্রতিনিধি ওই শৈশবের ।  বীজের ভেতর যেভাবে  গাছের স্বপ্ন নির্জনে থাকে । ---

" ঢেউয়ের পরতে আমি যে-বীজ ছড়াই
ফাটে তা ডুবন্ত চাপে ,
অনেক অঙ্কুর ভাসে
জীয়ন্ত আবেগে আর আমার মুখের চারিদিকে
জ্যোতি হয়ে চায় ঝলকাতে। "
                      ( ' জাগর '।  অরুণ মিত্র ।)

বড়োদের সমাজে যার হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল ।  অমোঘ সেই সত্যকেই মনের অস্থিরতা দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে । এ এক  বার্তা । জীবনের বার্তা। যে জীবন ইট চাপা ঘাসেদের মতো হলুদ হতে চায় না।  চায় না নিজস্ব প্যালেট ভরে উঠুক কালো রঙে।

            কবিতাটি পড়তে পড়তে  সম্মোহনের মতো কিছু একটা ঘিরে ধরে । সে  কি আশাবাদ ! নাকি দুঃশ্চিন্তা ।  কোনটা  ;  এখনো বুঝতে পারিনি ।  তবে একটি ভালো কবিতা পড়ার স্বাদ মনে লেগে রইলো জীবনভোর।

৪.

বারবার এখানে এসেছি অফিস ছুটির পর , একা
ফলের দোকান ছিল দারুণ উজ্জ্বল, তার পাশে
                                            মুক্ত - ডানা মেয়ে ।
এ শহরে কতদিন আছি ?
তরুণ কবির পাশে বসে থেকে কেটেছে সময়।
মেয়েদের স্বনির্ভর জীবিকা - সন্ধান , তার পাশে
                   মৃত্যুর কবিতা,  তার পাশে  হিম ---
এইসব দেখে বারবার চমকে উঠেছি ।
মুখোশের পাশে দেখেছি দস্তয়েভস্কির বই ,ইডিয়ট,যা  ঝুঁকে পড়ে তুলে নিতে গিয়ে বুঝেছি অন্ধের হাত
                                        এগিয়ে আসছে ।

এ শহরে অপরিচিতের মতো বহুদিন ঘুরে বেরিয়েছি
                                                           একা একা ।
আমাকে চিনবে না ?
                                              ( ' এ শহরে ' )


কালীকৃষ্ণ গুহর  এই কবিতাটি যত পড়ছি , ততই নিজেকে সময়ের নিরিখে ধরার ইচ্ছেটি প্রবল হয়ে উঠছে। তখন সবে এম . এ. পাশ করেছি ।  চাকরির চেষ্টা চলছে ।  সেই সঙ্গে চলছে অলস শিল্প- সাহিত্য চর্চা ।  মূর্তি গড়ার কাজ শিখছি পাড়ারই এক দাদার কাছে ।  সঙ্গে রিলিফের সত্যানুসন্ধান । একটু বেলা হলে শুরু হতো এ সমস্ত ক্রিয়াকর্ম ।  বাবা - মাও  বারণ করার মতো কিছু দেখতেন না । ফলত আমার অবাধ গতি তৈরি হয় অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করার উদ্দেশ্য নিয়ে ।  সেই মাহেন্দ্রক্ষণ- এ মেজোমামার আবির্ভাব এবং চাকরির প্রস্তাব ।  অঞ্চল : শিবপুর। কর্ম : সুপারভাইজার ।  লেখাপড়ার জগত থেকে দূরে শুধু নয়  ,  সম্পূর্ণ আলাদা । লেবারদের নিয়ে হিসেব পত্তর। আর অমানুষিক পরিশ্রম । কাজের আনন্দ থেকে নিরানন্দ বেশি ।  তবু সেদিনের কথা ভাবলে সেই চাকরিটি  মূল্যহীন মনে হয় না আমার । এবং আজও । অভিজ্ঞতাই মানুষের মূল্যবান সম্পদ। আর তা যে কোনো উপায়ে অর্জিত হতে পারে।

          কিন্তু কেন এমন একটি সময় অপরূপ হয়ে ধরা দিল আমার মনে । ধরা দিল ,  তার কারণ ' এ শহরে ' কবিতাটি ।  একটি ভালোলাগা মিলে মিশে আছে বর্তমান সময়ের এই গভীর শূন্যতার মধ্যেও ।সে সময় ছিল প্রশান্তির ।  অফিস থেকে বেরিয়ে পড়তাম দিনের আলো থাকতে থাকতেই । পাশেই গঙ্গা । ওপারে ডক। জাহাজ তৈরি হচ্ছে । মধ্যে মধ্যে  জাহাজের মন্থর শুভেচ্ছা সফর । নাইট ডিউটির সময় একবার জাহাজ  এম. ভি . হর্ষবর্ধন কে ( বা ঐ ধরনের ) দেখি ।  রাতের অন্ধকারে পঞ্চেন্দ্রিয়কে সজাগ  করে সে চলেছে । তার  জ্বলে থাকা আলোগুলো এতদিন  পরেও   ঘ্রাণ নিয়ে আসে
স্মৃতিতে।
               তবু বিকেলের সেই বেরিয়ে পড়ার মধ্যে বিস্ময় লুকোনো থাকত । মনে হত ,  এই সময় যেন বা  অনন্তের রূপ মুগ্ধ। এর প্রতিটি মুহূর্ত এখন আমার ।  কাউকে ,  কোনও  ক্ষণকে হারিয়ে যেতে দেব না ।  কখনো ধর্মতলা , কখনো শ্যামবাজার , কখনো কলেজস্ট্রিট  বা  রবীন্দ্রসদনে কিছুটা সময় অতিবাহিত করার মধ্যে নিরসন হত মনের জমে থাকা গল্পগুলির ।

" ফলের দোকান ছিল দারুণ উজ্জ্বল , আর পাশে
                                      মুক্ত - ডানা মেয়ে । "

তখন নিজেকে খননের প্র্যাকটিস ।  তাই প্রাকৃত- অপ্রাকৃত ঐশ্বর্য সব  চুপি চুপি এসে ধরা দিত যাত্রাপথে ।  মনে পড়ে ,  সুমন চ্যাটুজ্জের কথাগুলি ---  এই শহর জানে আমার প্রথম সবকিছু ... । আমি পালাতে চাই নি ।  তাই লেলিন মূর্তির পাদদেশে অফিস ফেরত সময়  কাটিয়ে দিতাম নতুন জীবিকার সন্ধান - স্বপ্ন বুকে নিয়ে।

         সত্যি !  আজ দরকারে , হ্যাঁ চারবারের দরকারে একবার যখন শহর মন্থনের কাজে নামি ,  তখন ফুস মন্তর হয়ে যায় সব । নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি ,
' আমাকে চিনবে না ? ' ---- তার উত্তরের অপেক্ষা না করেই পরিকল্পনাহীন অবিশ্রান্ত হয়ে ওঠে আমার যৌবনের স্মৃতি । সেখানে দস্তয়েভস্কির পাশে লরেন্স আর লরেন্সের পাশে  ১৯৯৭- এর  আত্মমৈথুন।

                                                                             ক্রমশ 



ছবি:  বিধান দেব 

   
             
 

ধারাবাহিক গদ্য । । অরিন্দম রায়


ভিনদেশি তারা

 

নৈঃশব্দ্য আর যোগাযোগহীনতার ধারাবিবরণী


স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে থেকেই তোতলামির শুরু। প্রথমদিকে একই কথা ,একই সিলেবল বলতে গিয়ে আটকে যাওয়া, বয়ঃসন্ধিতে সেই সমস্যা ভয়ানক আকার ধারণ করল।পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যে কথা বলাই বন্ধ হয়ে গেল ,মুখ দিয়ে শুধু একটা অস্পষ্ট ‘উঁহু’ জাতীয় আওয়াজ। অনেক সময় দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর তোতলামি আপনাআপনি সেরে যায় এক্ষেত্রে দেখা গেল সমস্যাটা পিছু ছাড়ল না কিছুতেই। বরং জোর করে কথা বলতে গিয়ে ব্যাপারটা বিতিকিচ্ছিরি এক অবস্থায় দাঁড়াত মাঝেমাঝে। ছেলেটির তখন ষোল বছর বয়স ,স্থানীয় হাসপাতালে ক্লিনারের কাজ করে।বাড়ির থেকে বেশি দূরে নয় হাসপাতাল, আসা যাওয়ার পথে পড়ে একটি বইয়ের দোকান। সাইকেল চেপে হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে বইয়ের দোকানের র‍্যাকে রাখা কয়েকটি বইয়ের দিকে চোখ আটকে গেল সেই কিশোরের। বইয়ের গায়ে লেখা তিনজন কবির নাম যথাক্রমে ম্যাকগাও ,হেনরি আর প্যাটেন তাঁদের নাম। বন্ধুর বাড়িতে ‘গ্রিম’ নামের একটা অ্যালবামে এই তিন কবির পারফরমেন্স আগেই শুনেছিল ছেলেটি ।বইটার কবিতাগুলো একইসঙ্গে মজার আবার গম্ভীর ,সারারাত বইটা ঘুমোতে দিল না তাকে। ভোর হওয়ার মুখে ছেলেটি নিজেই লিখে ফেলল তার জীবনের প্রথম কবিতা। সেই কিশোরটি জানত না কোনদিন সে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারবে কিনা, কিন্তু একটা প্রত্যয় সেদিন জন্ম নিয়েছিল তার ভিতরে যে কথা বলতে পারুক বা না পারুক ,লিখতে সে পারবেই । সেইদিনই সে সিদ্ধান্ত নিল লেখক হওয়ার। মাত্র ষোল বছর বয়সে। এরপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর ,সেদিনের সেই কিশোর এখন যুবক , প্রায় ছয় বছর ধরে সে লিখল একটাই কবিতার বই ___ যে বইয়ের ভরকেন্দ্র তোতলামি , বইয়ের নাম ‘স্টাম’ ,নৈঃশব্দ্য আর যোগাযোগহীনতার ধারাবিবরণী। 


যাঁর কথা বলছিলাম তিনি ডেভিড বেটম্যান।যে ব্যক্তি একসময়ে ঠিকভাবে কথা বলতে পারতেন না ,আজকে তিনিই অন্যতম জনপ্রিয় পারফরমিং পোয়েট।অনেক লড়াইয়ের শেষে স্পিচ থেরাপির সাহায্যে তোতলামির সমস্যা কাটিয়ে ওঠেন তিনি । বর্তমানে লিভারপুলের বাসিন্দা।কবিতা লেখার পাশাপাশি গল্প , চিত্রনাট্য এবং প্রবন্ধ লিখে থাকেন। পেশায় ক্রিয়েটিভ রাইটিং এর শিক্ষক। ২০০৭ সালে জেতেন লিভারপুল পোয়েট্রি স্ল্যাম চ্যাম্পিয়নশিপ। কুড়িটির বেশি কবিতা সংকলনে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।তীব্র স্যাটায়ার তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি হল ___ The Ideal God Competition , From Jellybeans To Reprobation , Curse of the Killer Hedge এবং A Homage to Me । তাঁর লেখা   রাজনৈতিক, তাঁর কবিতায় থাকে ঝাঁঝাল বিদ্রূপ। কবিতা পড়ার সঙ্গে কবিতা শোনার ধারাকে এই সময়ে  মিলিয়ে দিচ্ছেন যেকজন কবি তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম।সাহিত্যের বেলাভূমির পাঠকদের জন্য রইল এই কবির কয়েকটি কবিতার বাংলা অনুবাদ।   




ডেভিড বেটম্যান  



ঘোষণা


শান্তি প্রক্রিয়া থেকে

আমরা বিরতি চেয়ে নিচ্ছি 

পরস্পরের দিকে গুলি ছোড়ার জন্য

আমাদের কিছুটা সময় ব্যয় করা উচিত


কত চালাক 


আমার বাবা চালাকি একদম পছন্দ করতেন না। আচমকা রেগে গিয়ে

পাতি ঘরোয়া হিংসায় জড়িয়ে পড়তেন হামেশাই ,

সাধারণত মাথার পিছনে একটা সজোরে চাঁটি 

কারণ তিনি সন্দেহ করতেন যাবতীয় চালাকির উৎসস্থল ওখানেই।


বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এমনটা ঘটত চটপট উত্তর দিলে

কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে ধূসর কোনো অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসত : 

মাথার পিছন দিকে চাঁটি আর সেই প্রশ্নবাণ “নিজেকে খুব চালাক মনে করো ,তাই না?” 

আর তারপরেই আপনি খুঁজতে থাকবেন যা কিছু আপনি এইমাত্র বলেছিলেন অথবা করেছিলেন

যার গায়ে চালাকির কণামাত্র লেগে আছে ,

যাতে আপনার পরবর্তী কথাবার্তা আর কাজকর্ম 

আরও চালাকি-মুক্ত হয়।


আমাদের পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যেই যে কোনো মুহূর্তে 

দুর্ঘটনাবশত চতুরতা থাকার প্রমাণ পাওয়া যেত 

যদিও এসব চালাকির কোন ছাপ্পা দেওয়া ছিল না আমাদের মাথায় 

পরে আমি এই সমস্যাটিকে ‘A A’ এই দুটি ধাপে বিন্যস্ত করেছিলাম 

তা বলে সমস্যা লাঘব হয় নি  

কারণ যতটা সময় আমি পড়াশোনার জন্য ব্যয় করেছিলাম 

পুরোটাই ছিল চালাকির জন্য নষ্ট করা সময়;

আর আমার বাবা যদি জানতেন যে আমি বড়ো হয়ে ডিগ্রি পাব

আর বিদ্রূপাত্মক কবিতা লিখব

তিনি নির্ঘাত আমাকে বলতেন

যে আমি নিজেকে খুব চালাক ভাবতাম ,ভাবতাম না ? 


কিন্তু সমস্ত চালাকিই ছিল বাজে চালাকি

আর সবচেয়ে চালাক ব্যক্তি নিঃসন্দেহে সবার চেয়ে খারাপ।

আমার বাবা যদি হেরম্যান আইনস্টাইন হতেন তাহলে নিজেকে তিনি কী ঘৃণাই না করতেন !  

ক্ষুদে আইনস্টাইনের মাথার পেছনে চাঁটি মারার প্রয়োজনীয়তা সর্বক্ষণ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত ,

তার কানের কাছে তিনি বলে বেড়াতেন “ নিজেকে তুমি খুব চালাক ভাবো তাই না? ,

তুমি ভাবো তুমি খুউব চালাক।’’  


নাইটেংগেল পাখিদের মিষ্টতা 


আমি চেটেছিলাম ছোট্ট বাদামি রঙের পাখির উড়ন্ত ডানা

যখন এটা আমার জানালার সামনে দিয়ে যাচ্ছিল।

নরম আর পালকে ঢাকা একটা ঝাঁকুনি ,

সন্ধ্যা যাকে গিলে নিল,আর ফিরল না ।




অন্তর্মুখী 


আমি যে পাব-এ বসে আছি 

সেখানে তিনটে লোক তর্ক করছে

তারা কত অন্তর্মুখী সেই নিয়ে।

তারা ইতিমধ্যেই একমত হয়েছে

যে , অন্তর্মুখী লোকেরা 

আরও গভীর , আরও সংবেদনশীল এবং পরিপূর্ণ হয়ে থাকে।


এখন কে কতটা জোরে চিল্লিয়ে 

নিজেকে সবচেয়ে অন্তর্মুখী প্রমাণ করতে পারে

সেটা শোনাই বাকি আছে।


আমি পাঁচ মিনিট আগে কিছু বলতে গিয়ে

হাল ছেড়ে ফিরে এসেছি।

আমি ব্যাপারটা ওদের উপরেই ছেড়ে দিয়েছি।

বাড়ি যাও আর এই নিয়ে একটা কবিতা লেখো।

পরের রাতে সেটা পড়ে শোনাও।

সমালোচনা করে ধুয়ে দাও ওদের।


আমি প্রকৃতই গভীর

প্রকৃত সংবেদনশীল।


এবং পরিপূর্ণ


জন কিটস।। অনুবাদ: দেবাশিস দাশ


 


১.

ও একাকিত্ব! তোমারই সঙ্গে যদি-বা থাকতে হয়,
যেন তা না হয় আঁধার-জড়ানো জীর্ণ বাড়ির মাপে
জুবুথুবু কোনও স্তূপের মধ্যে। চলো চড়ি খাড়া ধাপে,—
প্রকৃতির মানমন্দিরে— ছোট উপত্যকাটিময়
ফুলে-ছাওয়া ঢাল, স্ফটিক-ফুল্ল তার নদীসঞ্চয়
মনে হতে পারে খোলা বিস্তার। ডালপালা-মণ্ডপে
আগলাতে দাও তোমার জাগর, শিয়ালকাঁটার ঝোপে
যেখানে হরিণ লাফ দিলে বুনো মৌমাছি পাবে ভয়।

কিন্তু, যদিও তোমার সঙ্গে হাসিখুশি এত দৃশ্য
তাড়িয়ে ফিরব, তবু নিষ্পাপ একটি আলাপী মন
পরিমার্জিত চিন্তার ছবি করলে উচ্চারণ
সে হবে আমার আত্মার সুখ, বিশাল মানব-বিশ্বে
তার থেকে বড় আনন্দ নেই নির্ঘাত; নির্জন
ডেরায় তোমার যদি বাঁধে দুটি সুজন সত্তা বিশ্বাস।

[মূল রচনা: ৫.৫.১৮১৬, সাময়িকপত্রে প্রথম প্রকাশিত কবিতা, দ্য একজ়ামিনার]

O Solitude! if I must with thee dwell,
Let it not be among the jumbled heap
Of murky buildings; climb with me the steep,—
Nature’s observatory—whence the dell,
Its flowery slopes, its river’s crystal swell,
May seem a span; let me thy vigils keep
’Mongst boughs pavillion’d, where the deer’s swift leap
Startles the wild bee from the fox-glove bell.
But though I’ll gladly trace these scenes with thee,
Yet the sweet converse of an innocent mind,
Whose words are images of thoughts refin’d,
Is my soul’s pleasure; and it sure must be
Almost the highest bliss of human-kind,
When to thy haunts two kindred spirits flee.

২. 

উজ্জ্বল নক্ষত্র! আমি তোমার মতোই যদি হতে পারতাম অবিচল—
একার ঐশ্বর্য নিয়ে রাত্তিরের বহু ঊর্ধ্বে ঝুলে থেকে হু-হু শূন্যতায়,
নিসর্গের মগ্নতায় ধৈর্যবান ঘুমহারা শ্রমণের মতো অবিকল
চাই না থাকতে পড়ে, শাশ্বত পল্লব খুলে দু'চোখের উদাসী প্রেক্ষায়—
পৃথিবীর মানবীয় কূলে-কূলে ঘুরে ঘুরে পুরুত-সদৃশ নিষ্ঠাব্রতে
চলেছে পবিত্র বারি ছিটোতে-ছিটোতে জলরাশি— সেই দৃশ্যের জানালা
খুলে ধরে নয়, কিংবা অন্যত্র কোথাও কোনও তৃণাঞ্চল এবং পর্বতে
নতুন নরম কোনও ঝরে-যাওয়া হিমের মুখোশ জুড়ে দৃষ্টিটুকু ঢালা—

না, তেমন নয় ঠিক— তবু আজও অবিচল, অপরিবর্তনযোগ্য আজও,
রূপশালী আমার প্রিয়ার সদ্য পেকে-ওঠা দু'টি বুকে বালিশের ওমে
শুয়ে-শুয়ে ছুঁতে চাওয়া অনুভব— নরম উৎরাই আর স্ফীতি যদি বাজে,
চিরকাল, চিরকাল জেগে থেকে বেঁচে থাকা মিষ্টি এক অশান্তির ধুমে,
এতটুকু চাই আমি, যেন শুনি বারবার স্নিগ্ধ-টানা প্রিয়ার প্রশ্বাস
এবং শাশ্বত বাঁচি,— নতুবা মৃত্যুর কোলে ঢলে যাব, এতটুকু শুধু অভিলাষ।

[১৮১৮]

Bright star! would I were steadfast as thou art—
Not in lone splendour hung aloft the night,
And watching, with eternal lids apart,
Like Nature’s patient sleepless Eremite,
The moving waters at their priestlike task
Of pure ablution round earth’s human shores,
Or gazing on the new soft fallen mask
Of snow upon the mountains and the moors—
No—yet still steadfast, still unchangeable,
Pillow’d upon my fair love’s ripening breast,
To feel for ever its soft fall and swell,
Awake for ever in a sweet unrest,
Still, still to hear her tender-taken breath,
And so live ever—or else swoon to death.

৩.

ঘন-হয়ে-আসা আঁধার ছাড়িয়ে রুপোলি পায়রা যেরকম
উঠে যায় আর ফুঁড়ে ছুটে যায় পুবের আলোর ভেতরে,
কেবল সাচ্চা আনন্দ তার ডানাকে ভাসিয়ে ধরে,
তেমনি তোমার আত্মা পেয়েছে উত্তরে নিষ্ক্রম,
যে-দেশে শান্তি আর ভালবাসা ঘর বাঁধে হরদম;
নক্ষত্রের রশ্মিমালার নিপুণ মুকুট প'রে
সুখী আত্মারা যেখানে তাদের মহিম শয্যাঘরে
বিপুল সুখের স্বাদ ভোগ করে, তেমন নজির কম।

এমনকী যারা দারুণ স্বর্গ আরও উচ্ছ্বাসে ভরে নেয়,
তুমি যোগ দিলে গায়কদলের সেই অমৃত চারণে
সুরেলা আলোয়, অথবা পরম পিতার চরম কামনায়
বাতাস ফাটিয়ে ভিন-ঠিকানার একমনা উৎসারণে
পবিত্র কোনও বার্তা পাঠাতে— এরচে' মস্তি জানা নেই!
দুঃখের লেশ আমাদের সুখ মাটি করবে কী-কারণে?

[১৮১৪, পিতামহীর মৃত্যুতে লেখা এলিজি, প্রকাশ: ১৮১৬]


As from the darkening gloom a silver dove
Upsoars, and darts into the eastern light,
On pinions that nought moves but pure delight,
So fled thy soul into the realms above,
Regions of peace and everlasting love;
Where happy spirits, crown'd with circlets bright
Of starry beam, and gloriously bedight,
Taste the high joy none but the blest can prove.
There thou or joinest the immortal quire
In melodies that even heaven fair
Fill with superior bliss, or, at desire,
Of the omnipotent Father, cleav'st the air
On holy message sent -- What pleasure's higher?
Wherefore does any grief our joy impair?



জন কিটস (অক্টোবর ৩১, ১৭৯৫-ফেব্রুয়ারি ২৩, ১৮২১):  কিটস ইংরেজি সাহিত্যের একজন সর্বপরিচিত রোম্যান্টিক কবি। লর্ড বায়রন ও পার্সি বিশি শেলির সাথে সাথে তিনিও ছিলেন দ্বিতীয় প্রজন্মের রোমান্টিক কবিদের একজন। তার মৃত্যুর মাত্র চার বছর আগে তার সৃষ্টিগুলো প্রকাশিত হয়। তৎকালীন সমালোচকদের দৃষ্টিতে তার কবিতা খুব একটা উচ্চ মর্যাদা পায়নি। তার মৃত্যুর পর তার কবিতাগুলো সঠিক মূল্যায়ন পেতে শুরু করে এবং উনিশ শতকের শেষ দিকে তিনি অন্যতম জনপ্রিয় ইংলিশ কবির স্বীকৃতি পান। পরবর্তীকালের অসংখ্য কবি ও সাহিত্যিকের ওপর তার প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। হোর্হে লুইস বোর্হেসের মতে, কিটসের লেখার সাথে প্রথম পরিচয় তার সাহিত্যিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। (উইকিপেডিয়া)

হাব্বা খাতুন।। অনুবাদ: সায়ন রায়









হাব্বা খাতুনের কবিতা 


১.

লাইল্যাক গাছগুলো ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে

আমার দুঃখের কথা তোমার কাছে কি পৌঁছোয় নি?


হ্রদ ও নদীর ধারে সারি দিয়ে ফুটে আছে ফুল 

চলো যাই পাহাড়ি প্রান্তর আর সরু হয়ে আসা উপত্যকায় 

এমনকি দূরের জঙ্গল সেও ফুল হয়ে ফুটে আছে

আমার দুঃখের কথা তোমার কাছে কি পৌঁছোয় নি?


দূরের গ্রামগুলিও হয়ে উঠেছে লাবণ্যময়

চলো যাই আমার মা-বাবার বাড়ি 

সেখানে বিস্তীর্ণ মাঠের ধারে ফুলেদের সারি

আমার দুঃখের কথা তোমার কাছে কি পৌঁছোয় নি?


২.

কেউ কি দেখেছ তাকে কোনো জায়গায়,কোনোদিন?

তিনিই সে যাকে পেতে চেয়ে হয়ে যাচ্ছি ক্রমে ক্ষীণ। 


শীত আমায় বানায় বরফ

গ্রীষ্মকালে যাই গলে

খুঁজতে হবে তাকেই আমার সবসময়ে হয়ে দীন

তিনিই সে যাকে পেতে চেয়ে হয়ে যাচ্ছি ক্রমে ক্ষীণ। 


একদা আমার নিবাস ছিল সুদূর ওই পাইন বনে

ছিলাম বেঁচে যতদিন না তারই কুঠার আঘাত হানে

সুমিষ্ট চন্দনের গুড়ি থেকে হলাম ছাইয়ের মত হীন 

তিনিই সে যাকে পেতে চেয়ে হয়ে যাচ্ছি ক্রমে ক্ষীণ। 


ভাগ্য আমার এই রেখেছে আমার জন্য মজুত করে

জ্বলতে হবে ধিকিধিকি, পুড়তে হবে ধীরে ধীরে 

ভালবাসার জটিল জালে আটকে গেছে হাব্বা মীন

তিনিই সে যাকে পেতে চেয়ে হয়ে যাচ্ছি ক্রমে ক্ষীণ। 


৩.

জগৎটা তো দুঃখ ছাড়া কিছুই নয়, ও ময়না!

টিকবে না তো কিছু যে আর, স্মৃতিও ক্ষয়

ময়না গো, এই দুনিয়া দুঃখে ভরা একটি স্থান 

টিকবে না তো কিছু যে আর, স্মৃতিও ক্ষয়।


খুঁজে ফিরেছি হন্যে হয়ে জগৎময়

প্রবঞ্চক আমার হাতে দেয়নি কিছু 

বন্ধু নয়, ভাইবোন নয়, কেউই নেই

টিকবে না তো কিছু যে আর, স্মৃতিও ক্ষয়। 


এই দুনিয়ায় কেন আমি এসেছিলাম?

কেন আমার এই জগতে জন্ম হলো?

খুললো না তো আমার জন্য একটিও দোর

টিকবে না তো কিছু যে আর, স্মৃতিও ক্ষয়। 


খুঁটিয়ে দেখি আমার অতীত তন্নতন্ন

আমায় বলো,কী পেয়েছি,আমার প্রিয়

কেন বা তিনি এতটা ভার চাপিয়ে দিলেন?

টিকবে না তো কিছু যে আর,স্মৃতিও ক্ষয়।


প্রেমের আগুন বইতে হয় প্রেমীদের 

প্রেমের বাজারে ক্রমেই তা ফুঁসতে থাকে

কয়েকজনই নিঃস্ব হয় সে দিব্য আঁচে

টিকবে না তো কিছু যে আর, স্মৃতিও ক্ষয়।


কেউ তো তবু তোমার প্রতি বাসনা জাগায়

চাঁদের আলো তোমার জন্য প্রতীক্ষায় 

হাব্বা বলে তার জীবনের দুখের কথা

টিকবে না তো কিছু যে আর,স্মৃতিও ক্ষয়।


৪.

প্রতিটি রন্ধ্র আমার দেহের ব্যথায় ব্যাকুল 

আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!


দেখেছিল আমায় সে ওপর থেকে পাঁচিলের

পারতাম তাকে জড়িয়ে দিতে সুন্দরতম শালে

কেনই বা সে এমনভাবে আছে রেগে?

আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!


দেখেছিল আমায় সে দরজা থেকে—

আমার বাড়ির রাস্তা তাকে কে চেনালো?

আমার জন্য রয়েছে কেবল যন্ত্রণাই!

আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!


দেখেছিল আমায় সে জানলা থেকে

লম্বা গ্রীবার সৌন্দর্য এই আমি

চলে গেল আমার হৃদয় শূন্য করে

আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!


দেখেছিল আমায় ছাদের জানলা দিয়ে 

কথা বলেছিল গায়ক-পাখির মতন করে

ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল দৃষ্টি হতে

আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!


দেখেছিল আমায় চিলেকোঠার থেকে

প্রবেশ করে এক ব্যাপারী আমার গৃহে 

ফুরিয়ে দিল আমায় একটু একটু করে

আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!


দেখেছিল আমায় ছাদের ওপর থেকে

পুড়তে দিল তীব্রভাবে যেমন মশাল

অনুতাপ ছাড়া কিছুই তো আর গেল না রেখে

আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!


ডুবে যাওয়া চাঁদের মত তাকিয়েছিল

কেন এলো পাগলপারা মানুষ হয়ে

ওই ভূমিকা কেনই বা সে করলো পালন

আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!


দেখেছিল আমায় নদীর পাড় থেকে 

গোলাপকুঁড়ি হারিয়ে গেল একেবারেই 

ভালবাসার আগুন আমায় গিলেই নিল

আমায় সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!


৫.

সকল ত্রুটি ক্ষমা করো হে পরওয়ারদিগার 

আমার মৃত্যু থেকে কি লাভ তুমি পাবে?


আটকে গেছি জালে আমি কি করে যে কাটাই দিন

এখন তুলসীগাছের উজ্জ্বলতা পুদিনার মত দীপ্তিহীন

যে আগুন জ্বালিয়েছ ধিকিধিকি জ্বলছে আমার হৃদয়ে 

আমার মৃত্যু থেকে কি লাভ তুমি পাবে?


নিজেকে তুমি ভরাতে পারো অজানা সব সম্পদে

কিন্তু তুমি নিঃস্ব হবে খালি হাতে যাবে কবরে

প্রশ্ন করি,যৌবন আমার,কিসের ছিল অহংকার?

আমার মৃত্যু থেকে কি লাভ তুমি পাবে? 


পড়েছিলাম কোরান আমি প্রথমবারেই

একটুখানি ভুল ছিল না সে চেষ্টাতে

ভালবাসার কিতাব আমার হয়নি পড়া

আমার মৃত্যু থেকে কি লাভ তুমি পাবে? 


যন্ত্রণাতে দীর্ণ এখন হাব্বার দেহ

একটিবারও আসোনি তুমি দেখতে তাকে

প্রতীক্ষায় আছো কি আমার কবরে যাবার?

আমার মৃত্যু থেকে কি লাভ তুমি পাবে?


হাব্বা খাতুন (১৫৫৪—১৬০৯): কিংবদন্তি সরিয়ে হাব্বা খাতুনের সঠিক পরিচয় পাওয়া কিছুটা কঠিন। একদল মনে করেন কাশ্মীরের সীমান্ত জেলা গুরেজ- এ তার জন্ম।তার বিয়ে হয় অশিক্ষিত এক গ্রাম্য মানুষের সাথে।হাব্বা তার স্বামীকে তার কিছু আধ্যাত্মিক ক্ষমতার কথা বলে।তার স্বামী ভয় পেয়ে তাকে ডাইনি সন্দেহে পরিত্যাগ করে।হাব্বা তার বাবার বাড়িতে ফিরে আসে।সেখানে সে মাঠে মাঠে কাজ করতো আর তার বেদনাভরা অনুভূতিগুলো দিয়ে গান বেঁধে গাইত।একদিন কাশ্মীরের শেষ স্বাধীন সম্রাট ইউসুফ শাহ চাক এইপথ দিয়ে যাবার সময় তার গান শোনেন।তার সৌন্দর্য, সংগীত ও বুদ্ধিমত্তার দ্বারা আকৃষ্ট হন।তিনি তাকে তার রাণী করেন।আরেকদল মনে করেন,হাব্বা খাতুন ছিলেন একজন পেশাদার গায়ক।যিনি ইউসুফ শাহ চাকের দরবারে সভাগায়ক হন।পরবর্তীতে সম্রাট তাকে তার প্রিয় রাণীর মর্যাদা দেন।পরবর্তী কালে সম্রাট আকবর ইউসুফ শাহকে পরাজিত ও নির্বাসিত করলে হাব্বা খাতুন প্রাসাদ ছেড়ে নির্জনে চলে যান এবং সাধিকার জীবন যাপন করেন।তাকে 'কাশ্মীরের বুলবুল'( Nightingale of Kashmir) বলা হয়।বিদ্বানের ফার্সিতে কবিতা রচনা না করে তিনি সাধারণের কাশ্মীরি ভাষায় গান ও কবিতা রচনা করেন।হাব্বা খাতুনের কবিতায় আমরা বিশুদ্ধ গীতিকবিতার আস্বাদ পাই।সামাজিক ভাবে নারীর যন্ত্রণা, বেদনাকে তিনি তার কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন।দূরের কোনো প্রেমিকের প্রতি প্রেম,বিরহই শুধু নয়,ইন্দ্রিয়জ অনুভূতি ও শরীরী কামনা,বাসনার কথাও তার কবিতায় উঠে এসেছে।সেই অর্থে তিনিই প্রথম কাশ্মীরের ফেমিনিস্ট কবি। 














মুণীন্দ্র মহন্ত।। অনুবাদ: বাসুদেব দাস


        নামঘর



আঠাশটা হাতি 

সিংহ আঠাশটা 

সাতটি স্তরের সিংহাসন 

দলেদলে কোনো বাধা না মেনে 

নেমে আসে জীবনের কঠিন পথে 

ভক্তি রসের ঝর্ণা 

কীর্ত্তনের সহজ পাঠ 

ভিজিয়ে কোমল করে মাটিময় প্রাণ 

লোহার পিলসুজে 

মেজাঙ্করী পাতার সহস্র প্রদীপ 

জ্বলজ্বল জ্বলজ্বল 

চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া আলো 

কোষে কোষে আলোর অনুরণন

ভক্তিমার্গের অন্বেষণ 

ক্ষণ অনুক্ষণ

টীকা: মেজাঙ্করী-এক ধরনের দীর্ঘ পাতার গাছ। এর পাতা মুগা-পলু খায় এবং এই পলু থেকে মুগা সুতোর উৎপাদন হয়।


        তৃষ্ণার্ত মাছগুলি


বাজারে মাছ 

আকাশলঙ্ঘী বাজার গৃহে মাছ 

মাছগুলি বাজারে সাঁতার কাটে 

বাজারে সাঁতরে ক্লান্ত হয় না

মাছের বাজার 

নিজের গৃহকোণ 

অন্দর মহল 

মাছগুলি চকচক করতে থাকে 

রূপালি রঙে রঙিণ

রঙের মধ্যেই একটু অন্ধকার 

মাছগুলিকে গিলে 

মাছগুলি ক্লান্ত হয় 

বাজার করে করে 


‘পানিমে মীন পিয়াসী

শুনতে শুনতে হাসি পায়।’


 কবি পরিচিতি -১৯৬৫ সনে জন্ম।কবি মুনীন্দ্র মহন্ত একজন সমাজ কর্মীও।প্রকাশিত কাব্য সংকলন গুলি যথাক্রমে ‘অনুভবর কোলাজ’,’শিলত বাছো ফুল’ এবং ‘পিয়াহত থকা মাছবোর’। 


মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২০

কবিতা: দীপক হালদার


খিদে 



খিদে  নিরীহ গানের দেশ 
ঢেউয়ে ঢেউয়ে দিগন্ত পেরোয়

আচ্ছন্ন গহন চোখে উদাস পথিক 
সমুদ্রে আকাশে হাঁটে 
জমি খুঁজে বানায় বসত 
সেখানেই চাষবাস 

অপ্রতিম ফলিয়ে ফসল 
কন্দরে গুহায় রেখে চিত্রিত সৌরভ 
বের হয় প্রবজ্যায় পুনঃ

বিরতি জানেনা গতি 
খিদে তো মায়ের জাত  
                            পথের সূচনা 

প্রান্তরেখা থাকেনা কখনো 
অভিধান অবয়বে তার 



ছবি:  বিধান দেব 





কবিতা: অঞ্জলি দাশ

 



উত্তরবাহিনী


ডাকনাম ভুলে গেলে নদী আর ফেরেনা কখনও।

নদী জানে ডুবসাঁতারের ছলে

তার জলে হা-হুতাশ ধুয়ে যায় লোকে,

জানে স্বীকারোক্তি ঢেলে যায় বুক খালি করে।

স্মৃতির উৎস থেকে দূরে যায় 

পিছু ডাকও মুছে ফেলে ধীরে।


হঠাৎ কখনও যদি পুরোনো জীবন মনে পড়ে

একবার ঢেউ ভেঙে তীর ছোঁয়,

আনন্দধারার মতো বিচ্ছেদের সুর উঠে এলে

শেষবার পিছনে তাকায়।

স্পর্শ ঝোঁকে জলের আয়নায় আমাদের ছায়া ডুবে গেলে বুঝি

আমরা চলেছি তার বিপরীত দিকে।


সম্পর্ক ছিঁড়েছে, তবু ভাঙন উপেক্ষা করে বলি,

এখনও স্বপ্নের টুকরো লেগে আছে ভেজা চোখে, ফিরে আয়......

উত্তরবাহিনী নদী পিছনে ফেরে না, বারবার পথ বদলায়,

পুরোনো নামের দাগ ধুয়ে যায় জলে...।




ছবি:  বিধান দেব 


কবিতা: রফিক উল ইসলাম


 


অ্যাকোরিয়াম


লাল-নীল পাখনায় ভরা করে খেলে বেড়াতে বেড়াতে

                                      এই স্বচ্ছ জলের অ্যাকোরিয়ামটিকেই

যখন সমুদ্র মনে হল, যাবতীয় খেলা থামিয়ে 

সেই যে আমি বিস্মিত হলাম, আমার নিরন্তর ডুবসাঁতার 

বুনোঝোপের আড়ালে স্তব্ধ হয়ে গেল! এতই তুচ্ছ আমি, 

নিজেকে ঠিকঠাক চিনে ওঠার পর, গভীরতর কল্লোল জুড়ে 

শুধুই অট্টহাসি, নিজেরই বিদ্রুপে লাল-নীল পাখনাগুলি

ক্রমশ সংকুচিত হয়ে এল!


সারাজীবনের উজান ঠেলে ঠেলে, ছোট্ট একটি অ্যাকোরিয়ামও

ডিঙিয়ে যেতে পারব না আমি? আমাকে ডিঙিয়ে ছুটে যাচ্ছে 

রহস্যময় ডুবুরির দল, আর চিরচঞ্চল মৎসকন্যারা!তারা হয়তো 

কাচের দেওয়াল ভাঙার যাদুমন্ত্র জানে, যে অদৃশ্য দেওয়ালে

                                                            ঠোক্কর খেতে

খেতে 

উন্মুখ জীবন ক্ষতবিক্ষত হয়ে ওঠে, পুব আর পশ্চিম 

একাকার হয়ে যায় । দিগ্ ভ্রান্ত নাবিকের আত্মা বুকে জড়িয়ে 

কিছুতেই আর বাতিঘরের ইশারা মেলে না।


তরঙ্গায়িত, আর অপার তুচ্ছতায় বুনোঝোপে আটকে থাকা

                                                                 নিজেকে নিয়ে 

ঠিক কোথায় পৌঁছাবো, আমার লাল-নীল পাখনারা

কিছুই জানে না! শুধু জানি, আমার অক্লান্ত ডুবসাঁতার 

সামান্য একটি অ্যাকোরিয়ামের অদৃশ্য কাচের দেওয়ালও

ভাঙচুর করার যোগ্য নয় । গভীর জলতলে, 

ক্ষতবিক্ষত এই উন্মুখ জীবন টুকু নিয়ে আমাকে কি কেবল

ওইসব রহস্যময় ডুবুরি আর চিরচঞ্চল মৎসকন্যাদের 

লীলায়িত মোহনা-বিজয় দেখে যেতে হবে?



ছবি:  বিধান দেব 


কবিতা: দেবাশিস সাহা

 







লাশফুল


রক্তের পাশে ফুল রেখো না
ফুল ভিজে গেলে
সংক্রামিত হবে গন্ধ

গন্ধের গভীরে 
জীবনের কুয়ো

লজ্জা পেয়ে
আমার মা আমার বোন
আমার বারবণিতা
ঝাঁপ দিচ্ছে কুয়োয়
নতজানু হচ্ছে মৃত্যুর কাছে

তুমি ফুল রেখো না
ওদের পাশে
জল্লাদের উল্লাসে
ওদের যেন ঘুম না ভেঙে যায়

যারা জেগে আছে 
তাদের ঘুম ভাঙাও
জেগে উঠুক
তাদের আগুন

ফুলের গন্ধ সংক্রামিত হলে
এই দেশ ভরে যাবে লাশফুলে



চোতক্ষ্যাপা



দারুচিনির দেশে 
কেউ কেউ নেমেছে দারুর খোঁজে 
চিনি নিয়ে আগ্রহ নেই মধুমেহ প্রেমিকের

স্লেট থেকে ভাগ্যরেখা মুছে
দারিদ্র্যরেখা এঁকে দিলো অমাবস্যা 
উড়ালপুল ধরে হেঁটে যায় ভাত
পিছু পিছু ভাই ও আমরা 
সিঁড়ি কাকে কি শেখায় জানিনা
সেই একই পড়া প্রতিদিন
ফুটপাত টকভাত বমি আর
অন্ধকার ঘরে ভ্যপসা গন্ধ

নিজের বুকে ভর করে
ব্রিজের নীচে ফিরেছে কামিজ
লতিয়ে লতিয়ে 
 এ বাড়ি সে বাড়ি
চলে যায় আলো রঙের আনন্দ 
সাবান জলে হাত ধুয়ে রাত ঘুমাতে যায়
সাবান জলে ধোয়া ভোর 
দিদিমণির চাল আলুর দিকে বাড়িয়ে দেয় হাত
মাস্ক গ্লাভসের কাছে 
আরো কিছুটা সময় চেয়ে নেয় জীবন 
পুলিশের ইশারার অপেক্ষায় 
নরম নরম আলোগুলো বসে থাকে 
পাতার আড়ালে 
চোতক্ষ্যাপার দল কাদা করছে রেশন দোকান 

মানুষ আজ সংখ্যা
পরিসংখ্যানের আড়ালে চলছে অন্য এক খেলা
লাঠির তাড়া খেয়ে 
গরম ভাত খুঁজে চলেছে 
এক নিরুপদ্রব ঠেক



ছবি:  বিধান দেব 

কবিতা: অনিন্দ্য জসীম


 

কাক


কাকের জন্যও কা কা করে মন
কেনো যে এমন অহেতুক হাহুতাশ !
এ বসন্তে কোকিলের ডাক শুনতে পাই নি বলে
এতো পরিতাপ কাকের কা কা শুনতে!

যদি বসন্তে কোকিলের গান শুনতে চাও
তোমাকে কাকের আবাসন ব্যবস্থা
বংশ বিস্তার নিয়ে ভাবতেই হবে!

কাক আর সাবানের গল্প, লোককথা
ভুলে গেলে কাকেরা অসে না, ভাত ছিটালেও
উঠানে দেখি না আর কাকের জটলা
কা কা ডাকে না ঘরের চালে-
অমঙ্গল আগাম ইশারায় কোনো!

কোন অভিমানে এই লোকালয় ছেড়ে
চলে যাচ্ছো,  হে কাক -- হে লোকালয়ের পাখি
আমার সন্তান কী শুনতে পাবো না কোকিলের গান!



শব্দ

কোন শব্দকেই যুৎসই মনে হচ্ছে না
ভালোবাসা শব্দটাও কেমন পর পর লাগছে
বন্ধু শব্দটা দূরের ভাঙা সাঁকোটার
প্রতিশব্দ মনে হয়, যেনো তার প্রয়োজন
ফুরিয়েছে এই কর্মহীন নিসঙ্গ মানুষের
                            সমাজ সংসার থেকে

দৈনন্দিন ব্যবহৃত অনেক শব্দই ভুলে যাচ্ছি
আমি বাড়ি আছি কি না- নাম ধরে
ডাকছে না কেউ, বিলুপ্ত প্রাণির মতোই
শব্দও বিলুপ্ত হয়, সময় বিলুপ্ত হয়
কিছু উটকো শব্দের সন্ত্রাস তছনছ করে দেয়
আমার একান্ত শব্দের ভুবন
                 জীবন ও রাষ্ট্রের সংযোগ


ঘোরলাগা সন্ধ্যা

সাপের খোলাস ছাড়ানো দেখতে দেখতে
সন্ধ্যা নেমে আসে, নদী ও আমাদের
মাঝখানে সূর্য ডুবে যায়।

তুমি বলেছিলে - আমাকে আলগা করো
বাহিরের কৃত্রিম সৌন্দর্য থেকে
পাথরে খোদাই করো আমার প্রকৃত কাঙ্ক্ষা
এতোদিন গুম করে রেখেছি যে কয়লার ঘ্রাণ
তাতে জলের স্ফুলিঙ্গ জ্বালাও, ফুল ও ফলের নির্যাস পান করে ফোটাও আলোর কুসুম 
আগামি ভোরের গানে পল্লবিত হোক
নদী ও পাহাড়ের আদিবাসী উপকথা

এই মতো সময়ের ডানায় উড়ন্ত চিল
পাক খেতে খেতে ছুঁ মেরে সাপের ফনা
আরেক পাহাড়ের দিকে উড়ে যায়
আমাদের মাঝখানে পড়ে থাকে দীর্ঘ সাপের খোলস




ছবি:  বিধান দেব 





কবিতা: অভিজিৎ দত্ত


 

যে-কোনো সুন্দর মানুষকে 


হে সুন্দর মানুষ, আমি শুধু তোমাকে একটা প্রবীণ তালষাঁড়া 
উপহার দিতে চেয়েছিলাম
চিরমসৃণতা থেকে মুক্তি দিতে আমি তোমার খর্বতা প্রার্থনা করেছি
সমসময় নৈমিত্তিক আমাকে এগিয়ে নিয়ে যায় অচিন শৈত্যপৃথিবীর 
কুহকের কাছে।
নির্মিত সাঁঝতারাটির পাশে নিঃশব্দে ভৌতিক আঁধার 
খ'সে খ'সে পড়ে---
তুমি যে কী ভেবে আরও সুন্দর হতে চেয়েছ বুঝে উঠিনি এখনও
নিপুণ বালিহাঁস অথবা সমুদ্রমৎস্যের বোধের মতো তুমি সুন্দর হবে না কোনোদিন;
দুঃখী কবির মতো সৌপর্ণী আর পাগলাগাছের পাতার মতো শ্রী 
হবে না তোমার।
একটা সংক্রমিত পয়ার, ঈল মাছ,  কুমড়োপটাশ, ভিক্ষান্ন 
কিম্বা একটি কুমড়োফুলের মতো বিলোল, সৈন্ধব, নিঃশ্রেয়স
হয়ে উঠবে না তুমি। 




হাতে কিছটা তুলো 


হাতে কিছুটা তুলো নিয়ে আনমনে পিঁজতেই থাকি---
হাত মনের বশ নয়,
জানি না যে হঠাৎ কখন থেকে পেঁজা শুরু হয়ে গেছে!
দেখি যে, তুলোর গোল্লাটি কার্পাস, যার রোঁয়াগুলি অদ্ভুত আকারে
কতকগুলি ভুল ট্রাপিজিয়ম ও বিভিন্ন বহুকৌণিক অসামতলিক 
ক্ষেত্র বিনির্মাণ করেছে। 
শিশুর কথার মতো তার কোনো যৌক্তিক তাড়নাও নেই
আড়ালের সৌন্দর্য যেন আরও সরে গিয়ে কস্তুরীগন্ধের আড়াল খুঁজেছে! 
আর খোঁজাটিও কেমন অশেষ, রহস্যেরও রহস্যে অতিক্রান্ত। 
সময়ের প্রতি বিন্দুতে আমরা কি কোথাও পৌঁছোতে চেয়েছি? 
যে-কোনও আঘাতের মুখে রেখে তুলোর ফেনিল ঢেউ
আমরা কোথায়ই-বা যেতে চাই?--- আকাশের অগ্নির সন্তান 
তবু যে তুলোর-কাছে-সহনীয়, অদাহ্য--- তার মরমি প্রতিভায় 
তুলো হাতে এসেছিল। 
তারপর ভরের একান্ত নিত্যতায় উড়ে উড়ে কার্পাস গাছে 
কাঁচা তুলোর ফল হয়ে ঝুলে আছে। 



ছবি: বিধান দেব 


  

সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২০

কবিতা: পাপড়ি ভট্টাচার্য




মোহনা বরাবর

সেই নদীতীর,উপবন, সোহাগ চিহ্ন
আর তিরতির জলে পা ডোবানো
                                   উদযাপন।
তুমি জড়িয়ে দিলে আলোর জাফরি আমি খুঁজে পেলাম আনন্দ

উথাল পাথাল দিনগুলো সমুদ্র তীরে
সুতীব্র মায়ার ফলবান উৎসব
                  চন্দ্রভাগা মোহনায় স্হির।
  
সেই প্রকৃতি আহ্বান, এলোমেলো হাওয়ায়
হারিয়ে যেতে যেতে সমুদ্র দস্যুতায়
                             তুলেছি ঝিনুক।
                            
আজকের এই ভাঙাচোরা দিনে তোমাকে
একটি সুদৃঢ় কাঠামোয় ফিরে ফিরে পেলাম
মোহনা বরাবর, অনবদ্য সৈকতে।



ছবি:  বিধান দেব 
                             
                 
                                               
 

 

কবিতা: সুবীর সরকার



 ১৫/০৯/২০২০


সারা রাত বৃষ্টির ভেতর তরজা গান শুনেছি
অসুখের প্রতিশব্দ ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন
লিপিড প্রোফাইল রিপোর্ট থেকে বেরিয়ে
                      আসছে সারি সারি পিঁপড়ে
জ্বরের কি কোন পূর্বাভাস থাকে!
সর্দি ও কাশি জড়ানো জীবন
                                    আমাদের
সামান্য আগুন চাইছি আর দূরেই থাকছে
                                                গলাব্যথা
  যোদ্ধাদের মনখারাপ নেই।
  অতিশয় ছোট পাখিদের অপমৃত্যু
                                       নেই।
  স্বপ্নের ভেতর ঘোড়াদের আদর করি।
  আর থই থই আস্তাবল।রক্তচাপ নিয়ে বসে
                                                 থাকি



ছবি:  বিধান দেব