শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২০

ধারাবাহিক গদ্য ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত


 

সাধনপর্বের  নির্জনতা ।। দ্বিতীয় পর্ব 



৩.

মা জানো , খেলার মাঠে ছবির খাতাটা আমি
হারিয়ে ফেলেছি । চারিদিকে কত খুঁজলাম
বকুলগাছটার নিচে অশথগাছটার  নিচে । তারপর
ওরা সব চলে গেল , অন্ধকার হয়ে এলো, আমি
ফিরে আসবার পথে কান্না এক  কী ভীষণ ভয়!
মা জানো, এখনি যেতে ইচ্ছে হয় দুরন্ত বাহিরে,--
আমি যে একটি গাছ  এঁকেছিলুম , একটি আকাশ
মাঠে বড় - বড় গাছ - আকাশের নিচে
আমার ছবিটা মা যে যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠবে ।
                                                ( ' ভয় ' )

আলোক সরকারের কবিতা ' ভয় '। কবিতাটি পাঠের  সময় একটা ছবি চোখে ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল। মিলিয়ে গেলই বা বলছি কেন। বেশ কয়েকবার তারা তুমুল আবেদন রেখে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিল। কবির বাড়িতে যাঁরা গেছেন , তাঁরা জানেন ফ্ল্যাটে ঢোকার আগে বাঁহাতে একটি মাঠ অবস্থান করছে। একধারে গম্বুজের মতো কিছু একটা পুরোনো গঠন দাঁড়িয়ে থাকে যাবতীয় রহস্য নিয়ে ।

তা কেন সেই মাঠটির প্রসঙ্গ মনে এল। যতবার পড়ছি , ঐ ' খেলার মাঠে' র শুরুর কথাতেই ফিরে ফিরে আসছে ছবিটা । তারপর সেটি কেটে যেতেই মেঘ ছায়া সরিয়ে উঁকি দিচ্ছে আরো এক শৈশব। সে শৈশব আমার । গতিপথ না জানা এক কিশোরের জোরদার নিরুদ্দেশ যাত্রা ।  সেখানে সবুজ নিয়ে লোফালুফি খেলছে আমার বন্ধুরা ।

তবে কবি আরো কিছু তন্ময় ।  ছবি আঁকার খাতা নিয়ে চলে যান খেলার মাঠে । খেলার-মাঠ কেন ?চার দেওয়ালের মধ্যে যে সীমারেখাটি  আছে , তা নেই বলে । নাকি গাছ আঁকবার বিষয়  বলেই প্রকৃতির সান্নিধ্য চাই , চাই মুক্ত বায়ু - জল - মাটি। শিল্পকর্মের শর্ত  কি একই কথা বলে না ।  তা সেই আত্মখাতাটি হারিয়ে ফেলা সত্যিই যন্ত্রণার । দীর্ণ হয়েছেন কবি ।  বহু খুঁজেছেন ।  তাঁর পরিচিত বকুল তলায় তাকে খুঁজে পাননি ।  খুঁজে পাননি অশত্থ গাছের তলাতেও। যদি বলি ,  তিনি যথেষ্ট সময়ও  পাননি খুঁজে দেখবার  । কারণ , ' অন্ধকার হয়ে এল', এমনকি ' ওরা সব চলে গেল '। কারা চলে গেল আর অন্ধকারই  বা কে ? কবির কি কোনো বন্ধু ছিল সেই প্রসন্ন যাত্রাপথে । কারো কথা আমরা পাইনি । অথবা অনাবশ্যক বিবেচনা করে কবি হয়তো উল্লেখ করেননি । এখন একা হয়ে পড়া জীবনে যে তাদের চাই ।  এই অন্ধকার তো সত্যিকারের অন্ধকার নয়। বরং এই আলোহীনতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অন্তর্নিহিত সত্য । একটি গাছ আর আকাশ আঁকা ছবির খাতাটি শুধু আঁকার খাতা নয় ।  সে যেন প্রতিনিধি ওই শৈশবের ।  বীজের ভেতর যেভাবে  গাছের স্বপ্ন নির্জনে থাকে । ---

" ঢেউয়ের পরতে আমি যে-বীজ ছড়াই
ফাটে তা ডুবন্ত চাপে ,
অনেক অঙ্কুর ভাসে
জীয়ন্ত আবেগে আর আমার মুখের চারিদিকে
জ্যোতি হয়ে চায় ঝলকাতে। "
                      ( ' জাগর '।  অরুণ মিত্র ।)

বড়োদের সমাজে যার হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল ।  অমোঘ সেই সত্যকেই মনের অস্থিরতা দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে । এ এক  বার্তা । জীবনের বার্তা। যে জীবন ইট চাপা ঘাসেদের মতো হলুদ হতে চায় না।  চায় না নিজস্ব প্যালেট ভরে উঠুক কালো রঙে।

            কবিতাটি পড়তে পড়তে  সম্মোহনের মতো কিছু একটা ঘিরে ধরে । সে  কি আশাবাদ ! নাকি দুঃশ্চিন্তা ।  কোনটা  ;  এখনো বুঝতে পারিনি ।  তবে একটি ভালো কবিতা পড়ার স্বাদ মনে লেগে রইলো জীবনভোর।

৪.

বারবার এখানে এসেছি অফিস ছুটির পর , একা
ফলের দোকান ছিল দারুণ উজ্জ্বল, তার পাশে
                                            মুক্ত - ডানা মেয়ে ।
এ শহরে কতদিন আছি ?
তরুণ কবির পাশে বসে থেকে কেটেছে সময়।
মেয়েদের স্বনির্ভর জীবিকা - সন্ধান , তার পাশে
                   মৃত্যুর কবিতা,  তার পাশে  হিম ---
এইসব দেখে বারবার চমকে উঠেছি ।
মুখোশের পাশে দেখেছি দস্তয়েভস্কির বই ,ইডিয়ট,যা  ঝুঁকে পড়ে তুলে নিতে গিয়ে বুঝেছি অন্ধের হাত
                                        এগিয়ে আসছে ।

এ শহরে অপরিচিতের মতো বহুদিন ঘুরে বেরিয়েছি
                                                           একা একা ।
আমাকে চিনবে না ?
                                              ( ' এ শহরে ' )


কালীকৃষ্ণ গুহর  এই কবিতাটি যত পড়ছি , ততই নিজেকে সময়ের নিরিখে ধরার ইচ্ছেটি প্রবল হয়ে উঠছে। তখন সবে এম . এ. পাশ করেছি ।  চাকরির চেষ্টা চলছে ।  সেই সঙ্গে চলছে অলস শিল্প- সাহিত্য চর্চা ।  মূর্তি গড়ার কাজ শিখছি পাড়ারই এক দাদার কাছে ।  সঙ্গে রিলিফের সত্যানুসন্ধান । একটু বেলা হলে শুরু হতো এ সমস্ত ক্রিয়াকর্ম ।  বাবা - মাও  বারণ করার মতো কিছু দেখতেন না । ফলত আমার অবাধ গতি তৈরি হয় অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করার উদ্দেশ্য নিয়ে ।  সেই মাহেন্দ্রক্ষণ- এ মেজোমামার আবির্ভাব এবং চাকরির প্রস্তাব ।  অঞ্চল : শিবপুর। কর্ম : সুপারভাইজার ।  লেখাপড়ার জগত থেকে দূরে শুধু নয়  ,  সম্পূর্ণ আলাদা । লেবারদের নিয়ে হিসেব পত্তর। আর অমানুষিক পরিশ্রম । কাজের আনন্দ থেকে নিরানন্দ বেশি ।  তবু সেদিনের কথা ভাবলে সেই চাকরিটি  মূল্যহীন মনে হয় না আমার । এবং আজও । অভিজ্ঞতাই মানুষের মূল্যবান সম্পদ। আর তা যে কোনো উপায়ে অর্জিত হতে পারে।

          কিন্তু কেন এমন একটি সময় অপরূপ হয়ে ধরা দিল আমার মনে । ধরা দিল ,  তার কারণ ' এ শহরে ' কবিতাটি ।  একটি ভালোলাগা মিলে মিশে আছে বর্তমান সময়ের এই গভীর শূন্যতার মধ্যেও ।সে সময় ছিল প্রশান্তির ।  অফিস থেকে বেরিয়ে পড়তাম দিনের আলো থাকতে থাকতেই । পাশেই গঙ্গা । ওপারে ডক। জাহাজ তৈরি হচ্ছে । মধ্যে মধ্যে  জাহাজের মন্থর শুভেচ্ছা সফর । নাইট ডিউটির সময় একবার জাহাজ  এম. ভি . হর্ষবর্ধন কে ( বা ঐ ধরনের ) দেখি ।  রাতের অন্ধকারে পঞ্চেন্দ্রিয়কে সজাগ  করে সে চলেছে । তার  জ্বলে থাকা আলোগুলো এতদিন  পরেও   ঘ্রাণ নিয়ে আসে
স্মৃতিতে।
               তবু বিকেলের সেই বেরিয়ে পড়ার মধ্যে বিস্ময় লুকোনো থাকত । মনে হত ,  এই সময় যেন বা  অনন্তের রূপ মুগ্ধ। এর প্রতিটি মুহূর্ত এখন আমার ।  কাউকে ,  কোনও  ক্ষণকে হারিয়ে যেতে দেব না ।  কখনো ধর্মতলা , কখনো শ্যামবাজার , কখনো কলেজস্ট্রিট  বা  রবীন্দ্রসদনে কিছুটা সময় অতিবাহিত করার মধ্যে নিরসন হত মনের জমে থাকা গল্পগুলির ।

" ফলের দোকান ছিল দারুণ উজ্জ্বল , আর পাশে
                                      মুক্ত - ডানা মেয়ে । "

তখন নিজেকে খননের প্র্যাকটিস ।  তাই প্রাকৃত- অপ্রাকৃত ঐশ্বর্য সব  চুপি চুপি এসে ধরা দিত যাত্রাপথে ।  মনে পড়ে ,  সুমন চ্যাটুজ্জের কথাগুলি ---  এই শহর জানে আমার প্রথম সবকিছু ... । আমি পালাতে চাই নি ।  তাই লেলিন মূর্তির পাদদেশে অফিস ফেরত সময়  কাটিয়ে দিতাম নতুন জীবিকার সন্ধান - স্বপ্ন বুকে নিয়ে।

         সত্যি !  আজ দরকারে , হ্যাঁ চারবারের দরকারে একবার যখন শহর মন্থনের কাজে নামি ,  তখন ফুস মন্তর হয়ে যায় সব । নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি ,
' আমাকে চিনবে না ? ' ---- তার উত্তরের অপেক্ষা না করেই পরিকল্পনাহীন অবিশ্রান্ত হয়ে ওঠে আমার যৌবনের স্মৃতি । সেখানে দস্তয়েভস্কির পাশে লরেন্স আর লরেন্সের পাশে  ১৯৯৭- এর  আত্মমৈথুন।

                                                                             ক্রমশ 



ছবি:  বিধান দেব 

   
             
 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন