১.
লাইল্যাক গাছগুলো ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে
আমার দুঃখের কথা তোমার কাছে কি পৌঁছোয় নি?
হ্রদ ও নদীর ধারে সারি দিয়ে ফুটে আছে ফুল
চলো যাই পাহাড়ি প্রান্তর আর সরু হয়ে আসা উপত্যকায়
এমনকি দূরের জঙ্গল সেও ফুল হয়ে ফুটে আছে
আমার দুঃখের কথা তোমার কাছে কি পৌঁছোয় নি?
দূরের গ্রামগুলিও হয়ে উঠেছে লাবণ্যময়
চলো যাই আমার মা-বাবার বাড়ি
সেখানে বিস্তীর্ণ মাঠের ধারে ফুলেদের সারি
আমার দুঃখের কথা তোমার কাছে কি পৌঁছোয় নি?
২.
কেউ কি দেখেছ তাকে কোনো জায়গায়,কোনোদিন?
তিনিই সে যাকে পেতে চেয়ে হয়ে যাচ্ছি ক্রমে ক্ষীণ।
শীত আমায় বানায় বরফ
গ্রীষ্মকালে যাই গলে
খুঁজতে হবে তাকেই আমার সবসময়ে হয়ে দীন
তিনিই সে যাকে পেতে চেয়ে হয়ে যাচ্ছি ক্রমে ক্ষীণ।
একদা আমার নিবাস ছিল সুদূর ওই পাইন বনে
ছিলাম বেঁচে যতদিন না তারই কুঠার আঘাত হানে
সুমিষ্ট চন্দনের গুড়ি থেকে হলাম ছাইয়ের মত হীন
তিনিই সে যাকে পেতে চেয়ে হয়ে যাচ্ছি ক্রমে ক্ষীণ।
ভাগ্য আমার এই রেখেছে আমার জন্য মজুত করে
জ্বলতে হবে ধিকিধিকি, পুড়তে হবে ধীরে ধীরে
ভালবাসার জটিল জালে আটকে গেছে হাব্বা মীন
তিনিই সে যাকে পেতে চেয়ে হয়ে যাচ্ছি ক্রমে ক্ষীণ।
৩.
জগৎটা তো দুঃখ ছাড়া কিছুই নয়, ও ময়না!
টিকবে না তো কিছু যে আর, স্মৃতিও ক্ষয়
ময়না গো, এই দুনিয়া দুঃখে ভরা একটি স্থান
টিকবে না তো কিছু যে আর, স্মৃতিও ক্ষয়।
খুঁজে ফিরেছি হন্যে হয়ে জগৎময়
প্রবঞ্চক আমার হাতে দেয়নি কিছু
বন্ধু নয়, ভাইবোন নয়, কেউই নেই
টিকবে না তো কিছু যে আর, স্মৃতিও ক্ষয়।
এই দুনিয়ায় কেন আমি এসেছিলাম?
কেন আমার এই জগতে জন্ম হলো?
খুললো না তো আমার জন্য একটিও দোর
টিকবে না তো কিছু যে আর, স্মৃতিও ক্ষয়।
খুঁটিয়ে দেখি আমার অতীত তন্নতন্ন
আমায় বলো,কী পেয়েছি,আমার প্রিয়
কেন বা তিনি এতটা ভার চাপিয়ে দিলেন?
টিকবে না তো কিছু যে আর,স্মৃতিও ক্ষয়।
প্রেমের আগুন বইতে হয় প্রেমীদের
প্রেমের বাজারে ক্রমেই তা ফুঁসতে থাকে
কয়েকজনই নিঃস্ব হয় সে দিব্য আঁচে
টিকবে না তো কিছু যে আর, স্মৃতিও ক্ষয়।
কেউ তো তবু তোমার প্রতি বাসনা জাগায়
চাঁদের আলো তোমার জন্য প্রতীক্ষায়
হাব্বা বলে তার জীবনের দুখের কথা
টিকবে না তো কিছু যে আর,স্মৃতিও ক্ষয়।
৪.
প্রতিটি রন্ধ্র আমার দেহের ব্যথায় ব্যাকুল
আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!
দেখেছিল আমায় সে ওপর থেকে পাঁচিলের
পারতাম তাকে জড়িয়ে দিতে সুন্দরতম শালে
কেনই বা সে এমনভাবে আছে রেগে?
আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!
দেখেছিল আমায় সে দরজা থেকে—
আমার বাড়ির রাস্তা তাকে কে চেনালো?
আমার জন্য রয়েছে কেবল যন্ত্রণাই!
আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!
দেখেছিল আমায় সে জানলা থেকে
লম্বা গ্রীবার সৌন্দর্য এই আমি
চলে গেল আমার হৃদয় শূন্য করে
আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!
দেখেছিল আমায় ছাদের জানলা দিয়ে
কথা বলেছিল গায়ক-পাখির মতন করে
ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল দৃষ্টি হতে
আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!
দেখেছিল আমায় চিলেকোঠার থেকে
প্রবেশ করে এক ব্যাপারী আমার গৃহে
ফুরিয়ে দিল আমায় একটু একটু করে
আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!
দেখেছিল আমায় ছাদের ওপর থেকে
পুড়তে দিল তীব্রভাবে যেমন মশাল
অনুতাপ ছাড়া কিছুই তো আর গেল না রেখে
আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!
ডুবে যাওয়া চাঁদের মত তাকিয়েছিল
কেন এলো পাগলপারা মানুষ হয়ে
ওই ভূমিকা কেনই বা সে করলো পালন
আমাকে সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!
দেখেছিল আমায় নদীর পাড় থেকে
গোলাপকুঁড়ি হারিয়ে গেল একেবারেই
ভালবাসার আগুন আমায় গিলেই নিল
আমায় সে ভরিয়ে দেয় কামনায়!
৫.
সকল ত্রুটি ক্ষমা করো হে পরওয়ারদিগার
আমার মৃত্যু থেকে কি লাভ তুমি পাবে?
আটকে গেছি জালে আমি কি করে যে কাটাই দিন
এখন তুলসীগাছের উজ্জ্বলতা পুদিনার মত দীপ্তিহীন
যে আগুন জ্বালিয়েছ ধিকিধিকি জ্বলছে আমার হৃদয়ে
আমার মৃত্যু থেকে কি লাভ তুমি পাবে?
নিজেকে তুমি ভরাতে পারো অজানা সব সম্পদে
কিন্তু তুমি নিঃস্ব হবে খালি হাতে যাবে কবরে
প্রশ্ন করি,যৌবন আমার,কিসের ছিল অহংকার?
আমার মৃত্যু থেকে কি লাভ তুমি পাবে?
পড়েছিলাম কোরান আমি প্রথমবারেই
একটুখানি ভুল ছিল না সে চেষ্টাতে
ভালবাসার কিতাব আমার হয়নি পড়া
আমার মৃত্যু থেকে কি লাভ তুমি পাবে?
যন্ত্রণাতে দীর্ণ এখন হাব্বার দেহ
একটিবারও আসোনি তুমি দেখতে তাকে
প্রতীক্ষায় আছো কি আমার কবরে যাবার?
আমার মৃত্যু থেকে কি লাভ তুমি পাবে?
হাব্বা খাতুন (১৫৫৪—১৬০৯): কিংবদন্তি সরিয়ে হাব্বা খাতুনের সঠিক পরিচয় পাওয়া কিছুটা কঠিন। একদল মনে করেন কাশ্মীরের সীমান্ত জেলা গুরেজ- এ তার জন্ম।তার বিয়ে হয় অশিক্ষিত এক গ্রাম্য মানুষের সাথে।হাব্বা তার স্বামীকে তার কিছু আধ্যাত্মিক ক্ষমতার কথা বলে।তার স্বামী ভয় পেয়ে তাকে ডাইনি সন্দেহে পরিত্যাগ করে।হাব্বা তার বাবার বাড়িতে ফিরে আসে।সেখানে সে মাঠে মাঠে কাজ করতো আর তার বেদনাভরা অনুভূতিগুলো দিয়ে গান বেঁধে গাইত।একদিন কাশ্মীরের শেষ স্বাধীন সম্রাট ইউসুফ শাহ চাক এইপথ দিয়ে যাবার সময় তার গান শোনেন।তার সৌন্দর্য, সংগীত ও বুদ্ধিমত্তার দ্বারা আকৃষ্ট হন।তিনি তাকে তার রাণী করেন।আরেকদল মনে করেন,হাব্বা খাতুন ছিলেন একজন পেশাদার গায়ক।যিনি ইউসুফ শাহ চাকের দরবারে সভাগায়ক হন।পরবর্তীতে সম্রাট তাকে তার প্রিয় রাণীর মর্যাদা দেন।পরবর্তী কালে সম্রাট আকবর ইউসুফ শাহকে পরাজিত ও নির্বাসিত করলে হাব্বা খাতুন প্রাসাদ ছেড়ে নির্জনে চলে যান এবং সাধিকার জীবন যাপন করেন।তাকে 'কাশ্মীরের বুলবুল'( Nightingale of Kashmir) বলা হয়।বিদ্বানের ফার্সিতে কবিতা রচনা না করে তিনি সাধারণের কাশ্মীরি ভাষায় গান ও কবিতা রচনা করেন।হাব্বা খাতুনের কবিতায় আমরা বিশুদ্ধ গীতিকবিতার আস্বাদ পাই।সামাজিক ভাবে নারীর যন্ত্রণা, বেদনাকে তিনি তার কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন।দূরের কোনো প্রেমিকের প্রতি প্রেম,বিরহই শুধু নয়,ইন্দ্রিয়জ অনুভূতি ও শরীরী কামনা,বাসনার কথাও তার কবিতায় উঠে এসেছে।সেই অর্থে তিনিই প্রথম কাশ্মীরের ফেমিনিস্ট কবি।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন