বুধবার, ৩০ মার্চ, ২০২২

সুপুরিবনের ছায়ায় ছায়ায় ।। সুবীর সরকার


 


৯.
আমি আমার ১৮ বছর বয়স থেকে বাবু দার কাছে যাই।বাবু দা, মানে শ্রী দেবজ্যোতি রায়।লেখার মানুষ।মুক্তচিন্তার মানুষ।নকশালবাড়ি আন্দোলনের মানুষ।প্রখর পড়ুয়া।গভীর দুই চোখের ভেতর একজন সন্ত বুঝি।সন্ন্যাসী ও সৈনিক বুঝি।কিভাবে বাবু দার সাথে পরিচয় হয়েছিল আজ আর সেটা মনে নেই।বাবুদা তখন থাকতেন কুচবিহারের পাটাকুড়ার বাড়িতে।একটা স্কুটার ছিল বাবু দার।
তখন তিনি রাজনৈতিক সক্রিয়তা থেকে সরে এসেছেন।নিমজ্জিত হয়েছেন লেখা পড়া মানব অধিকার সংক্রান্ত কাজকর্মে।
আমি সপ্তাহে তিনদিন সাইকেল চালিয়ে বাবু দার বাসায় যেতাম।ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার সামনে বসে থাকতাম।সাহিত্য সমাজ নিয়ে বাবু দা বলে যেতেন নানা কথা।মাঝে মাঝে শোনাতেন নিজের লেখা।
তবে কবিতা নয় বাবু দার গদ্য আমাকে আকৃষ্ট করতো।এখনও করে।নিজের রাজনৈতিক জীবনের নানান অভিজ্ঞতা শোনাতেন তিনি।কত কত মানুষ।ঘটনা।অভিজ্ঞতা।আমি উদ্বেল হয়ে পড়তাম।উত্তেজিত হয়ে পড়তাম।সেই সময় নিজের রাজনীতি আর জীবন নিয়ে একটা বড় গদ্য লিখছিলেন বাবু দা।মাঝে মাঝে শোনাতেন।গণপিটুনি,ধরা পড়া,জেলযাত্রা আর চোরাবালিতে ডুবে পড়বার গল্পগুলি মন্ত্রমুগ্ধের মতন শোনা হয়ে যেত আমার।পরবর্তীতে সেই লেখা বই হয়ে বেরিয়েছিল_"নরকের থেকে একটুকরো অনির্বচনীয় মেঘ"।
আমার ভেতরে জীবন আর সৃজন নিয়ে কত প্রশ্নই তো জমতো।সেই সব প্রশ্নগুলো ছুড়ে দিতাম আর বাবু দা শান্ত ভাবে সেই সব নিয়ে কথা বলে যেতেন।আমার জীবনবোধ কেমন বুঝি বদলে বদলে যেত।ভেতরের খিদে বেড়ে যেত।
এক নুতন মানুষ হয়ে উঠতে থাকতাম আমি।
আমার সৃজন জীবনে মস্ত এক ছায়া হয়েই থাকবেন বাবু দা।
যদিও এখন আর আগের আড্ডা হয় না।
জাস্ট দেখা আর কুশল বিনিময় হয়।
শ্রী দেবজ্যোতি রায়ের কাছে অনন্ত ঋণ আমার।
১০.
প্রায় ৩৫ বছর আগে আমার সঙ্গে পরিচয় আর ক্রমে সখ্যতা জমেছিল ভানু দার সাথে।ভানু ভট্টাচার্য।তিনি নিজে কবিতা লিখতেন না।গিটার বাজাতেন।টিউশন করতেন।আর সম্পাদনা করতেন "অহংকারী অন্বেষা" নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা।আমি ডাকে লেখা পাঠাই।লেখাটি প্রকাশিত হয়।তারপর একদিন সাইকেল নিয়ে সটান হাজির সম্পাদকের ইন্দ্রজিৎ কলোনির বাড়িতে।সেটা ছিল বৈশাখের তপ্ত দুপুর।একজন হাসিখুশি মজলিসি মানুষ ছিলেন ভানু ভট্টাচার্য।প্রথম আলাপেই আমাকে কাছে টেনে নিলেন।আমার ভেতর স্বপ্ন ছড়িয়ে দিলেন ভানু দা।
আমিও যুক্ত হয়ে পড়লাম "অহংকারী অন্বেষা"_র সঙ্গে। পরে আমাকে সহ সম্পাদক করেছিলেন ভানু দা।তীব্র তেজ নিয়ে আমি ঘুরে বেড়াতে থাকলাম সমস্ত শহর।আমাকে তখন কবিতায় পেয়েছে।আমি আর ভানু দা প্রায় দিন আড্ডা দিতাম।কখনো যোগ দিতেন রমেন দাস,ভগীরথ দা,কুমার শিবেন্দ্র নারায়ণ,ঘেঘিরঘাট থেকে এসে জুটতো চন্দন কুমার চন্দ।নিজেদের লেখা,স্বপ্ন আর পত্রিকা নিয়ে নানান পরিকল্পনা নিয়ে সে এক উন্মাদনার পর্ব।সে এক উত্তাল প্রস্তুতিপর্ব আমার জীবনের।
১৯৯৭ সালে পত্রিকা চালাতে না পেরে বন্ধ করে দিলেন ভানু দা।আমিও তখন তীব্র বেকার।আর্থিক ভাবে দাড়ানো সম্ভব ছিল না পাশে।ভানু দাও আর্থিক কষ্টে সময় কাটাচ্ছেন।বিয়ে করেছেন।সেই দায় তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
এর পর ২০০৫ সালে আমি কুচবিহার ছেড়ে মাথাভাঙ্গা চলে গেলাম।ইতিমধ্যে ভানু দার সঙ্গে যোগাযোগ কমে এসেছিল।
আমিও জীবন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত।
অনেক পরে একদিন শুনলাম ভানু ভট্টাচার্য আর নেই।একটি চিট ফান্ডে জড়িয়ে গিয়ে তিনি তীব্র হতাশায় আত্মহনন করেছেন।
আচমকা হারিয়ে গেছে রমেন দাও।
চন্দন কবিতা ছেড়ে আশ্রম বানিয়ে সাধু হয়ে গেছে।
আমার জীবনে ভানু দা শান্ত এক সুপুরি গাছের ছায়া।গহিন মায়া।
যতদিন বাঁচবো,ভানু দাকে বহন করবো আমি।

ছবি : বিধান দেব 

সুবীর সরকার. জন্ম 1970, 3 জানুয়ারি. নয়ের দশকে লিখতে আসা এ কবি উত্তরের লোকজীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন তীব্র ভাবে. ত্রিশ বছরের বেশী সময় ধরে কবিতা, গদ্য সহ বিভিন্ন ধারায় অনায়াস যাতায়াত করেছেন. বাংলা ভাষার প্রায় সব কাগজে নিয়মিত লেখালিখি করেছেন, করছেন. 1996 সালে তাঁর প্রথম কবিতাবই প্রকাশিত হয় কবিতা পাক্ষিক থেকে. গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ও গদ্যের বইগুলো- ধানবাড়ি গানবাড়ি, মাহুত বন্ধু রে, নির্বাচিত কবিতা, বিবাহ বাজনা, নাচঘর, উত্তরজনপদবৃত্তান্ত, মাতব্বর বৃত্তান্ত, ভাঙা সেতুর গান. পেশায় শিক্ষক এ কবি ভালোবাসেন রবিশস্যের খামার বাড়ি, সাদা ঘোড়া আর যৌথ যাপনে চাঁদের আলোয় কবিতা আড্ডা, লোকগানের আমেজ.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...