রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

গুচ্ছ কবিতা ।। সৌমিত বসু


 মায়া বৌ-১৩৩


এসো অন্ধকার লিখি। যে অন্ধকারে পরস্পরের মুখ দেখা যায়। যে অন্ধকার এতোকাল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে, পাতাকুড়ানীর  ঢঙে সাইকেলে বয়ে এনেছে সবুজ সন্ধ্যাটিকে, পেটের ভেতরের চাপচাপ অন্ধকার কথা টেবিলের ওপর চশমার মত শুইয়ে রেখেছে বালির চড়ায়। এসো দু-হাতে অন্ধকার মাখি, হাত ধুয়ে ধুয়ে কালো করে তুলি নিজেদের বেসিনের রং। ঠোঁটের ওপর জড়ো হোক মাছের চোখের মতো অন্ধকার, নাকছাবি ভেঙে বেরোনো অন্ধকার, আলপথ ধ'রে তোমার একলা হেঁটে যাওয়া অন্ধকার। এসো বন্ধু, মুখোমুখি বসে আজ আলগোছে লিখে রাখি আমাদের জড়ো করা পাথরকুচি অন্ধকার।


ছাই


ডাকছি । আর ডাকগুলো বাতাস লেগে একটু একটু করে ফিতে হয়ে যাচ্ছে । উড়ছে ঘুড়ির মতো।এক হাত বাঁধা । অন্যহাতে একবার মাটি একবার  আকাশ । একবার বাবা একবার ভাই । কুলকুচো  করে ছিটিয়ে দেওয়া জলে ভেসে উঠছে অবিকল তার মুখ , রামধনুর মতো নিরপরাধ।একটি দোলনা যেন ক্রমাগত ঘুরে বেড়াচ্ছে স্মৃতি বরাবর। আর ডাকগুলো ফড়িংএর মতো উড়ে এসে বসছে স্মৃতির ওপরে । একটি শ্মশান হেঁটে চলেছে একলা গ্রামের আলপথ ধরে । সব দেখাই তাহলে একদিন ভুল হয়ে যায় ? সব ভালোবাসার গুঁড়োই একদিন--



সংসার


তোমার ভল্ল আমার বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে

চতুর্দিকে গরম কুমকুম

আমি ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ছি দেখে হেসে উঠছে মানুষজন

ভাবছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হলো

এবার তালুতে আসবে সমস্ত বিধবারা

যারা আমার পাশের চেয়ারে বসতে গিয়ে

হোঁচট খেয়েছে বারবার তারাও খুশি

সর্বোপরি আমি নেই ভেবে যারা রাস্তা ফাঁকা ভেবেছিল তারাও আজ গল্পে গল্পে রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।সাজিয়ে দিচ্ছে আনন্দময় সন্ধ্যা ,তোমার প্রশংসায়।


আমার তলোয়ার ঠিক তোমার দুটো বুকের মাঝে।রক্ত নয়,থোকা থোকা চেরিফল আর আনন্দ।

জোৎস্না এসে পেতে দিয়েছে উঠোন তাতে গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছে তোমার স্থাবকেরা।

সমস্ত নিন্দামুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে টার্কিস ব্লু রঙের স্রোত

সেই রং দুহাতে মেখে কারা যেন নেমে যাচ্ছে খাঁড়ির গভীরে।তুমি মৃত্যুঘুমে।


গুটিয়ে রাখা পর্দা কার্টেন কল এর আগেই টানটান হয়ে উঠছে

যেন দুটো মৃত মানুষ উঠে বসে জড়িয়ে ধরছে পরস্পর।আর

হাততালি দেওয়া হাতগুলো ক্রমশ নীল হয়ে আসছে।

অন্ধকারে বসে হঠাৎ ফুটোর ভেতর দিয়ে চাঁদ দেখে প্রথমবার  নিজেদের বোকা বলে আবিষ্কার করছে মানুষজন।


ঋতুস্নান



কতদূর যেতে পারো তুমি?কতদূর?যেদিন জোৎস্না ও সমুদ্রের শঙ্খ লাগবে, তুমি জড়িয়ে ধরবে আমায় লেজ দিয়ে পাকে পাকে, মেঘ ভেবে পাবেনা কোথায় জল ঝরাতে হয়, ঠিক কোথায় থামাতে হয় আবর্তনের সেতুবন্ধন।তুমি রোদ হয়ে ওঠার আগেই আমি কপাল থেকে সরিয়ে নেবো সমস্ত নৌকো।সমস্ত জলপ্রপাত ঈর্ষা হয়ে তাকিয়ে থাকবে আমাদের বরফশীতল দেহদুটোর দিকে।তখন শৃঙ্গারের রঙ বাদামি, যৌনতার রঙ আদিম তামাটে।আমরা হাত ঘষে ঘষে বের করে আনবো পালঙ্কের নিচে লুকিয়ে রাখা বাক্স তোরঙ্গ যার ভাঁজে ভাঁজে গোপনতার কারুলিপি।তোমার ঠোঁট তখন আর কোনো ঠোঁট নয়, যেন উঠোন জুড়ে ধান খুঁটে বেড়াচ্ছে একটা চড়াই,আমার দেহ থেকে সমস্ত শুষে নেওয়া ঘাম তুমি ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছ রোদের বিপরীতে আর তার ভেতর থেকে উঠে আসছে বিচিত্র রঙের ওলট পালট।দুটো দেহ যেন পিষে যাচ্ছে পোরসেলিনের বাটিতে।সবাইকে অবাক করে জন্ম নিচ্ছে আমাদের মেয়ে, তরল আগুনে ভর দিয়ে উঠে বসছেন ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি।একটি মুহূর্ত জন্ম নিচ্ছে শেষ হবার আগেই।


ছবি : বিধান দেব 

সৌমিত বসু ।। জন্ম : ২৬ নভেম্বর ১৯৬৩ দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপে। পেশা: শিক্ষকতা। গত শতাব্দীর আশির দশকের সুপরিচিত কবি। বাংলাদেশেও সমান জনপ্রিয়। পঁচিশটির বেশি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত। পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। 





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন