প্রান্তরের আলোকচিত্রী
আমাদের প্রতিদিনের কথারা যখন ক্রমশ ভোঁতা হতে হতে তাদের তীক্ষ্ণতা হারিয়ে ফেলে, যখন শব্দের উচ্চারণে আর কোনও ম্যাজিক থাকে না কিংবা বলা কথাগুলো কেবলই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তখন, তখনই খুঁজে নিতে হয় কথার নতুন কোনও আঙ্গিক। সেই নতুন আঙ্গিকের কথা কবিরাই আবিষ্কার করেন। যুগে যুগে, প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে। শিল্পের যে কোনও মাধ্যমকেই এই নতুন কথা বলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। কিন্তু কবির মাধ্যম যেহেতু মানুষেরই মুখের ভাষা তাই তার ক্ষেত্রে কাজটা আরও দুরূহ। সেই সঙ্গে একজন কবিকে এ সিদ্ধান্তও নিতে হয় যে জনগনেশের (অধিকাংশ সাধারণ পাঠকের) ভাবনা তরঙ্গের স্রোতে মিশে যায় এমন ভাষায় কবিতা লিখবেন নাকি তার নিজের ভাবনাতরঙ্গে কথা বলবেন এবং প্রতীক্ষা করবেন সারা জীবন নিজ ভাবনা তরঙ্গের সমান ভাবনাতরঙ্গে বাস করা পাঠকদের জন্য। বলা বাহুল্য এই দু ধরনের কবিই আছেন প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক ভাষায়। আমি মূলত শেষোক্ত কবিদেরই পছন্দ করি। কারণ তারা পাঠকদের কাছে যান না। বরং পাঠকদের নিজের কাছে নিয়ে আসেন। যারা সাধারণ পাঠক সাধারণ পাঠক বলে চিৎকার করেন, সামাজিক দায়বদ্ধতার ফর্দ বানান তাদের বলব সাধারণকে অসাধারণ করে তোলাটাই কবির কাজ। আর কবি যখন নিজেই মূর্খ , কবি যখন নিজেই সামাজিক নন তখন কবির আবার সামাজিক দায়বদ্ধতা কী? কবি বরং সামাজিক ভাষ্যের পুনর্নবীকরণ করুন। নতুন ভাষাস্কেলে মানুষের অভ্যস্ত বেঁচে থাকাকে বদলে দিন। মানুষ নতুন হয়ে উঠুক বেঁচে থাকায়, বিশ্বাসে। প্রগতিশীল পৃথিবীর পরিবর্তিত মুখ মানেই নতুন কবিতা। যেমন—
'এক অরণ্য সন্ধ্যায় ঘুমন্ত নদীর বুকে চাঁদ নির্ভার ভাসে। দৃশ্য কুড়িয়ে ফেরে প্রান্তরের আলোকচিত্রী। মহাযজ্ঞের সমারোহে নৌকাযোনিতে ঢুকে যায় মহাজাগতিক শিশ্ন।'
কবিতাটির নাম 'প্রান্তরের আলোকচিত্রী'। কবি শীলা বিশ্বাস। শীলার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হয় কোনও এক বকখালি কবিতা উৎসবে। প্রথম সাক্ষাতেই তার সাবলীল হাসি আর উপহার ' নেবুলা মেঘের মান্দাসে'। কবি হিসেবে সে আমারই সমসাময়িক। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার সাম্প্রতিক কবিতা আমার বোধিনন্দনকে প্রাণিত করেছে। এবার কাকদ্বীপে 'গদ্যপদ্যপ্রবন্ধ'-র অনুষ্ঠানে পেলাম উপহার 'নির্বাচিত শূন্য'। আর তাতেই এই মহাজাগতিক বিস্ময়। হ্যাঁ মহাজাগতিক বিস্ময় শুধু মহাকাশেই সংঘটিত হয় তা নয়। আমাদের ভেতরেও হয়। কারণ আমরা মহাকাশজাতক। শীলার কবিতায় পরিচিত শব্দ তার সংস্থান বদলে ফেলে এক অপরিচিত আলোর বুদ্বুদ মেখে আসে। মনে হয় যেন সদ্য জন্মালো। আর কবি হিসেবে শীলা খুবই নিরপেক্ষ। ওই প্রান্তরের আলোকচিত্রী। 'নির্বাচিত শূন্য'-র আয়োজন বেশ চমকপ্রদ। তিনভাগে বিভক্ত এর সূচির উপনামবিভাগগুলি হল— মিয়াঁওনামা, সম্পাদ্য ও স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছায়াছবি। আবেগরহিত, নিরুদ্বেগ, সংযমী এবং আত্মবিশ্বাসী শীলা এই কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতায় লিখেছেন —
'কিছুদিন বাড়িতে থাকলে টের পাই আমার মনের মধ্যে অনেক বিড়াল বাস করে। বিড়ালের মধ্যে অনেক আমি। ফিরে এসে ঘরে ঢুকতেই দেখামাত্র আমার কোলে লাফ দিয়ে উঠবে কিনা তখন সেটাই বড় প্রশ্ন। কিছু কিছু প্রশ্ন আর উত্তর গা জড়াজড়ি করে থাকে। বিড়াল আদরের পর জামা আর লোমের সম্পর্কের মত অবিচ্ছেদ্য জেদী একগুঁয়ে। অন্তর্মহলের দৃষ্টি বিশ্বদর্শন বুঝে গেলে মাত্র সাতদিনেই বদলে যেতে পারে অভ্যাস। অভ্যাস বদলে দিতে পারে শ্রেণী। এরকম সময়েই তো জন্মবদলের খেলায় মেতে ওঠে একঘর নির্দোষ প্রাণী। অনায়াসে বদল করে নেয় ভূমিকা।'
কবিতাটির নাম 'বিড়াল জন্মের ভূমিকা'। এখানে 'অন্তর্মহলের দৃষ্টি', 'বিশ্বদর্শন' আর অভ্যাস বদলের যে ইঙ্গিত দিলেন শীলা সেটি একপ্রকার তার জীবন দর্শনও। সেই দর্শনে মানুষ থেকে মনুষ্যেতর প্রাণী , আপাততুচ্ছতা থেকে বিশ্বদর্শনের জাগতিকতা সহজ হয়ে যায়। আর সেখানেই শীলা নিজেরও ভূমিকা বদল করেন। দীর্ঘ কাল ধরে নানান সাংসারিক খুটিনাটি আর মেয়েজন্মের দুর্ভাগ্য নিয়ে মধুর-কষায় প্রেম ও বিপ্লবের কবিতা পড়তে পড়তে ক্লান্ত আমি শীলার এই দুঃসাহসিক অভ্যাস বদলের তড়িৎচাবুকের ঘা খেয়ে সোজা হয়ে বসলাম। আর আরও আরও শান্ত হলাম এই আশ্বাসে যে শীলা লিখেছেন—
'আমার শরীর পুনরায় প্রস্তর হইতে সজীব হইয়া উঠিল তখনই যখন এ যাবৎ চুপ করিয়া থাকা মার্জারটি মুখ ঘুরাইয়া স্তব্ধতাপূর্বক আমার কোলে আসিয়া বসিল। আমি তাহার মাথায় হাত রাখিতেই প্রিয় মার্জার মিউ শব্দে বুঝাইয়া দিল তাহাকে দীর্ঘ সময় অভুক্ত রাখিয়াছি। তাহার আহারের বন্দোবস্ত করিয়া ফিরিয়া আসলাম লেখায়। পাঠ্যক্রমের বাহিরে চোখ রাখিলে হৃদয়-তন্তুগুলি অধিক জাগরূক হয়। শব্দটা কেবল শব্দরূপ পায় তাহা নহে স্রষ্টা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ দেয়। নিজের অস্তিত্ব ও স্বাক্ষর রাখিবার সুদীর্ঘ প্রয়াসের কোনও শর্টকাট থাকিতে পারে না। নিরন্তর আদান প্রদান তাহার চলনের একটি অঙ্গ।'
(একটি মার্জার ও ক্ষুধা—৩)
ভেঙে ফেলা অভ্যাসের এমন এক দ্বৈত কথন কবি যখন আত্মস্থ করেন তখন তার প্রতি একটা আস্থা তৈরী হয়।কারণ তিনি জানিয়ে দিচ্ছেন—'নিজের অস্তিত্ব ও স্বাক্ষর রাখিবার সুদীর্ঘ প্রয়াসের কোনও শর্টকাট থাকিতে পারে না।' আহাহা। আজকাল প্রতিমুহূর্তেই আমরা যখন নিগোসিয়েসানে ব্যস্ত তখন এই পর্যন্ত পড়ে নিরালায় নিদ্রা দেওয়া যায়। আসলে শীলার কবিতা যতখানি মহাজাগতিকতার কথা বলে তার থেকেও বেশি বলে বহুজাগতিকতার কথা। অর্থাৎ একই চেতনার মধ্যে একাধিক চেতনার ক্যালাইডোস্কোপ। কারণ একই জীবনের বহুময়তা আর রূপভেদ—
'মেঘের কোমল রূপভেদগুলির মধ্যে দেখি প্রত্নজিজ্ঞাসাময় করুণ মুখ। সম্পর্কের মধ্যেকার নন্দনতত্ত্বগুলিতে চোরা উজান ভাটায় ফুটে থাকে ক্যান্ডিফ্লস। নখে নখে বজ্র বিদ্যুৎ নাকি তরোয়াল। খোলা চুলে আঙুল চালিয়ে রবাহূত বিষাদ। জলের আলপনায় কে করে ঈশ্বরের আবাহন! কারা নেয় ছেঁড়া পুঁজির কিংবদন্তী সাক্ষাৎকার? কুশণ্ডিকা জ্বেলে রাখে সামান্য মোমদান। ত্রিকাল হাতের তালুর এক সমতলে এলে বুঝি বুকের গভীরেই মেঘেদের নিদারুণ সহবাস।'
(কোমল রূপভেদগুলি)
আপাতদৃষ্টিতে এটিকে জীবনের প্রাত্যহিকতাহীন মনে হতে পারে। কিন্তু শীলা তার নিজের একটা নির্দিষ্ট স্তর থেকে কথা বলছেন। সে কথা বোঝার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। সম্পর্কের অন্তর্গত নন্দন নিয়ে যে সহবাস তাইইতো কাঙ্ক্ষিত। এখানে কোনও ইরোটিক প্রলোভন নেই। নেই সভ্যতার অন্তর্মহলের আদিম চাওয়া-পাওয়ার বিভ্রান্তি। এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। তবে শীলা যে শুধু আকাশকুসুম চয়ন করেই বিরহের বেলা কাটান তা নয়।
'রতিছড়ায় উঠোন লেপে ক্ষেত্র করেছি প্রস্তুত। বিভাজিকা বেয়ে নামে অশ্বকেশর। বৃন্তচ্যুত ফুল হস্তিনী রাগে উল্কি সনেট গাঁথে। চাঁদ ঘুমে গেলে তার নিশিআঁখি পল্লব একাকার নাভিকুণ্ডলিনী। মৎসগন্ধার জল ডুব ডুব দ্বাররক্ষী নন্দী কী করে জানে! রাত্রি বুঝি আড়াল দিলো জোছনা কোলে টেনে। আড়ালের ফাঁকে প্রহরী তবুও প্রহর গোনে। কলমের ডগা লাঙলের ফলা শাস্ত্রে সূত্র লেখে।'
(বৃন্তচ্যুত ফুল হস্তিনী রাগে—ই)
রতিমিলনের কথাই এখানে বলা হয়েছে। তবু তার ধার ও ভার আলাদা। এমন শাস্ত্রীয় অঙ্গরাগ যার জন্য কবি ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন তার নবাগত অভিজ্ঞতা নতুন শাস্ত্র সূত্র লিখছে।
কবিতা আসলে সেই কৌতুক আর মায়ার প্রভঞ্জন যা জেগে উঠলেই বিমোহিত করতে থাকে আমাদের তার অশেষ করুণায়। আর সেই করুণায় স্নাত হতে আমাদের চাই গতি। এই গতি নানান অভ্যস্ততার বাইরের এক সংবেদন। চিত্রশিল্পী চিত্রনিভা চৌধুরী তাঁর স্মৃতিকথা-য় লিখেছেন —
'অতৃপ্তি আর অসন্তোষ থাক জীবন জোড়া, থাক নিবিড় নৈরাশ্য আর অসীম কালের বিরহ বেদনা, থাক অনন্ত-লাভের প্রবল ব্যাকুলতা— এরা তীর্থযাত্রার পাথেয়, কোথায় পৌঁছিবে সঠিক জানা নাই। কিন্তু অশান্ত গতি কামনা করি। যে গতি গঙ্গার, যে গতি সৃষ্টি লোকের সেই গতি জীবনের। এই কথাটি জেনেছি— গতিহীনতাই অপমৃত্যু।'
অর্থাৎ, সৃষ্টির গতি জীবনের গতি। জীবনের গতি সৃষ্টির গতি নয়। এই সূক্ষ্মতার অভাবেই আমাদের এত ঢাক, এত কেত্তন। অন্তরালের আবহাওয়া দিয়ে জীবনের আকাশকে সাজানোর অভিপ্রায়ে শীলার কবিতাযাত্রা। তাই প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে তাকে নিজের আখ্যান করে তোলার অভিধায় বিশ্বাসী তিনি।
'জানালা গলে মেঝেতে পড়ে থাকা রোদ আমাকে পরম কৌতুকে বাজিয়ে নেয়। নদীর সোঁতায় পড়ে আছে প্রেম একলা। শিস দিয়ে জানিয়ে যায় গান্ধর্ব মেঘ। খাদের কিনারে এসে নীচু হয়ে মিশে যায় সবুজমহলে। ধোঁয়া ওঠে নিঃশ্বাসে। চায়ের পেয়ালা আমারই মতো ঘুম জড়ানো চোখে টুং টাং আড়মোড়া ভাঙে। জানালার ফ্রেমে আটকে থাকা দলে দলে মহিষের মতো দূরের পাহাড়ের দিকে চেয়ে আছে নাম না জানা অর্কিড। আমি তাদের নাম দিয়েছি খিলখিল আর কানাকানি। ব্যস্ত-ক্লান্ত শহর তুমি এসে কুড়িয়ে নিও পথের দুপাশে দুখানি বিশ্রামফুল।'
(স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছায়াছবি—ঝ)
কোনও কোনও কবির কাছে কবিতা কেবল শব্দ শব্দ খেলা নয়। তার শ্বাস-প্রশ্বাস। শীলা বিশ্বাসের কবিতাও তেমন। তার কবিতা পড়তে পড়তে আমি তার শ্বাস-প্রশ্বাসের নৈঃশব্দ্য কে প্রত্যক্ষ করি। শীলা কথার কাছে অঙ্গাবরণ খোলেন। স্বপ্ন ডানায় মাখেন ল্যাভেন্ডার। তার সন্ধ্যাভাষায় পথ হারাতে হারাতে আমি তাকে খুঁজে পেয়েছি। খুঁজে পেয়েছি তার পাথুরে চার্চ ও হৃদয় ভাষা। যা অবলীলাক্রমে আমাদের হয়ে ওঠে।
নির্বাচিত শূন্য ।। শীলা বিশ্বাস ।। সুতরাং ।। একশো টাকা
ছবি : বিধান দেব
অরুণ পাঠক ।। জন্ম: ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ কাঁজিয়াখালি, হাওড়ার মাতুলালয়ে। পিতৃভূমি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনাকোপা গ্রাম। সেখানেই আবাল্য বসবাস। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঙ্গভাষা ও সাহিত্য-এ স্নাতকোত্তর।
শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রিপ্রাপ্ত। পেশা শিক্ষকতা। এই শতাব্দীর সূচনা (শূন্য) দশকের কবি। কবিতা ও কবিতা বিষয়ক সাহিত্যপত্র 'সাহিত্যের বেলাভূমি ' পত্রিকার সম্পাদক। স্যাক সাহিত্য সম্মাননা, বনানী পুরস্কার, সামসুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রভৃতি একাধিক পুরস্কারে সম্মানিত। কবিতা পড়তে একাধিকবার বাংলাদেশে গিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'দ্বিতীয় বার একা'। কবিতাই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র আশ্রয়।
শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রিপ্রাপ্ত। পেশা শিক্ষকতা। এই শতাব্দীর সূচনা (শূন্য) দশকের কবি। কবিতা ও কবিতা বিষয়ক সাহিত্যপত্র 'সাহিত্যের বেলাভূমি ' পত্রিকার সম্পাদক। স্যাক সাহিত্য সম্মাননা, বনানী পুরস্কার, সামসুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রভৃতি একাধিক পুরস্কারে সম্মানিত। কবিতা পড়তে একাধিকবার বাংলাদেশে গিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'দ্বিতীয় বার একা'। কবিতাই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র আশ্রয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন