রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

গুচ্ছ কবিতা ।। শান্তনু পাত্র


 শরীরে দ্যাখো অনন্ত আকাশ


       



স্পন্দন



শাম্ভবী মুদ্রায় স্থির দৃষ্টি রাখি ভ্রূসন্ধির মাঝে,

রিল-ভিডিওর মতো দৃশ্যপট চলে যায় দ্রুত...

আকাশগঙ্গার ওই নীল ছায়াপথে ঢেউ ওঠে 

শূন্যতার বুক ফেটে ওড়ে মনখারাপের তুলো।


সময় হলেই জানি, গ্রন্থির বন্ধন যত ছিন্ন হবে ধীরে

নুনের পুতুল আমি, মিশে যাব দুরূহ সমুদ্রে।

তৃষিত পাখির মতো ডানা মেলে পঞ্চভূত এসে

তীক্ষ্ণ চঞ্চু দিয়ে তুলে নেবে ঠিক, অবশিষ্ট আলো।


যত্ন করে আকাঙ্ক্ষার মায়া-দীপ জ্বেলে

তবুও কেন যে বড় বাঁচতে ইচ্ছে করে?

হলুদ শাড়িটি পরে যখন প্রবেশ করো তুমি,

হেঁটে যাও আনমনে, উজ্জ্বল স্মৃতির করিডরে...




ইউফোরিয়া



আসবে বলেছিলে, পেরিয়ে যায় দিন,

রয়েছি কতকাল অপেক্ষায়...

আকাশে চোখ মেলে, তোমাকে খুঁজে মরে

অল্প বিস্তর সবাই প্রায়।


বিষাদ বাসা বাঁধে মনের অগোচরে

মাঘের শীত তবু, তপ্ত প্রাণ...

একলা হয়ে যাই, তোমাকে যত লিখি,

রাত্রি বেড়ে চলে, ডিপ্রেশান।


পেশার দাবি আছে, মনকে ভালো রেখে

চরম হতে হবে ইউফোরিক...

তবুও কেন আমি লেখায় হাত দিয়ে

ধাক্কা খেয়ে বলি― স্থির তড়িৎ!


কলম ছেড়ে দিয়ে আবার ধরে নিই

এ নেশা পুরোপুরি খতরনাক।

ভেবেই চলি শুধু, বিপথে ঘোরা ফেরা?

রাস্তা এক আছে, চক্রপাক।


দিব্যি কেটে বলি, কবিতা ছুঁয়ে বলি

তুমিই দিয়ে গেছ হাতের যশ‌।

জেনেই গেছি কবে, নিখুঁত সার্জারি

আসলে সেও এক কাব্যরস।





দেনা


সংসারী হতে পেরেছি কি আমি? সন্ন্যাসী! তাও নয়...

মাঝখানে শুধু আয়ুটুকু যেন তিরতিরে এক রেখা।

জীবন! তোমাকে বুঝতে বুঝতে প্রজ্ঞার অপচয়,

দুর্জ্ঞেয় কত তোমার কাব্য ম্যাজিক কালিতে লেখা।


পারবে কি তুমি হেঁটে যেতে ওই সময়ের বিপরীতে?

হাওয়া ওঠে জোরে, আল্পনা আঁকে সুবর্ণরেখা চর

স্কুলব্যাগ এক খেলা করে দ্যাখো সোনাঝুরি ধানক্ষেতে...

সম্পদ যত উপচে পড়ছে, তৃপ্ত হৃদয়গড়‌।


রাস্তা যেটুকু পেরিয়ে এসেছি ফিরবে না কোনওদিন,

তবুও বলছি শোধ করে যাবো তোমার গভীর ঋণ...



ভুলে গেছি শুধু...



ভুলিনি এখনও সেই  অনাহার-দিন

ভুলতে পারিনি আমি দুর্ভিক্ষের খিদে

ভুলতে পারিনি শীর্ণ ঠাকুমার মুখ

ভুলিনি ভুলিনি সেই শ্মশানের রাত।


ভুলিনি পশ্চিমি হাওয়া, অকাল বৈশাখী

উড়ে যাওয়া চিলেকোঠা, ডানাভাঙা পাখি


ভোলা কি এতই সোজা কলকাতা যাওয়া...

ভুলিনি কিছুতে আমি জয়েন্ট এন্ট্রান্স‌।


ভুলতে কি পারা যায় প্রথম মাইনে!

ভুলিনি প্রথম কেনা মায়ের শাড়িটি


ভুলিনি তোমাকে ওগো শালুক পুকুর

ভুলিনি এখনও আমি উচ্ছ্বাস-সাঁতার...


ভুলিনি প্রথম কেনা গিফটের দাম‌


ভুলে গেছি শুধু, মস্ত প্রেমিক ছিলাম




যে নদীর কাছে আমি...



মনের গোপন থেকে মেঘ উড়ে এসে

নির্দ্বিধায় গুঁড়ো হয়ে মিশেছে বৃষ্টিতে...

বিপদসীমার কাছে জলরাশি এসে

স্রোত হয়ে বয়ে যায় প্রতিটি শিরায়


তোমার উশ্রীর ঢেউ ভাসায় আমাকে...

ভেজা গায়ে হাবুডুবু  তীব্র-সন্তরণে

বিজাতীয় স্পর্শ এসে জ্বেলে দেয় আলো।


রোমাঞ্চ সাঁতার শেষে ফিরে গেছি ঘরে


ঝুঁকেছে পশ্চিমে সূর্য কালের নিয়মে

অদৃশ্য ‌আভায় লেখা মৃত্যুর ঠিকানা।

দিন শেষে জল যত বাষ্প হয়ে ওড়ে

ধারাপথে জেগে ওঠে বালির বিছানা


যে নদীর কাছে আমি রোজ রোজ গেছি

তারই শুকনো চরে পুড়তে এসেছি।



দেবীপক্ষ



আশ্বিনের আলো-ধোয়া তোমার পায়ের পাতা― 

সে তো,আমার পড়া শ্রেষ্ঠ বিভাব-কবিতা।

পাশ ফিরে,চোখে চোখ রেখে

পরম নিশ্চিন্তে হাত রেখেছি অক্ষরে...


অদ্ভুত পাগল তুমি ! একথা বলেই পা সরিয়ে 

দুহাত রাখলে শুধু  আমার কপালে।

সাথে সাথে ধূ ধূ প্রান্তরের শূন্য বুকে  

জেগে উঠল কাশফুল কিছু,

শরতের মেঘ এল আমার আকাশে‌।


তোমার ভ্রুভঙ্গি ইশারায় দেখি,  বরাভয় মুদ্রা...


আজন্ম বন্ধনহীন, নিরাসক্ত আমি।

তবুও দুদিক থেকে লতার বাঁধন

আর আগমনী-স্রোত এসে আষ্টেপৃষ্ঠে 

দ্রুত বেঁধে ফেলেছে আমাকে।


       

  

  চশমা



'আপনি তো চোখের ডাক্তার 

রোজ কত মানুষের দু'চোখ দ্যাখেন!

দেখব কি আজ একটু আপনার চোখ?'

এই বলে তাকিয়েছে অচেনা মেয়েটি


নামিয়ে নিয়েছি চোখ, শিওর হয়েছি

সুশিক্ষা পায়নি এই বেয়াদপ মেয়ে।


এগারো বছর আগে এ ঘটনা চুঁচুড়ার

জেলা হাসপাতালে,

গঙ্গার অতলে‌ সেই ছবি....


মিলিয়ে যায়নি স্মৃতি তাড়া করে আজও

গভীর ঘুমের মাঝে কার যে আঙুল

খুলে দেয় চশমা আমার,  দুচোখের

পাতা টেনে কী যে দ্যাখে বুঝতে পারি না।


মোবাইলে কাব্যগাথা, রাত বেড়ে চলে

ঘুম ভাঙে জুঁইয়ের সুগন্ধে, খুঁজে দেখি...

সযত্নে চশমা রাখা বালিশের ধারে,

বাইরে অঝোরে বৃষ্টি, আবছা সকাল


মেঘলা দিনের হাওয়া ঘোরে চক্রাকারে...




স্বাস্থ্য-শ্রমিক



বুকের ভেতরে জমে দীর্ঘশ্বাস কত!

ফেসশিল্ড ভিজে যায় দু চোখের জলে...

কে তার খবর রাখে বলো!


পড়ন্ত বিকেলে ঠাণ্ডা ভাতের থালায়

মাছিও বসে না, তবু খেয়ে নিতে হয়।

স্পিরিটের গন্ধমাখা নিদ্রাহীন রাত―

একান্তে বাজিয়ে চলে গহীণ শূন্যতা।


কেউ বোঝে, কেউ বা বোঝে না অতশত।

গাউনের নিচে জমা  রক্ত আর ঘাম

নিভৃতে সঞ্চিত হয় কালের গহ্বরে...


 

  পথ পাঁচালি


ইচ্ছে হয় শিলাবতীর পাড়ে ওই শুনশান আশ্রমে গিয়ে শাকান্ন খেয়ে সারাদিন মৃদঙ্গ পেটাই, কিম্বা ফেকোঘাটের আঁধারজঙ্গলে কুঁড়েঘর বেঁধে থাকি, নির্বস্ত্র হয়ে যোগাভ্যাস করি। ইচ্ছে হয় মোষের মতো নাকটুকু বার করে মগ্ন-মৈনাক হয়ে রায়ডাকের টলটলে জলে ডুবে থাকি অনন্তকাল...


বড়ো ইচ্ছে করে― প্রতাপ পাহাড়ির মতো সাইকেলে সবজির পশরা সাজিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরি‌।


ইচ্ছে তো হয়ই, সনাতন মাহারের মতো কল্কে নিয়ে বসে পড়ি অশ্বত্থ গাছের শিকড়ে, দম নিয়ে পাড়ি দিই সপ্তর্ষিমণ্ডলে...


অবাক হই। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে অবচেতন মনও কেমন সেয়ানা হয়ে উঠেছে। বেছে বেছে এমন সব জায়গায় ঘুর ঘুর করছে যেখানে আউটডোরের ভিড় নেই, জনসমাগম নেই,ভাইরাস নেই, মৃত্যুর গন্ধ নেই...





পাতালের ডায়েরি



কেন যে ঘুরে ফিরে, অকাল মহামারী

স্তব্ধ করে দেয় জনজীবন।

শ্মশানে ধোঁয়া ওড়ে, মানুষ কেঁদে ওঠে

দুঃখ রোগ শোক চিরন্তন।

 

ক্ষুদ্র ভাইরাস শক্তি কী-অসীম 

দাপায় অলিগলি দুনিয়াময়,

বিষের কণাটুকু আঘাত হেনে যায়,

আটকে থাকে ওই নীল সময়।


শুদ্ধ বিজ্ঞান দমন করে গেছে

অজানা বীজ আর কতক্ষণ!

কলেরা মুছে গেছে, প্লেগও পালিয়েছে

তুমিও হাওয়া হবে ওমিক্রন।


সময় নেই আর, আমাকে যেতে হবে

রয়েছে কত রোগী  অপেক্ষায়...

যেখানে আকুলতা লাইন দিয়ে আছে

পাখিরা বসে আছে গাছের গায়।


বৃক্ষ হতে আমি পারিনি কিছুতেই

ক্ষুদ্র ছায়াটুকু সঙ্কুলান...


আবছা বাতিঘর জ্বলছে ধিকিধিকি 

স্নিগ্ধ আলো দেবো, যদিও  ম্লান।


                                     

                           

   

অপারেটিং চোখ



প্রবল শৈত্য, ঘূর্ণি তুলছে ছিন্নভিন্ন হাওয়া...

কেঁপে ওঠে দ্যাখো পারদস্তম্ভ, এপিডেমিকের থাবা।


দুর্দিনে যত কবিতারা সব, ও.টি'র বাইরে থাকে,

আঁটোসাঁটো রুল, প্রবেশ নিষেধ ডেটলের ঘ্রাণ শুধু...

বিকেল ঘনায়, ছুরির ডগায় স্নিগ্ধ রক্ত ফোঁটা 

আঁধার সরিয়ে চোখের ভেতর দীপ জ্বেলে দেবে বলে―

পর্ব মাত্রা উপমার দল, সার্জারি শেষ করে

নিভৃতে দ্যাখো, মিশে যায় ওই কবির অশ্রুজলে‌।



অনিকেত



কালো মেঘ এসে জমেছে আকাশে, ফিরে যায় ঘরে পায়রার দল

স্তব্ধ বাতাসে কবিতার কুচি স্থির হয়ে ভাসে লক্ষ্যে অটল‌।


সুযোগ পেলেই প্রাণঘাতী বাজ নিমেষেই নেমে বিষটুকু ঢালে

মেঘের ভেতরে বিদ্যুৎ যত, ঘন হয় ক্রমে শ্রাবণ-বিকেলে।


ফিরে আসে ঘরে লোকজন যত, অফিসযাত্রী কিম্বা কৃষক

সময়ের সাথে বেড়ে চলে দ্যাখো! নির্মম ওই ঝড়ের দমক


সবাই ফিরেছে, শুধু একজন প্রান্তরে বসে দেখছে আকাশ।

ঘরদোর-হীন আত্মমগ্ন গলায় জড়ানো শব্দের ফাঁস...

জেগে থাকে শুধু আধখানা চাঁদ, আলো টুকু তার ভেজায় কপাল


ফেরার জায়গা হারিয়ে কবেই, বৃষ্টিতে ভেজে

 কবি-মহাকাল...


      


 জ্বলন্ত ফানুস 



পড়ন্ত বিকেলে এসে কেন তুমি  করে দিলে 

চরিত্র খারাপ

জানোই তো কত পথ পার করে আমি এক

নিঃসঙ্গ শ্রমণ

ঝোলায় রেখেছি শুধু, চেনা ও অচেনা কত

 সম্পর্কের ঢেউ ...

জেনে রাখো, সঙ্গীহীন মানুষের মন বড়ো কবিতা-প্রবণ।


পলাশ কলির ঠোঁটে শরতের ভোরে আমি 

দেখেছি শিশির...

চুম্বনে নিয়েছি শুষে মুহূর্তেই লালা-ভেজা 

ওষ্ঠের পরাগ


শ্রোণীর রোমের মতো শৌখিন শৈবালে ছাওয়া রহস্য-মোহানা।

পেলব উরুর ঘ্রাণ লেগে আছে জলে জলে

প্রতিটি কণায়...   

ডুবে মরি ভেসে মরি‌, সাঁতার শিখেছি কবে

নিশ্চিত জানি না

এ যেন দাবার দান‌, শরীরের হাতি ঘোড়া এগোয় পিছোয়


অনিকেত পোড় খাওয়া সেয়ানা শ্রমণ আমি

ভালো ভাবে জানি―

ক্ষণস্থায়ী সব কিছু। বাঁক নিলে নদী, কারু কিছু

এসে যায়?

টেকে না এসব দৃশ্য, এই আছে এই নেই

জ্বলন্ত ফানুস...


থেমে গেলে স্পন্দন, যেভাবে পুড়ে যায় দ্রুত

নির্বস্ত্র মানুষ।



         

স্পর্শ



মন, সে তো দিশাহীন সমুদ্রের মতো

ওখানে সাঁতার খুব বিপদসঙ্কুল

সিদ্ধান্ত তোমার, তবু কেন এই ভুল?

ভেসে চলে যায় দ্যাখো দুঃখ সুখ ক্ষত...


দিনান্তে বলো তো কেন, স্পর্শ পেতে চাও!

আত্মাতে মেলাবে নাকি জীবনের সুর

সে পথ কন্টকাকীর্ণ, রাস্তা বহুদূর...

হৃদয় অবধ্য, আগে নিজেকে বাঁচাও..


তার চেয়ে ছুঁতে পারো সহজিয়া দেহ

মেঘের পোশাক ছেড়ে দাঁড়ালাম পাশে

শতাব্দীতে ধূমকেতু একবারই আসে

মন ও হৃদয় বড়ো অলৌকিক মোহ।


ছোঁয়াটাই সব নয়, আটকে নিঃশ্বাস―

আমার শরীরে দ্যাখো, অনন্ত আকাশ।




 স্মারক লিপি



ঝরতে ঝরতে বর্ষা প্রায় শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। শালগাছের কচি শাখাতে গজিয়েছে তুলতুলে কত পাতা।

 দু'মাইল ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে এক মনকেমন করা হাওয়া। ক্লান্ত বকের দল ঘাড় উঁচিয়ে ভেসে চলেছে বিন্ধ্যাচলের দিকে। পশ্চিম আকাশে ছুটে আসা দুটো বেগুনি রঙের মেঘ ধীরে ধীরে মিশে গিয়ে নিমেষেই ধূসর সরোবর।মাঝখানের জলটুকু যেন সৃষ্টির প্রথম তৃষ্ণা।

 

সুবর্ণরেখার জলে সুর্য্য ডুব দিতেই মোহবর্ণের সন্ধ্যা এসে এলাকার দখল নিল। অনেকদিন পর ভাঙা মন্দিরে টিমটিমে মাটির প্রদীপ।

 বিগ্রহের সামনে জ্বলতে থাকা ধূপ আর অচেনা ফুলের গন্ধে অবশ হয়ে যায় সহস্র বছরের অহং...

স্নেহভরা ভূমির পবিত্র বুকে পা রাখতেও সংকোচ হয়। শুধু এখানকার মাটিটুকু কাগজে মুড়ে  কপালে ঠেকিয়ে বুকপকেটে রেখে দেওয়া...


ইনিয়ে বিনিয়ে প্রকাশ নয়, এ'সব দৃশ্য তো শুধু হৃদয়ে ধারণ করে জীবন সার্থক করার..

কৃত্রিম শব্দের চোখে ফুটে ওঠে অপারগ ও অসহায় দৃষ্টি।

আর বুকপকেটে রাখা ওই মাটির গন্ধভরা কাগজটুকু পৃথিবীর সব মেকি কবিতার বিরুদ্ধে এক স্মারকলিপি....


ছবি : বিধান দেব 

শান্তনু পাত্র।জন্ম ১৯৭৭ সাল। পেশায় চক্ষু শল্য চিকিৎসক। দুটি কাব্যগ্রন্থ আছে 'স্টেথোর বৃত্তে শিশির পড়ে' ও 'হৃদয়গড়ের হাসপাতাল'


৫টি মন্তব্য: