রবিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২২

পাঠকের হাট ।। অরুণ পাঠক


 

 [আমার কাব্যজ্ঞানের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকেই দেখে আসছি অগ্রজ কবিরা তাঁদের বই অকাতরে উপহার দিচ্ছেন। মুখে তৃপ্তির হাসি দাতা ও গ্রহীতার। চার চোখে সমান আগ্রহ। আশে পাশে কৌতুহল। বয়সে অনেক ছোট হলেও বহু প্রতিষ্ঠিত বিদ্বান কবি অল্পবয়সী আমাকেও তাঁদের কাব্যগ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। আমিও আমার কাব্যগ্রন্থ ঝোলা থেকে বের করে কাঁপা কাঁপা হাতে কোনও শ্রদ্ধেয় অথবা স্নেহভাজন কবিকে উপহার দিয়ে স্বর্গীয় তৃপ্তি উপলব্ধি করি। আজও কোনও অনুষ্ঠানে গেলে এই কাব্যগ্রন্থ দেওয়া-নেওয়ার একটি বিশেষ পর্ব অলিখিতভাবে সূচিভুক্ত থাকে। তার বাইরে ডাক বিভাগের মাধ্যমেও অনেক কবি তাঁদের কাব্যগ্রন্থ আমার ঠিকানায় পাঠান।
নবীন-প্রবীণ, পরিচিত-অপরিচিত সেইসব কবিদের কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আমি এবার আমার অনুভবের দু-চার কথা বলতে চাইছি এখানে। তবে শুধু উপহার পাওয়া কাব্যগ্রন্থ নয় সেইসঙ্গে গাঁটের কড়ি খরচ করে যে অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ আমি এযাবৎ কিনেছি সেইসব কাব্যগ্রন্থেরও কোনও কোনওটি এই আলোচনার উপলক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।]


 কল্পনা মাখিয়ে এরপর তুমি যা খুশি উদাহরণ


কবিতার সমুদ্রে যত ঢেউ ওঠে তার প্রত্যেকটিই পূর্ণ করতে পারে অমৃতকলস। মুহূর্তে রেঙে ওঠা মুখের সঙ্গে অন্বিষ্ঠ চোখের চিকচিক যত ক্ষণমুহূর্তকে বিধৃত করে মর্মের ঘরে ততই বেড়ে যায় অন্বেষণ। কবিতাভিক্ষুকের তৃষ্ণা আর মেটে না। কিন্তু কবিতা কী দেয় আমাদের? তা কি কেবল ভাববাদী চেতনার স্তরে অমুক অমুক হয়েই থেকে যাবে? তা কি আমাদের বাস্তবে বেঁচে থাকার সঙ্গে কোনোভাবেই সহায়তা করে না? ইরানের কবি আব্বাস কিয়ারোস্তামি লিখেছেন—"কবিতা আমাদেরকে হাজার ফুট উচ্চতায় তুলে ধরে আর সেখান থেকে নীচে সারা জগতকে একত্রে দেখার ক্ষমতা প্রদান করে। কবিতা আর কিছু নয়। শিল্প না থাকলে, কবিতা না থাকলে আসে দারিদ্র্য, রিক্ততা।"(ইন দ্য শ্যাডো অফ ট্রিজ— বইয়ের শেষ প্রচ্ছদে লেখা কবির বক্তব্য/ কথাচিত্রকণা— সংকলন ও তর্জমা: আব্দুল কাফি)। দারিদ্র্য ও রিক্ততায় অভ্যস্ত মানুষ তাই কবিতা থেকে দূরে থাকলেও কবিতাই বারবার তাদের দ্বারা, তাদের জন্য ও তাদের হয়ে উঠতে চায়। যেমন:

আনাগোনা নির্বান্ধব হয়ে ওঠে
দুঃখ খুলে যায় আমাদের সড়ককুজন

ওখানে গল্পের আবহাওয়া... সুরঞ্জনা
কী কথা তাহার মোবাইলে!

থলি নাও, খুচরো, খাদ্যের হও আজ
দরদাম করো... গায়ে হাত দাও সকল আনাজ
ককিয়ে শিউরে ওঠে, উঠছে ছোঁয়ায়
                                        (বাজার)

এই কবিতার রচয়িতা পলাশ দে। শূন্য দশকের অন্যতম একজন কবি। যে বইয়ে এই কবিতাটি আছে তার নাম 'একা মফসসল'। ২০১০ সালে রাখালিয়া থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। তার অনেক আগে থেকেই আমি তার কবিতার সঙ্গে পরিচিত। 'আমি কিন্তু পারি স্বপ্ন', 'ফুঁ' কাব্যপুস্তিকাদুটি এর আগেই প্রকাশিত। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত পলাশের কবিতা পড়ছিলাম। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত অরণি-র পঞ্চাশ বছরের বাংলা কবিতা সংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গের শূন্য দশক সম্পাদনাকালে তার কবিতা রেখেছিলাম। কিন্তু সম্মুখ সাক্ষাৎ ? না, মনে নেই।
   একজন কবি মূলত একক পথের যাত্রী। তার চলার ট্রাক তাকেই তৈরী করে নিতে হয়। পলাশ দে তার প্রথম কবিতাটি থেকেই সেই দুর্লভ একাকী চলার পথটি তৈরী করে নিতে পেরেছেন। কবিতা নির্মাণে বাংলা ভাষার কোনও উত্তরাধিকার তার নেই। চূড়ান্ত সামাজিক, অবক্ষয় সচেতন, নীতিভ্রষ্টতায় ক্রুদ্ধ এই কবি কি কিছুটা মরমী?

অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার আগের মুহূর্তেই তবে
কী ভাবছিল ছেলেটি?

ভাবছিল, দ্যাখো হবে

রাজি হয়ে যাবে ঠিক
                                     (তুমি যা ভাবছ)
নৈর্ব্যক্তিক। ক্ষুদ্র স্ববাচন। তলিয়ে যাবার আগে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার প্রত্যাশা।
কিংবা,

ভালো লাগা শব্দটির আগে-পিছে
কোনো অজুহাত নেই

শুধু এক বিকেলের অপেক্ষা
আর এক অপেক্ষার বিকেল
                                              (প্রেম)

যে কবিতাপাঠকেরা কবিতায় কাহিনি চান, নাটক চান, একশো পঁচিশ পঙক্তির কবিতায় সুরেলা কণ্ঠ চান তারা হতাশ হবেন হয়ত। কিন্তু জীবনের সুবৃহৎ গল্পের এমন সূক্ষ্ম আয়োজনই যে একজন কবির কাজ তা তার কবিতায় পুরোদস্তুর দেখিয়ে দেন পলাশ। কবিতা যে শুধু কথার আলেখ্য নয়, তা যে অনেকখানি উদ্ভাবনের ইশারামাত্র,  তা যে সত্যেরই অনূর্ধ্ব বাস্তব পলাশের কবিতা পড়লে তা অনুভব করা যায়।

জানলার পিছনে একটি নিস্তব্ধতা
নিস্তব্ধতার পাশে একটি নদী
নদীর দু-পাশে একটি হাওয়া
হাওয়ার গুনগুনে একটি বাসস্ট্যান্ড
বাসস্ট্যান্ডের ফিশফাশে একটি অপেক্ষা
অপেক্ষার গল্পে কেউ গুমখুন

এবার, কে কার আগে পিছে
তদন্ত শুরু করার ভূমিকায়
তুমি
সানাই এবং বিসমিল্লা খানের মাঝখানে
ফাঁকা
                                      (সুর)

আমরা জানি যেকোনও সুর উৎক্ষেপনের জন্য যে সব যন্ত্র আছে তার ভেতরে বেশ কিছুটা ফাঁকা থাকে। বাধাপ্রাপ্ত সচল বাতাসকে একমুখী গতিতে একজন শিল্পী স্বরে পরিণত করেন। সুর একপ্রকার স্বরই। এই স্বর যখন আমাদের জীবনের প্রাতিস্বিকতায় তার উৎস খোঁজে তখন চালক আর চালিকাশক্তি, যন্ত্র আর যন্ত্রীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে জীবন। যা সর্বার্থেই ফাঁকা। যাকে আশ্রয় করে পরিপার্শ্ব,  যাকে আশ্রয় করে স্বর বা সুর। পলাশের কবিতা বেজে ওঠে না। পাঠ শেষে তা দাবি করে নীরবতা। সমাজের নানাবিধ অসুখ ও অসুদ্ধতাকে এমন নিস্পৃহতায় পলাশ তুলে ধরেন যাতে আমাদের উচ্ছ্বাস, উল্লাস জন্মায় না। আমরা থেমে যাই। আমাদের চিন্তাশক্তি সাময়িক বিরতি চায়। কবি শঙ্খ ঘোষ 'কবিতার মুহূর্ত' গ্রন্থে এরকম পরিস্থিতিকেই 'ভাষাকে ভেঙে দিয়ে ভাষার সত্যে পৌঁছবার কোনও লড়াই' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও লিখেছেন —'Nova Express-এর মধ্যে বারো দেখিয়েছিলেন যে নীরবতাই হলো আমাদের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষণীয় অবস্থা, কিন্তু শব্দেরই কোনো বিশেষ প্রয়োগরীতির মধ্য দিয়ে আমরা পৌঁছতে পারি সেই নীরবতায়।' (কবিতার মুহূর্ত)। পলাশ তার কবিতায় শব্দের সেই বিশেষ প্রয়োগরীতি আয়ত্ব করতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয়।
            


কিন্তু একটা কবিতায় এত এত দৃশ্যের সমাহার, পুরো একটি কোলাজের মতো, তার চারদিক থেকে হাওয়া বেরোচ্ছে, আলো বেরোচ্ছে। আত্মা? স্তম্ভিত? অনন্যোপায়? হয়ে ওঠাচ্ছে শিল্পসত্তা? হয়ে ওঠাচ্ছে একটা নতুন নামগন্ধ?  হ্যাঁ। এসব কবিতা পড়লে এরকমই অভিজ্ঞতা হয়।

দেখলেই আকাশ...না ভাবলেও
চিলেকোঠায় জোছনা হতে পারে

কল্পনা মাখিয়ে এরপর তুমি যা খুশি উদাহরণ
যে কোনও বর্ণবৈষম্য আহা গল্প মাখামাখি
চলছে তো চলছেই

ওই যে ছাদের নীচে ফেরিওলা
নিঃসঙ্গ, কিছুটা ঝুঁকে... সেই ফিরে ফিরে যাচ্ছে

না না এইসব নয়
বরং অন্যরকম, কিছু ফিরিয়া বলা যাক—

জোনাকিরা সেই কবে থেকে শ্বাসকষ্ট পাচ্ছে তো পাচ্ছেই
                                                         (ছাদ)

পলাশ শুধু একজন কবি নন, তিনি একজন চিত্রপরিচালকও। তাই দৃশ্যগত সহাবস্থানের শিল্পবোধ তার যথেষ্ট। বর্তমান বিশ্বে নন্দিত সিনে কবিতার সচল আবহ পলাশের কবিতায় খুঁজে পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু সেই সঙ্গে কবিতার বাক্যের রীতিতে যে ধরণের কারুকাজ পলাশ করেছেন সমসাময়িক বাংলা কবিতায় তা আর কোথাও পাওয়া যায় না। কবিতায় সিনট্যাক্স নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এর আগে করেছেন উৎপলকুমার বসু। তারপর পলাশ। এতে ঝুঁকি আছে। পলাশ সে ঝুঁকি নিয়েছেন। তার কবিতার শুরু হচ্ছে এভাবে—
একলা বাড়ন্ত হয়ে যাচ্ছে

জানলা খোলা, ছাদে ওঠা ভাগ হয়ে যাচ্ছে এখন
হ্যাঙারের ফাঁকা ঢেকে যাচ্ছে অন্যরকম পোশাকে
গন্ধ ছড়াচ্ছে বাড়িময় দেয়ালের কান সমেত
                                         (স্ত্রী বউ ওয়াইফ)


কবিতার বিষয় বলার মতো মূর্খতা আর কাল কবিতাআলোচকের না থাকাই ভালো। আমারও তা নেই। জীবনের বাচনিক সজ্জার অন্দরমহলে ঢুকে পড়তে পারলে কবিতার রূপের অন্ধকারকে উপভোগ করা যায়। এইটুকুই শুধু আমার অধিকার ও অর্জন। পলাশের কবিতা প্রাত্যহিক দিনের শুরুতে ঝেঁপে আসা রোদ্দুরে নিজেকে নতুন করে মেপে নেওয়ার মতো। যার কোনও চিহ্ন গায়ে লেগে থাকে না পুনরায় পরদিন আবার নিজেকে মেপে নিতে।

সবুর গাছের নীচে এই আমরা যে কজন
একলা সামলে আছি
ফল হব হব করেও আলিঙ্গন পারছে না নিজেকে

আর আমাদের সব সহ্যের আগে 'অ' বসে যাচ্ছে

প্লাস-মাইনাস করে দেখেছি অনেকবার কিন্তু জাঁহাপনা

সে চলে গেল এবং বলেও গেল
                                               ( পলাশনামা)

গ্রন্থের শেষ কবিতায় আপন সমানুবর্তন রেখেও পলাশ যেভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি ভাবমোক্ষণকে মুচড়ে দিলেন তাতে কি প্রমাণ হল না যে বেলা অনেক বয়ে গেছে। বাংলা কবিতার জেনারেশন গ্যাপ রবীন্দ্রনাথ পেরিয়ে দু'দুটো শতাব্দী পেরিয়ে যে একবিংশে এসে পড়েছে তারও এক নিবিষ্ট প্রমাণ এখানে পাওয়া যায়। যদিও আগেও অনেক কবিই সদর্থক ও নঞর্থক অর্থে রবীন্দ্রপঙক্তি ইতিপূর্বে তাদের কবিতায় ব্যবহার করেছেন।
আর সেই ঐতিহ্যই বাংলা কবিতার চিরঐতিহ্যে জুড়ে দিল পলাশের কবিতাকে।

একা মফসসল ।। পলাশ দে ।। রাখালিয়া ।। চল্লিশ টাকা

ছবি : বিধান দেব 

অরুণ পাঠক ।। জন্ম: ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ কাঁজিয়াখালি, হাওড়ার মাতুলালয়ে। পিতৃভূমি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনাকোপা গ্রাম। সেখানেই আবাল্য বসবাস। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  বঙ্গভাষা ও সাহিত্য-এ  স্নাতকোত্তর।
শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রিপ্রাপ্ত। পেশা শিক্ষকতা। এই শতাব্দীর সূচনা (শূন্য) দশকের কবি। কবিতা ও কবিতা বিষয়ক  সাহিত্যপত্র 'সাহিত্যের বেলাভূমি ' পত্রিকার সম্পাদক। স্যাক সাহিত্য সম্মাননা, বনানী পুরস্কার, সামসুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রভৃতি একাধিক পুরস্কারে সম্মানিত। কবিতা পড়তে একাধিকবার বাংলাদেশে গিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'দ্বিতীয় বার একা'। কবিতাই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র আশ্রয়।













২টি মন্তব্য: