বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২১

গুচ্ছ কবিতা ।। আবু রাইহান


 শিকড়ের ঘ্রাণ 


সীমানা ভাগ হয়ে গেলে নদীর জলজ ক্রীড়ায় 

প্রাচীনত্ব প্রলেপে ক্রমাগত ঢুকে যেতে থাকে 

একটি জনপদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস... 

এভাবেই হয়তো মুছে ফেলা যেত 

       বিভাজিত জনপদের খণ্ডিত আবাস! 


যেহেতু এই পৃথিবীতে ভূমির কোন বৃদ্ধি নেই 

     তাই মায়াময় অবলুপ্ত সম্পর্কের সন্ধানে 

স্বপ্নিল আবেগে জারিত হতে হয়

            প্রাচীন মানচিত্রের বিনির্মাণে! 


যেমন করে দূরাভাষে আত্মজর কণ্ঠস্বরে 

                 জেগে ওঠে নাড়ির টান 

নাব্যতা কমে গেলে,নদী খুঁজে ফেরে শিকড়ের ঘ্রাণ!

 

নদীর কাছে জলজ ছায়ায়-১৮


হায় প্রিয় নদী কেন তুমি স্থির, জোয়ার-ভাটাহীন

কার প্রতি তোমার এতো নিগুড় অভিমান,অন্তহীন

ঘনিষ্ঠ মানুষের ডাকেও কেন নীরব থাকো রাতে, 

তোমার সমস্ত কথোপকথনই কি 

                কেবল নির্জনতার সাথে?


অনন্ত জীবন প্রবাহে নিজস্ব দুঃখ-বোধের কথা ভেবে 

                    কেন কষ্ট দাও প্রাণে?  

আমরা সকলেই তো ভেসে চলেছি চলমান স্রোতে,

                    সময়ের দুর্লঙ্ঘ্য টানে!


প্রিয় নদীর জলজ ছায়া সরে গেলে,সবকিছু শূন্য মনে হয় 

এ জীবনে প্রাপ্তির ভাঁড়ারে তখন কেবলই ক্ষয়,কেবলই ভয়!


মহাজাগতিক ভয়


এখন আমার স্বপ্নে দেখা দেয় কবরখানায় শুয়ে থাকা 

                      প্ৰিয় মানুষদের মুখ

এতোকাল ধরে এসব কথা কি করে যে ভুলে ছিলাম 

    তা ভাবতে ভাবতে অনুভব করি বেদনার্ত সুখ


এখন স্বপ্নের ঘোরে কৈশোর ও যৌবনের 

                 প্রিয় এক নদীর ছবি আসে 

খুব নিবিড় করে দেখলে সে নদীর বুকে 

               কেন যে তোমার মুখটা ভাসে


ইচ্ছে করে নদীর সীমানা ধরে 

             ভেসে যাই পারিযায়ী পাখিদের মত

জলজ শুশ্রুষায় ধুয়ে ফেলি জমানো অপ্রাপ্তির সব ক্ষত

নদীর এই জলপথকে কেন যে আমার চিরচেনা মনে হয়


তবুও হায় আমার পথ আগলে দাঁড়ায়

                    মহাজাগতিক এক ভয়!

 

                                                 শূন্য আকাশ জুড়ে নিঃসঙ্গতা যখন ধুলিকণা হয়ে ওড়ে

যন্ত্রনার অশ্রুগুলো তখনই কেবল শব্দ হয়ে ঝরে পড়ে!


 অপার্থিব আনন্দের স্বপ্নীল আবেশ


রাত্রি নির্জন হলে খাঁ খাঁ করে বিদ্যাসাগর সেতুর বুক 

তখন অন্ধকার ছুঁয়ে থাকা হুগলির জলে বেড়ে যায় 

                     রাতচোরা মানুষদের গভীরতর অসুখ!


হে আমার জনম দুঃখিনী প্ৰিয়তমা শেষ পর্যন্ত তুমি এলে 

আজন্ম লালিত মনের দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভুলে,সব আভরণ খুলে!


রাতের রমণীয়  আলোয়, জীবনের পড়ন্ত বেলায় 

জারিত হলাম হৃদয়ের কাঙ্ক্ষিত  আদিম খেলায়!


নিবিড় আলিঙ্গনে নিশ্চিত শয়নে জড়িয়েছিলে তৃপ্ত মনে 

আমাদের প্রশান্তির ঘুমে স্টেশনের ঘণ্টাধ্বনি কেবল 

                 রাত্রি শেষের প্রহর গোনে!


বুকে নিয়ে অপার্থিব আনন্দের স্বপ্নীল আবেশ

হাওড়া স্টেশন ছাড়ে সকালের কুলিক এক্সপ্রেস!


ফুরায় না এ জীবনের সব লেনদেন


শালিকেরা এখন আর গৃহস্থ বাড়ির উঠোনে ধান খেতে আসেনা 

মানুষের বাড়ির কাছাকাছি এখন কেবল দেখা যায় কতিপয় কাক 

এরকম একটি কাক প্রতিদিন সকালে 

আমার কোয়াটার্সের গ্রিলের বারান্দার বাইরে সার্সিতে এসে বসে 

এসেই কা-কা স্বরে নিজের উপস্থিতি জানান দেয় 

আমার মা একটি বিস্কুট তার সামনে রেখে দিলে 

সেটি মুখে তুলে নিয়ে সে গাছের ডালে উড়ে গিয়ে বসে 

প্রতিদিন সকালে মা ও কাকের এই সম্পর্কের চেনা দৃশ্য 

দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম! 

একদিন হঠাৎ করে খেয়াল করলাম- 

মায়ের সেই পরিচিত কাকটি এখন আর আসে না 

তার আসার অপেক্ষায় মা প্রতিদিন সকালে 

বারান্দায় গ্রিলের পাশে চুপ করে বসে থাকেন 

হে ক্রান্তদর্শী জীবনানন্দ  সব পাখি হয়তো নীড়ে ফেরে 

কিন্তু ফুরায় না, এ জীবনের সব লেনদেন........!


ছবি : বিধান দেব 

পরিচিতি : 

জন্ম পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রামের সরবেড়িয়া গ্রামে সালে! বর্তমানে কর্মসূত্রে বন্দর শিল্পনগরী হলদিয়ার বাসিন্দা! বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় এম এস সি এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি থেকে বায়োটেকনোলজিতে এম.টেক!পেশায় হলদিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি ডিগ্রী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সিনিয়র আধিকারিক!দীর্ঘ আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে কলকাতার বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র গুলিতে সাংবাদিকতা করেছেন! বর্তমানে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদপত্র ‘দিনদর্পণ’ পত্রিকার অ্যাসোসিয়েট এডিটর(সাহিত্য সম্পাদক)!ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রমিতাক্ষর’ এর যুগ্ম সম্পাদক! https://sahityerpramitkathan.blogspot.com নামে নিজস্ব একটি ওয়েব ব্লগ ম্যাগাজিন রয়েছে!নব্বইয়ের দশকের কবি!কবিতা  ছাড়াও প্রবন্ধ, গল্প এবং ফীচার লেখক!



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন