বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১

জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র


 

 

 

জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন     

 

 

নবম পর্ব

ডংশান মঠ ও চ্যানধারার তিন ঘরানা  

 

চতুর্থ আচার্য তাও সিনই পৃথিবীর প্রথম চ্যান মঠের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর হাত ধরেই চ্যান মতাদর্শ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়। হুয়াংমেই প্রদেশের পতোউ পর্বতের দুই চূড়ার একটিতে তিনি চ্যান মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে পতোউ অর্থাৎ ভাঙাচূড়া নামের পরিবর্তে এর নাম হয়, সুয়াংফেং বাংলায় দ্বি-চূড়া। তাও সিন-এর অন্যতম শিষ্য তথা পঞ্চম আচার্য হং-জেন, গুরুর সঙ্গে প্রায় তিন  দশক এই মঠে অতিবাহিত করেছেন। ৬৫১ খ্রিস্টাব্দে তাও-সিন-এর মৃত্যুর পর হং-জেন  সুয়াংফেং পর্বতের অপর চূড়ায় ফেংমাও অঞ্চলে চলে যান। তাও-সিনের অনুসারীদের অনেকেই  তাঁকে অনুসরণ করেন। হংজেন-এর উদ্যোগে ৬৫৪ খ্রিস্টাব্দে সেখানে গড়ে ওঠে ডংশান মঠ। এখনও এই মঠটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে উজু মঠ ( Wuju Temple ) নামে। চিনা ভাষায় ডংশান শব্দের অর্থ পূর্ব দিকের পর্বত। অবস্থানগত দিক থেকে সুয়াংফেং পর্বতকে এমন নামে ডাকা হত। এজন্য  চতুর্থ আচার্য তাও সিন প্রতিষ্ঠিত প্রথম চ্যান আখড়াটিও ডংশান মঠ নামেই পরিচিত। চ্যানধারার বিবর্তনের ইতিহাসে এই দুই ডংশান মঠের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চ্যান নথিতে এই দুই মঠকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ডংশান ফামেন (Dongshan Famen) বা পূর্ব-পর্বতের-ধর্ম- দ্বার নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। বস্তুতপক্ষে এই দুই ডংশান মঠ যে পরবর্তী চ্যানধারার যাবতীয় ধরণগুলির আঁতুড়ঘরের ভূমিকা পালন করেছিল, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। ডংশান মঠ-এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে চ্যানধারার দুটি ঘরানা গড়ে ওঠে  উত্তর ও  দক্ষিণ। এই ধারা বিভাজনের কেন্দ্রে রয়েছে বোধিলাভের পন্থা নিয়ে এক বিতর্ক। এ সংক্রান্ত এক প্রবাদ চ্যান-ইতিহাসে সুপ্রচলিত  নান-তুন পেই-চিয়েন (Nan-tun pei-chiyen) অর্থাৎ দক্ষিণের হঠাৎ, উত্তরের ধীর। দক্ষিণ-ঘরানার মতে বোধি হঠাৎ করেই ধরা দেয়, তার জন্য সূত্র বা শাস্ত্রপাঠ  আবশ্যিক নয়। কলাকৌশলও অপ্রয়োজনীয়। অন্যদিকে উত্তর ঘরানা ছিল ধীর বা ক্রমবোধিতে  আস্থাশীল। তারা মনে করত সূত্র বা শাস্ত্রপাঠ এবং নিয়মনিষ্ঠার সঙ্গে ধ্যান অনুশীলনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বোধিকে পাওয়া যায়। এই দুই ঘরানা ছাড়াও ডংশান মঠ-এর আংশিক প্রভাবে গড়ে উঠেছিল ভিন্ন এক ঘরানা  ষণ্ডমুণ্ড 

 

উত্তর-ঘরানার কথা  

৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে পঞ্চম আচার্য হং-জেন-এর মৃত্যুর পরে তাঁর শিষ্যদের অনেকেই ডংশান মঠ ছেড়ে  চাওয়ান (Changan) ও লো-ইয়াং (Lo-yang) এই দুই রাজধানী শহরে ছড়িয়ে পড়েন। অল্পদিনের মধ্যে তাঁরা চ্যান-শিক্ষক হিসাবে বিশেষ পরিচিতি পান। তাঁদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁরা ব্যক্তি-পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের ডংশান মঠের শিক্ষা-প্রচারক হিসাবে পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করতেন। ডংশান মঠের অবস্থান উত্তর চিনে হওয়ার কারণে তাঁরাই অচিরে  উত্তর-ঘরানার চ্যান-শিক্ষক নামে চিহ্নিত হন। ফা-জি (৬৩৮-৬৮৯ খ্রিঃ) ছিলেন এই শিষ্যমণ্ডলীর অন্যতম প্রধান মুখ। প্রথম জীবনে ফা-জি ছিলেন হুই-মিং (Hui-ming)-এর অনুসারী। ৬৫৫-৬৫৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফা-জি, হুই-মিং-এর সাহচর্যে নাগার্জুন-এর মাধ্যমিক বা শূন্যবাদের চর্চা করেন। পরে হুই-মিং-এর অনুপ্রেরণায় ফাজি, হং-জেন-এর শিষ্যত্ব নেন। ফা-জি, প্রায় ষোলো বছর ডংশান মঠে অতিবাহিত করেন এবং বোধিপ্রাপ্ত হন। কোনও কোনও নথিতে ফা-জি-কেই ষষ্ঠ চ্যান-আচার্য হিসাবে দেখানো হয়েছে। হং-জেন-এর মৃত্যুর পরে তিনি প্রব্রজ্যায় বেড়িয়ে পড়েন। ৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে তাং-বংশীয় সম্রাট কাও-জং (Gao-zong) এর মৃত্যু হলে রাজধানী শহরে অরাজকতা দেখা দেয়। এইসময় ফাজি, শাওলিন মঠে  আশ্রয় নিয়ে সাধারণ সন্ন্যাসীর মতোই জীবনযাপন করতেন। শাওলিন মঠের শিক্ষক হুই-তুয়ান (Hui-tuan) তাঁকে চিনতে ভুল করেননি। তাঁর দ্বারা অনুরুদ্ধ হয়েই ফাজি, ৬৮৬ থেকে মৃত্যু অবধি টানা তিনি বছর ধরে শাওলিন মঠের ধ্যানার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রেখে গেছেন। তাঁকে কেন্দ্র করে শাওলিন মঠ আবার প্রাণ  ফিরে পায়। প্রথম আচার্য বোধিধর্মের স্মৃতিবিজড়িত এই মঠটিকে তিনি পুনরায় সচল করে তোলেন। ঝিমিয়ে পড়া মঠটি আবার মনন ও শরীরচর্চার পীঠস্থান হয়ে ওঠে ; সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দেশময়। মৃত্যুর আগে তিনি শাওলিন মঠের শিক্ষার্থীদের বলে যান, তাঁরা যেন তাঁর সতীর্থ সেনশিউ-এর নিকট শিক্ষা নেন। তিনি বিশেষভাবে কাউকে দীক্ষা দিয়েও যাননি। নিঃসন্দেহে অহংজয়ী ফা-জি-ই ছিলেন উত্তর-ঘরানার শ্রেষ্ঠ সংগঠক। তাঁকে কেন্দ্রে রেখেই উত্তর ঘরানা  চ্যানধারার প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিল। 

       উত্তর ঘরানার আরও একটি উজ্জ্বল মুখ শেন-সিউ (৬০৬-৭০৬ খ্রিঃ)। প্রখ্যাত     কনফুসিয়ান পণ্ডিত চাং-উয়ে (Chang-yueh : 667-730) লিখেছিলেন তাঁর সমাধিলিপি। সেই ঐতিহাসিক লিপি থেকে সেনশিউ-এর জীবনকথার অনেকটাই আমরা জানতে পারি। শেন-সিউ   জন্মেছিলেন হুনান প্রদেশের ওয়েই সি অঞ্চলের এক অভিজাত পরিবারে। এমনও নথি পাওয়া যায়   যেখানে তাং রাজবংশের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের যোগাযোগের ইংগিত আছে। ৬১৮ খ্রিস্টাব্দে হুনান (Hunan) ও শ্যানতং (Shantung) প্রদেশ মন্বন্তর ও মহামারীর কবলে পড়ে। এই বিপর্যয়   যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে না-পারায় ওই বছরেই সাং রাজাদের পতন ঘটে ও চিনের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে তাং রাজাদের উদয় হয়। শেনসিউ তখন তেরো বছরের বালক। ক্ষুধার্ত   মানুষের দুর্দশায় ব্যথিত হয়ে তিনি লোকজনকে নিয়ে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে সরকারি শস্যভাণ্ডারে পৌঁছে যান এবং নিরন্ন অসহায় মানুষের অন্নের সংস্থান করেন। ঘটনাটি বুঝিয়ে দেয়, শেনসিউ নিছক সংসার জীবন যাপনের জন্য সংসারে আসেননি। এইসময় এক বৌদ্ধ-ভিক্ষুর সঙ্গে  সাক্ষাতের পরে তিনি প্রব্রজ্যা বেছে নেন। কয়েক বছর ধরে তিনি উ (Wu), লো-ফু (Lo-fu), তুং (Tung), মেং (Meng), লু (Lu), তিয়েন-তাই (Tientai) ইত্যাদি পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম মঠে মঠে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সন্ধানে ঘুরে বেড়ান। ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে ২০ বছর বয়সে তিনি লো-ইয়াং-এর তিয়ান-ক্যুং (Tien-kung) মঠে বসবাস শুরু করেন। এই মঠের সঙ্গে আবার সম্রাট কাও-জং-এর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ৬৫১ খ্রিস্টাব্দে পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই বয়সে তিনি পৌঁছান হুয়াংমেই-এর ডংশান মঠে।  চিনা ধ্রুপদী সাহিত্য, তাওবাদ, কনফুসীয় মতবাদ, মহাযান সূত্র ও শাস্ত্রের জ্ঞান নিয়ে মঠে প্রবেশের অল্পদিনের মধ্যেই তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য হয়ে ওঠেন। পঞ্চম আচার্য হং- জেন-এর কাছে বছর ছয়েক ধ্যান ও শাস্ত্র শিক্ষা করে তিনি চাওয়ান শহরের তা-চুয়াং-ইয়েন (Ta-cuyang-yen) মঠে আশ্রয় নেন। সেখানে অবস্থানের সময় তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। দূরদূরান্তর থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে শিক্ষা নিতে আসে। ৬৬৭-৬৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে বৌদ্ধধর্মচর্চা রাজকীয় নিষেধাজ্ঞায় পড়লে সেনশিউ প্রায় দশ বছরের মতো আত্মগোপন করেন। আত্মগোপন পর্বের শেষের দিকটা তিনি চিংচৌ (Chingchou)-এর ই-চুয়ান (Yu-chuan) মঠে কাটান। অতঃপর অনুসারী ও অনুরাগীবৃন্দ সেনশিউ-এর জন্য নির্মাণ করেন দ্যুমেন মঠ (Dumen si)

       জীবনের অন্তিম পর্বে ৭০১ খ্রিস্টাব্দে সেনশিউ ডাক পান রাজসভায়। তাং-সম্রাট কাও-জং  –এর স্ত্রী সম্রাজ্ঞী উ-জেতিয়ান (U-zetian) তাঁকে রাজসভায় আমন্ত্রণ জানান। সেনশিউ-এর বয়স তখন চুরানব্বই বছর। এই সংবর্ধনার কথা ফলাও করে লিপিবদ্ধও করা হয় সরকারি নথিতে। সম্রাজ্ঞী তাঁকে রাজকীয় বাহিনীর কুচকাওয়াজের মাধ্যমে অভিবাদন জানানোর ব্যবস্থা করেন। সন্ন্যাসী ও সাধারণ মানুষ তাঁকে ফুল ছড়িয়ে স্বাগত জানান। এক সুদৃশ্য শিবিকা তাঁকে বহন করে আনে। পথ ঢেকে দেওয়া হয়েছিল বর্ণময় চন্দ্রাতপ ও পতাকায়। শিবিকা রাজপ্রাসাদে ঢোকার পর সম্রাজ্ঞী উ সেনশিউকে নতজানু হয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এই প্রথম কোনও প্রসিদ্ধ চ্যান-সাধু রাজসভার সঙ্গে নির্দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জড়ালেন। প্রতিদানস্বরূপ সম্রাজ্ঞী উ, সেনশিউকে কৌ-শি (Koushi) অর্থাৎ জাতীয়শিক্ষক খেতাব দান করেন। বোধিধর্মীয় চ্যান এমন এক বেপরোয়া আদর্শ যা জন্ম থেকেই প্রতিষ্ঠানবিরোধী। সে আদর্শ শিরোধার্য করে চ্যান-আচার্যদের কেউই রাজ-আনুগত্য দেখাননি। এমনকি তাঁদের কেউ কেউ রাজসভার আমন্ত্রণ অস্বীকার করতে গিয়ে প্রাণকে পর্যন্ত বাজি রেখেছেন। তাহলে সেনশিউ কেনই বা সম্রাজ্ঞী উ-জেতিয়ান-এর আমন্ত্রণ রক্ষা করলেন ?  তিনি কী বার্ধক্যে উপনীত হয়ে আদর্শচ্যুত হয়েছিলেন ? অথবা ভেবেছিলেন রাজ-অনুগ্রহ লাভ ব্যতীত মতাদর্শ টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়! নাকি তাঁর শরীরে বহমান নীলরক্ত তাঁকে প্ররোচিত করেছিল রাজন্যবর্গের সান্ন্যিধ্যগ্রহণে ? অন্যদিকে সম্রাজ্ঞী উ কি তাঁর স্বৈরিণীভাবকে আড়াল করার জন্য এতদিনের অনুসৃত তাওবাদকে ত্যাজ্য করে হঠাৎ অহিংস মতাদর্শে বিশ্বাসী চ্যানসাধুকে রাজকীয় সংবর্ধনা দিলেন ! প্রজাবিক্ষোভকে অহিংস ধর্মাদর্শ দিয়ে মোকাবিলা করার মনস্কামনা কী এমন ধর্মপ্রীতির প্রচ্ছদে সুগুপ্ত ছিল ? ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যাবহারের দৃষ্টান্ত তো ইতিহাসে অপ্রতুল নয়, আমাদের সাম্প্রতিক সময়ের দিকে তাকালেও উদাহরণের অভাব ঘটবে না।

       সম্ভবত শেন-সিউ, চ্যান-আদর্শকে পরম্পরিত বৌদ্ধধর্মের দিকেই পিছিয়ে দিতে চেয়েছিলেন   বোধিধর্ম যে পরম্পরিত বৌদ্ধধারা অস্বীকার করে চ্যানধারার দ্রোহীপ্রবাহ অনুসারীদের সুষুম্নাকাণ্ডে  প্রবাহিত করে দিতে চেয়েছিলেন, শেন-সিউ বোধহয় তা যথার্থভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি   অথবা সেই দায়ভার বহনের দায় স্বীকার করেননি। এমনটাই হয়। দুনিয়া কাঁপানো বিপ্লব-বিদ্রোহ তো শেষমেশ গ্লানিময় পরিণতিই ডেকে আনে। সম্রাজ্ঞী উ-জেতিয়ান সিংহাসন নিষ্কণ্টক করার জন্য কারাগার ও গুপ্তহত্যার যথেচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন; সাম্রাজ্য মুড়ে ফেলেছিলেন গুপ্তচর ও গুপ্তঘাতকে পাশাপাশি তিনি ঘটা করে বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসারেও নেমেছিলেন, নির্মাণ করেছিলেন  মহার্ঘ মঠ ও বিহার। নিজেকে তিনি মৈত্রেয় বুদ্ধের অবতার হিসাবে ঘোষণা ও দিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর এই দাবিকে বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের দ্বারা সমর্থনও করিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর এই প্রকল্পের উপসংহার হল শেন-সিউ-এর রাজকীয় সম্বর্ধনা। এমনিতেই শেন-সিউ ছিলেন যথেষ্ট   খ্যাতিমান। রাজকীয় সম্বর্ধনা লাভের পর তাঁর খ্যাতি আরও বৃদ্ধি পায়। চিনের বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁর কাছে শিক্ষার্থীরা আসতে থাকে। শেন-সিউ তাঁর জীবনের শেষ পাঁচ-ছয় বছর দুই রাজধানী  শহর চাওয়ান ও লো-ইয়াং-এ অবস্থান করেন। অগণিত শিক্ষার্থী তাঁর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। মৃত্যুর আগে শেন-সিউ তাঁর পরবর্তী আচার্য হিসাবে সুংশান ফুচি (Songshan puchi)-কে  নির্বাচন করে যান। কোনও নথিতে এমনও উল্লেখ আছে শেনসিউ তাঁর অন্য এক শিষ্য ই-ফু  (Yifu 658-736)-কেও পরবর্তী আচার্য মনোনীত করে যান। ৭০৬ খ্রিস্টাব্দে শেন-সিউ-এর মৃত্যুর  পর তৎকালীন সম্রাট চোঙজং (Zhongzong) সুংশান ফুচি-কেই শেন-সিউ-এর স্থলাভিষিক্ত করেন  ও রাজকীয় সম্মান দেন। ফুচি ছিলেন জনপ্রিয় চ্যান-শিক্ষক। চিনের বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁর কাছে শিক্ষার্থীরা আসতে থাকেন। ৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে ৮৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। আদর্শনিষ্ঠ উত্তরাধিকারীর অভাবে কালক্রমে উত্তরের চ্যান ঘরানাটি নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে ও কালস্রোতে ভেসে যায়।                        

 

দক্ষিণ-ঘরানার কথা

৭৩২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি হুয়া-তাই (Hua-tai)-এর বিখ্যাত তা-ইং (Ta-yun) মঠে এক মহা   ধর্মসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় চ্যান মতাদর্শ বিষয়ে যুগান্তকারী বক্তব্য রাখেন ষষ্ঠ আচার্য  হুইনেং-এর অন্যতম প্রধান শিষ্য শেং-হুই (Shen-hui) যুক্তি ও তথ্যের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে সচেষ্ট হন  উত্তর-ঘরানার চ্যান-চর্চার সঙ্গে বোধিধর্ম প্রবর্তিত চ্যানধারার কোনও সম্পর্কই  নেই। এ বিষয়ে তাঁর যুক্তি ছিল, বোধিধর্ম বোধিলাভের জন্য সূত্র বা শাস্ত্র পাঠকে গুরুত্ব না-দিয়ে ধ্যানকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি রাজসভার সংস্পর্শ এড়িয়ে চলেছেন। আমাদেরও অবশ্য তা মান্য করা উচিত। দক্ষিণ দেশের হুইনেং অভঙ্গ-আচার্য-ধারায় বোধিধর্মের চীবর ও ভিক্ষাভাণ্ড পেয়েছিলেন পঞ্চম আচার্য হং-জেন তাঁর হাতে ওই ধর্ম-প্রতীক তুলে দিয়ে তাঁকে ষষ্ঠ আচার্যের  মনোনয়ন দিয়ে গেছেন। ন্যায়ত তিনিই বোধিধর্ম-ধারার ষষ্ঠ আচার্য। তার প্রমাণ পরম্পরিত চীবর   ও ভাণ্ড। সভায় উপস্থিত উত্তর ঘরানার প্রতিনিধি চুং-ইং (Chung-yuan) প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, অকিঞ্চিৎকর চীবর ও ভিক্ষাভাণ্ড কীভাবে ধর্ম-পরম্পরার অপরিহার্য অঙ্গ হতে পারে ? শেং-হুই এর  উত্তরে গৌতমবুদ্ধ কর্তৃক শিষ্য মহাকাশ্যপকে সোনার জরিবোনা চীবর দানের প্রসঙ্গ তুলে  ধরেন এবং বলেন, বস্তুগত ভাবে এগুলো নগণ্য হলেও একটা পরম্পরা ও বিশ্বাসকে প্রবাহিত  করার মাধ্যমে এই নগণ্য জিনিসও ধর্মের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠতে পারে বই-কি ! অতঃপর শেং-হুই উত্তর-ঘরানার উপর তীব্র আক্রমণ নামিয়ে আনেন। তিনি বলেন, উত্তর-ঘরানা বোধিধর্ম-ধারার চ্যান-প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং বোধি-সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে ভ্রমপূর্ণ সাধনপথ বেছে নিয়েছে। উত্তর ঘরানার প্রতিনিধি চুং-ইং বলেন, হুইনেং ও শেন-সিউ উভয়েই কি  পঞ্চম আচার্য হং-জেন-এর শিষ্য নয় ? এর উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে তাঁদের চ্যান-পদ্ধতি অভিন্ন নয় কী ? শেং-হুই বলেন, মোটেও না। আমাদের আচার্য হুইনেং, হঠাৎ-বোধির শিক্ষা দিয়ে গেছেন আর শেং-সিউ বলে গেছেন ক্রমবোধির কথা যা নিছক মনকে একাত্ম ও শান্ত করার মধ্যেই  সীমাবদ্ধ। এইভাবে মনকে বাইরের প্রভাব থেকে মুক্ত করার চেষ্টা হাস্য উদ্রেকের জন্য যথেষ্ট। বিমলাকৃতি সূত্র পড়ে দেখুন, এই ধরনটা কোনোভাবেই মহাযান পথের সঙ্গে মানানসই নয়। সেদিন শেং-হুই-এর অকাট্য যুক্তির কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন, উত্তর ঘরানার প্রতিনিধি চুং-ইং। ওই মহাসভায় শেং-হুই-এর বক্তব্য থেকেই চ্যান-ধারার দক্ষিণ-ঘরানার সূত্রপাত হয়।

       Biographies of Eminent Monks (Sung kao-seng chuan) পুথিতে শেং-হুই (৬৮৪-৭৫৮ খ্রিঃ)-এর জীবনের কিছু ঘটনা স্থান পেয়েছে। অন্যান্য কিছু নথিতেও শেং-হুই গুরুত্বের সঙ্গে বিদ্যমান। জন্মস্থান সিয়াং-ইয়াং (Hsiang-yang)-এর নিকটবর্তী কুউ চাং (Kuo-chang) মঠের ধর্মশিক্ষক হা-উয়ান(Hao-yuan)-এর কাছে তিনি ধর্মসংক্রান্ত প্রাথমিক পাঠ   নেন। ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং-এর কাছে শিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি চোদ্দো বছর বয়সে সাও-চি (Tsao-chi)-র উদ্দেশে রওনা হন। তবে এই পর্যায়ে তিনি ঠিক কত বছর সাও-চি-তে কাটিয়েছেন তার উল্লেখ পাওয়া যায় না। ৭০৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি চাওয়ান-এ থাকতে শুরু করেন। এই সময় তিনি উত্তর-ঘরানার শেন-শিউ-এর নিকট তিন বছর শিক্ষা নেন। ৭০৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তাঁর সাও-চি-বাসের তথ্য পাওয়া যায়। ৭১৩ খ্রিস্টাব্দে ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং-এর মৃত্যুর সময় তিনি তাঁর কাছে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়। ৭২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি নান-ইয়াং(Nan- yang)-এর লুং-সিং (Lung-hsing)-এ বসবাস শুরু করেন। সেখান থেকে তাঁর জন্মস্থান সিয়াং- ইয়াং এবং রাজধানী লো-ইয়াং ছিল নিকটবর্তী। আসলে তিনি রাজধানী শহরের নিকটে থেকে গুরু হুইনেং-এর শিক্ষাদীক্ষার কথা প্রচারের আলোয় আনতে চাইছিলেন, যাতে উত্তর ঘরানার সঙ্গে যুতসই লড়াই দেওয়া যায়। ৭৩২ খ্রিস্টাব্দের তা-ইং মঠে মহা ধর্মসভায় বক্তৃতা দেওয়ার পরে  শেং-হুই রীতিমতো খ্যাতনামা হয়ে ওঠেন। রাজধানী লো-ইয়াং শহরেই তিনি পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন। এখানেই তাঁর পরিচিত লোকজনের সংখ্যা বেশি ছিল। বিভিন্ন মঠে তাঁর যাতায়াত শুরু হয়, অধ্যক্ষদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ৭৪৫-এর দিকে তিনি লেখালেখিতে মন দেন। লিখে ফেলেন, Record of the Manifestation of the Truth (Hsien-tsung chi) এবং Defination of the Truth (Pu-ti-to-ma nan-tsungting shih-feilun)  ৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে শেন-হুই রাজনৈতিক দুর্বিপাকের শিকার হন। জনৈক সামরিক আধিকারিক লু-আই (lu-i)-এর গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে দুই রাজ-প্রতিনিধি শেন-হুইকে আটক করে রাজদরবারে ধরে নিয়ে যান। সম্রাট সিয়েন চোয়াং-এর সঙ্গে তাঁর বাক্য বিনিময়ের তথ্য পাওয়া যায়। আসলে লো-ইয়াং-এর বিভিন্ন মঠে এবং অন্যান্য স্থানে অনুষ্ঠিত শেন-হুই-এর সভায় ব্যাপক জনসমাগম হত। সেইসব সভায় তিনি উত্তর-ঘরানার প্রতিক্রিয়ায় অনেক সময় রাজতন্ত্রবিরোধী কথাবার্তাও  বলতেন। সেই কারণেই সন্দেহ করা হয়, তিনি বোধহয় গোপনে বিদ্রোহের বীজ ছড়াচ্ছেন। শেন- হুইকে নির্বাসন দণ্ড দেওয়া হয়। প্রথমে তাঁকে পাঠানো হয়, চিয়াংশি (Kiangsi) প্রদেশের ই- ইয়াং (I-yang)-এ, পরে হুপেই (Hupeh)-এর উ-থাং(Wu-tang)-এ পরের বছরের সুচনায় আধিকারিকরা তাঁকে নিয়ে যান, সিয়াং-ইয়াং(Hsiang-yang)-এ এবং সপ্তম মাসে নিয়ে যান, চিং-চৌ (Ching-chou)-এর কাই-উয়েন (Kai-yuan) নামক স্থানে। তবে নির্বাসনের এই স্থানটি দুটি কারণে শেন-হুই-এর মনে স্বস্তি এনেছিল। প্রথমত, স্থানটি ছিল তাঁর জন্মস্থানের নিকটবর্তী এবং দ্বিতীয়ত, স্থানটি ছিল বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান।

       লু-শান (Lu-shan) বিদ্রোহ চিনের ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ তাং বংশের রাজত্বকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। বিদ্রোহীদের হামলার মুখে দুই রাজধানী শহরের বাড়িঘর, মঠ-বিহার তছনছ হয়ে যায়। রাজকোষে অর্থসংকট  দেখা দেয়। এইসময় সম্রাট সিয়েন-চোয়াং অর্থের ঘাটতি পূরণের জন্য নতুন বিল আনেন। এই  বিল অনুযায়ী ঘোষণা করা হয়, সমস্ত ধর্মপ্রচারকদের সরকারি নথিতে নাম লেখাতে হবে। এজন্য তাঁদের সূত্রপাঠের যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হয়ে ১০০ চিনা মুদ্রার বিনিময়ে সরকারি শংসাপত্র সংগ্রহ করতে হবে। বার-দুয়েক এড়িয়ে যাওয়ার পরে শেষে একপ্রকার বাধ্য হয়েই শেন- হুই সেই সরকারি প্রকল্পে অংশ নেন। আর আশ্চর্যের বিষয় এই যে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে তিনি প্রভূত  অর্থ সংগ্রহ করে রাজকোষে তুলে দেন। তাঁর প্রদত্ত অর্থ, দুই রাজধানী শহরের পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করেছিল। প্রতিদান স্বরূপ সম্রাট সিয়েন-চোয়াং শেন-হুই-এর উপর ন্যস্ত যাবতীয়  নিষেধাজ্ঞা খারিজ করে দেন। শুধু তাই নয়, তাঁকে প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করেন। যে শেন-হুই উত্তর-ঘরানাকে যারপরনাই সমালোচিত করেছেন রাজ-সভার সঙ্গে সম্পর্ক  গড়ে তোলার জন্য, সেই শেন-হুইকে-ই কিনা জীবনের অন্তিম পর্বে রাজসভার ক্লিন্ন ছায়ায় দাঁড়িয়ে শিরোধার্য করে নিতে হয় রাজকীয় স্তোকস্তুতি ! জীবন বোধহয় এমনই আশ্চর্য এক ঘটনা প্রবাহের সমাহার !  

                  

ষণ্ডমুণ্ড ঘরানার কথা

ষণ্ডমুণ্ড ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা ফারং (৫৯৪-৬৫৭ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন বর্তমান কিয়াংসু প্রদেশের চিয়াং অঞ্চলের বাসিন্দা। কৈশোরে তিনি তাওবাদ ও কনফুসীয় মতবাদের চর্চা করে হতাশ হন। আসলে তিনি চেয়েছিলেন এক সমুন্নত জীবনদর্শন যার সন্ধান, তাঁকে এই দুই দর্শন দিতে পারেনি।    অতঃপর নির্বাণসূত্র পাঠ করে তিনি জীবন সম্পর্কিত এক নতুন দিশা অর্জন করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, প্রজ্ঞা এমন এক নৌকা যার সওয়ারি হয়ে অজ্ঞতার তীর থেকে অনজ্ঞতার তীরে উতরে যাওয়া যায়। ১৯ বছর বয়সে তিনি মাথা মুড়িয়ে মুক্তির সন্ধানে বেড়িয়ে পড়েন। বেড়াতে বেড়াতে তিনি পৌঁছান মাও (Mao) পর্বতে। সেখানে তিনি কুই-ফা-শি (Kuei-Fa-shih) নামক জনৈক ভিক্ষুর কাছে দীক্ষা নেন। কিছুকাল তিনি সান-লুন (San-lun) মঠে থেকে প্রজ্ঞাপারমিতাসূত্রও চর্চা করেন। তিয়েনতাই (Tien-tai) মঠেও তাঁর অবস্থানের কথা জানা যায় অতঃপর ৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি  পৌঁছে যান নিউতউ (Niutou) পর্বতের নির্জনতায়। সেখানে তিনি ই-শি (Yi-shi) মঠের  পিছনে একটি পাথুরে ঘর বানিয়ে বসবাস শুরু করেন। দিনের পর দিন কাটে ধ্যানমগ্নতায়। ফারং-এর প্রকৃতিনিষ্ঠ জীবনযাপনে মুগ্ধ হয়ে পাখিরা ঠোঁটে করে ফুল এনে তাঁকে উপহার দেয়। একসময় এই প্রচারবিমুখ আত্মমগ্ন মানুষটির কথাও জনপদে ছড়িয়ে পড়ে, অনুসারীও জুটে যায় চিনা ভাষায় নিউতউ শব্দের অর্থ ষণ্ডমুণ্ড অর্থাৎ ষাঁড়ের মাথা, এই শব্দের অনুষঙ্গে তাঁর নাম হয় নিউতউ ফারং বা ষণ্ডমুণ্ড ফারং।  

       একদা চতুর্থ আচার্য তাও-সিন চললেন ষণ্ডমুণ্ড ফারংকে দেখতে। তাঁকে অনেকেই নিষেধ করেছিলেন, সাবধান করে দিয়েছিলেন এই বলে যে, ফারং কারও সঙ্গে আলাপ করতে চান না; অনেকেই তাঁর কাছে পৌঁছেও ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে এসেছেন। দুর্গম পার্বত্য পথ অতিক্রম করে অবশেষে তাওসিন পৌঁছে যান ফারং-এর কাছে ; দেখেন ফারং একটি পাথরের উপর ধ্যানস্থ হয়ে  বসে আছেন। তাও-সিন-এর উদ্যোগে শুরু হয় কথোপকথন।  

আমাকে মার্জনা করবেন, আমি জানতে চাই আপনি ওইভাবে বসে কী করছেন ?                      

ফারং  আমি মনকে ধ্যানস্থ করছি।                   

তাও-সিন  আমি জানতে চাইছি কে কাকে ধ্যানস্থ করছে ? যে মনকে ধ্যানস্থ করার কথা বলা হচ্ছে, সেই মনটাই বা কী ?

ফারং বুঝলেন এ কোনও সাধারণ ভিক্ষু নয়, এ যথেষ্ট পরিশীলিত ও প্রাজ্ঞ। তিনি কী উত্তর দেবেন ভেবে পেলেন না। ফলে পুনরায় আর এক দফা কথোপকথন শুরু হল এবার উদ্যোক্তা  স্বয়ং ফারং।

আপনি কোথায় থাকেন ?

তাও-সিন  আমার নির্দিষ্ট কোনও আস্তানা নেই। আজ এখানে তো কাল ওখানে, এইভাবেই চলে।

ফারং  আপনি কি আচার্য তাও-সিন-এর নাম শুনেছেন ?

তাও-সিন  আপনি তাঁর কথা জানতে চাইছেন কেন ?

তাও-সিন  আমি তাঁর মাহাত্ম্যের কথা অনেক শুনেছি। আমি তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে চাই।

তাও-সিন  আমিই তাও-সিন।

ফারং, চমকিত হলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ পাথুরে আসন ত্যাগ করে তাওসিনকে যথাযথ অভিবাদন  জানালেন, সেই সঙ্গে চা-পানের অনুরোধ করতেও ভুললেন না। এমন সময় খুব কাছেই কোথাও  বাঘের গর্জন শুনে তাও-সিন একটু ঘাবড়ে গেলেন। ফারং মৃদু হেসে বললেন, বুঝলাম ওটা এখনও আপনার মধ্যে এখনও টিকে আছে। তাওসিন কিছুই বললেন না। ফারং চা বানাতে  গেলেন। সেই অবসরে তাওসিন, ফারং-এর পাথুরে আসনের উপর বড়ো করে লিখে দিলেন ‘বুদ্ধ’। ফারং চা নিয়ে ফিরলেন। পাথুরে আসনে বসতে গিয়ে ‘বুদ্ধ’ শব্দে তাঁর চোখ আটকে গেল, তিনি অন্য একটি পাথরের উপর বসলেন। তাও-সিন হাসি মুখে বললেন, দেখছি এটা এখনও আপনার মধ্যে বেঁচেবর্তে আছে। তাও-সিন-এর এই কথায় ফারং বোধিপ্রাপ্ত হলেন। লোকে বলে এই ঘটনার  পর থেকে পাখিরা তাঁর জন্য আর ফুল বয়ে আনত না।

       ষণ্ডমুণ্ড ঘরানা খুব বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করেনি। সপ্তম শতাব্দীর শেষে সূচিত হয়ে নবম শতাব্দীর সূচনায় ঘরানাটি অবলুপ্ত হয়। নিউতউ ফারং এই ঘরানার প্রথম আচার্য এবং অষ্টম তথা শেষ আচার্য ছিলেন চিং-শান (৭১৪-৭৯২ খ্রিস্টাব্দ)। বোধিধর্মের চ্যানধারার সঙ্গে ষণ্ডমুণ্ড ঘরানার প্রত্যক্ষ কোনও যোগাযোগ ছিল না, এমনকি চতুর্থ আচার্য তাও-সিন-এর সঙ্গে ফারং-এর সাক্ষাৎ হয়েছিল কিনা এ নিয়েও বিতর্ক আছে। তবে ষণ্ডমুণ্ড ঘরানার চতুর্থ আচার্য ফা-চি (Fa-chih) ও  তাঁর প্রধান  শিষ্য চি-ওয়েই (Chih-wei) যে, বোধিধর্ম-ধারার পঞ্চম আচার্য হং-জেন-এর সঙ্গে   যোগাযোগ রেখে চলতেন এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নথি আছে। ষণ্ডমুণ্ড ঘরানা কেবল চিনের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না। নবম শতাব্দীর প্রথম দিকে সাইচো (৭৬৭-৮২২ খ্রিঃ) নামের জনৈক জাপানি ভিক্ষু ধর্মচর্চার জন্য চিনে গিয়ে ষণ্ডমুণ্ড ঘরানাকে জাপানে পৌঁছে দিয়েছিলেন। উত্তর ও দক্ষিণ ঘরানার মাঝে দাঁড়িয়ে ষণ্ডমুণ্ড ঘরানা স্বাতন্ত্র্য-চিহ্নিত একটি নাম। উত্তর-দক্ষিণ ঘরানা যখন প্রাধান্য বিস্তারের লড়াইয়ে নেমেছে রাজধানী শহরের নাগরিক আবহে, তখন ষণ্ডমুণ্ড ঘরানার সাধকেরা নিউতউ পর্বতের নির্জনতায় বুদ্ধ-প্রকৃতি অর্জনের নিরলস সাধনায় ব্যাপৃত থেকেছেন এক অলোকসামান্য আত্মমগ্নতায় ।  

 

 

তথ্যসূত্র : 

1.SUDDEN AND GRADUAL : APPROACHES  TO  ENLIGHTENMENT  IN  CHINESE THOUGHT  EDITED  BY  N.  GREGORY, UNIVERSITY  OF  HAWAI  PRESS,  HONOLULU  1987.

2. ZEN BUDDHISM :  A  HISTORY  INDIA  AND  CHINA  BY  HEINRICH  DUMOULIN  TRANSLATED BY  J. W. HEISIG AND PAUL KNITTER ; MACMILLAN PUBLISHERS COMPANY, 1988.

3. THE NORTHERN SCHOOL AND THE FORMATION OF EARLY CHAN BUDDHISM BY JOHN R. MACRAE , UNIVERSITY OF HAWAII PRESS  HONOLULU, 1986.

4. SEEING THROUGH ZEN BY JOHN R. MACRAE UNIVERSITY OF CALIFORNIA PRESS , 2003.

5. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EASTBY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.

6. THE PLATFORM SUTRA OF THE SIXTH PATRIARCH BY JOHN R. MC RAE; NUMATA CENTER FOR BUDDHIST TRANSLATION AND REASEARCH, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.

7. THE PLATFORM SUTRA : THE ZEN TEACHING OF HUINENG BY RED PINE ; COUNTERPOINT, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.

. TRANSMISSION AND ENLIGHTENMENT IN CHAN BUDDHISM SEEN THROUGH THE PLATFORM SUTRA BY MORTEN SCHLUTTER ; TAIPEI CHUNG – HWA INSTITUTE OF BUDDHIST  STUDIES.      

9.. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON.

 

10. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK.



ছবি : বিধান দেব 

                                                                       ক্রমশ...

 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন