বৃহস্পতিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২১

কবিতা : মজিদ মাহমুদ


 লঙ্কাবি যাত্রা 


গতরাত ছিল দুটি দিনের সন্ধিক্ষণে উল্লম্ব অস্থির

বৃষ্টির মৃদু-আলাপচারিতা যদিও এই ভূখণ্ডের বৈশিষ্ট্য

তবু একই ছাতা দিয়েছিল আমাদের অভিন্ন অবলম্বন

আমরা হেঁটেছিলাম সুতীক্ষ্ণ সুতার উপর

আমরা উঠেছিলাম সর্বোচ্চ উচ্চতায়

তাই কেউ পারেনি ঠেকাতে আমাদের পতন

দ্রæত পতিত হবার কালে খুলে গেল আমাদের দৃশ্যেন্দ্রিয়

দেখতে পেলাম যে বিস্তীর্ণ উদ্যান থেকে আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম

আদিম পৃথিবীর ঝড়ো হাওয়া, অনভ্যস্ত পথচলা

কিংবা একটি সাপের হিস্-হিস্ শব্দে ভড়কে গিয়েছিলাম


অনেক খুঁজেছ তুমি, করেছ অনেক পর্বত আরোহণ

তোমার পায়ের গোছা তাই কাঠগোলাপের মত শক্তসুন্দর

এমনকি বুকের উৎকর্ষে রয়েছে কষ্টের ছাপÑ

তবু মিলনের আকাক্সক্ষা এতটুকু ¤øান করেনি

আর আমি, একই পথে হেঁটে হেঁটে ন্যুব্জ-ক্লান্ত

পেশীগুলো শিথিল হয়ে পড়ছে, হারিয়ে ফেলছি গ্রহণের ক্ষমতা  


হয়তো অন্বেষণকালে আমাদের বহুবার হয়েছে দেখা

হয়তো কদাচিৎ চিনতে পেরেছি

তবু অসংখ্য প্রবঞ্চনা আমাদের মিলতে দেয়নি

যে-সব দুষ্ট দেবতা আটকে দিয়েছিল আমাদের লঙ্কাবি যাত্রা

তাদের ইচ্ছের কাছে যদিও আমরা সমর্পিত

তবু আমাদের মিলনের আনন্দে তাদেরও রয়েছে ভাগ

কেননা তারাই তো দিয়েছে আমাদের 

বিচ্ছেদের দীর্ঘতার আনন্দ! 




কেউ আছে 


যে শুনছে আমার কবিতা সে আছে

যে লিখছে আমার কবিতা সে আছে

ঘুম ও স্বপ্নের মধ্যে যে নদী পার হয়

অন্ধকার গলির মাথায় যে অপেক্ষায়

আমি তো তার কাছে যাব

যারা বলে কেউ নাই

তারা আমার অস্তিত্বের বিপরীতে থাকে

অনেক লিঙ্গান্তরের ভিড়ে আমি যাকে

হারিয়ে ফেলেছিলাম

হয়তো উপযুক্ত ছিলাম না পাহাড়ি খাড়ায়

তবু গিরিখাত ধরে এতদূর এসেছি

উপত্যাকায় করেছি চাষ

তাই বলে পর্বত চিনি না!

যে ঘুমিয়ে আছে তাকে ঘুমাতে দাও

যারা জেগে আছে গভীর তমশায়

কেউ আছে জেগে নিশ্চয়

তাই আমি জাগতে পেরেছি।




প্রত্নপথের সন্ধানে


যদিও আমরা সকলেই করেছিলাম একটি

গুপ্ত পথের অনুসন্ধান

তবু প্রত্যেকের যাচ্ঞা ছিল গোপন 

আমারা যখন কিছুটা অংশ হারিয়ে ফেলেছিলাম

আমরা যখন পরষ্পর মুখোমুখি

তুমি তখন কপাল থেকে মুছে দিচ্ছিলে ঘাম

সরিয়ে নিচ্ছিলে অবাধ্য চুলগুলো

আমরা যখন গভীর মমতায় গলে পড়ছিলাম

যখন আমাদের পবিত্র চিন্তাগুলো

শারীরের প্রমূর্তি হয়ে গেয়ে উঠছিল আনন্দস্তুতি

এই পথেই তো আমরা উদ্যানে হেঁটে বেড়াতাম

প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে রয়েছে এসব পথের অনুপুঙ্খ বয়ান

এ পথ হারিয়ে গিয়েছিল প্রতœ-স্মৃতির ভেতর

নৃতত্তে¡র শিক্ষকগণ এখনো তাদের ছাত্রীদের

যে মাতৃতান্ত্রিক বপন ক্রিয়ার কথা বলেনÑ

এ তো সেই পথ

এই তো আমাদের শোষণমুক্ত সমাজ

এ পথ পুনরায় হারিয়ে যাওয়ার আগে

আমাদের কি উচিত নয়

যারা দিকভ্রান্ত এখনো দিনান্তে ফুরিয়ে যায়

তাদের লুপ্ত পথটুকু পথের সাথে

পুনরায় মিলিয়ে দেয়া!




দুঃখ 


সব ভালো কবিতা দুখীদের অধিকারে

কবিতা লিখতে গেলে যেমন কিছুটা দুঃখ লাগে

পড়তে গেলেও কিছুটা দুঃখের প্রয়োজন

প্রাপ্তি যার কানায় কানায় সে যাবে সমুদ্র বিলাসে

রাজ্য শাসনে তুমি তুষ্ট

স্ত্রীর পঞ্চ ব্যঞ্জনে তুলছ ঢেকুর

সন্তানের সাফল্যে প্রতিবেশি ঈর্ষানিত

মদ ও মাংসের যাচঞা হয়েছে পুরণ

তোমার জন্য তো কবিতা নয়

দু’একটা পদ্য হয়তো রয়েছে কোথাও

পৃথিবীর সকল সুখী মানুষের কবিতা একটাই

তাই তুমি বলতে পার- কবিতা কেমন হবে

কিন্তু প্রতিটি দুঃখের রয়েছে আলাদা রঙ 

এমনকি গতকালের দুঃখগুলোর সঙ্গে

আজকের দুঃখের নেই মিল

বোনের দুঃখ ভাইয়ের দুঃখ

বাবা ও মায়ের দুঃখ একই পরিবারভুক্ত নয়

দুঃখের বাস মানুষের সৃষ্টি চেতনায়

দুঃখের কোনো বাবা নাই

এমনকি যে তোমাকে দুঃখ দিয়েছে

তারও রয়েছে নিজস্ব দুঃখ

প্লাথ ও উলফের দুঃখ কি অগ্নিজলে নির্বাপিত হয়েছিল

পো ও হেমিংওয়ের দুঃখও তো হয়নি জানা

ট্রামেকাটা দুঃখ, নীরবতার দুঃখও সয়েছেন কবিরা

দুঃখই তো কবির বাড়ি ফেরার পথ


ছবি : বিধান দেব 




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন