বৃহস্পতিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২১

সম্পাদকের কথা


 


এসময় খুব বিষণ্ণতা গ্রাস করছে। এসময় স্মৃতি করে দিচ্ছে সব কিছু। এমন ঘোলাটে আকাশ এমন ঘোলাটে নদী এত উজ্জ্বল ঝকঝকে হয়ে উঠবে তা হয়তো অজ্ঞান শৈশবেও ভাবিনি। তবে অতীত আমাদের প্রসন্ন থাকতে শিখিয়েছে সব অবস্থায়। বঙ্কিমচন্দ্র- শরৎচন্দ্র-বিভূতিডূষণ আমাদের কম বাস্তবতার মুখোমুখি করেননি। সব ভয়ঙ্করতার পাশে জীবনের প্রসন্ন দেবতা চিরকালীন স্রোতের মতো বয়ে এসেছে। না, তা চোরাস্রোত নয়। জীবনকে উপলব্ধির এই-ই সেরা সময়। এ সময় মনুষ্যত্বকে ঘুলিয়ে দেবার সময় নয়। 'অমাবস্যার শ্মশানে ভীরু ভয় পায়/ সাধক সেখানে সিদ্ধিলাভ করে'--( সেই সব স্বপ্ন/ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)। এখনই সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার সময়। সেই নিষ্পাপ সাধনা মানুষকে বাঁচার তৃপ্তি দেবে। প্রতিবেশীহীন বাঁচা বাঁচা নয়। চেতনাহীন, উপলব্ধিহীন পৃথিবীর অস্তিত্ব আমাদের আপেক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গির আপাত সত্যকে একেবারে নস্যাৎ করে দিতে পারে হয়তো। সেদিন নাই বা এল। মানব সভ্যতা থেকে স্বপ্ন শব্দটা নাই বা গেল মুছে।


বিশেষ রচনা : রাজীব ঘোষাল


 সভ্যতার খাণ্ডবেচ্ছা 

  


খুব সম্প্রতি বনে জঙ্গলে মানুষের আগুন লাগানোর প্রবণতা যেন সভ্যতার জন্য একটি থ্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে।কিন্তু কেন এই প্রবণতা!এর উত্তর সাম্প্রতিকে নয় সুদূর অতীতে সমাহিত।একটা সময় ছিল বনে দাবানল জ্বলত। প্রকৃতির রোষে অসহায় মানুষ মনে মনে ত্রাহি ত্রাহি রবে প্রমাদ গুনত।তারপর এল সেইদিন যেদিন আগুন হয়ে উঠল মানুষের ঢাল।বিভিন্ন হিংস্র জন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ আগুনকে কাজে লাগাল।ক্রমে সভ্যতার আয়ুধ হয়ে উঠল আগুন।আর কে না জানে আয়ুধ যেমন উপকারী তেমন মারাত্মক হয়ে ওঠাতেও তার জুড়ি নেই।

  কিছুদিন আগেই আমাজনের জঙ্গলে বিশাল অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সামনে আসে। সারা বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে যায়।পৃথিবীর বৃহত্তম রেন ফরেস্ট জীব বৈচিত্রের আঁতুড়ঘর যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে তো পুরো মানব সভ্যতাই ধ্বংসের মুখোমুখি হবে!এর দায় কার? কার স্বার্থে এই খেলা।উত্তর সারা বিশ্বই জানে।জানে মানুষের অপরিমিত লোভ।পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় হঠাৎই লক্ষ করা গেল আগুনের লেলিহান শিখা।কে লাগালো আগুন? কেন চুপ রইল বনদপ্তর? এই প্রশ্নের উত্তরে অনেক যদি কিন্তুর হিসেব লেগে আছে। আমাদের একটি সহজ প্রশ্নের আশু সমাধান বের করতে হবে। প্রশ্নটি হল সভ্যতা কাকে বলে? বনভূমি কেটে নদীপাড় দখল করে পাহাড়ের কোলে সাতমহলা বাড়ি বানানোকে আমরা যেমন সভ্যতা বলব না তেমনই সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে মদ মাংস রুটির জীবনকেও আমরা সভ্যতা বলব না। জঙ্গল জুড়ে ভারি বুটের আওয়াজ যেমন সভ্যতা নয় তেমনই অসহায় খেটে খাওয়া উর্দি পরা লোকটির বুক বুলেটে ঝাঁঝরা করে দেওয়াও সভ্যতা নয়। সভ্যতা খুবই দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলনের বিষয়। যেখানে কোনো চাতুরীর আশ্রয় নিতে হবে না। প্রকৃতির সঙ্গেই সহাবস্থান করবে মানুষ। যেখানে নিছক বাড়ি বানানোর প্রয়োজনে রাস্তার প্রয়োজনে বদ্ধ করা হবে না জলের গতিপথ।যেখানে গাছ কাটা হবে না বেহিসেবী। বনে আগুন দেওয়ার আগে যখন মানুষ লক্ষবার ভাবনা চিন্তা করবে তাকেই আমরা সভ্যতা বলতে পারি। 

  পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের বনাঞ্চল জুড়ে বামনি ফলস,সুকরিডোবা, আপার ড্যাম,লোয়ার ড্যাম, দোয়ারিখাল, ধসকা, মাঠা, গোর্গাবুরু, পারডি, টিকরটাঁড় আজ মানুষের পর্যটন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। আর পর্যটন বাড়লেই, বাড়বে হোটেল ব্যবসার রমরমা। এই পুরো নিসর্গ এলাকা জুড়েই কেউ বা কারা আগুন লাগিয়ে দেয়। ছুটে আসে  তরুণ মাহাত, সাধন মাহাত, বাপী মাহাত, দুর্গাদাস মাহান্তি, সুজিত মাহাত, জনার্দ্দন মাহাত, অক্ষয় ভগত, উজ্জ্বল মাহাত,প্রদীপ মাহাতর মতো প্রায় একশ জন মত স্বেচ্ছাসেবী। তিনটি দলে ভাগ হয়ে আগুন নেভানোর কাজে হাত লাগায়।পরবর্তীতে অগ্নিসঙ্গযোগের ঘটনা যাতে না ঘটে সেদিকেও নজরদারী চালানো হবে বলে শপথ নেয় এই প্রকৃতিপ্রেমী ভূমিপুত্ররা। আগুন আপাতত নিভেছে। কোনো যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই কেবল মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে অসাধ্য সাধন করেছে একদল প্রকৃতিপ্রেমী যুবক। তারা জ্বলে ওঠা আগুনের পাশে ট্রেঞ্চ কেটে কখনো আগুন লাগা জঙ্গলের চারপাশে দশ ফুট পনের ফুট এলাকা শুন্য করে দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে আগামী বর্ষায় নতুন করে চারা লাগিয়ে সিড বল ছড়িয়ে আবারো বনভূমিকে আগের রূপ দেওয়া হবে। এদিকে ডি.এফ.ও পুরুলিয়া দাবী করেছেন তাদের বিভাগীয় কর্মীদের প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। বিড়ি মাচিস ইত্যাদি নিয়ে বনে ঢোকার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে নজরদারী।যদিও  আগুন লাগানোর হাত থেকে বাঁচানো গেল না নিতুড়িয়া সাঁতুড়ি রঘুনাথপুরের ছোটো ছোটো বনবাদাড়গুলিও। মানুষের ঔদ্ধত্যের কারণেই পুড়ে মারা গেল অজস্র ছোটো ছোটো বনজ পশুপাখি। এদিকে করোনার করাল গ্রাসে মানুষের জীবন তটস্থ। অক্সিজেনের জন্য ছটফট করছে অজস্র মানুষের ফুসফুস। তবু কি মানুষের ঘুম ভাঙবে! কেন জানি না মনে হচ্ছে সেই যে অতিদীর্ঘ ঘুমে ঘুমিয়েছিলেন মহারাজ মান্ধাতা অথবা কৃষ্ণ অর্জুনকে সঙ্গে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলছেন খাণ্ডব বন। এইসব ঘটনাগুলি কিছুকাল দ্বৈপায়ন হ্রদের নিচে বিশ্রাম নিক। শঙ্খ ঘোষের মত কোনো দরদী মানুষ এসে বলুনঃ “ সব শান্ত হোক। প্রয়োজনে পৌরহিত্যের ভার নেব আমি ” ……



ছবি : বিধান দেব 

ধারাবাহিক গদ্য ।। দীপক হালদার


 

ডায়মন্ড হারবারের সাহিত্যচর্চার ইতিবৃত্ত 
আট.
 ডায়মন্ডহারবারের সৌভাগ্য প্রায়শই সেখানে প্রশাসনিক পদের দায়িত্ব নিয়ে কোনও না কোনও কবি সাহিত্যিকের আগমন ঘটেছে।কবি বাসুদেব দেব এবং কবি ও কথাকার তপন বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ডায়মন্ডহারবার ত্যাগ করলেন চাকরিতে বদলির সুবাদে, তখন কবি সুধীর দত্ত ডায়মন্ডহারবার এক নম্বরের ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক হিসেবে কর্মভার গ্রহণ করলেন কয়েক মাসের মধ্যেই। ফলে ডায়মন্ডহারবারের সংস্কৃতিপ্রাণ ও সাহিত্যরসিক মানুষজনের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে গেল অচিরেই। স্থানীয় সাহিত্যসেবীগণ তাঁকে কাছে টেনে নিলেন পরম আন্তরিকতার সঙ্গে।ব্যাবেল টাওয়ারের চূড়া তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ,এছাড়া আরশি টাওয়ার  ,প্রাকপুরান প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থগুলি তাঁর কবি প্রতিভার পরিচায়ক। শরৎসুনীল নন্দী,রামচন্দ্র প্রামাণিক , সুধীর দত্ত এই তিনজনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হত সংবেদ নামের অত্যন্ত উচ্চ মানের একটি সাহিত্য পত্রিকা।কবিতাকেন্দ্রিক এই পত্রিকায় যেমন উচ্চাঙ্গের প্রবন্ধ প্রকাশিত হতো,তেমনই কবিতা ও থাকত।গল্পও ছাপা হয়েছিল দু একবার। নিয়মের টানে তাঁকেও বদলি হতে হল একসময়।তাঁর শূন্যস্থানে এসে বসলেন আর এক কবি। কবি অমিতাভ মৈত্র। মৃদুভাষী চমৎকার স্বভাবের এই মানুষটির ও
স্থানান্তর ঘটল কালের নিয়মে।
                                       বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পদার্পণ থেকে যার সূচনা, কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বংশধর কবি সুধেন্দু মল্লিক,কবি  বাসুদেব দেব, কবিও কথাশিল্পী তপন বন্দ্যোপাধ্যায়,সুধীর দত্ত ,অমিতাভ মৈত্রতে এসে আপাতত তার সমাপ্তি ঘটল।
                                             কিন্ত চর্চা চলতে থাকল তার   নিজের গতিতে।দেখা গেল ডায়মন্ডহারবার মহকুমার বিভিন্ন স্থানে অন্তঃসলিলা স্রোতঃধারার মতো সাহিত্য চর্চার ধারাও  ক্রম বহমান। ডায়মন্ড হারবারের মাথুর মানখন্ড কামারপোল জোবরালি প্রভৃতি এলাকায় সাহিত্য চর্চার ধারা চোখে পড়ে ।নিষ্ঠা, একাগ্রতা থাকলেও উপযুক্ত মান রক্ষার দিকে সঠিক দৃষ্টির অভাব ওইসব প্রচেষ্টাকে উল্লেখযোগ্য সফলতা দান করতে পারেনি বলেই মনে হয়। এই মুহূর্তে কবি শুকদেব হালদার এবং কবি ,সম্পাদক চিত্তরঞ্জন দাস এই দুজনকে বিশেষভাবে মনে পড়ছে । এসবের মধ্যেও কারো কারো ব্যক্তিগত সদিচ্ছা ও মেধাবী প্রচেষ্টা সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ সাফল্য এনে দিয়েছিল ।
         ড. নলিনীরঞ্জন কয়াল এরকম এক ব্যক্তিত্ব ।গবেষণামূলক বহু প্রবন্ধ এবং পুস্তক রচনা করেছেন মাথুর মানখন্ড অঞ্চলের এই বিদগ্ধ মানুষটি। পদবী নিয়েওতাঁরউল্লেখযোগ্যকাজআছেবলে জানা যায়।শ্রীযুক্ত অজিতকুমার সামন্ত আর একজন সাহিত্যসেবী।মাথুর হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষকতার  পাশাপাশি তিনিও সাহিত্য চর্চায় নিরত ছিলেন ।তাঁর বহু প্রবন্ধ উল্লেখযোগ্যতার দাবিদার ।
       শ্রী অরুণ কুমার পুরকাইত মাথুর গ্রামের বাসিন্দা ।বর্তমানে কলকাতায় থাকেন ।তাঁর লেখা বহু ছোটগল্প কলকাতার দৈনিক, সাপ্তাহিক পত্র- পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে ।তাঁর দুখানি গল্প সংকলন ও প্রকাশিত হয়েছে।অরুণ কুমার  কলকাতার পত্র- পত্রিকার ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পরবর্তীকালে লেখা ছেড়ে দেন ।
                           কিন্তু আর এক অরুণ, ফলতার সোনাকোপা গ্রামের বাসিন্দা অরুণ পাঠক দারুণ লড়াই ক'রে, মেধা এবং সময়ের প্রতি সুবিচার ক'রে, আধুনিক কবিতাকে রক্তধারায় গ্রহণ করে সুন্দর, স্বভাবসিদ্ধ, নিজস্বতার পরিচয়বাহী কবিতা রচনা করে চলেছেন তুমুল উৎসাহে ও যোগ্যতায়।কবিতা, কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ, পুস্তক সমালোচনা ছাড়াও অরুণ দীর্ঘদিনব্যাপী সম্পাদনা করছেন  'সাহিত্যের বেলাভূমি 'নামে একটি অতীব উচ্চ মানের লিটল ম্যাগাজিন ।বাংলা কবিতার জগতে অরুণ এক সমীহ  উদ্রেককারী নাম।অরুণ অনেকগুলো কাব্যগ্রন্থের জনক।
          ডায়মন্ডহারবার মহকুমার আশুরালী গ্রামের আশুরালী গ্রামোন্নয়ন পরিষদের কর্ণধার অমৃতলাল পাড়ুই এক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ।পরিষদের মুখপত্র হিসেবে তিনি সম্পাদনা করতেন 'গ্রামোন্নয়ন কথা ' নামে একটি উল্লেখযোগ্য এবং সমীহসূচক পত্রিকা ।যাতে গবেষণামূলক প্রবন্ধের বিচিত্র সমাবেশ ঘটত,ও ছাড়া পত্রিকায় থাকত মহকুমার সাহিত্য ও সংস্কৃতির সুলুক সন্ধান ,থাকত খোঁজখবর। 
অমৃতলাল নিজেও পুতুল নাচ নিয়ে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন শুধু নয়, প্রায় বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলা পুতুল নাচের দলকে বিভিন্নভাবে সাহায্য ও উৎসাহিত করতেন সক্রিয়ভাবে ।প্রায় কুড়ি বছর ধরে ধরে নিয়মিত প্রকাশ করেছেন 'গ্রামোন্নয়ন কথা '।সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন তিনি।
              ডায়মন্ডহারবারের বাসুলডাঙা অঞ্চলের বাসিন্দা নিখিলরঞ্জন হালদার সুন্দর কবিতা লিখতেন ।তাঁর অকাল প্রয়াণে এলাকার সাহিত্যসেবীগণ শোকাহত । ফজলুর রহমান নামে এক তরুণ    সম্পাদনা করতেন হুগলির বাঁকে নামে একটি পত্রিকা ।পত্রিকার প্রকাশ দীর্ঘদিন বন্ধ ।মগরাহাট অঞ্চলের আহমদ আলি হালদার গল্প কবিতা লিখতেন একসময় ।তাঁর কলম আপাতত স্তব্ধ ।এম বাকিবিল্লা ছই নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনার সাথে সাথে ছোটগল্পও লিখতেন, বর্তমানে তাঁর কলম ছুটিতে ।পলাশকেতন ছদ্মনামে আব্দুল রাজ্জাক লস্কর লিখতেন কবিতা ।বহুদিন তাঁর চর্চার কোনো খবর নেই ।আজিজুল হক বাবলু প্রকাশ করতেন পার্ল হারবার নামের পত্রিকা ।সেটিও বর্তমানে বন্ধ ।আজিজুর হক নামের আর এক তরুণ কয়েকবছর ধরে প্রকাশ করে আসছেন রেঁনেসা নামের পত্রিকা,পত্রিকাটি এখনও নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
                                           আটের দশকে ডায়মন্ডহারবারে একসময় জন্ম নিল আরও একটি পত্রিকা,নাম জনতীর্থ।সম্পাদক এবং প্রকাশ ডায়মন্ডহারবারের লেনিন নগরের বাসিন্দা শ্রী অজিত কুমার বসু।পত্রিকাটি কয়েকবছর চলার পর পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়।
           আটের দশকের মাঝামাঝি ডায়মন্ডহারবারে আরও কয়েকটি পত্রিকার প্রকাশ ঘটে। কবি অমলেন্দু বিকাশ দাশের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় স্ফূটনাঙ্ক নামের পত্রিকা।কবিতা,গল্প, প্রবন্ধ ও ছড়ার সমাবেশ ঘটত সেখানে।বেশ কয়েকবছর চলার পর তার চলনও রুদ্ধ হয়,স্ফূটনাঙ্ক- দ্যুতিও মুখ লুকোয়। অমলেন্দু কবিতা, ছড়া লেখার পাশাপাশি প্রবন্ধ,ভ্রমণকাহিনী এবং উপন্যাস ও লিখে থাকেন ।এসব বিষয়ে বেশ কয়েকটি গ্রন্থের জনক অমলেন্দু বিকাশ দাশ।
                                                ঊনিশ শ পঁচাশি সাল নাগাদ কবি সাকিল আহমেদ এর  সম্পাদনায় প্রকাশিত হল কুসুমের ফেরা নামের পত্রিকা।কবিতাকেন্দ্রিক এই পত্রিকার পাতায় স্থান পায় কবিতা,   ছড়া ,ছোট নিবন্ধ কখনও কখনও ছোটগল্প। সাকিল সাংবাদিকতার কাজ করতেন। আনন্দবাজার, আজকাল, প্রতিদিন প্রভৃতি দৈনিক পত্র পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার পর বর্তমানে কলম নামের দৈনিক কাগজের সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন ।পত্রিকা প্রকাশ ছাড়া সাকিল আহমেদ আরও একটি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। নিজ উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় অন্তত দশবার বইমেলার আয়োজন করেছেন ডায়মন্ডহারবারে।আকরে তা বড়ো না হলেও ওইসব বইমেলা ডায়মন্ডহারবারের সংস্কৃতিপ্রাণ মানুষের কাছে অনেক অনেক ধন্যবাদ ভালোবাসা ও সমর্থন আদায় করেছিল।বইমেলায় নিত্যদিন সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সাথে সাথে একদিন থাকত সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা এবং  কবি সম্মেলনের আয়োজন। ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে ওসবের অবদান অবশ্যই মনে রাখার এবং স্মরণ করারও।সাকিল আহমেদ এর কুসুমের ফেরা আজও জীবিত এবং চলিষ্ণু। সাকিল আহমেদ কাব্যগ্রন্থ, ছড়াগ্রন্থ ও একটি উপন্যাস লিখেছেন। 
                   গত প্রায় চোদ্দ বছর ধরে ডায়মন্ডহারবারের ধনবেড়িয়া গ্রাম থেকে কবি, ছড়াকার সুব্রত মন্ডলের সম্পাদনায়  প্রকাশিত হয়ে চলেছে আলোর মিছিল নামের পত্রিকা ।পত্রিকায় বড়দের উপযোগী গল্প, কবিতা, প্রবন্ধের পাশাপাশি ছোটছোট ছেলে মেয়েদের লেখা ছড়া, কবিতা এবং তাদের আঁকা চিত্রকর্মও মুদ্রিত হয় ।যা অভিনব শুধু নয় বেশ উৎসাহব্যঞ্জক।
          নিলয় ভট্টাচার্য এবং তাঁর সহধর্মিণী দীপালি ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন প্রকাশ করেছেন প্রতিবাদ নামের সংবাদ সাহিত্য ফোল্ডার ।বর্তমানে তা আর প্রকাশিত হয় না।
                   শ্রী নীলরতন মন্ডল কয়েকবছর ধরে প্রকাশ করছেন একটি পত্রিকা, নাম হীরকদ্যুতি। তবে তার প্রকাশ খুবই অনিয়মিত । নীলরতন এলাকার আঞ্চলিক ইতিহাস তথা মন্দির মসজিদ নিয়ে  প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন ।ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্যচর্চার জগতে এইসব ক্রিয়াকান্ড সবিশেষ উল্লেখযোগ্য সংযোজন। 



ছবি : বিধান  দেব 

ধারাবাহিক গদ্য ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত


 

সাধনপর্বের  নির্জনতা



১৫.

ভাসান
এবার  ভাসিয়ে দিতে হবে আমার এই তরী।
       তীরে ব’সে যায় যে বেলা মরি গো মরি।
   ফুল -ফোটানো সারা করে বসন্ত যে গেল সরে,
     নিয়ে ঝরা ফুলের ডালা বলো কী করি ?।

   জল উঠেছে ছলছলিয়ে ঢেউ উঠেছে দুলে—
    মর্মরিয়ে ঝরে পাতা বিজন তরুমূলে।
   শূন্যমনে কোথায় তাকাস ? সকল বাতাস সকল
                                                          আকাশ
              ওই পারের ওই বাঁশির সুরে উঠে শিহরি ॥
                                  (  ' সঞ্চয়িতা ' )
সামনেই তাঁর জন্মদিন ।  শুধুই কি একটা জন্মের  দিন । এই দিনটা তো আমাদেরও  নতুন জন্মলাভের দিবস ।  পুরানো নতুনের মিলন- ই হোক বা আত্মোন্নতি----  সবক্ষেত্রেই জন্মদিনটি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রানের প্রিয় গান বা কবিতা নিয়ে রচিত হোক শ্রদ্ধার্ঘ্য ।
'এবার ' শব্দটি দিয়ে কবিতাটি শুরু। আবার পুরো লেখাটির মধ্যে ওই একটি শব্দই বাইরে রেখেছেন কবি ।  কেন ? যা কিছু পুরনো , সমস্ত সরিয়ে নতুনের আহ্বান ? নাকি জীবনকে আরো একবার দেখে নেওয়া। আরো একবার জেনে নেওয়া । বসন্ত তার কাজ শেষ করেছে । ফুল- ফোটানোর শেষ করে তার এখন চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। জল  উঠেছে ছলছলিয়ে। পাতার মর্মর ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। কবি অন্য পারের বাঁশির শব্দ শুনেছেন।
আমরাও শুনছি দূরাগত আহ্বান ।  প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে ।  এক পক্ষের বিদায় তো অন্য পক্ষের আসবার মাহেন্দ্রক্ষণ । দুপক্ষই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চায় ।  থাকতে চায় রং মেখে কুশীলবদের মত । এই থাকতে চাওয়াটা দোষের কিছু নয় ।  বঙ্গ জীবনের অঙ্গ হতে হবে সকলকে। সমাজ -মনস্তত্ত্ব বলছে মানুষের মনে রাখার বিষয়গুলি ব্যক্তি -ইচ্ছার দ্বারা চালিত । বৃহত্তর স্বার্থ থেকে ক্ষুদ্রতর স্বার্থের দিকে চালিত মানুষ তার বোবা যন্ত্রণাকে যুক্তিসংগত বলেই চিরকাল ধরে নেয় । সেই যে কবি বলেছেন , " নাহি জানে কার দ্বারে দাঁড়াইবে বিচারের আশে,...। "
আমাদের শক্তি আমাদের নিজস্ব। কবি তাঁর জীবনকে আশাবাদের চূড়ান্তে নিয়ে গেছেন । তাই বসন্তের পর বৈশাখ , আবার চৈত্রের পর গ্রীষ্ম---- চলতেই থাকে, থাকবে । আজ আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর সময় ।  ' ওই পারের ওই বাঁশির সুরে'  ক্ষণিকের পর্যবেক্ষণ নয় , লগ্ন হয়ে আছে জীবনের অন্তর্ভূমি ।  তিনি যে মনের কথা গুলি নীরবে উচ্চারণ করে গেলেন তা বুঝতে দেরি হলে লজ্জার শেষ থাকবে না।
একটি ঘটনা দিয়ে শেষ করব লেখা। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি কালাম দক্ষিণ আফ্রিকায় যান নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে দেখা করতে ।  তাঁকে এগিয়ে দিতে এসে ম্যান্ডেলা নিজের লাঠিটি আর  সঙ্গে নেননি ।  কালামকেই অবলম্বন করেন । এই ঘটনা আমাদের কিছু কি ইঙ্গিত করল ! জানি না ! হয়তো...

১৬.

অর্ঘ্য

তীর্থে  এসেছে , কাদা লেগে আছে পায় ;
কাঁটা ফুটে আছে পায় ।
লাল পদ্মের মতো দেবতার পদযোগে কি উপায়
হাঁটু গেড়ে বসা যায় ।

কবি বলেছেন 'নতজানু ' তার এইভাবে বসাটাকে;
সে কিছু জানে না ; হাঁটু ভেঙে যায় তার :
লাল পদ্মের মতন  হৃদয় তুলে ধরে , ধরে থাকে;
এই তার উদ্ধার ।

সম্প্রতি নারায়ণ  সান্যালের ' পথের মহাপ্রস্থান ' বইটি  পড়ছিলাম ।  তার আগে অবশ্যই প্রবোধ সান্যালের ' মহাপ্রস্থানের পথে ' পড়েছি। সেই দুর্গম যাত্রাপথের বর্ণনা দিচ্ছেন লেখক।
  " বাঁ দিকে নিচে এবার নতুন নদী , দক্ষিণ বাহিনী অলকানন্দা , গঙ্গার মতোই তার স্রোতের শব্দ, নীল নির্মল প্রবাহ ; জলের অবিশ্রান্ত আওয়াজে নীরবতা আরো গভীর হয়ে উঠেচে, ---- চড়াই পথে আমরা চলেছি উত্তরদিকে । ক্রমাগত উত্তর দিকেই আমাদের গতি , মহাযোগীর জটাকে স্পর্শ করবার জন্য নিরন্তর তার দেহ বেয়ে উঠচি  যত পিপীলিকার দল  ।  তীর্থের এই দীর্ঘ পথটিই  আমাদের তপস্যা, পথ শেষ হলেই সকলের ছুটি ।  জীবনেও এমনি, অবিচ্ছিন্ন অগ্রগতি আমাদের বাঁচা, আমাদের সাধনা;  পরম পরিনামকে স্পর্শ করতে আমরা এগিয়ে চলেচি, কোথায় গিয়ে পৌঁছবো  জানিনে। "
কি নিদারুণ সত্য ! কবিতাটির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে যেন ।  কত পরিশ্রম , কত কষ্ট শেষ করে তবে পৌঁছনো যায় দেবতার লাল পদ্মের মতো পদযুগলের কাছে । এর প্রতিটি পদক্ষেপ কাঁটায় কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত ।  কিন্তু ভক্ত প্রাণের কাছে যে তা অতি সাধারণ বিষয় । সে এই কষ্ট স্বীকার করতে চায়। যুগ যুগ ধরে মানুষ মনে করে এসেছে কষ্টের গুরুত্ব ।  তাই কষ্টের সঙ্গে মিলিয়ে 'কেষ্ট ' এসেছে । অর্থাৎ পরমকে পাওয়ার জন্য চরম পথের সন্ধান।
শুধুই কি ঈশ্বর ! যেকোনো লক্ষ্যের জন্যই এই কষ্ট স্বীকার করতে হয় সকলকে ।  বীতশোক ভট্টাচার্যের 'দ্বিরাগমন '  কাব্যগ্রন্থের 'অর্ঘ্য ' কবিতাটি আমাদের স্মরণে-বিস্মরণে জেগে থাকে ।   ভক্ত ঈশ্বরকেই লীলাময়  ভাবছেন , আবার ভাবছেন মঙ্গলকামী। সূক্ষ্ম  স্থূল কত রূপেই তার প্রকাশ।
কবিতাটি পড়তে পড়তে মনে পড়ে গেল ১৯৭৭ সালে হরিদ্বার ভ্রমণের একটি ঘটনা। নিতান্তই ছোট আমি ও বোন ।  সেসময় মনসা মন্দির অথবা চন্ডী মন্দিরে যাওয়ার রোপওয়ে / সিঁড়ি ছিলনা। পথ যদিও এক-দেড় ঘণ্টার ( চন্ডী পাহাড় তুলনায় বেশি ) তবু সেই পথটুকু ভাঙতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল মা-বোন আর আমার ।  মা একবার পাহাড়ে হুমরি খেয়ে পড়তে পড়তে বাঁচেন ।  নিচেই ট্রেন চলে যাওয়ার লাইন ।  ভক্ত প্রাণের অর্ঘ্য সাজিয়ে সেদিন আমরা সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছে যাই মন্দিরে ।  পুজো দিয়ে নেমে এলাম ।  কিন্তু মন কি সেদিন কোনো আত্মীয়তা গড়ে তুলতে পেরেছিল ।  আঘাত ; তা যত ছোটই হোক , মায়ের সেই  প্রায় পড়ে যাবার ছবিটি মনের ভেতর অনভিপ্রেত একটা জিজ্ঞাসা  তুলে দিয়ে যায় ।  মা কি সত্যি সেদিন তাঁর হৃদয় পদ্মকে তুলে ধরেছিলেন 'উদ্ধার ' পাওয়ার জন্য । কিন্তু কী থেকে উদ্ধার ! আমাদের চারজনের জীবন তো  সুন্দর ছিল ।  ছিল খুশি আর  আনন্দের মিলিত গান। যত মানুষ প্রতিদিন ভক্ত প্রাণের অর্ঘ্য  সাজায় , তারা কি সবাই মানবজীবনের টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত। তা নয় ! তাহলে !
প্রতিটি মানুষ নিজেকেই কি ' তীর্থ ' বলে ভেবে এসেছে ।  যে জায়গায় সে ছুটে যাচ্ছে , তার সৌন্দর্য সে দেখবে , সে গ্রহণ করবে পথের কষ্ট ।  কারণ ঐটুকুই তার জীবনের সম্বল ।  সহিষ্ণুতার পরাকাষ্ঠা হয়ে একসময় দুঃসহ জীবনও  হয়ে উঠবে বিপুল আনন্দের । তখন নিজের হৃদয় পদ্মকেই বারবার প্রণাম জানাবে কাদা আর কাঁটায় ঘেরা লতাগুল্মময় পদযুগল । সেই উদ্ধারের আশায় বসে আছে চির যুগের ধর্মপ্রাণ মানব - মানবী।

   

ছবি : বিধান দেব

ধারাবাহিক গদ্য । । অরিন্দম রায়


 ভিনদেশি তারা



টাগ ডাম্বলি

আসল নাম জিওফ ফরেস্টার , লেখেন টাগ ডাম্বলি এই ছদ্মনামে । জন্ম ১৯৬৫ সালের ১৮জুন , অস্ট্রেলিয়ায়।  তিনি সুরকার , গায়ক , কমেডিয়ান এবং কবি । তাঁকে বলা হয় “Australia’s godfather of spoken word’ । একটি গদ্যে তিনি বলেছেন কবিতা কখনই আর ‘বিশাল’ বা ‘বড়ো’ হবে না। হয়ত কোন একজন বিশেষ কবি মিডিয়ার বদান্যতায় একটু বেশি আলো পাবেন , তাঁকে মনে হবে খুব বড়ো কেউ একজন , কিন্তু ‘কবিতার ইন্ডাস্ট্রি’ জাতীয় কিছু গড়ে ওঠার সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতেও নেই। কারণ কবিতা কখনই ‘পপ’ , টিভি , অথবা ফিল্ম বা থিয়েটার এমনকি স্ট্যান্ড আপ কমেডির মতো জনপ্রিয় হবে না । সেই ৪০এর দশকে জর্জ অরওয়েল তাঁর Poetry and the Microphne  প্রবন্ধে লিখেছিলেন যে , সব শিল্পের মধ্যে কবিতাকেই সবচেয়ে কম কৃতিত্ব দেওয়া হয়। টাগ আরও বলছেন , কবিতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি যোগাযোগ যত কমে আসছে ততই তাঁদের কাছে কবিতা একটা ভণ্ডামি আর দুর্বোধ্য ব্যাপার হিসেবে প্রতিপন্ন হচ্ছে। আরও বেশি সংখ্যক শ্রোতার কাছে , পাঠকের কাছে কবিতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য টাগ চাইছেন কবিরা নিজেদের লেখা নিজেরাই পড়ুন। প্রয়োজনে মঞ্চ বনাম পাঠ এর দীর্ঘকালীন লড়াই দূরে সরিয়ে মাল্টিমিডিয়ার সাহায্য নিতে বলছেন তিনি। যদিও টাগ জানেন মঞ্চের পড়ার কবিতা ( পারফরমেন্স পোয়েট্রি ) আর বইয়ে মুদ্রিত কেবলমাত্র পড়ার কবিতার মধ্যে ফারাক থেকেই যায় । কখনো কখনো তারা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলেও দুটির ক্ষেত্র মূলত আলাদা।এমন কোনো বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত বলেও টাগ মনে করেন না । তবে পারফরমেন্স পোয়েট্রি আর সাবেক কবিতাপাঠের ধারা দুটিকে পরস্পরের মধ্যে লড়িয়ে দিলে একটা ভ্রান্ত ডাইকোটোমি তৈরি হয়। এটা অনেকটা  বাস্কেটবল টিমের সঙ্গে ক্রিকেট টিমকে লড়িয়ে দেওয়ার মতো ব্যাপার হয়ে যায় । বরং তিনি বলছেন একে অপরের হাত ধরে চলার কথা। যাতে পোক্ত হয় কবিতার ভিত্তিভূমি।

 

গুবরে পোকা

ছোটবেলায় আমি একটা গুবরে পোকাকে ছিঁড়েছিলাম

একটু একটু করে

কোথা থেকে তার ঐ টিকটিক আওয়াজটা আসে শুধু সেটা দেখার জন্য

খুঁজে পেতে চেয়েছিলাম ঐ রহস্যময় আওয়াজের উৎসস্থল।

আমি ওর দেহের অংশগুলো আলাদা করেছিলাম একেবারে নিয়ম মেনে

গাড়ি সারাইয়ের মিস্ত্রির মতো ___

ডানাগুলো , শুঁড়গুলো , মাথাটা …

কিন্তু তারপর আমি ভুলে গেছিলাম

কিভাবে এগুলো জোড়া লাগাতে হয়।

 

প্রথম থেকে শেষ অব্দি ওটা নড়াচড়া থামায়নি

একখানা

পা

ঝাঁকিয়েই যাচ্ছিল।

 

ততক্ষণে রহস্য পালিয়ে গেছে।

 

 

 

 

 

হলিউডে কেরিয়ার গড়ার নিখুঁত চিত্রনাট্য

দৃশ্য ১ : শৈশব

বিবর্ণ শহরে ভাঙাচোরা বাড়ি

পাগল মা , মাতাল বাবা।

বহিরাগত , একা , পরাজিত , খাপছাড়া ,

নিগৃহীত , যাকে সবাই ভুল বোঝে

কোনো বন্ধু নেই , আত্মবিশ্বাস তলানিতে ।

বাবা-মাকে ঘৃণা করে , ভাইবোনদেরও

স্কুল এবং কতৃপক্ষকেও ।

অপরাধ করা

সংশোধনাগারে ঠাঁই

ধর্ষকামী প্রহরী , ধোলাই , অত্যাচার।

 

দৃশ্য ২ : প্রথম সুযোগ

সংশোধনাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর

কাজ খোঁজার কানাগলিতে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো।

দুটো বিকল্প : হয় পাগল হয়ে গিয়ে

সেমি-অটোমেটিক মেশিন গান নিয়ে শপিং মল তছনছ করা

অথবা কোনো ধূলিধূসরিত ছোট শহরের পেট্রল পাম্পে

প্রতিভার সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো ব্যক্তির চোখে পড়ে যাওয়া

তারপর ফিল্ম স্টার আর পাগল হয়ে

শপিং মলে তছনছ করা

হাতে সেমি-অটোমেটিক মেশিন গান ।

সৌভাগ্যক্রমে দ্বিতীয়টাই ঘটে ।

দৃশ্য ৩ : খ্যাতি

তোষামোদ , প্রশংসা

সমালোচকদের প্রশস্তি ।

নতুন ব্র্যান্ডো , টিনএজারদের নতুন স্বপ্নের নায়ক

লিমুজিন এ স্বপ্নদোষ ।

চকচকে পার্টি , পাপারাৎজি

অস্কারে নমিনেশান , পরিচালকের চোখের মণি।

অ্যান্টিক গাড়ির সংগ্রাহক আর সুপারমডেলের প্রেমিক

ম্যাডোনার বন্ধু।  

 

দৃশ্য ৪ : ঘেঁটে ফেলা

মদ , অহং , কোকেন , মাথায় গণ্ডগোল

মোসাহেবের দল আর বহুমূল্য বেশ্যারা।

বদমেজাজ , সস্তার হোটেল

রেস্টুরেন্টে গোলমাল পাকানো

ফোটোগ্রাফারের মুখে ঘুঁষি মারা

সেট-এ মদ্যপ অবস্থায় পৌঁছানো।

স্ক্রিপ্ট এর বিরুদ্ধে ভেটো দেওয়া , নিজের এজেন্টকে ঘাড়ধাক্কা দেওয়া

পরিচালককে কাজ থেকে তাড়ানো।

মাতাল হয়ে গাড়ি চালানো -ড্রাগ-অ্যারেস্ট হওয়া

মারপিট , অ্যারেস্ট হওয়া

দুঃখ ভুলতে নাইটক্লাবের বাথরুমে রাত কাটানো

গসিপ কলাম , কুখ্যাতি অর্জন।  

 

দৃশ্য ৫ : মুক্তি

নর্দমা দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া কেরিয়ারের

নাম কাদা

কেউ তোমাকে ছোঁবে না

জীবনের সর্বনিম্ন ভাটা।

আসক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু।

নিজেকে পরিষ্কার করা

বৌদ্ধধর্মের আশ্রয় নেওয়া , ভেগানিজম ,

থেরাপিস্ট , অপমানিত হওয়া , আর

বউ আর পরিবারের প্রতি মিষ্টি ভালোবাসাকে

বুঝতে শেখা।

বিকলাঙ্গ শিশুদের জন্য দানধ্যানে মন

পারিবারিক সিনেমা তৈরি করা।

 

দৃশ্য ৬ : চূড়ান্ত বিজয়

পারিবারিক সিনেমাটি সুপারহিট হল।

অপরাহ-র শো এ নতুন বইয়ের প্রচারে উপস্থিত:

নেশামুক্তি এবং নিরাময়ের শুরু

নিম্নলিখিত বক্তব্যগুলি রাখলেন :

খ্যাতি একটি দুধারি তলোয়ার।

অন্যকে আঘাত করে আপনি আসলে নিজেকেই আহত করেন।

নিজের নিজেকে আরও ভালবাসতে শেখা উচিত।  

অপরাহ আপনাকে নায়ক বললেন।

দর্শক আপনার সাহসের প্রশংসা করল

আপনি বিনয়ের অবতার সেজে একটা হতভম্ব ভাব ফুটিয়ে তুললেন মুখে , বোঝালেন আপনি কতটা কৃতজ্ঞ।

অপরাহ আপনাকে আলিজ্ঞন করতে উঠে দাঁড়ালেন

আপনার স্ত্রী এবং সন্তানেরা আপনাকে অবাক করে দিয়ে মঞ্চে উপস্থিত হল

দর্শক উঠে দাঁড়াল , চিৎকার , কান্নাকাটি , এবং

হাততালি।

হাততালি আপনার পুনর্জন্মের জন্ম

হাততালি আপনার নেশামুক্তির জন্য

হাততালি আপনার মনের জোর , সাহসের জন্য

হাততালি মিলনাত্মক সমাপ্তির জয়ের জন্য

হাততালি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়ের জন্য

হাততালি আরও এক নায়কের সৃষ্টির জন্য

হাততালি অপরাহ-র জন্য

হাততালি বাণিজ্যের জন্য

হাততালি নিজেদের জন্য হাততালি নিজেদের জন্য

হাততালি নিজেদের নিজেদের জন্য হাততালি।

 

অর্কেস্ট্রায় বেজে ওঠে নিশ্চিত জীবনের ক্রিসেন্ডো

কুশীলবদের নাম ভেসে চলে

সমাপ্ত। 

ধারাবাহিক গদ্য ।। চন্দন মিত্র


  

জন্মের আগের মুখ জেন তত্ত্ব ও জেন গল্পের অমায়িক ভুবন     

 

তৃতীয় আচার্য সেং ৎসান এক ভুবনবিলাসী ভবঘুরে     

তার ভাবনা ছিল এরকম, সংসারে আপাদমস্তক জড়িয়ে পড়ার অর্থ রোগব্যাধি, শোকতাপ, দুঃখ দুর্দশা ইত্যাদিকে  সাদর আমন্ত্রণ জানানো। মোটের উপর সংসার তার কাছে দুঃখের আখড়া হিসাবেই প্রতিভাত হয়েছিল। সংসার সম্পর্কিত এই নেতিবাচক ধারণাই তাকে এক অনিকেত জীবনের অনিশ্চিত পথে ছুটিয়ে নিয়ে গেছে। জনৈক  অজ্ঞাতকুলশীল ভবঘুরে হিসাবেই সে জীবনটা কাটিয়ে দিতে চেয়েছিল। যথার্থ পরিব্রাজকের মতো নির্মোহ মন নিয়ে সে পদব্রজে ঘুরে বেড়িয়েছে, কোথাও শিকড় চারাতে দেয়নি। থিতুও হয়নি কোথাও। কখনও প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে থেকেছে দিনের পর দিন। প্রাণধারণের রসদ ও প্রাণের আরাম দুটোই জুগিয়েছে মাতৃস্বরূপা প্রকৃতি।  কখনও মানুষের সঙ্গ করে বুঝে নিতে চেয়েছে মানবচরিত্রের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি। সাধ্যমতো মানুষের পাশে দাঁড়াতে সে কখনও পিছপা হয়নি। আকস্মিকভাবে তার জীবনে নেমে আসে এক দুরপনেয় বিপর্যয়। একদিন সকালে জেগে উঠে সে দেখে শরীরের বিভিন্ন স্থানে কিছু ক্ষত তৈরি হয়েছে। কয়েকদিন ধরে সে সারা দেহে ব্যথা অনুভব করছিল। আজ বুঝল সেই যন্ত্রণাই ছিল এই বীভৎস রোগের উপসর্গ। কয়েকদিন সে নিজের জানা ভেষজের সাহায্যে ক্ষত নিরাময়ের চেষ্টা চালায়। কিন্তু কোনও লাভ হয় না। চিকিৎসকেরা তাকে ফিরিয়ে দেন। বিজ্ঞেরা শোনান এ তার পাপের ফল; এর নিরাময় অসম্ভব। কৃতকর্মের খোঁজে সে অতীতচারণা শুরু করে। না, এমন কোনও গুরুতর অপরাধের কথাও মনে পড়ে না, যাকে পাপ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। হতে পারে তার  স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করছে ? অথবা এমনও হতে পারে সে হয়তো পূর্বজন্মের পাপের ফল এজন্মে ভুগছে। তবে বছর কয়েক আগের একটা ঘটনার কথা তার বেশ মনে পড়ে। কোনও একটা গ্রামে ঢোকার রাস্তার ধারে একটা  অসুস্থ লোক পড়েছিল। সে তাকে সেবা শুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছিল। লোকটির সর্বাঙ্গে ছিল দগদগে ঘা। সে আর ভাবতে চায় না, ভাবতে গেলে সেই নিরীহ  অসহায় লোকটিকেই দায়ী করতে হয় তার এই ভয়ানক রোগের জন্য। শেষমেশ অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, সে নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করে। মানুষের সংস্পর্শ এড়ানোর জন্য সে আশ্রয় নেয় ইয়াংসি নদীছোঁয়া হুয়ানগং পর্বতের এক নিভৃত অরণ্যে।

      খ্রিস্টীয় হিসাবে তখন পৃথিবীতে চলছে ৫৩৬ অব্দ ; তার বয়স তখন চল্লিশ পেরিয়েছে। সে ধরেই নিয়েছে দুর্বহ জীবন থেকে তার আর মুক্তি নেই, এখন কেবল নিভৃতে বসে সর্বরোগহর মৃত্যুর প্রতীক্ষা করা ছাড়া তার অন্য কোনও উপায় নেই। একদিন আপনমনে ঘুরতে ঘুরতে সে জঙ্গলের গভীরে ঢুকে পড়ে। আর আশ্চর্য হয়ে দেখে একটি প্রাচীন গাছের তলায় পাথরের উপর বসে আছেন একজন সন্ন্যাসী। তাঁর বাম হাতখানা কনুইয়ের নীচ থেকে কাটা। সন্ন্যাসীর সামনে বসে আছেন কয়েকজন মানুষ। গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে সে। একসময় সে সন্ন্যাসীকে একা পেয়ে যায়। সন্ন্যাসীর বেদীর সামনে সে নতজানু হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে 

প্রভু, আমি এক ভয়ানক রোগে আক্রান্ত আমি জানি এ আমার পাপের ফল। আপনি পাপ থেকে মুক্ত করে আমাকে বাঁচান।

সন্ন্যাসী— দাও, তোমার পাপটুকু আমার হাতে তুলে দাও।

ভবঘুরে যুবকটি তখন ডুবুরির মতো মনের অথই গভীরে ডুব দিয়ে পাপের পাঁক তুলে আনতে যারপরনাই সচেষ্ট হয় তার আশা এইবার সে পাপের দুর্বহ ভার মাথা থেকে নামিয়ে ফেলতে পারবে। সন্ন্যাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার চোখে জল চিকচিক করে ওঠে। কিন্তু  নিরবচ্ছিন্ন  অনুসন্ধান শেষে কোথাও সে পাপের লেশমাত্র খুঁজে পায় না।  হতাশ হয়ে সে জানায়    

আমি তো কোথাও পাপের খোঁজ পেলাম না।

সন্ন্যাসী  আমি তোমার পাপ দূর করে দিয়েছি। তুমি নতুন জীবন লাভ করলে। এখন থেকে তুমি বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের অনুসারী হলে।

ভবঘুরে  এটা বুঝেছি যে, আপনার মতো আরও অনেককে নিয়ে সংঘ গড়ে ওঠে। কিন্তু বুদ্ধ ও ধর্ম কী তা তো আমি জানি  না !  

সন্ন্যাসী  মনই বুদ্ধ, মনই ধর্ম ; ধর্ম ও বুদ্ধ একই , সংঘও আসলে তাই।

ভবঘুরে  এখন বুঝলাম যে, পাপ আমার ভিতরে নেই বাইরেও নেই; আবার এই দুইয়ের মাঝেও নেই। মনই সব, যা বুদ্ধ  তাইই ধর্ম। 

       পাঠক, আপনি নিশ্চয় এতক্ষণে বুঝে গেছেন, এই হাতকাটা সন্ন্যাসী আসলে দ্বিতীয় আচার্য হুই-কে। তিনি প্রতিষ্ঠান বিরোধী মতাদর্শ প্রচারের জন্য রাজন্যবর্গ ও ধর্মজীবীদের চক্রান্তের শিকার হয়ে আত্মরক্ষার জন্য এদু নগর ত্যাগ করে হুয়ানগং পর্বতের গোপন ডেরায় অবস্থান করছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, হুই-কে এতদিন নাগরিক জীবনে থেকেও এমন কাউকে পাননি যার হাতে গুরু বোধিধর্ম প্রদত্ত অমূল্য জ্ঞানবর্তিকাটি ভরসা করে তুলে দেওয়া যায়। আর আজ তিনি পেলেন এমন এক অজ্ঞাতকুলশীল রোগজর্জর ব্যক্তিকে যার বোধের গভীরতা তাঁকে মুগ্ধ করেছে। এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার আভাস তিনি পাচ্ছেন। তাঁর মনে হচ্ছে এতদিন যে আধারের অন্বেষণে তিনি হন্যে হয়ে ঘুরেছেন মানুষের ভিড়ে, আজ বুঝি সেই অলোকসামান্য নিজেই তাঁর নিকটে এসে মুক্তি-যাচঞা করছে। তিনি নিজের হাতে যত্ন করে তার মস্তকমুণ্ডন করলেন। তারপর তার উদ্দেশ্যে বললেন, আমার কাছে তুমি রত্নস্বরূপ, আমি তোমার নাম দিলাম  সেং ৎসান। নামটির বাংলা করলে দাঁড়াবে, সংঘরত্ন। যে রোগ সেং ৎসান-এর জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল, সেই রোগের অভিশাপ থেকে সে মুক্ত হয়। এমনটা ভাববেন না যেন, হুই-কে গায়ে হাত বুলিয়ে দিতেই সেং ৎসান-এর রোগটা গায়েব হয়ে গিয়েছিল। সিংহভাগ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের শাস্ত্রসমূহের মতো চ্যানপুথি অশ্লীলভাবে অলৌকিকতা ফেরি করেনি। কারণ পয়সা ও প্রতিপত্তি হাসিলের জন্য তাঁরা মতাদর্শ প্রচারে নামেননি। তাঁদের এক ও অদ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল মানবহিত। মুসা-ইশা এমনকি আমাদের চৈতন্যদেবও অলৌকিক উপায়ে রোগ সারিয়ে জগতে কীর্তি রেখে গেছেন। আসলে ধর্মপ্রভুদের জীবনীতে রোগনিরাময়ের অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শিত না-হলে ভক্তরা সেই নির্গুণ প্রভুকে দুয়ো দিয়ে অন্য ধর্ম-দোকানে অন্য সগুণ প্রভুর খোঁজ করবে। তাই পাল্লা দিয়ে প্রত্যেক ধর্মই প্রভুর অলৌকিক কেরামতিতে রোগ-সারানোর বেশ কয়েকটি উপাখ্যান রাখতে ভুল করেনি। তবে আমরা এটাও মনে করি না যে, ধর্মপ্রভুদের রোগনিরাময় ক্ষমতা সম্পর্কে যেসব গল্প ছড়ানো রয়েছে সেগুলির সবই মিথ্যা। আমরা বরং বিপরীত মতটাই পোষণ করি। আমরা মনে করি তাঁরা মানবদেহ সম্পর্কে, দেহের বিভিন্ন ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতেন শুধু তাই নয়, বিবিধ রোগ উপশম ও নিরাময়ের নিদানও তাঁরা ভালোমতো জানতেন। ফলে মৃৎবৎ দেহে প্রাণসঞ্চার, মানসিক ও শারীরিক ব্যাধি থেকে নিষ্কৃতিদানের ঘটনা তাঁদের হাত ধরে ঘটা মোটেও অসম্ভব ছিল না। এই পদ্ধতিতে অনেক ধর্মগুরুই রোগনিরাময়ের মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন তথা অলৌকিক শক্তির প্রচারের দৌলতে ভক্ত সংখ্যা বাড়িয়ে নিয়ে ধর্ম-সম্প্রদায় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার পিছনে এই রোগনিরাময় বিষয়টা একটা গুরুতর ভূমিকা রাখে। মানুষ রোগজর্জর হয়ে পড়লে রোগমুক্তির চিন্তা ছাড়া অন্যান্য চিন্তাগুলি তার কাছে গৌণ তথা মূল্যহীন হয়ে পড়ে। সেই বিপন্নতার সময় তাকে যে আশ্বস্ত করে, নিরাময় দান করে, তাকে তো সে দেবতা জ্ঞান করবেই। এই মানসিক বৈশিষ্ট্য থেকেই ডাক্তারকে ভগবান ভাবার রেওয়াজ তৈরি হয়েছে। আর তাই লোকনিরুক্তিতে ডাক্তার হয়ে উঠেছেন ঈশ্বরগোত্রীয়  ডাক তার অর্থাৎ তাকে ডাক। কেবল সুদূর-অদূর অতীতে নয় বর্তমান সময়েও মানুষের মনের এই ধরণ বদলায়নি। লোকধর্মগুলিতেও আমরা লোকচিকিৎসার প্রসার লক্ষ করি। ভারতবর্ষে সুফিদের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পিছনেও অন্যতম প্রধান ভূমিকা রয়েছে এই রোগনিরাময়ের ঘটনার। ইদানীং বাংলার গ্রামেগঞ্জে গৃহস্থের বাড়িতে বাড়িতে কোথাও পিতা-পরমেশ্বরের নামে, কোথাও জিশুদাদার নামে আসর বসানো হচ্ছে। এইসব আসরে চতুরতার সঙ্গে জিশুকে ব্যবহার করছে একদল স্বার্থান্বেষী। তারা লোকসমাজকে বোঝাচ্ছে, জিশুদাদার ভজনা করলে  নিঃসন্তান সন্তান লাভ করবে, যে-কোনো রোগ সেরে যাবে বিনা ওষুধে। সব থেকে ভয়ংকর বিষয় হল পিতা-পরমেশ্বর বা  জিশুদাদার এইসব প্রচারকরা তাদের অনুসারীদের ডাক্তারি চিকিৎসা নিতে তথা ঔষধ সেবন করা থেকে বিরত হওয়ার প্রাণঘাতী উপদেশও দিয়ে যাচ্ছে অবলীলায়। মানুষ তাদের উপদেশ মেনে চলতে গিয়ে মৃত্যুমুখে পড়েও আস্থা হারাচ্ছে না। একুশ শতকের জ্ঞানবিজ্ঞানচালিত  দুনিয়ায় যদি এমনটা ঘটে, তাহলে আমাদের অতীতের অন্ধকার কতটা নিকষ ছিল তা অনুমান করার জন্য আমরা এই সাম্প্রতিক বিষয়টা উত্থাপন করলাম মাত্র। অন্যান্য ধর্মমতগুলি যেখানে মানুষের অসহায়তাকে  পুঁজি করে তাকে সাম্প্রদায়িক নির্বোধে পর্যবসিত করেছে, সেখানে চ্যান তথা জেন মতাদর্শ তার সীমিত পরিসরে মানুষকে আত্মবিশ্বাসী ও আত্মজ্ঞানী হয়ে ওঠার পথ দেখিয়েছে।

       বোধিধর্ম নিজে ছিলেন বিশিষ্ট ভিষক। তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে হুইকেও চিকিৎসাবিদ্যায় হাত পাকিয়েছিলেন। সেং ৎসান তাঁর চিকিৎসায় ক্রমশ সুস্থ হয়ে ওঠেন। দুবছর হুই-কের ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকে যান তিনি। একদিন হুই-কে তাঁকে ডেকে বলেন  

বোধিধর্ম ভারতবর্ষ থেকে আমাদের দেশে এসেছিলেন। আমাকে তিনি দীক্ষিত করে তাঁর ভিক্ষাভাণ্ড ও চীবর আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আমি প্রতিশ্রুত ছিলাম যথাসময়ে কোনও যোগ্য ব্যক্তির হাতে আমি তাঁর ভিক্ষাভাণ্ড ও চীবর এবং মতাদর্শ তুলে দেব। আজ আমি তোমার হাতেই সেই গুরুভার অর্পণ করছি।

হুই-কে, নতজানু সেং ৎসান-এর হাতে তুলে দেন সযত্নে রাখা ভিক্ষাভাণ্ড ও চীবর। পুনরায় বলতে শুরু করেন 

তুমিও যথাসময়ে যোগ্য ব্যাক্তির হাতে এই ভার ন্যস্ত কোরো। আপাতত কয়েক বছর তুমি নগরে যাবে না; গহন পার্বত্য অরণ্যই তোমার আদর্শ স্থান। কাউকে শিক্ষা বা উপদেশ দিতে যেয়ো না। আসন্ন বিপর্যয় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখাই তোমার কাজ।

সেং ৎসান বলেন  আপনি দয়া করে আসন্ন বিপর্যয় সম্পর্কে আমাকে ধারণা দিন

হুইকে বলেন  আমি তোমাকে সে বিষয়ে অনুমানভিত্তিক কিছুই বলব না। তোমাকেই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে সম্যক বিচারের মাধ্যমে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

          হুইকে নিজেই এদুতে এই রাষ্ট্রিক বিশৃঙ্খলার শিকার হয়ে হুয়ানগং পর্বতের অরণ্যে আত্মগোপন করেছিলেন  চিনে এই বৌদ্ধ-পীড়ন শুরু হয়েছিল অনেক আগে ৪৪৬ খ্রিস্টাব্দে। ওই বছর উত্তর ওয়েই রাজবংশে (Northern Wei)-র   তাওবাদী সম্রাট তাইয়ু (Taiwu) জিওংনু ( Xiongnu) গোষ্ঠীর বিদ্রোহী নেতা গাই-উ(Gai Wu)-কে দমন করতে গিয়ে এক   বৌদ্ধ মঠে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্রের সন্ধান পান। বৌদ্ধমত ও প্রতিষ্ঠান তাঁর শাসনের অন্তরায় হয়ে উঠেছে ভেবে তিনি বিদ্রোহের   উৎপত্তিস্থল গুয়ানঝং অঞ্চলের বৌদ্ধমঠ ও স্থাপত্য ধ্বংসের এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হত্যার নির্দেশ দেন। তাঁর এই নির্দেশের পিছনে বৌদ্ধবিদ্বেষী তাওবাদী অমাত্য কুই হাও (Cui Hao)-এর জোরদার ইন্ধন ছিল। তাইয়ু-র পরে অবশ্য বৌদ্ধধর্মের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হতে থাকে। শেষমেশ ৪৫২ খ্রিস্টাব্দে তাইয়ু-র পৌত্র ওয়েনচেং ( Wenchengসিংহাসনে বসার পরে তা উঠে যায়। দক্ষিণ চিনে বৌদ্ধ-পীড়ন শুরু হয়েছিল বুদ্ধ-অনুরাগী সম্রাট উ(WU)-র মৃত্যুর পর। এই মহানুভব সম্রাটের সঙ্গে ৫২০ খ্রিস্টাব্দে বোধিধর্মের সাক্ষাৎ হয়েছিল, তা আমরা জানি। লিয়াং বংশের এই সম্রাট ৫৪৯ খ্রিস্টাব্দে গৃহবন্দি অবস্থায়  অনাহারে প্রাণ হারান। উ-র পরে সিংহাসনে বসেন তাঁর অন্যতম পুত্র জিয়ানয়েন (Jianwen)। তিনি চিন থেকে তাওবাদ ও বৌদ্ধবাদ দূরীকরণে তৎপর হয়ে ওঠেন। তাঁর নির্দেশে বৌদ্ধ মঠ-সংঘারাম, স্থাপত্য, চিত্রকলা, পুথিপত্র ধ্বংস করে ফেলা হয়। উত্তর ওয়েই রাজবংশের পরে উত্তর চিনের শাসক হয়ে বসে উত্তর ঝউ রাজবংশ (Northern Jhou Dynasty)। এই বংশের সম্রাট উ-দি (Wu Di) জনৈক প্রাক্তন বৌদ্ধ ভদন্তের প্ররোচনায় তাওবাদ ও বৌদ্ধবাদকে মুছে ফেলার জন্য এক আপোষহীন সংগ্রামে নামেন। তিনি বেশ কৌশলী ছিলেন। ৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি কনফুসীয়, তাওবাদী ও বৌদ্ধ পণ্ডিতদের এক বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। উ-দি ছিলেন ঘোরতরভাবে কনফুসীয় আদর্শে বিশ্বাসী। স্বাভাবিকভাবে তাঁর নিযুক্ত বিচারকমণ্ডলীর বিচারে প্রথম স্থান অধিকার করেন কনফুসীয় মতের পণ্ডিতেরা, দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন তাওবাদী পণ্ডিতেরা। আমাদের মনে রাখতে হবে এই দুটি মতেরই উৎপত্তিস্থল চিন। আর বৌদ্ধবাদ সে তো বিদেশাগত মতাদর্শ তাকে তো তিনজনের মধ্যে তৃতীয় হতেই হবে। প্রথমে বদনাম দাও তারপর মারো এক্ষেত্রে উ-দি এই কূটনীতি কাজে লাগিয়েছিলেন। ঠিক এক বছর পরে ৫৭৪-এ রাষ্ট্রীয়ভাবে কনফুসীয় মতবাদ ছাড়া অন্যদুটি মতবাদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এছাড়াও বলা হয়, সরকারি দপ্তরে নথিভুক্ত না-করে জনগণের মধ্যে কোনও মতাদর্শ প্রচার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। মঠ ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসাবে আত্মসাৎ করা হয়। ঐতিহ্যবাহী শাওলিন মঠেও বন্ধের হুকুমনামা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। কনফুসীয় আদর্শে সাংসারিক জীবনকেই শ্রেষ্ঠত্বের তকমা দেওয়া হয়েছে। সে নীতি অনুসরণ করে সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীদের সামাজিক আগাছা হিসাবে চিহ্নিত করে বলপূর্বক সাংসারিক জীবনে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। সেং ৎসান, হুইকে-র নিকট দীক্ষিত হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ সময় জুড়ে চিন দেশে বৌদ্ধ-নিপীড়নের ঘটনার  সাক্ষী থেকেছেন। বুঝতে পেরেছে্ন গুরু হুই-কে কোন বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

      দীক্ষান্তে প্রায় দশ বছর সেং ৎসান পার্বত্য অরণ্যে বাস করেছেন। ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাস যেমন গোপন থাকে না, যার হৃদয়ে সমাজশুদ্ধির আগুন থাকে তাঁর পক্ষে আত্মগোপন অসম্ভব। তবুও সেং ৎসান যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, নিজেকে  আড়ালে রাখতে। সন্ন্যাসীর পোশাক ছেড়ে সাধারণ পোশাকে আত্মপরিচয় গোপন করে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মাঝেমধ্যে ডেরা পালটাতে হয়েছে। তবুও তিনি সংগোপনে উপযুক্ত পাত্র খুঁজে তাতে আদর্শের বীজ বুনে দিয়েছেন। এইভাবে তাঁকে ঘিরে এক গোপন সংঘ গড়ে উঠেছে। তবুও তাঁর খোঁজ এখনও সার্থকতা পায়নি। তাঁকে তো খুঁজে নিতে হবে ঘাতসহ এক অদ্বিতীয় আধার যার উপর ভরসা করে তুলে দেওয়া যায় পরম্পরিত আলোকবর্তিকা। একদা সেং ৎসান লিখে ফেলেন নির্মেদ এক  তত্ত্বকাব্য  সিন-সিন-মিং (Hsing-hsin Ming) যার বাংলা হবে এইরকম, হৃদয়-উৎসারিত-প্রত্যয়। এই কাব্যের ছত্রে ছত্রে বর্ণিত হয়েছে সহজ পথের চলন-রেখা। চ্যান তথা জেন ধারার অনুসারীদের কাছে এই কাব্যটি রেডবুক হিসাবে চর্চিত হয়ে আসছে। যদিও কাব্যটি সেং ৎসান-এর লেখা কিনা এবিষয়ে গবেষকদের মতভেদ লক্ষ করা যায়। ৬০৬ খ্রিস্টাব্দে এই অকৈতব ভবঘুরে একটি মহাদ্রুমের ছায়ায় বসে অম্লান বদনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তখনও তাঁর হাতে ধরা ছিল দীর্ঘদিনের সঙ্গী একটি বৃক্ষশাখা, যে ছিল তাঁর আত্মরক্ষার আয়ুধ ও পাকদণ্ডি-পদচারণার বিঘ্নবিনাশক। বোধিধর্মের হাতেও তো থাকত এমন এক বৃক্ষশাখা।

 তথ্যসূত্র : 

১. DENKOROKU; THE RECORD OF THE TRANSMISSION OF THE LIGHT BY KEIZAN JOKIN ; TRANSLATED BY HUBART NEARMAN, OBC SHOSTA ABBEY PRESS , CALIFORNIA .

২. HISTORY OF ZEN BY YU-HISIU KU; SPRINGER, SINGAPORE.

৩. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF CONFUCIANISM BY RODNE L. TAYLOR AND HOWARD Y. F. CHOY, THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK

THE A TO Z OF BUDDHISM BY CARL OLSON, THE SCARECROW PRESS , UK.

৫. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON.

৬. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK

 

THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK

. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EAST BY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.

 

                             

                                

           

 

ছবি : বিধান দেব 

কবিতা : মজিদ মাহমুদ


 লঙ্কাবি যাত্রা 


গতরাত ছিল দুটি দিনের সন্ধিক্ষণে উল্লম্ব অস্থির

বৃষ্টির মৃদু-আলাপচারিতা যদিও এই ভূখণ্ডের বৈশিষ্ট্য

তবু একই ছাতা দিয়েছিল আমাদের অভিন্ন অবলম্বন

আমরা হেঁটেছিলাম সুতীক্ষ্ণ সুতার উপর

আমরা উঠেছিলাম সর্বোচ্চ উচ্চতায়

তাই কেউ পারেনি ঠেকাতে আমাদের পতন

দ্রæত পতিত হবার কালে খুলে গেল আমাদের দৃশ্যেন্দ্রিয়

দেখতে পেলাম যে বিস্তীর্ণ উদ্যান থেকে আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম

আদিম পৃথিবীর ঝড়ো হাওয়া, অনভ্যস্ত পথচলা

কিংবা একটি সাপের হিস্-হিস্ শব্দে ভড়কে গিয়েছিলাম


অনেক খুঁজেছ তুমি, করেছ অনেক পর্বত আরোহণ

তোমার পায়ের গোছা তাই কাঠগোলাপের মত শক্তসুন্দর

এমনকি বুকের উৎকর্ষে রয়েছে কষ্টের ছাপÑ

তবু মিলনের আকাক্সক্ষা এতটুকু ¤øান করেনি

আর আমি, একই পথে হেঁটে হেঁটে ন্যুব্জ-ক্লান্ত

পেশীগুলো শিথিল হয়ে পড়ছে, হারিয়ে ফেলছি গ্রহণের ক্ষমতা  


হয়তো অন্বেষণকালে আমাদের বহুবার হয়েছে দেখা

হয়তো কদাচিৎ চিনতে পেরেছি

তবু অসংখ্য প্রবঞ্চনা আমাদের মিলতে দেয়নি

যে-সব দুষ্ট দেবতা আটকে দিয়েছিল আমাদের লঙ্কাবি যাত্রা

তাদের ইচ্ছের কাছে যদিও আমরা সমর্পিত

তবু আমাদের মিলনের আনন্দে তাদেরও রয়েছে ভাগ

কেননা তারাই তো দিয়েছে আমাদের 

বিচ্ছেদের দীর্ঘতার আনন্দ! 




কেউ আছে 


যে শুনছে আমার কবিতা সে আছে

যে লিখছে আমার কবিতা সে আছে

ঘুম ও স্বপ্নের মধ্যে যে নদী পার হয়

অন্ধকার গলির মাথায় যে অপেক্ষায়

আমি তো তার কাছে যাব

যারা বলে কেউ নাই

তারা আমার অস্তিত্বের বিপরীতে থাকে

অনেক লিঙ্গান্তরের ভিড়ে আমি যাকে

হারিয়ে ফেলেছিলাম

হয়তো উপযুক্ত ছিলাম না পাহাড়ি খাড়ায়

তবু গিরিখাত ধরে এতদূর এসেছি

উপত্যাকায় করেছি চাষ

তাই বলে পর্বত চিনি না!

যে ঘুমিয়ে আছে তাকে ঘুমাতে দাও

যারা জেগে আছে গভীর তমশায়

কেউ আছে জেগে নিশ্চয়

তাই আমি জাগতে পেরেছি।




প্রত্নপথের সন্ধানে


যদিও আমরা সকলেই করেছিলাম একটি

গুপ্ত পথের অনুসন্ধান

তবু প্রত্যেকের যাচ্ঞা ছিল গোপন 

আমারা যখন কিছুটা অংশ হারিয়ে ফেলেছিলাম

আমরা যখন পরষ্পর মুখোমুখি

তুমি তখন কপাল থেকে মুছে দিচ্ছিলে ঘাম

সরিয়ে নিচ্ছিলে অবাধ্য চুলগুলো

আমরা যখন গভীর মমতায় গলে পড়ছিলাম

যখন আমাদের পবিত্র চিন্তাগুলো

শারীরের প্রমূর্তি হয়ে গেয়ে উঠছিল আনন্দস্তুতি

এই পথেই তো আমরা উদ্যানে হেঁটে বেড়াতাম

প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে রয়েছে এসব পথের অনুপুঙ্খ বয়ান

এ পথ হারিয়ে গিয়েছিল প্রতœ-স্মৃতির ভেতর

নৃতত্তে¡র শিক্ষকগণ এখনো তাদের ছাত্রীদের

যে মাতৃতান্ত্রিক বপন ক্রিয়ার কথা বলেনÑ

এ তো সেই পথ

এই তো আমাদের শোষণমুক্ত সমাজ

এ পথ পুনরায় হারিয়ে যাওয়ার আগে

আমাদের কি উচিত নয়

যারা দিকভ্রান্ত এখনো দিনান্তে ফুরিয়ে যায়

তাদের লুপ্ত পথটুকু পথের সাথে

পুনরায় মিলিয়ে দেয়া!




দুঃখ 


সব ভালো কবিতা দুখীদের অধিকারে

কবিতা লিখতে গেলে যেমন কিছুটা দুঃখ লাগে

পড়তে গেলেও কিছুটা দুঃখের প্রয়োজন

প্রাপ্তি যার কানায় কানায় সে যাবে সমুদ্র বিলাসে

রাজ্য শাসনে তুমি তুষ্ট

স্ত্রীর পঞ্চ ব্যঞ্জনে তুলছ ঢেকুর

সন্তানের সাফল্যে প্রতিবেশি ঈর্ষানিত

মদ ও মাংসের যাচঞা হয়েছে পুরণ

তোমার জন্য তো কবিতা নয়

দু’একটা পদ্য হয়তো রয়েছে কোথাও

পৃথিবীর সকল সুখী মানুষের কবিতা একটাই

তাই তুমি বলতে পার- কবিতা কেমন হবে

কিন্তু প্রতিটি দুঃখের রয়েছে আলাদা রঙ 

এমনকি গতকালের দুঃখগুলোর সঙ্গে

আজকের দুঃখের নেই মিল

বোনের দুঃখ ভাইয়ের দুঃখ

বাবা ও মায়ের দুঃখ একই পরিবারভুক্ত নয়

দুঃখের বাস মানুষের সৃষ্টি চেতনায়

দুঃখের কোনো বাবা নাই

এমনকি যে তোমাকে দুঃখ দিয়েছে

তারও রয়েছে নিজস্ব দুঃখ

প্লাথ ও উলফের দুঃখ কি অগ্নিজলে নির্বাপিত হয়েছিল

পো ও হেমিংওয়ের দুঃখও তো হয়নি জানা

ট্রামেকাটা দুঃখ, নীরবতার দুঃখও সয়েছেন কবিরা

দুঃখই তো কবির বাড়ি ফেরার পথ


ছবি : বিধান দেব 




কবিতা : সুরজিৎ প্রামাণিক


 দীর্ঘশ্বাস


যে পাথর জলের অতল থেকে মাটিতে দীর্ঘশ্বাস রাখতে চায়

আদিম শ্যাওলারা তার বুকে গিট বেঁধে রাখে

ছন্দপতনের ইশারা হাতে নিয়েও ডানা মেলছে পরীরা


সূর্যাস্ত হল, রাত্রিও গভীর, আমি নক্ষত্রের নদীতে

ডুব দেওয়ার আগেই অনিবার্য রাত্রির কাছে তুমি মোহগ্রস্ত কর আমাকে...


আমি স্বপ্নের নদীতে ভাসি আর কল্পনার আকাশ রামধনু এঁকে দেয়

কারণ নক্ষত্র হাতের মুঠোয় নিয়ে বিষ পান করা কঠিন

বিষধর সাপ যেদিকে ফনা তোলে, তার উল্টো দিকেই

আমার গোপন অভিপ্রায় গুলো রাখা আছে...


দীর্ঘকাল তোমাকে নিয়ে সবুজ পাতার মতো প্রেমিক হতে চাই


শূন্য ১


কাদা ঘাঁটি অশৌচ হয়ে যায় স্ত্রী পরিবার 

ফনিমনসায় গেঁথেছি ধর্ম গ্রামীণ লোকাচার ছাড়িয়ে তুমি

নদীর মতো একটা জীবন চেয়েছ

আমাদের অস্তিত্বের সাঁকো ভেঙে গেলে ব্যাধির পরিখা প্রস্তুত

তখনও পাখিরা আসে পদাবলীর সুর ঠোঁটে নিয়ে


আমি বৈষ্ণব নই তোমাকেও বৈষ্ণবী হতে বলিনি কখনও

জলরং আঁকা দেওয়ালে রাজনীতি সহযোদ্ধার মুখ আরও বেশি টাটকা হয়

বহুগামী হতে দেরি নেই যাদের তারা গিরগিটি হতে বলে নির্ঘাৎ

স্মৃতির মাদুরে তখন আমরা বসে কাঠঠোকরার মতো মুখোমুখি কথা বলি

আমাদের অবাধ্য প্রেমের ভাষা আয়ত্ত করে দু' একটা দুরন্ত ইঁদুর

আর অনায়াসে তুমিও পেরিয়ে যাও ব্যস্ত নদীটি বৈধ পুর্নিমার গানে, অবগাহনে


এবার ধারণের মন্ত্রে বুঁদ হতে হবে আমাদের 

আমাদের পৌঁছাতে হবে সম্বোধনহীন ভালোবাসায় শৈশবে

নদীতো উদ্দেশ্যবিহীন সংক্রমিত

তুমিটিও সৃষ্টির নিরুপম শূণ্যতায় স্পর্ধাহীন


 শূন্য ২


তুমি আলতায় দু'পা চুবিয়ে নিলে, আমি বেশ মনোযোগী হয়ে উঠি

বিচ্ছিন্ন ছায়াযুদ্ধে গভীর হয়ে থাকে শব্দের অভিধান


আমি আর ঈশ্বরকে ডাকিনা নক্ষত্র সামলে নিয়ে দেখেছি

দু'চোখে ভিক্ষার আলো বড়ো ভয়ঙ্কর

তুমি তো জানো সর্বনাশের ধর্ম হয় না কখনও

দুঃখের কান্না আমাদের পাঁজর জুরে আছে


গান স্পষ্টত থেমে যায় একদিন অনন্ত ভাঙনের অভিমুখে

দূরত্বের কাছাকাছি অংশত আলো আত্মায় প্রাণ এনে দেয়

সরল প্রস্থানে কাটছে না সময় প্রকৃতির আত্মমগ্ন ইশারায়

আমরা নির্বিরোধ

কারণ অদৃশ্য হওয়া তো সহজ কথা নয়


পথ


অকারণে তুমি যখন দুঃখ দাও আমার মুদ্রাদোষে আমি হেসে ফেলি

তখন অসময়ে বৃষ্টি নামে নিঃশব্দ পথের উপর

বন্ধুরা সবাই এগিয়ে যায় কেবল পড়ে থাকি আমি আর একটি ক্লান্ত ব্যাঙ


মেঘমেদুরতায় পিছিয়ে পড়েছি অনেক এখন তুমি বলো নির্ঘাৎ বিষাদ সাজিয়ে রাখলেই কি ভালোবাসা যায়!

চাকা তো সচল, প্রেক্ষিত শাস্ত্রসম্মত, তবু দহনগাথা আমাকে পুড়িয়ে কঠিন পাথরের মতো করেছে আমারই বিষন্ন জন্মদিনে


শুধু শ্রদ্ধাটুকু রেখে আমার বাকি সব নিয়ে নিতে পারো

থমথমে আকাশে ধূসর স্বরলিপি ভাসছে

আর নির্মম বিষন্নতা কাটিয়ে দিচ্ছে আমার ধ্রুব মৃত্যু


ছবি : বিধান দেব 

কবিতা : অবশেষ দাস


 মারাদোনা



মারাদোনা হাতেগোনা

ফুটবল গ্রহে

বিরোধীরা কুপোকাত

তার বিদ্রোহে।

মারাদোনা মারাদোনা

লাট্টুর গতি

আমাদের ইতিহাসে

ফুটবল পতি।


মারাদোনা তুলোধোনা

সব দেশ কাঁপে

তার পাশে কেউ নেই

ফুটবল ম্যাপে।


রাজকীয় খেলোয়াড়

খেলা তার ধ্যান

তার কাছে ফুটবল

সাধারণ জ্ঞান।

মাঠে মাঠে ঝড় তোলা

গ্যালারিতে ঝড়

তাকে দেখে বিরোধীর

বুক ধড়ফড়।


ফুটবলে শেষ কথা

পায়ে ঝরে সোনা

সকলের আদরের

তিনি মারাদোনা।


মারাদোনা মারাদোনা

ইতিহাস জুড়ে

তিনি আজ খেলা ফেলে

গিয়েছেন দূরে।


মারাদোনা ভালো থেকো

ফুটবল কাঁদে

তোমার জন্য কবি

কত ছড়া বাঁধে।


মারাদোনা পূজনীয়

দর্শক বলে

তুমি ছিলে তুমি আছো

মানুষের দলে।


শঙ্খধ্বনি


দোষ দিয়েছে বর্বরে

সমাজ বড়ো নড়বড়ে।


বিবেক মরে দংশনে

বাক্স বদল জংশনে।


ইতিহাসে জ্বলজ্বলে

শিক্ষিতরা কোন্ দলে।


চাপ দিয়েছে ছাড়বি দল

মানুষ যেন বার্বি ডল।


দূষণ বেড়ে হয়রানি

স্বপ্নে দেখি ছয় রাণী।


ফুল ফুটেছে চারদিকে

আঙুল তোলে কার দিকে।


মেঘ জমেছে বিষ্টি দিন

জন্মদিনের মিষ্টি নিন।


তোমরা তো খাও। তার বেলা ?

গরীব খাবে চারবেলা।


আমরা জানি, কমবেশি

বড়লোকের দমবেশি।


জীবন বড়োই অঙ্কময়

বাংলা ভাষা শঙ্খময়।


জল থৈ থৈ শব্দকোষ

হৃদয় জুড়ে শঙ্খ ঘোষ।


 আপনজনের মুখে


মেঘের ওপর মেঘ করেছে, রোদ ম্রিয়মাণ অতি

বুড়ো গাছের নতুন পাতা ছড়াচ্ছে সংহতি।

পাড়াগাঁয়ের খবরা-খবর একই রকম আছে

প্রতিবেশীর হিংসা বিবাদ কেউটে হয়ে নাচে।

চালের অভাব জলের অভাব অভাব ষোল আনা

ক্রমে ক্রমে ঊর্ধ্বমুখী কোভিড দিচ্ছে হানা।

সব খুলে যায়, সব ভুলে যায়, শবের গড়াগড়ি

ভ্রূক্ষেপহীন জনসমাজ ভাইরাস ছড়াছড়ি।

এক ছোবলে বিধ্বস্ত আর এক আসছে তেড়ে

মহামারীর দুর্দিনে আজ কে দেবে ভাত বেড়ে ।

দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা আসে ওষ্ঠাগত ভয়ে

একটা জাতির জীবন কাটে সংশয়ে সংশয়ে।

মেঘের ওপর মেঘ করেছে, রোদ গিয়েছে নেমে

সবার বাড়ি চিড়িয়াখানা, সবাই কেমন থেমে।

সামনে আসছে আরোগ্য লাভ , প্রতিশ্রুতি বুকে

নতুন দিনের নতুন কথা আপনজনের মুখে।


জল বেহালা 


সুখ লিখেছি শোকের গায়ে 

শোক লিখেছি সুখে

এমন ধারাপাতের কথা 

সবার মুখে মুখে।


রাম চলে যায় নাম থেকে যায় 

বনবাস তো রামের

চোদ্দ বছর কেটেই গেল

কী হল তা নামের !


শোকের নামে লোকের ভয়

জোঁকের তো ভয় নুনে

তোমার জন্যে সারাজীবন 

রাখছি গুনে গুনে !


শোক লিখেছি রোদের ওপর

সুখ লিখেছি জলে

জলের ওপর রোদের চুমো 

শোক বেশি জ্বলজ্বলে !


সুখের কাছে তোমার থাকা

শোকের কাছে আমি

তোমার আমার জল বেহালা 

বাজান অন্তর্যামী।


ছবি : বিধান দেব 

বুধবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২১

কবিতা : মলয় পাহাড়ি


 


১.


দাস বিদ্রোহ


রাজবাড়ির পা ধোয়া জল 

নদীতে এসে পড়ে


নদীতো অনুদাস

 চরণ নাকি অ-মৃত বুকে

বর্ষাকে অক্ষর পাঠায়


বন্যায় ভেসে যায় রাজার মহল

বন্যায় ?  নাকি দাসবিদ্রোহে !


২.

একটাই গামলা


আমরা সবাই এসে যে যার পোশাক

চোবাচ্ছি। যে যার পছন্দের রঙ হয়ে যাচ্ছে পোশাক


তুমি দেখছ লীলা, অলৌকিক

আমি জানি ওটা ক্ষয়


৩.

চিকেন রেজালা


আজ মেয়ের জন্মদিন।


 খুঁটিনাটি তুলে নিচ্ছি বাজার থেকে

নিজের হাতে সাইজ করেছি দেশি চিকেন


মেয়ের কাছে আমি আজ ধবধবে চিকেন রেজালা

মুরগিটার মেয়ের কাছেও



ছবি : বিধান দেব