শুক্রবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২১

কাব্যগ্রন্থ আলোচনা : জিৎ পাল




 

ইঙ্গিতপূর্ণ উপস্থাপন, নিজস্ব আলো                অন্ধকার অর্জনের প্রচেষ্টা

                                          

যে কোনো তরুণ কবির কাব্যগ্রন্থ হাতে নিলে এক ধরণের প্রত্যাশা জন্মায় । হয়ত নতুন কোনো উচ্চারণ নতুন কোনো কাব্যাশ্রিত  মন  ও  মননের বিচ্ছুরণে আলোকিত হবে কবিতাপ্রাঙ্গন। বাস্তবে এমনটা খুব স্বল্পই ঘটে । তবু প্রত্যাশা নিয়ে আবার নতুন কোনো কাব্যগ্রন্থ পাঠ। শূন্য  দশক এক শক্তিশালী ও বৈচিত্রময় দশক। কারো কারো কবিতায় পূর্ববর্তী দশকগুলির কোনো কোনো খ্যাত কবির সামান্যতম আলোছায়া চুঁইয়ে এলেও , দ্রুততার সঙ্গে মিলিয়ে যায় । প্রতিভাত হতে থাকে নিজস্ব আলো অন্ধকার অর্জনের প্রচেষ্টা। নিজকীয়তা। 
দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায়ের " আঙুরভাব শেয়ালভাব" কাব্যগ্রন্থটি পড়তে পড়তে বারবার মনে কিছুটা বিষ্ময়ের বুদ্বুদ তৈরি হয়েছে। ক্রমশ প্রবেশ করেছি তার সম্মোহিত পংক্তিপ্লাবনে। বিষ্ময়ের জলবিম্ব তৈরি হয়েছে কারণ , একজন তরুণ কবির  এতটা প্রস্তুতি, এতখানি ঋদ্ধি অর্জন , সচরাচর নজরে পড়ে না।  

" দু-চারটে গাছ এখানে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে নেশা করে 
দুরকম মদ -- ছায়া আর রোদ ভাঁড়ে ঢেলে নিয়ে খায় 
উদোম মাতাল দু-চারটে গাছ এখানেই জুয়া খেলে 
খেলায় যে জেতে -- তারই মাথায় সূর্য অস্ত যায়"

 'পশ্চিম' নামের এই চার লাইনের কবিতাটি পড়লেই যে কোনো কবিতাপাঠক বুঝতে পারবেন , এই কবির  বীক্ষণ  একটু অন্যরূপ। দুচারটে গাছের কথার অন্তরালে পারিপার্শ্বিক ছবির এক ইঙ্গিতপূর্ণ উপস্থাপন। এরকম আরো একটি কবিতা হলো 
' একটি গাছের জন্য'।

একটা গাছের মা বাবা কেউই নেই 
কাঠবিড়ালিই দেখেশোনে -- সে তো পিসি 
মাসি শুঁয়োপোকা মাঝে মাঝে ঘুরে যায় 
দুপুরের দিকে কাকা বাঁদরেরা আসে 
গাছটির মজা তখন দেখার মতো
পিঁপড়েরা তার মেজো মামি সেজো মামি 
ডালে এসে বসে রঙিন পাখিরা , তারা 
পাড়াতুতো সব দাদা দিদি ভাই বোন 
একটা গাছের ডালে মৌচাক হয় 
মৌমাছি ফুল থেকে মধু এনে রাখে 
একটা গাছের বান্ধবী হয় ওরা 
যেহেতু একটা গাছের কেউই নেই 
এরাই আদরে গাছটিকে ঘিরে রাখে 
কিন্তু গাছের মরা মা ও বাবা আছে 
গাছটির ছায়া হয়ে পাক খায় ওরা 
গাছটিও বোঝে এবং ডুকরে কাঁদে

একটি গাছের কথার আড়ালে কবি একটি অসহায় অনাথ শিশুর বেড়ে ওঠাকে উপস্থাপন করেন নিপুণ এবং নবতর এক ভঙ্গিমায়। কবিতাটি পড়লেই বোঝা  যায় কবি সম্পর্ককে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন। আমাদের আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধব পাড়াতুতো দাদা দিদি এসব নিয়েই তো গড়ে ওঠে সামাজিক জীবন। প্রতিটি সম্পর্কই মূল্যবান। তার একটি কবিতার নাম ' পিসি'।

"বাংলাদেশের ঘরে ঘরে কত পিসি আছে বসে ভাবি 
সেইসব পিসি-- যারা কোনোদিন পেল না বিয়ের পিঁড়ি 
একা বসে আমি যখন ভাবছি ওই পিসিদের তবে 
কোন নামে ডাকি ! মনে হল ওরা যেন লাউগাছ সব 
বাবা কাকাদের সংসার ধরে ওরা বেড়ে চলে , ওরা 
বাবা কাকাদের সংসার ধরে জড়িয়ে জড়িয়ে ওঠে
লাউডগা সাপ তাকেও তো দেখি ---সবুজে সবুজ হয়ে 
হেঁটে হেঁটে চলে পিসিদের ঘুমে , স্বপ্নে বাতাসে মেঘে 
লাউডগা সাপ ওদের জীবনে না আসা পুরুষ যেন"




সত্যিই , বাংলাদেশের ঘরে ঘরে থাকা এই অবহেলিত পরার্থপর পিসিদের দেখা যায় নিশ্চয়ই, কিন্তু কবি তার শব্দতরঙ্গে নির্মাণ করেন এমন এক সিম্ফনি , যা যে কোনো কবিতাপাঠকের বুকে তৈরি করবে দীর্ঘস্থায়ী হাহাকার।
বেশ কয়েকটি কবিতা আছে মা বাবাকে কেন্দ্র করে। বইটি উৎসর্গও মা আর বাবাকে।
"আমার মা-বাবা পাশাপাশি বসে কখনো সখনো হাসে/ হাসলে বাবাকে শারদ আকাশ মনে হয় আর মা-কে/ একদম ঠিক কাশবন লাগে । আবার যখন ওরা / পাশাপাশি বসে একে অপরকে অভিযোগ করে , দেখি-/ সাপ ও বেঁজির তুমুল লড়াই ঘিরে নিল বাড়িঘর"। এই মা বাবাই একসময় ' আমে দুধে মিশে একাকার ' হয়, তখন কবি মা বাবাকে মৌচাকের সঙ্গে তুলনা করেন এবং উপভোগ করেন 'চাক ভেঙে দুবেলা যে মধু 'পান ,  সেই মধুকে। প্রথম কবিতার নাম " পাগলা হাতির মা" আর কাব্যগ্রন্থের শেষ লাইন " মা-মন মা-মন চিন্তা কোরো না , আমি তো দাঁড়াবো উঠে"। এভাবেই বিভিন্ন কবিতায় এসেছে মায়ের প্রসঙ্গ। এসেছে রান্নাঘর, ঘটিবাটি , বঁটি,পান ,কলসির  বিভিন্ন অনুষঙ্গ। রান্নাঘরও যে মায়ের বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় , কবির তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে সেই চিত্রও।
" সে দেয় খুন্তির শব্দ তেজপাতা ফোড়ন
পাঠায় ধোঁয়া , ঝাঁঝ, সোনালি কাঁচা তেল ভাসে -
সকালে লাফায় সে , দুপুরে শিলনোড়া বালিশ 
সে দেয় রুচি খিদে অথবা গন্ধের মতো কিছু
পাঠায় এছাড়াও-- মায়ের লাল, নীল বয়স 
মায়ের বয়সের সঙ্গে সে নিজেকে বদলায় "

কবির নানান কবিতায় এসেছে বন্ধুদের প্রসঙ্গও। " তেঁতুল পাতায় ন-জন" নামে যেমন কবিতা আছে তেমনি আছে বিপদে ফেলে -চলে-যাওয়া বন্ধু সম্পর্কে কবিতাও।

" এবারে শরৎ এল যথারীতি। তবে আমি তাকে ঠিক 
চিনতে পারিনি।কেননা শরৎ বদলেছে তার জামা 
এবারে শরৎ বন্ধুর বেশে গুপ্তঘাতক যেন
আমাকে বিপদে ফেলে তরতর নিজ গাছে উঠে গেল 
এদিকে জংলি ভালুক আমার খুব কাছে চলে আসে "

এক এক সময় কবির ভাব ও বেদনার  নিজস্ব নীলকান্তমনি তার বর্ণচ্ছটা ছড়িয়ে রাখে । তার আঙুরভাব ও শেয়ালভাবের হদিশ পাওয়া যায় । পাওয়া যায় তার  লিখতে না পারার কষ্টের মালকোষ। 
" ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাই-- বাথরুমে দেরি হয়।
জল টগবগে ফুটছে গরম অতএব স্নানে ঢুকি
দেরি হতে থাকে -- সকালে খাবার খেতে গিয়ে দেরি হয় 
আর জমে ওঠা শ্যামাপোকা ঝরে পড়ে যায় মাথা থেকে 
দুটো শ্যামাপোকা মাথা থেকে খসে পড়ে গেল আজ , ফের 
সিঁড়ি দিয়ে নামি ... পথে রাস্তায় ... রোজ মাথা থেকে দুটো 
শ্যামাপোকা উড়ে... উড়তে উড়তে ...কোথায় হারিয়ে যায়...
ফেরে না কখনো। সবুজ চুমকি ক্রমশ হারাই আমি

সাদা পাতা কাঁদে, কাক ডাকে খুব ।যেন কেউ মারা গেছে ।
বহুদিন হল, কত কত দিন তিনটে চারটে করে 
শ্যামাপোকা খসে আঁধারে মিলোয়...
                                   ফেরে না কখনো 
জানি।"
 
কবির ইচ্ছা শুধু তার  " লেখারা যেন" "সংকেত করে শুধু"। এই আকাঙ্খাই কবির পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের দিকে আমাদের আগ্রহের উদ্রেক করে।
ছন্দের ঝনঝনানি কাব্যগ্রন্থে অনুপস্থিত। অথচ কী অসাধারণ মাত্রাবৃত্তের ব্যবহার। কাব্যের নিভৃতে ছন্দকে অনবলোকিত রাখার  সক্ষমতা রয়েছে কবির। প্রচ্ছদ কৃষ্ণেন্দু চাকী। প্রকাশক পান্নালাল ঘোষকে ধন্যবাদ এমন সুন্দর ঝকঝকে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করবার জন্য।

কাব্যগ্রন্থ :  আঙুরভাব শেয়ালভাব
কবি : দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায় 
প্রকাশনী : দেবভাষা 
মূল্য : ৬০ টাকা 
প্রকাশকাল : ২০১৫




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন