শুক্রবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২১

কাব্যগ্রন্থ আলোচনা : সীমন রায়

 





ব্যক্তিগত সন্ধ্যাহ্নিক’ – প্রেমে ও প্রমাদে               কালো দিদিমণির স্বপ্ন



হাতে এলো অভিজিৎ দাশগুপ্তের সাম্প্রতিক কবিতার বই ‘ব্যক্তিগত সন্ধ্যাহ্নিক’ – তন্বী বইটির দু’মলাটের মধ্যে চেপেচুপে পোড়া আছে স্বল্পায়তন মোট আটাশটি কবিতা। সাহিত্যের বেলাভূমি প্রকাশনা থেকে সম্প্রতি ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বইটি প্রকাশিত হয়েছে। শূন্য দশকে এসে বাংলা কবিতার ছিরিছাঁদ বদলাচ্ছে খুব দ্রুত। কবিতাকে সেভাবে নির্দিষ্ট করে দশকভুক্ত করা না গেলেও একেকটি দশকের সময়ের জলছাপ কবির কলমে ঠিকই উঠে আসে। বিশ্বায়ন পরবর্তী বাংলা কবিতা যেমন আত্মপরিচয়ের সংকট-বিচ্ছিন্নতা এবং পুঁজি আগ্রাসনের খতিয়ান বুকে করে বেড়ে উঠেছে, উত্তরাধুনিকে ভোল বদল, সিনট্যাক্স ভেঙে ভেঙে আজ কাল পরশু পরপর নতুন কবিতা-ধ্বনি কবিতা-না কবিতার মুহুর্মুহু নিরীক্ষার ভিড়ে তেমনই নিবেশিত কবিতায় মগ্ন এই কবির বিচ্ছিন্ন স্বর ছোট্ট এক ফর্মার এই বইটি। কবিতার যে নির্জন, সংবেদী, সমান্তরাল পৃথিবী গড়ে তুলেছেন অভিজিৎ, তা বিশ্বায়িত দুনিয়ায় শিকড়হীন একক মানুষের অস্তিত্বকে ধরে রাখে। নামহীন শুধুমাত্র সংখ্যাচিহ্নিত কবিতাগুলি যেন একটা যাত্রার দ্যোতনা দেয়, তবু অপ্রমেয় সমান্তরালতায় তা সম্পূর্ণ হয় না। একক পুরুষের কিছু টুকরো অনুভূতির কোলাজ এই কবিতাগুলি। যেন এক পুরুষের খাপছাড়া প্রেমের শিকড় জলহীন পড়ে থাকে, অতৃপ্তি আর বিচ্ছিন্নতায় মোক্ষ খুঁজে নিতে নিতে ‘দিদিমণি’ হয়ে ওঠে পরম যন্ত্রণাময় এক অবসেশন। এই অজ্ঞাত ‘দিদিমণি’-ই কবিতাগুলির লিবিডো বলা চলে। এই শতাব্দীর শুদ্ধতম অনুভূতি বিচ্ছিন্নতা, কর্পোরেট হাতছানিতে যা রোজ আড়াল করে দেয় প্রণত ভালোবাসা। সম্পর্কের ধূসরতা, না হয়ে ওঠা প্রেম আর দমিত কামনায় দিদিমণি – আখ্যানের একমাত্র ‘কালো’ দিদিমণি পাঠকের আকাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠেন। হালভাঙা নাবিকের দিশা দেখাবেন দিদিমণি।



রবার্ট ফ্রস্ট এক জায়গায় বলেছেন যে গরম স্টোভের উপরে বরফের টুকরো যেভাবে গলে যায়, কবিতাও সেভাবেই গলতে গলতে নামবে। খুবই সামান্য এলিমেন্ট নিয়ে কবিতাগুলির বুনন হলেও অভিভবের অতলে ঘাই মেরে যায় কবির শব্দবিন্যাসের জাদু। বরফ গলার মতনই পাদভূমিতে নেমে আসছে যেন সমস্ত কবিতা। প্রথম কবিতাতে লিখছেন ‘শুধু জবা ফুটে আছে দিদিমণি / তোমার পাথরপ্রতিমায়’। এ যেন অময় মানবী। জবা ফুলের প্রতীতি দৈবী ইশারা এক। এর পরেও নানা কবিতায় দিদিমণির ইমেজারি রয়েছে। অভিজিৎ যখন লেখেন ‘দিদিমণি ঐ গৌতমী আকাশে / লুটপাট চলছেই / খুব ভদ্রভাবে আমি তোমাকে কাঁদাতে পারি।’, খুঁটি নড়া ভাঙা ভাঙা প্রেমের অন্যতর সংজ্ঞা গড়ে ওঠে। পুরুষকার উথলে ওঠে পংক্তির আলিশায়। একটা দমিত আবেগ পুরো কাব্যগ্রন্থ জুড়ে কবিতাগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, কোথাও সে টান আলগা হয়নি। পাঁচ নম্বর কবিতাটি সমগ্র বইটির থিম নির্ধারণ করে দেয় –

‘কালো’ বললেই সব বলা হল / তোমার ঠোঁটের ভাষায় সে মেঘ / বৃষ্টি আনে…’

কালো বর্ণ, জবা ফুল, কখনো ব্রহ্মাণ্ড সাধন পীঠের তান্ত্রিক উপচারে দিদিমণি অতীন্দ্রিয় নারী হয়ে ওঠেন, হয়তো বা আদ্যার বিনির্মিত কায়া। কখনো এই কালোমুখী মানবীর হাত ধরেন আগুন দেবতা, পুরনো প্রেমের চিহ্ন বুকে নিয়ে ধিকিধিকি জ্বলে তার ক্ষত। তবু সে এখনো কুমারী যে বোধগম্যের অতীত কিন্তু নক্ষত্রের দোষে তাকে ঘিরেই ঘুরে ঘুরে মরা আজীবন। যেন সেটাই ডেস্টিনি। এ যেন কবির দৈনন্দিন ব্যক্তিগত নোটস্‌ যেখানে জাপানি হাইকুর মতো চারটি শব্দে বুনে ফেলেন ফিরে আসার লিরিক – ‘ভেজা মাটি / পদছাপ - / গৃহমুখী…’ প্রেমের শরীর জুড়ে শাণিত দংশন নামে হাঙরের, ছিঁড়ে ফুঁড়ে যায় যেন প্রেমের সাঁজোয়া। অসম্পূর্ণতাই শূন্য দশকের প্রধান ফসল। প্রেম আর প্রমাদের এক জার্নাল তৈরি করে যাচ্ছেন এখানে অভিজিৎ। কখনো স্ফূরিত কামনার জোয়ার আসে। উনিশ, কুড়ি, বাইশ নম্বর কবিতায় শরীরী চাহিদার মেঘ ঘনতর হয় পংক্তিতে। ‘অমন গাঢ় ফুলদুটি প্রতি রাতে / আগুন লালায় পুড়ে খাক’ এত আশ্চর্য কামচিত্র কবির স্বাতন্ত্র্য সূচিত করে। দুটি এক পংক্তির কবিতা যেন রুদ্ধশ্বাস রতি। একেবারে শেষের আগের লেখায় অভিজিৎ যখন লেখেন ‘অশুভ চিহ্নের কাছে বাধ্য করো / পাথর ও লতা সাজিয়ে রাখতে’ শুধু নির্বাক উপলব্ধি করা ছাড়া প্রকাশের অন্য কোনো ভঙ্গিমা কাজে আসে না। ‘দিদিমণি’ শব্দবন্ধটি চোখে পড়লে জয় গোস্বামীর ‘মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়’এর সেই সেলাই দিদিমণির চিত্রকল্প ধরা দিলেও স্বাতন্ত্র্যে এই কবি ভাস্বর। সংযত এবং সংহত কবিভাষা, প্রচুর চিহ্ন-প্রতীতি আর মোহময় শব্দবিন্যাসে ‘ব্যক্তিগত সন্ধ্যাহ্নিক’ একক পুরুষের স্বপ্নকথন হয়ে থাকে। কাঙ্ক্ষিত কালো দিদিমণির আসঙ্গলিপ্সায় নিশ্চিত মনে পড়ে যাবে ‘মেঘ করে এলে / আমরা তখন আর / শাশ্বত থাকি না’।


                  


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন