রবিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২২

জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র



জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন
     
 
 
চতুর্দশ পর্ব 

ফা-ইয়েন / হো-গেন সম্প্রদায়  

ফা-ইয়েন সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা, ফা-ইয়েন ওয়েন-ই (জাপানি, হো-গেন ৮৮৫-৯৫৮ খ্রিঃ)। তিনি ছিলেন পূর্ব চিনের জেজিয়াং প্রদেশের রাজধানী হ্যাংচউ-এর বাসিন্দা। সাত বছর বয়সে তিনি মস্তকমুণ্ডন করে স্থানীয় চিতোঙ মঠের অধ্যক্ষ চুয়াং-ওয়েই-এর তত্ত্বাবধানে বৌদ্ধ ধর্ম ও শাস্ত্র অনুশীলন শুরু করেন। কুড়ি বছর বয়সে তিনি শাওশিং-এর কাইয়ুয়ান মঠে গিয়ে ওঠেন। অতঃপর তিনি পৌঁছে যান, মিং-চউ-এর মেই পর্বতের ইউয়াং মঠে। সেখানে তখন আচার্য শি-চাও-এর ভাষ্য শোনার জন্য দূরদূরান্ত থেকে লোকজন গিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন। অচিরেই ফা-ইয়েন, শি-চাও-এর নজরে পড়ে যান। কিন্তু মন বসাতে পারলেন না বেশিদিন। এবার তিনি দক্ষিণ দিকে যাত্রা করলেন। ফু-চউ পৌঁছে তিনি, হ্যাংচিং হুইলাং (৮৫৪-৯৩২ খ্রিঃ)-এর শিষ্যমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য হিসাবে কিছুদিন সন্ন্যাসজীবন অতিবাহিত করেন। অনুসন্ধিৎসু ফা-ইয়েন কোথাও বেশিদিন, থিতু হতে পারেননি। জ্ঞানস্পৃহা তাঁকে ছুটিয়ে নিয়ে গেছে মঠ থেকে মঠান্তরে। ফা-ইয়েন হুয়ায়েন বা কেগান বৌদ্ধগোষ্ঠীরও অনুরাগী ছিলেন। অবতংসক সূত্র ছিল তাঁর ঠোঁটস্থ। বিভিন্ন সময় তিনি কনফুসীয় পণ্ডিতদের সঙ্গেও আলোচনায় অবতীর্ণ হতেন, মিশতেন কবি ও সাহিত্য-অনুরাগীদের সঙ্গে। 

  ফু-চউ ছেড়ে তিনজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ফা-ইয়েন তীর্থযাত্রায় বেড়িয়ে পড়েন। একদা তুষারঝড়ের কবলে পড়ে ফা-ইয়েন সপার্ষদ আশ্রয় নেন, আচার্য লুওহান কুইশেন (জাপানি, রাকান কেইজিন ৮৬৭-৯২৮ খ্রিঃ)-এর তি-শাং মঠে। মঠটি এতটাই পোড়ো ও ভাঙাচোরা ছিল যে, ঝড়বৃষ্টি থেকে আশ্রিতদের রক্ষা করার মতো পূর্ণ সামর্থ্য তার ছিল না। তবে মঠস্বামী লুওহান, অতিথিদের জন্য যথাসম্ভব স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করেছিলেন। পরের দিন লুওহান ও ফা-ইয়েন-এর কথাবার্তা শুরু হয়। তেমন গুরুতর কিছু নয়, আসলে ফা-ইয়েনকে দেখে লুওহান-এর মনে কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসার উদয় হয়েছিল।

লুওহান— এই দুর্যোগের মধ্যে আপনারা কোথায় যাত্রা করেছিলেন ?

বস্তুত, এই জিজ্ঞাসার উত্তর ফা-ইয়েন-এর কাছে ছিল না। তিনি জানতেন না, ঠিক কোথায় গিয়ে উঠবেন। ফলে উত্তর যেমন অগোছালো হওয়ার তেমনই হল।  

ফা-ইয়েন— আমরা তীর্থযাত্রায় বেড়িয়েছি।

লুওহান— এই তীর্থযাত্রা কী ? কী ফল লাভ হয় এতে? 

ফা-ইয়েন— এটা আমি ঠিক জানি না।

না, লুওহান মোটেও বিস্মিত হলেন না বা আগন্তুকের এহেন উত্তর পেয়ে বীতশ্রদ্ধও হলেন না। দেখা যাক তিনি কী বললেন। 

লুওহান— না-জানাই তো জানার নিকটে নিয়ে যায়।

ফা-ইয়েন, এমন উত্তর আশা করেননি। তিনি চমকিত হলেন, তাঁর সঙ্গীরাও।
    
  ফা-ইয়েন-এর মনে হল বা বেশ চমৎকার মানুষ তো ! ভাবলেন, কিছুদিন থেকে গেলেই হয়। আসলে ফা-ইয়েন এতদিন এত জ্ঞানীগুণীর সঙ্গ করেছেন, কিন্তু এমন সহজ অথচ নিগূঢ় তত্ত্ব কারোর কথায় পাননি। কৈশোরে ফা-ইয়েন, হুয়ায়েন গোষ্ঠীর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। হুয়ায়েন গোষ্ঠী মনে করতেন, সবকিছুই চৈতন্যে নিহিত ; চেতনাই হল সারসত্য। হুয়ায়েন গোষ্ঠীর এই দার্শনিক প্রত্যয় গড়ে ওঠার তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল অবতংসক সূত্র। লুওহান-এর সঙ্গে কথোপকথনের সময় ফা-ইয়ান প্রায়শ অবতংসক সূত্র থেকে উদ্ধৃতি দিতেন, হুয়ায়েন গোষ্ঠীর ‘কেবল চৈতন্য’ তত্ত্ব আওড়াতেন। লুওহান, তেমন কিছু বলতেন না। শুধু বলতেন— বুদ্ধের কথার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। একসময় অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, ফা-ইয়ান নিজেকে সমর্পণ করে জানান— আমার এতদিনের অধীত বিদ্যার আর কিছুমাত্র অবশিষ্ট নেই। আপনি আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন। লুওহান, চেয়েছিলেন ফা-ইয়েনকে নিছক চেতনার ধাঁধা থেকে উদ্ধার করে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনতে। একদা তিনি মঠের দরজার সামনে পড়ে থাকা একটি প্রস্তরখণ্ড দেখিয়ে ফা-ইয়েন-এর মাথা থেকে চেতনা-সর্বস্বতার ভূত নামাতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। সেই স্মরণীয় কথোপকথনটি দেখে নেওয়া যাক।

লুওহান— বলুন তো পাথরটি কোথায় অবস্থান করছে, আপনার মনের ভিতরে না বাইরে ?

ফা-ইয়েন— অবতংসক সূত্র থেকে জেনেছি, সবই চেতনার ফসল। সুতরাং পাথরটি মনের মধ্যেই আছে। 
লুওহান— আপনি এতো বড়ো একখানা পাথর মনের মধ্যে বহন করে তীর্থ যাত্রাযাত্রায় চলেছেন ? খুব কষ্ট করছেন ভায়া !

লুওহান-এর এই কথায় ফা-ইয়েন-এর জাগরণ ঘটে। তিনি অন্য কোনো মঠে রওয়ানা দেওয়ার জন্য মনস্থির করে ফেলেছিলেন, ব্যাগপত্তর গুছিয়েও নিয়েছিলেন। কিন্তু পা আর উঠল না। চার বন্ধুই লুওহান-এর শিষ্য হয়ে গেলেন। ফা-ইয়েন হলেন লুওহান-এর সুযোগ্য ধর্মসূরি। 

  ফা-ইয়েন চেয়েছিলেন, কান-চে দ্বীপের নির্জনতায় একটি কুটির বানিয়ে থেকে যাবেন। কিন্তু সঙ্গী হোঙ-চিং ও অন্যান্যদের আপত্তিতে তাঁর সেই স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিতে হল। তাঁদের একান্ত ইচ্ছা ইয়াংসি নদীর দক্ষিণ দিকে যত মঠ-মন্দির আছে সবগুলি তাঁরা ঘুরে দেখবেন, ফা-ইয়েনকেও তাঁদের সঙ্গ দিতে হবে। যখন তাঁরা লিন-চুয়াং পৌঁছালেন, তখন স্থানীয় এক আধিকারিক ফা-ইয়েনকে চুং-শোউ মঠের মঠাধ্যক্ষের দায়িত্ব অর্পণ করেন। মঠাধ্যক্ষের অভিষেকের দিনে চা-পানের অনুষ্ঠান সবেমাত্র শেষ হয়েছে, এমন সময় তত্ত্বাবধায়ক ভিক্ষু এসে জানালেন— আপনার মঞ্চের চারপাশে ভিক্ষু, সন্ন্যাসী ও সাধারণ নারী, পুরুষ এসে জড়ো হয়েছেন। তাঁরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। 
ফা-ইয়েন শান্ত স্বরে বললেন— বুঝতে পারছি, তাঁরা সত্যিই একজন প্রাজ্ঞব্যক্তিকে দেখতে চান। 
এক মুহূর্তও সময় ব্যয় না-করে তিনি মঞ্চে উপবিষ্ট হলেন। সমবেত দর্শকমণ্ডলী তাঁকে অভিবাদন জানালেন। তিনিও সবাইকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে কথা শুরু করলেন—

আপনারা অধীর আগ্রহে আমার কথা শোনার জন্য অপেক্ষমাণ। সুতরাং আমার পক্ষে নীরবতা পালন অনুচিত। প্রাজ্ঞ পূর্বপুরুষদের মতো আমার পক্ষে কি আপনাদের জন্য সত্যের পথ নির্দেশ করা সম্ভব ? সবাই নিজের যত্ন নিন। 

এইটুকু কথা বলেই তিনি তড়িঘড়ি করে নেমে পড়লেন মঞ্চ থেকে। 
 
  ওয়েন-ই ক্রমশ খ্যাতিমান ভাষ্যকার হয়ে ওঠেন। চিয়াংশু প্রদেশের সদ্যস্বাধীন রাজ্য দক্ষিণ তাং-এর যুবরাজ লি-চিং (৯১৬- ৯৬১ খ্রিঃ) তাঁর গুণমুগ্ধ হয়ে পড়েন। লি-চিং প্রথমে তাঁকে নানকিং শহরের পাওয়েন মঠের দায়িত্ব দেন। ওয়েন-ই-র পাণ্ডিত্য ও ব্যবহারে প্রীত হয়ে পরে তাঁকে চিং-লিয়াং মঠের অধ্যক্ষের দায়িত্ব অর্পণ করেন। এই মঠের অধ্যক্ষ হিসাবে ফা-ইয়েন প্রভূত খ্যাতি পান। তাঁর প্রত্যক্ষ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজার। তা ছাড়া বিভিন্ন জায়গা থেকে অগণিত জিজ্ঞাসু ব্যক্তি তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য মঠে ভিড় জমাতেন। কেবল সূত্রপাঠ বা ব্যাখ্যা দান নয়, ওয়েন-ই নিজের অন্তরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসুদের সংকট নিরসনের জন্য বিভিন্ন নিদান দিতেন। ফা-ইয়েন-এর সময় এক চ্যানসাধুর গল্প মুখে মুখে ফিরত। সেই চ্যানসাধু তাঁর কুটিরের দরজায় লিখে রাখতেন মন, জানালায় লিখে রাখতেন মন, দেয়ালেও লিখে রাখতেন মন । ফা-ইয়েন, তাঁর বক্তব্যে উক্ত চ্যানসাধুর গল্পটি উল্লেখ করে বলতেন, তাঁর উচিত ছিল, দরজায় লিখে রাখা দরজা, জানালায় লিখে রাখা জানালা এবং দেয়ালে লিখে রাখা দেয়াল। তাঁর এই ভাষ্য তাঁর গুরু লুওহান-এর শিক্ষার কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি তাঁর সুযোগ্য শিষ্যকে বুঝতে শিখিয়ে ছিলেন কেবল মন নয়, বস্তুজগৎও সত্য, তাদের সব সময় উপেক্ষা করা অনুচিত। লুওহান এই শিক্ষা পেয়েছিলেন তাঁর গুরু শুয়েন শা-র কাছ থেকে। ফা-ইয়েন এই গুরুশিষ্য পরম্পরার শিক্ষাকে ভিত্তি করে পৃথক এক চ্যান সম্প্রদায় গড়ে তোলেন , যা তাঁর তিরোধান-পরবর্তী সময়ে ফা-ইয়েন সম্প্রদায় নামে পরিচিতি পায় । ফা-ইয়েন কবিত্বশক্তিরও অধিকারী ছিলেন। তাঁর কবিতায় আমরা পাই এক মরমী কবিকে, যিনি সুবাসিত পিউনি ফুলের শোভা দেখতে দেখতে অনুভব করেন তাঁর চুলে পাক ধরেছে, আর ফুলগুলিকেও গতবছরের মতো অতটা রক্তাভ-সুন্দর দেখাচ্ছে না। অথবা নির্জন পর্বতে বসে যিনি খোবানি ফুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে একটি নাম-না-জানা পাখির সুরেলা শিস শুনে সারাদিনটা শান্তিতে কাটিয়ে দেন ।

  ৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের কথা, ফা-ইয়েন তখন চুয়াত্তর বছরে পা-দিয়েছেন। একদা তিনি ঘোষণা করলেন, শরীর জানান দিচ্ছে যে, তিনি আর বেশিদিন থাকবেন না। মাস খানেক পরে একদিন সকালে তিনি শিষ্যদের বিদায়বার্তা দিয়ে নিজেই সযত্নে মস্তকমুণ্ডন করে স্নান সেরে নতুন চীবর পরিধান করলেন। তারপর শান্তভাবে উপবিষ্ট হলেন। আর উঠলেন না। কেবল চিং-লিয়াং মঠে নয়, শোকের ঢেউ আছড়ে পড়ল কাছে-দূরে সর্বত্র, যেখানেই পৌঁছাল সেই মর্মন্তুদ সংবাদ। লি চিং তাঁকে মরণোত্তর খেতাব দেন, তা ফা-ইয়ে চানশি, বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়— মহান ধর্মদ্রষ্টা। সংক্ষেপে ফা-ইয়েন। 

  ফা-ইয়েন-এর শিক্ষার একটি মৌলিক পদ্ধতি ছিল জিজ্ঞাসু বা প্রশ্নকর্তার উক্তির কোনো ব্যাখ্যা না-দিয়ে বরং উক্তিটিকেই একটু মোচড় দিয়ে বা সরাসরি উত্তর হিসাবে ফিরিয়ে দেওয়া। উদাহরণে আসা যাক।

একদা জনৈক চ্যানসাধু ফা-ইয়েনকে বললেন—

আমার নাম একো। আপনি আমাকে বুঝিয়ে দিন বুদ্ধ কী ?

ফা-ইয়েন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন— আপনি, একো।

একদিন এক সভায় ফা-ইয়েন, ভিক্ষু শিউ-শান-চুকে বললেন— বলা হয় যে, একটি একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য স্বর্গ ও পৃথিবীকে পৃথক করেছে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?   

শিউ-শান-চু বিন্দুমাত্র সময় ব্যয় না-করে উত্তর দিলেন— একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য স্বর্গ ও পৃথিবীকে পৃথক করেছে। 

এবার ফা-ইয়েন বললেন— আপনার এই ব্যাখ্যাটি কীভাবে যাচাই করা যেতে পারে ?

শিউ-শান-চু, ফা-ইয়েনের উদ্দেশে বললেন— তাহলে আপনার ব্যাখ্যা কী ?

ফা-ইয়েন অবলীলায় উত্তর দিলেন— একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য স্বর্গ ও পৃথিবীকে পৃথক করেছে। 

  ফা-ইয়েন-এর ধর্মসূরি তিয়েনতাই তে শাও (৮৯১-৯৭১ খিঃ)। অবশ্য তিনি বেশিদিন ফা-ইয়েন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেননি। সম্ভবত রাজ-অনুগ্রহ লাভের জন্য তিনি তিয়েনতাই বৌদ্ধঘরানায় যোগ দেন। তাঁর দুই শিষ্য ইয়ুং মিং ইয়েন শাও (৯০৪-৯৭৫ খিঃ) ও তাওয়ুন। 

  ইয়ুং মিং ইয়েন শাও, চ্যান-ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর একশো-খণ্ড-বিশিষ্ট শাং-চিং-লু নামের মহাগ্রন্থের জন্য। এই গ্রন্থে তিনি চ্যান-সম্পর্কিত যাবতীয় নীতিমালা সংকলিত করেছেন। অবশ্য এটা করতে গিয়ে তিনি নির্মল চ্যানধারাকে সূত্রের জটিল আবর্তে আবিল করে তুলেছেন। সূচনা থেকেই চ্যানধারা সূত্রনির্ভরতা কাটিয়ে ঋজু ও মননশীল হয়ে উঠতে চেয়েছে। কিন্তু মাঝেমধ্যেই প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রবল হয়ে উঠে চ্যানধারাকে শাস্ত্র-অনুগত করে তুলতে সচেষ্ট হয়েছে। ইয়ুং মিং ইয়েন শাও-এর এই প্রচেষ্টাও সেই প্রতিক্রিয়াশীলতার দিকেই ঝুঁকে আছে। তবে তাঁর মহাগ্রন্থটি চ্যানধারার দিগদর্শন হয়ে না-উঠলেও গ্রন্থটি যে মহাযানমতের দিগদর্শন হয়ে উঠতে পেরেছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।  

    তাওয়ুন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তবে তিনি যে অসাধারণ কাজটি করে গেছেন চ্যান-ইতিহাসে তার তুলনা মেলা ভার। তাঁর সংকলিত তিরিশ খণ্ডের ‘কইতোকু দেনতোরোকু’ চ্যান-ইতিহাসের অন্যতম আকরগ্রন্থ। বলা যায় এই মূল্যবান বইটির উপর নির্ভর করেই রচিত হয়েছে যাবতীয় চ্যান-ইতিহাস। এই তথ্যঋদ্ধ গ্রন্থে তাওয়ুন, সূচনা থেকে তাঁর সমকাল পর্যন্ত প্রায় সকল উল্লেখযোগ্য চ্যান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে যতটা সম্ভব বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যা সেই সময়ের নিরিখে রীতিমতো অসাধ্যসাধন একটি গবেষণাকর্ম। 
এই গ্রন্থটি না-থাকলে চ্যানধারার বিবর্তন রেখাটিকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা সম্ভব হত না। তাঁর গ্রন্থে গুরু-শিষ্য পরম্পরার যে উক্তি-প্রত্যুক্তিগুলি উদ্ধৃত হয়েছে, সেগুলি সংকলন করে পরবর্তীকালে রচিত হয়েছে বিভিন্ন কোয়ানগ্রন্থ।

  ফা-ইয়েন সম্প্রদায়, খুব বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করেনি। পঞ্চম প্রজন্মের পরেই এই সম্প্রদায় লোপ পায়। সম্প্রদায়ের অনেকেই লিন-চি সম্প্রদায়ে যোগ দেন। তবে ক্ষণস্থায়ী হলেও চ্যানধারা তথা চিনের সংস্কৃতিতে ফা-ইয়েন সম্প্রদায়ের অবদান অনস্বীকার্য। 


তথ্যসূত্র :  

Zen's Chinese heritage: the masters and their teachings by Andy Ferguson ; 
Boston: Wisdom Publications, 2000.

Original Teachings of Chan Buddhism by Chang Chung Yuan ; Vintage Books 1971.  

Records of the Transmission of Lamp ( Jap. Keitoku Dentōroku ) Complied by Daoyun; Translated by R. S. Whitefield, The Hokun Trust 2017. 

Zen’s Chinese Heritage by Andy Ferguson ; Wisdom Publication, 1999.

History of Zen by Yu-hsiu Ku ; Springer 2016. 

The Golden Age of Zen by John C. H. Wu ; Image Books 1996. 

ছবি : বিধান দেব 


চন্দন মিত্র ।। জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৬, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবার মহকুমার ভগবানপুর (হরিণডাঙা) গ্রামে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখার সূত্রে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। লেখেন প্রবন্ধ ও গল্প । 
প্রকাশিত পুস্তক   : 
কাব্য পুস্তক : আমার আত্মার পায়ে বাঁধার ঘুঙুর, যাপনচিত্র, ২০১৯; সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে, সাহিত্যের বেলাভূমি ২০২০
প্রবন্ধ পুস্তক : জেন : রিপুতাড়িত মানবের নিকট সুসমাচার ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কলিকাতা লেটার প্রেস, ২০১৯ 
সম্পাদিত পত্রিকা : পাড়ি


 
 
        
    
  
    
         
             

            
                    


  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন