দ্বিতীয় বর্ষ ।। পঞ্চম সংখ্যা ।। ডিসেম্বর ২০২১
বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২১
সম্পাদকের কথা
দ্বিতীয় বর্ষ ।। পঞ্চম সংখ্যা ।। ডিসেম্বর ২০২১
ল্যাপিস লাজুলি ।। সায়ন রায়
৫.
শীতের সর্পিল ফেনা বসন্ত-বারুদে তেতে লক্ষ লক্ষ শব্দের ভ্রূণ
Sparse breaths, then none—
and it was done.
Listening and hugging hard,
between mouthings
of sweet next-to-nothings
into her ear—
pillow-talk-cum-prayer—
I never heard
the precise cadence
into silence
that argued the end.
Yet I knew it had happened.
Ultimate calm.
[A Scattering/ Christopher Reid]
একটা উদ্ভট জামা গায়ে দিয়ে চলেছে একটা হাতকাটা বেড়াল।সকল বৃষ্টির দানাগুলো চোখের জলের মধু সঞ্চয় করে সুমিষ্ট মিছরি হয়ে উঠেছে। উপভোক্তার দল আয়েস করে চুষছে সেইসব মিছরির দানা।কেউ কেউ মিছরির ছুরিও ব্যবহার করছে নির্দ্বিধায়।হাটে বাজারে হাতির ছানা বিক্রি হচ্ছে কেজি দরে।খাইয়ে দাইয়ে কে কত পেটমোটা দানবাকৃতি হাতি বানাতে পারে, সেই নিয়ে চলছে এক অসম প্রতিযোগিতা। বহুদিন হলো নিকটবর্তী গ্রহের সাথে আমাদের চিঠি চালাচালি বন্ধ।কী এক হরতালে তাল কেটে গেছে সকল টেলিগ্রাফ তারের।সময় নিয়ে লোফালুফি খেলছে সার্কাসের বাঁদর।পাথরের দাঁত পরে দাঁত ক্যালাচ্ছে দশটা-পাঁচটার হুল্লোড়বাজ অফিসযাত্রীরা।তুষার ঝরছে।বেগুনি রঙের সেইসব তুষারে মিশে আছে সকল চুপ-কথা আর মনের গূঢ় ও গহীন আশ্চর্য।
~~
গত শতাব্দীর সত্তর দশকের শেষ ও আশির দশকের গোড়ার দিকে ইংরেজি কবিতায় স্বল্পসময়ের জন্য এক নতুন ধরনের কবিতা রচনার সূচনা হয়েছিল, যা মার্সিয়ান পোয়েট্রি নামে পরিচিতি পায়।এই কবিতায় দৈনন্দিন ব্যাপারস্যাপার ও মানুষের আচরণ অদ্ভুত ভাবে বর্ণিত হত, যেন একজন মঙ্গলগ্রহের অধিবাসী এই পৃথিবীতে বেড়াতে এসেছেন এবং তার কাছে এই পৃথিবীর সবকিছুই মায় মানুষজনের কাজকর্ম দুর্বোধ্য ঠেকছে।জগৎ,সমাজ ও বস্তুসকলের প্রতি এক বিচ্ছিন্নতা (alienation)-কে প্রকাশ করেছিল এই কাব্যান্দোলন তথা এই আন্দোলনে অংশভাক্ কবিরা।এই আন্দোলনের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত দুজন কবি হলেন ক্রেগ রেন এবং ক্রিস্টোফার রিড।ক্রেগ রেন-এর 'A Martian Sends a Postcard Home' মার্সিয়ান পোয়েট্রির একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।এই কবিতায় একজন মার্সিয়ান অপর একজন মার্সিয়ানকে এই পৃথিবীর ব্যাপারস্যাপার অদ্ভুতভাবে বর্ণনা করছেন।তিনি বই-কে বলছেন 'ক্যাক্সটন' (প্রথম ইংরেজ মুদ্রকের নাম / তাঁর মুদ্রিত বই) এবং বই-কে বর্ণনা করছেন এইভাবে :
mechanical birds with many wings
perch on the hand
cause the eyes to melt
or the body to shriek without pain
পরিচিতকে অপরিচিত করে তোলার এই ধারাটি উপন্যাসে নিয়ে আসেন মার্টিন অ্যামিস।১৯৮১ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘Other People : A Mystery Story' উপন্যাসে গল্পটি বর্ণিত হয় নায়কের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, যেখানে তিনি অ্যামনেসিয়া আক্রান্ত এবং মানব অভিজ্ঞতার সাধারণ ধারণাগুলিও তার স্মৃতিতে হারিয়ে গেছে। স্যুররিয়ালিজমের কাছাকাছি এই মার্সিয়ান পোয়েট্রির জন্ম হয় ষাটের দশকের এক্সপেরিমেন্টাল পোয়েট্রির পরিপ্রেক্ষিতে।যদিও তার ঋণ ছিল মেটাফিজিকাল পোয়েট্রি,অ্যাংলো স্যাক্সন রিডল ও ননসেন্স পোয়েট্রির কাছে।
~~
একটা ছোট কমলা রঙের নদী ধীরগতিতে নিজের মনে বয়ে চলেছে।আশ্চর্য উদাসীন।তাকে ডাকলেও দেয় না সাড়া।নদীর দুপারে দুজন মানুষ,চাল নেই চুলো নেই,কোথা থেকে যে এসে পড়েছে নিজেরাই জানে না।ছেঁড়া-ফাটা জামা,তাদের মুখাবয়ব ততোধিক জীর্ণ ও বিষণ্ণ।হয়তো নয়,কিন্তু মনে হচ্ছে একজন কালা, অপরজন অন্ধ।তারা নদীর দুপারে পরস্পরের অস্তিত্ব অনুভব করেছে।চারিদিকে ধূসর আর মরা প্রকৃতি।প্রাণের চিহ্নটুকু নেই।এই বিরান ভূমিতে দুপারে দুজন,মাঝে কমলা রঙের নদী।এক অস্ফুট গোঙানির মত শব্দ,অর্থহীন—বেরিয়ে আসছে তাদের মুখ থেকে : ব্যা ব্যা ব্যা—ক্রির ক্রির ক্রির—ট্রাম ট্রাম ট্রাম-ফট ফট ফট...
~~
১৯৫৩ সালের ৫ই জানুয়ারি প্যারিসের 'ব্যাবিলন থিয়েটারে' এক অচেনা আইরিশম্যানের লেখা নাটক মঞ্চস্থ হয়।নাম : En Attendant Godot'। স্যামুয়েল বেকেট ফরাসিতে লেখা তার এই নাটকটি পরে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং ১৯৫৫ সালে তা লন্ডনে মঞ্চস্থ হয়।১৯৫৬ সালে তা অভিনীত হয় আমেরিকায়।এই নাটকটি এতদিন পর্যন্ত প্রচলিত থিয়েটারের সমস্ত রীতিনীতিকে ভেঙে তছনছ করে দেয়।থিয়েটারে সূচিত হয় নতুন সম্ভাবনার পথ।অনেকে বলে থাকেন ইউরোপীয় থিয়েটারে তিনটি স্তম্ভ : শেক্সপীয়ার, ইবসেন, বেকেট।যাইহোক এই নতুন ধরনের নাটককে 'থিয়েটার অফ দ্য অ্যাবসার্ড ' আখ্যা দেওয়া হয়।নামটি দিয়েছিলেন সমালোচক মার্টিন এসলিন।যদিও এই নামটিতে বেকেট-এর আপত্তি ছিল।স্যামুয়েল বেকেট, আর্থার অ্যাডামভ, ইউজিন আয়নেস্কোর নাটককে এই নামে চিহ্নিত করলেন এসলিন।সার্ত্র এবং কামু চর্চিত এক্সিসটেনসিয়ালিজম-এর গভীর প্রভাব ছিল এই থিয়েটারে।এই থিয়েটারের মূল ফোকাস ছিল এমন এক অবস্থাকে চিত্রিত করা যখন মানব অস্তিত্ব তার অর্থ ও উদ্যেশ্য হারিয়ে ফেলেছে।মানুষে মানুষে সকলরকম যোগাযোগ ভেঙে পড়েছে।গঠনগত দিক থেকে এই নাটক বৃত্তাকার।নাটকটি শেষ হয় সেখানে, যেখানে নাটকটি শুরু হয়েছিল।সকল সংলাপ ও প্রতর্ক অসংগত ও অযৌক্তিক হয়ে ওঠে যার চূড়ান্ত পরিণতি নীরবতা। 'Nothing happens,nobody comes,nobody goes.It's awful !’ ‘ওয়েটিং ফর গোডো' নাটকের পাঁচটি চরিত্রের মধ্যে অন্যতম মুখ্য চরিত্র ইস্ট্রাগন-এর এই সংলাপটিতেই নাটকটির ভরকেন্দ্র বিধৃত রয়েছে।নাটকের আরেকটি চরিত্র লাকি, যে একজন ক্রীতদাস, যার গলায় বাঁধা এক বিরাট দড়ি। যেটির অপর প্রান্তটি ধরে তার মালিক পোজো মঞ্চে প্রবেশ করে।প্রায় তিনপাতা জোড়া লাকি-র দীর্ঘ মনোলগটি গুরুগম্ভীর,দার্শনিক শব্দবন্ধ ও ততোধিক লঘু শব্দের মিশেলে এক ভাবউদ্রেককারী,অর্থহীন,করুণ ও নিষ্ফল আস্ফালন ছাড়া কিছুই নয়।যদিও 'ওয়েটিং ফর গোডো' নাটকে কাহিনি,চরিত্র,ক্রিয়া(action),মঞ্চ—সবকিছুতেই ন্যূনতমকে গ্রহণ করা হয়েছে।এই নাটকের পাহাড়প্রমাণ সাফল্যের পর বেকেট তার পরবর্তী নাটকগুলিতে আরো চূড়ান্ত পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। যেমন 'এন্ডগেম' (১৯৫৭) নাটকের তিনটি চরিত্রের দুজন ডাস্টবিনে বন্দী, অপরজন চাকালাগানো আর্মচেয়ারে বসে।'হ্যাপি ডেইস' (১৯৬১)-এ মূল নারী চরিত্র উইনি-কে প্রথমার্ধে দেখা যায় এক মাটির ঢিবির মধ্যে কোমর পর্যন্ত ডুবে আছে, শেষার্ধে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকতে দেখা যায় তাকে।'নট আই'(১৯৭২)-এ দেখানো হয় একজন মহিলার মুখটুকু।তার শরীরের বাকি অংশ ছায়ায় ঢাকা থাকে।তার দুটি নাটক 'অ্যাক্ট উইদাউট ওয়ার্ডস (১ ও ২)-তে কোন শব্দ নেই।মাইম ব্যবহৃত হয়।এরই চূড়ান্ত পরিণতি দেখা যায় 'ব্রেথ' (১৯৭০) নাটকে।এক মিনিট দৈর্ঘ্যের এই নাটকে নিঃশ্বাসের উত্থান পতনের শব্দ ও কান্নার ধ্বনির সঙ্গে নিরাভরণ মঞ্চে আলো বাড়ে ও কমে। বেকেট ১৯৬৯-এ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান।
~~
প্রকাণ্ড এক শব্দে ঘুম ভেঙে যায়।আকাশের বুক চিরে নেমে আসছে হাজার হাজার মশাল।দিগন্ত জোড়া বিস্তীর্ণ মাঠে এক কালো ঘোটকী দৌড়ে বেড়াচ্ছে প্রাণান্তকর। কান পাতলে শোনা যায় তার হ্রেষা।হাজার হাজার জোনাকি ফুটে আছে গাছে।ভামবেড়ালের চোখের ভাটিতে রুটি সেঁকছে এক বৃদ্ধা।মাংসের ঘ্রাণ ছড়াতে ছড়াতে প্রজাপতিদল বাগান-বিহারে।যৌনসুখানুভূতির স্বপ্নে কেঁপে কেঁপে উঠছে বৃদ্ধের রোম।রোম জ্বলছে,বেহালা বাজাতে বাজাতে ভাবোন্মাদ নিরো উলঙ্গ হয়ে নৃত্যের কথা ভাবছেন।মুঙখের ক্যানভাস থেকে নেমে এসে ভীত রমণী এই অবেলায় আকাশ ফাটিয়ে আর্তনাদ শুরু করলো।অজস্র সুতোর ঢেউ চরাচর জুড়ে। পাতলা বালির স্তর পর্দার মত লম্বালম্বি ঝুলছে। অর্ধ্বস্বচ্ছ। একটার পর একটা পর্দা ঠেলে যেতে যেতে শামুকের খোল,অন্ধকার।উল্টোদিকে বাজির নকশা,উড়ো খই, হাতেমতাই—ননসেন্স,ননসেন্স।এক মহাজাগতিক ননসেন্সের তরঙ্গায়িত ঢেউ আছড়ে পড়ছে ইথার সমুদ্রে।হাফ-পাগল,হাফ-উন্মাদ একজন দুজন তেজস্ক্রিয় ঠোঙায় ধরে রাখছে সেইসব মহাজাগতিকতার সামান্য বিদ্যুৎ।
~~
দক্ষিণবঙ্গের একজন কবি, সদ্যপ্রয়াত।উত্তরবঙ্গের একজন সিনিয়র কবি।জীবিত, সুস্থ,সৃষ্টিশীল।প্রথমজন শম্ভু রক্ষিত। দ্বিতীয়জন বিজয় দে।এদের দুজনের কবিতায় পাচ্ছি মহাজাগতিক ননসেন্স-এর সুদূরপ্রসারী ব্যাপ্তি ও বিষাদ।সামান্য নমুনা : ‘ চাঁদের চোরা আলো চিবোতে চিবোতে মুখের পূর্বপাড়া /যত অস্ত যেন এখানেই/ হে প্রতিদিন নতুন নতুন দারিদ্রসীমারেখা/ তোমার ছায়ার নীচে থুতু একটি দুঃখ-শেখার স্কুল খুলেছে.....(চাঁদপুর/সকল বৃক্ষের চুমুক/বিজয় দে)। আরেকটি নমুনা : ‘তার আগে নাড়াচাড়া,যেমন সমস্ত উদাসীনতায় চিন্তার বিষয় ও / অনুসন্ধান প্রাণ যোগ করা যায় কি-না।দূরের কথা,উৎকীর্ণ বেগ বলতে/ যা বোঝায়।কম নয়,অসহ্য; সেথায় সংঘর্ষ বেধেছিল/প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, অন্য কেউ কোথায় রেখে যায়।বৃহৎ টান একরকম,হলুদ রং/ ফলাফল এক—পুরুষের বোধ,উপলব্ধি, জগৎ কল্পনা/ তারপর তোলাছবি,অষ্টম ভ্রাতা,মহাকাশ বিজয়ের যুগ মানুষের ভয়াবহত্ব... (নং-৩৭/ প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না / শম্ভু রক্ষিত)।
~~
দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে, আগুন জ্বলছে। শীত করছে, ভীষণ শীত...
ছবি : বিধান দেব
সায়ন রায়
জন্ম ১৯৭৭-এ। পেশা শিক্ষকতা।বিষয় ইংরেজি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'মহামানবের পোশাক' প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে 'কবিতাপাক্ষিক' থেকে।এখনও পর্যন্ত কবিতার বইয়ের সংখ্যা সাত। পেয়েছেন 'শব্দসিঁড়ি' পত্রিকা প্রদত্ত 'সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্মারক সম্মান'।সম্পাদনা করেন 'গুহালিপি' নামের একটি কবিতা বিষয়ক পত্রিকা। একমাত্র গদ্যের বই An Endless Journey : Revisiting Goutam Ghose Cinema।শখ : বইপড়া, ঘুরে বেড়ানো।
ভিনদেশী তারা ।। অরিন্দম রায়
জন্মসূত্রে তিনি ব্রিটিশ নাগরিক। পেশায় কিছুদিন আগে অব্দি ছিলেন সাইক্রিয়াট্রিক নার্স। ২০০৬ সালে তিনি নার্সিং পেশা থেকে অবসর নিয়ে প্রবেশ করেন স্ট্যান্ড আপ কমেডির জগতে। স্ট্যান্ড আপ কমেডির জগতে তাঁর পনের বছর হয়ে গেল। তবে শুধু কমেডি শো নয়, তাঁর আরেক প্রেম কবিতা। পারফর্মিং কবিতার জগতেও তিনি সুপরিচিত। তিনি রব গী। নিজেকে তিনি পরিচয় দেন ‘স্ট্যান্ড আপ পোয়েট’ হিসেবে। সারা পৃথিবীতে তিনহাজারের বেশি শো করেছেন রব। হিউমার তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সোজাসাপ্টা ভাষায় কবিতায় কথা বললেও রব-এর লেখায় পাঠক নানা স্তর খুঁজে পাবেন। রব, তাঁর কবিতা পাঠের মাধ্যমে মানসিক সমস্যায় ভোগা মানুষদের চিকিৎসা করেন। তাদের শুশ্রুষার জন্য কবিতা এবং কমেডিই রব-এর অস্ত্র। সাম্প্রতিক করোনা মহামারির সময়ে তিনি ফিরে এসেছেন তাঁর পুরনো পেশায়। কারণ রব সামাজিক নিঃসঙ্গতা তাঁর কাজের মূল ক্ষেত্র। তিনি কাজ করছেন অ্যালজাইমার্স রুগীদের নিয়েও। সামাজিক দূরত্বের এই সময়ে রব গী তাঁর কবিতা নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন সেইসমস্ত মানুষজনের কাছে যাঁদের পাশে দাঁড়ানো আজ সবচেয়ে বেশি জরুরি, সম্ভবত কবিতা লেখার চাইতেও।
আমার বিষণ্ণ জীবন কত ভালো
এই পৃথিবী মাইক্রোওয়েভে তৈরি হয়েছিল
আর আমি আমার কুঁচকে ছোট হয়ে যাওয়া মুড়ে রাখা মস্তিষ্কের থেকে পালাতে পারছি না।
আমার মুখে আঘাতের চিহ্ন
আর মাইগ্রেন;
আর মনে মনে আমি যে-ই নাইলন আবিষ্কার করে থাকুক না কেন তার থেকেও জঘন্য।
আমি পর্বতকে মহম্মদের কাছে নিয়ে গেলাম
কিন্তু তার কাছে ইতিমধ্যেই একখানা আছে।
যতক্ষণ না আপনি কোনো ভুল করছেন ততক্ষণ কিছু শিখতে পারবেন না
আর আমি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি কোথায় সবকিছু ভুল হয়ে গেল।
আমি একটা অযোগ্য, বোকা লোকের মতো একা একা ঘুরে বেড়াই
আমার চোখের পিছনে জায়গার চারপাশে;
কল্পনার আনাচে কানাচে দ্রুতপায়ে ঘুরি
আর ভিজে যাওয়া স্বপ্নের এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া চাদরের উপরে;
এখনও আমার পায়ের তলায় ভেজা ভাব ,
কিন্তু আবারও বিন্দুমাত্র বিস্মিত হই না
যখন আমি যুক্তি খুঁজে পাই না
কেন আমার জানা সমস্ত রসিকতার মধ্যে নিজেকেই সবচেয়ে বেশি হাস্যকর বলে মনে হয়।
আমার মাথায় কোনও সমাধান সূত্র নেই
আমার সমস্ত চিন্তাভাবনা একরকম বলে মনে হয়।
কিছুই পাল্টায় না, সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তিরা
ধীরে ধীরে আমাকে পাগল করে দিতে থাকে।
সম্ভবত আমি একলাই থেকে যাবো,
কিন্তু আমার সাবান থেকে এখনও বাড়ির গন্ধ বেরোয়।
আমি আমার সম্মান-সম্ভ্রম নিই, তাদের নগ্ন করি
আর সত্যি দিয়ে ধুই।
আমি সেই গন্ধটা আবার পেতে চাই,
কিন্তু আমি ভয় পেতেও খুব ভীত হয়ে থাকি।
আমি পলিটিকালি কারেক্ট এবং আমি ঘুমোতে পারি না।
এখনও আমার মাথাব্যথা করে আর এর থামার কোনও লক্ষণ নেই;
আমার অর্শ আছে আর আমার নাক বন্ধ;
আমি একটা বিষণ্ণ বুড়ো কুকুরের মতো যার লিঙ্গের হাল খারাপ
আর যে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে তোমার পিছনে পিছনে যাচ্ছে।
কেউ একজন আমার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দেয় আর ভিতর থেকে সবকিছু বের করে আনে।
আমার নাড়িভুঁড়ি একটা বস্তার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
আমাকে তার ভিতরে নেমে সবকিছু আগের মতো গুছিয়ে রাখতে হয়,
কিন্তু আমার পায়ুপথে আমি দারুণ মজা অনুভব করি,
মনে হয় ওটা যেন উল্টে গেছে
এমন একটা জায়গার পিছনে যেখানে এটা একেবারে মানায় না।
আমার হারাবার কিছুই নেই আর তারপরে আমি এটা হারিয়ে ফেলি;
তুমি এইমাত্র আমার যুদ্ধজাহাজটি ডুবিয়ে দাও আর আমার অহংকারকে পিষে সমতলে পরিণত করো।
আমি তোমাকে পছন্দ করতে পারি না যদি না আমি অবসেসড হয়ে থাকি
তাই আমি একাই বসে থাকবো আর হতাশ হবো,
কারণ আমার বিশ্বাসের নিচে, আমি একটা বাচ্চা বই আর কিছু না।
আমার মন আবদ্ধ হয়ে আছে এবং আমি সেটা ফিরে পাচ্ছি না,
আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে আমি প্ররোচিত হয়েছিলাম
আর আমার সবচেয়ে ভালো অংশটা টয়লেটে শুয়ে আছে;
আর আমার কিছু আসে যায় না যদি কেউ আমাকে পছন্দ না করে,
আমি আমার যত জয়ের স্মারক একটা পাত্রে রাখি তার মধ্যে পেচ্ছাপ করব বলে;
আমার দক্ষতা আছে কিন্তু কিছু একটা নেই,
আমি পৃথিবীকে বলতে চাই, কিন্তু আমার কথা শোনার জন্য দাঁড়ায় না,
তাই মেরুদণ্ডে একটা তাগড়াই লাথি মেরে আমাকে আমার দুর্দশা থেকে উদ্ধার করো
আর আমাকে এমনভাবে মারো যেন আগামীকাল বলে কিছু নেই,
কারণ বিরক্ত হওয়ার চেয়ে অন্য সবকিছু ভালো।
তুমি আমায় মুক্ত করেছ ___ হ্যাঁ, তোমায় অজস্র ধন্যবাদ।
আমার মাথা রাইটার্স ব্লকে ঠাসা
ঘড়িতে অনেকগুলি মাইল।
আমি গ্রামাঞ্চলকে ভীষণ ঘেন্না করি,
আমি একটা গর্ত খুঁজে পেতে চাই, তার ভিতর হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে সত্যের অধরা সুগন্ধ পেতে চাই।
কিন্তু আমার কথা যথেষ্ট হয়েছে _____ এবার তোমার কথা হোক।অরিন্দম রায় : জন্ম ১৯৮০, হাওড়ার বাসিন্দা। ইংরেজি
সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। শূন্য দশকের কবি। দীর্ঘ সময় ধরে সম্পাদনা করছেন 'লালন' পত্রিকা। বর্তমানে 'লালন' ওয়েবজিন হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে। কবিতার বই : 'রোজনামতা', 'শবসাধনা', 'নির্বাচিত শূন্য' এবং ''অষ্টধাতুর পৃথিবী'( ১৪বছর বাদে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে)। কবিতার পাশাপাশি গদ্য এবং অনুবাদেও স্বচ্ছন্দ।
সুপুরিবনের ছায়ায় ছায়ায় ।। সুবীর সরকার
সুপুরিবনের ছায়ায় ছায়ায়
পাঠকের হাট ।। অরুণ পাঠক
[আমার কাব্যজ্ঞানের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকেই দেখে আসছি অগ্রজ কবিরা তাঁদের বই অকাতরে উপহার দিচ্ছেন। মুখে তৃপ্তির হাসি দাতা ও গ্রহীতার। চার চোখে সমান আগ্রহ। আশে পাশে কৌতুহল। বয়সে অনেক ছোট হলেও বহু প্রতিষ্ঠিত বিদ্বান কবি অল্পবয়সী আমাকেও তাঁদের কাব্যগ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। আমিও আমার কাব্যগ্রন্থ ঝোলা থেকে বের করে কাঁপা কাঁপা হাতে কোনও শ্রদ্ধেয় অথবা স্নেহভাজন কবিকে উপহার দিয়ে স্বর্গীয় তৃপ্তি উপলব্ধি করি। আজও কোনও অনুষ্ঠানে গেলে এই কাব্যগ্রন্থ দেওয়া-নেওয়ার একটি বিশেষ পর্ব অলিখিতভাবে সূচিভুক্ত থাকে। তার বাইরে ডাক বিভাগের মাধ্যমেও অনেক কবি তাঁদের কাব্যগ্রন্থ আমার ঠিকানায় পাঠান।
নবীন-প্রবীণ, পরিচিত-অপরিচিত সেইসব কবিদের কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আমি এবার আমার অনুভবের দু-চার কথা বলতে চাইছি এখানে। তবে শুধু উপহার পাওয়া কাব্যগ্রন্থ নয় সেইসঙ্গে গাঁটের কড়ি খরচ করে যে অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ আমি এযাবৎ কিনেছি সেইসব কাব্যগ্রন্থেরও কোনও কোনওটি এই আলোচনার উপলক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।]
কিছু কিছু কাব্যগ্রন্থ আছে যেগুলো প্রথমবার পড়ে মনে হয় হৃদয় আঁচড়ালো না। তারপর প্রাত্যহিকতা তার আর সবকিছু দিয়ে জীবনকে সচল রাখে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল কোনও বেদনঘনানো আকুতি যত মৃদু আয়োজন নিয়েই উচ্চারিত হোক না কেন যদি সে সত্যিই কবিতা হয় তার মোহ অতিক্রম করা দুরূহ। কবিতা আক্রান্ত কোনও মানুষকে তা হাতছানি দেবেই। তখন আবার সেই শব্দতীর্থপদে আমাদের মাথা নত করতে হয়। যেমন:
যাদের হৃদয়ে ঝড় আছে
তারা প্রেমের ডাক বোঝে
গোপনে স্বীকার করে পার্ক
দু-একদিন সিনেমার টিকিট
সে রকম প্রস্তুতি ছাড়া
রাত্রির অতিক্রম ব্যর্থ হয়
প্রতিদিন নতুন ঠিকানা
তার কাছে ফিরে আসে। (২০)
আপাত নিরীহ এই দুটি স্তবকে খুব সাধারণভাবে বলা হয়েছে প্রেমের ডাক বোঝার জন্য হৃদয়ে ঝড় থাকার প্রয়োজন। বলা বাহুল্য এই অসামান্য সত্যটি আমি এই কবিতাটি পড়েই বুঝেছি। হৃদয়ে ঝড় অর্থাৎ নিজেকে প্রেমের জন্য তছনছ করে না ফেললে সত্যিই তার আসা-যাওয়া টের পাওয়া যায় না। কবির মতে এটা এক রকম প্রস্তুতি। সেটা ছাড়া রাত্রির অতিক্রম ব্যর্থ হয়। আর প্রতিদিন নতুন ঠিকানা তার কাছে ফিরে আসে। এই নতুন ঠিকানা কি নতুন নতুন মঙ্গল ঘট? নতুন নতুন প্রেমের? এমন সূক্ষ্ম অথচ স্বাভাবিক উচ্চারণ অনেক সময়েই আমাদের চোখে পাশ কাটিয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমারও তাই হয়েছিল। কিন্তু চোখের স্থবিরতা মনকে আটকে রাখতে পারে না। তাই বইটিকে আবার বের করতে হল। বইটির নাম 'পথের পুরোনো ধুলো'। কবি মানসকুমার চিনি। মানসদার অধিকাংশ কাব্যগ্রন্থই তাঁর কাছ থেকে উপহার পেয়েছি। আদম থেকে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটি তিনি আমাকে দিয়েছিলেন ১৩/০৪/২০১৪ তারিখে। মানসদাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম ১৯৯৯ বা ২০০০ সালে কোনও একদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসের গেটের ভেতরে বামপাশে বাঁধানো সিমেন্টের মেঝেতে। পা ঝুলিয়ে বসেছিলেন সাম্যব্রত জোয়ারদারের সঙ্গে। পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সুদীপ্ত মাজি। প্রথম দর্শনে নজর পড়েছিল তাঁর গলায় শোভিত রুদ্রাক্ষের মালায়। কোঁকড়ানো চুলে কালো ফ্রেমের চশমায় বহুল পঠিত এই কবিকে পাশে বসা সমকালীন আরেক কবি সাম্যব্রতর নাগরিক ঘরানার আত্মস্টাইলের সঙ্গে না গেলেও বেশ মনে ধরেছিল আমার। হাসি মুখে কথাও বলেছিলেন তিনি। তারপর কত জায়গায় কতভাবে তাঁর সঙ্গে দেখা। কত কাব্যগ্রন্থ আদানপ্রদান। হিসাব নেই। তেমনই একদিন। তেমনই এই কাব্যগ্রন্থ। মানসকুমার চিনি একজন বহুপ্রজ কবি। অসংখ্য কবিতার বই তাঁর। কাব্যগ্রন্থ ছেপে ঝোলা শূন্য করতেই তিনি ভালোবাসেন।
ঐতিহাসিক ভাস্কর্য খোদাইয়ের পর
শিল্পীকে মৃত মনে হয় (২৬)
শিল্পী কি একজন মানুষ শুধু? নাকি মানুষের অভ্যন্তরে শিল্পী জাগ্রত হন? আমাদের যাবতীয় দ্বিধাকে নস্যাৎ করে তিনি লেখেন:
যে কবি নরম ঘাসে শ্বাস নেয়
সে অক্ষর মাড়িয়ে চলে যায়
আর এক কবি। (৪৬)
আহা সময়! অলসতার কোনও স্থান নেই এ বিশ্বে। জরা-যন্ত্রণার আগেই আমাদের সমাপন করতে হবে নিজের কাজ। কীভাবে বুদবুদের মতো উদগ্রীব হয়ে উঠছে চেতনাসফল এইসব ভাষ্য। চোখের আঙিনা পেরিয়ে আমাদের জীবনের অন্ধিতে-সন্ধিতে সেঁধিয়ে যাচ্ছে আমরা এ কাব্যগ্রন্থ পড়লেই বুঝতে পারব।
কিশলয় পাঠের দিন, শিশুকাল
তোমার শরীরে মানায়
খেলার মতো নরম বয়স
নতুনপাঠ ইতিহাসে ঢাকা।
এখন উগ্রপন্থী শিশুর দল
নিখুঁত সময়ের মতো। (১৮)
যে শিশুজীবন আমরা পেরিয়ে এসেছি তার সঙ্গে এখনকার শিশুজীবন মেলানো যায় না। কিন্তু আমরা এই ভয়াবহ শিশুদের কি বলতে পারতাম 'উগ্রপন্থী শিশুর দল'? কবি বললেন। এবং আরও বললেন 'নিখুঁত সময়ের মতো'। ভীষণ আতঙ্কিত হওয়ার মতো এই বাস্তবতা। কিন্তু একে স্বীকার করা ছাড়া কোনও উপায় নেই।
খুব সংবেদী, নিরাভরণ কিছু আন্তরিক দেখা এখানে কবিতা হয়ে উঠেছে। কবির যাপন যেভাবে তার সমাজকে ধ্বস্ত করে কিংবা সমাজ যেভাবে কবির যাপনকে ধ্বস্ত করে সেই উভমুখ যখন কোনও কবির কলমে স্তব্ধতার অনুশীলন করে তখন আমরা যা যা পেয়ে যাই:
১ চাঁদের ভেতরে থাকে আঘাতের স্বর
বাতাসের ভেতর যে আলো পড়ে
খুব চেনা, কেউ কার! (২২)
২ যে লেখা পড়ে হারিয়েছ পথ
সে পাখি একদিন ফিরবে ক্ষত নিয়ে
মনের দিকে (২৯)
৩ কত চোখ ভিজে যায় কান্নার সাথে
চোখের পাতা যেন ফুলের বাগান। (৩৪)
৪ ও পূর্ণিমার পথ
চুপি চুপি ভালোবাসা হয়ে এসো
দেখো কীভাবে নক্ষত্র ফুটছে
কোনো প্রমাণ ছাড়াই। (৩৭)
এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। বোঝা যায় অন্তরে ভেঙেচুরে শেষ হয়ে যাওয়া এক কবিসত্তা কীভাবে মানব শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। হাঁটাচলা করেন। শুধুমাত্র কবিতাই কীভাবে হয়ে ওঠে একজন কবির শ্বাসক্রিয়া। এলোমেলো অথচ সংঘবদ্ধ, শুদ্ধ কিছু বাক্ যেন প্রলুব্ধ চিন্তার মতো ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে পারস্পরিক কোনও অন্বয় খুঁজে পাওয়া যায় না সে সবের। কিন্তু বোঝা যায় একজন কবির কম্পিত হাতে জীবনের রসায়ন নিঙরে ওঠা কিছু ব্যথা, কিছু বিচ্ছেদ আর সর্বজনীন এক বেঁচে থাকা।
বোধের অন্তরালে থাকে নির্মাণ
টুকরো মৃত্যুখণ্ড গড়িয়ে পড়ে
যেন পৃথিবীর একভাগ স্মৃতি।
শিল্পশরীরে থাকে জীবন ও শূন্যতা
ভেতরে সন্ন্যাস, তবু পুনর্জন্ম ভেবে
ভবিষ্যদ্ বাণী মাঝে মাঝে ভুল হয়। (স্মৃতি সন্ন্যাস)
হ্যাঁ, এসব লেখায় কিছু অসংলগ্নতা আছে। যে অসংলগ্নতা, যে হেঁয়ালিপনা কবিত্বশক্তির গুণে অনন্যতা পায় কবিত্বশক্তির সেই জোর হয়তো সবখানে নেই। কিন্তু ঢের বাংলা কবিতাকে অকারণ স্মার্টনেস আর জটিল অসংলগ্নতার গুণে, পর্যাপ্ত হেঁয়ালিপনার গুণে উতরে যেতে দেখেছি। একজন ফকিরের অন্তর্মোচন যেমন তার গানে, যে গান কেউ শুনবে সে কখনও কল্পনা করে না কবি মানসকুমার চিনিও তদ্রূপ।
এত বাঁক শরীরের ভেতরে থাকে!
আমি মুহূর্ত বুঝে অক্ষরের নীচে
লুকিয়ে পড়ি
যেন কাব্যের বহুদূরে স্তব্ধতা...
সমস্ত ইন্দ্রজাল ধ্বংস হবে একদিন
রহস্যের ভেতর সব ইতিহাস চেনা যাবে। (ইন্দ্রজাল)
বিলুপ্ত পথের আয়নার জন্য তাকিয়ে থাকা কবি, একগুচ্ছ ভয়ের শব্দ দিয়ে যৌনতাকে চিনতে চাওয়া কবি মানসকুমার চিনি এভাবেই অশোধিত অলিন্দের সমস্ত পাপকে কবিতায় শুদ্ধ করে তোলেন। আমি তাকিয়ে থাকি তাঁর ঝোলার দিকে। নতুন কোনও কবিতার বই বিলিয়ে দিতে দিতে কখন সেটি হালকা হয়ে যায়।
পথের পুরোনো ধুলো ।। মানসকুমার চিনি ।। আদম ।। আশি টাকা
পেশা : শিক্ষকতা। কবিতা লেখা ও পত্রিকা সম্পাদনার জন্য বেশ কয়েকটি পুরস্কারে ভূষিত।
নয়া বৃহদারণ্যক ।। দেবাশিস দাশ
নয়া বৃহদারণ্যক
৪. আত্মতত্ত্ব (contd.)
আত্মতত্ত্ব ব্রহ্মকথা না জেনে যতই
পুণ্য কাজ করা যাক, ব্যর্থ সমস্তই।
যেমন, না-করা কাজ, অপঠিত বেদ
কোনওই দেয় না ফল, আত্মার অভেদ—
সম্প্রীতির তত্ত্ব— এই জন্মে না জানলে
তেমনই খোলে না বিশ্বে মুক্তির জানলা।
এ-তত্ত্ব যে জানে, আত্মা তাকে রক্ষা করে।
তাছাড়া, শান্তির পথ দেশ দেশান্তরে
স্তীর্ণ হলে লোকে-লোকে বিভিন্ন সমাজে
যোগসূত্র পাওয়া যাবে, জ্ঞানে কর্মকাজে
শৃঙ্খলা যোজিত হবে। যেহেতু সবাই
একই আত্মার অংশ, সকলেই তাই
হিংসা-দ্বেষ-অমঙ্গল বর্জিত আবহে
বুদ্ধের মৈত্রীর পন্থী। গ্লানি বয়ে-বয়ে
যে-মানুষ পরিশ্রান্ত, তার জন্য পথ
আত্মতত্ত্বে খোলা আছে। নিখিল জগৎ
নানা ব্যঞ্জনায় ফুটে ওঠে এই জ্ঞানে।
আদি আত্মা যেরকম অপূর্ণ ব্যথায়
দয়িতা খুঁজেছিলেন, তেমনি সততায়
মানুষ পূর্ণতা খোঁজে সম্পদে-সন্তানে।
শরীরের মধ্যে আছে আত্মার সংসার—
এ-কথা যে জানে, জন্ম পরিপূর্ণ তার।
কারণ, মনই আত্মা, বাক্যই সঙ্গিনী,
প্রাণই সন্তান তার,— এভাবে কি চিনি?
মানব-সম্পত্তি চোখ, দৈব বিত্ত কান,
কর্মই শরীর তার,— জানে আত্মবান।
ছবি : বিধান দেব
জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র
জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন
ত্রয়োদশ পর্ব
শাও-তুং/সোতো সম্প্রদায়
লিয়াংচিয়ে (৮০৭-৮৬৯ খ্রিঃ) জন্মেছিলেন চিনের জেজিয়াং প্রদেশের হুই চি নামক স্থানের এক অভিজাত পরিবারে। বাল্যকালেই তিনি স্থানীয় এক মঠে বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন শুরু করেন। মঠের অধ্যক্ষ ছিলেন নিতান্ত সাদামাটা একজন বৌদ্ধভিক্ষু। বিভিন্ন শাস্ত্র মুখস্থ করানোই ছিল তাঁর কাজ, কিন্তু ব্যাখ্যা বা বুঝিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য তাঁর ছিল না। মহাযান বৌদ্ধ তত্ত্ব তথা চ্যান ঘরানা সম্পর্কে তিনি বিশেষ কিছু জানতেনও না। একদিন তিনি শিক্ষার্থীদের প্রজ্ঞাপারমিতাহৃদয় সূত্র পড়াচ্ছিলেন। ছেলেরা তাঁর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সমস্বরে পাঠ করছিল—
ধর্ম শূন্য সব শূন্য মহী শূন্যময়।
না নেয় জনম কেহ নাহি পায় লয়।।
বিশুদ্ধ কিছুই নাই, অশুদ্ধও নাই।
বৃদ্ধি বা ক্ষয় মায়া যা দেখিতে পাই।।
এ সকল শূন্যতার নিছক দ্যোতনা।
রূপ অনুভূতি চিন্তা রুচি বা চেতনা।।
নাহি চক্ষু কর্ণ জিহ্বা অথবা নাসিকা।
দেহ নাই মন নাই সবই মরীচিকা ।।
শেষ দুই চরণ উচ্চারণ করার সময় বালক লিয়াংচিয়ে-র মনে অনুসন্ধিৎসা জাগ্রত হল। সে সহসা দাঁড়িয়ে উঠে আচার্যকে জিজ্ঞাসা করল— আচার্য, এখানে পড়ছি চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক, দেহ, মন কিছুই নেই। কিন্তু বাস্তবে এগুলির সবই তো আমাদের আছে ! তাহলে পুথিতে এমন মিথ্যা কথা লেখা আছে কেন ?
লিয়াংচিয়ে-র জিজ্ঞাসায় আচার্য বেকায়দায় পড়লেন। তিনি দিনের পর দিন এইসূত্র পড়িয়ে চলেছেন। পড়িয়ে পড়িয়ে মুখস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেননি সূত্রটিতে ঠিক কোন কথা বলতে চাওয়া হয়েছে। তাঁর দীর্ঘ ভিক্ষু জীবনে কোনো শিক্ষার্থীই এই ধরণের জিজ্ঞাসা উত্থাপন করে তাঁকে বিড়ম্বনায় ফেলেনি। তিনি স্বীকার করলেন— এর উত্তর আমার জানা নেই। সত্যি কথা বলতে কী, আমি তোমার শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নই ! আমার বিশ্বাস এমন কেউ আছেন, যিনি তোমার জিজ্ঞাসার যথার্থ উত্তর দিতে পারবেন। তুমি বরং উ শিয়ে পার্বত্য মঠে যাও। সেখানে গিয়ে আচার্য লিং মো-র সঙ্গে দেখা করো।
বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে লিয়াংচিয়ে চললেন, উ শিয়ে পর্বত অভিমুখে। মঠে পৌঁছে তিনি মস্তক মুণ্ডন করে হলুদ চীবর ধারণ করে রীতিমতো সন্ন্যাসী হয়ে ওঠেন। আচার্য লিং মো-র কাছে কয়েক বছর থাকার পর তিনি গিয়ে পৌঁছালেন আচার্য বোধিধর্মের স্মৃতি বিজড়িত প্রসিদ্ধ শাওলিন মঠে। তখন তাঁর বয়স একুশ। অতঃপর তিনি মাজু তাওই-র ধর্মসূরি ন্যানচুয়ান পু ইউয়ান (জাপানি, নানসেন ফুঙান : ৭৪৯- ৮৩৫ খ্রিঃ)-এর সঙ্গে দেখা করতে তাঁর মঠে যান। ন্যানচুয়ান তখন গুরু মাজু-র মৃত্যুবার্ষিকী পালন নিয়ে বেশ ব্যস্ত ছিলেন। কাজের ফাঁকে তিনি শিষ্যদের উদ্দেশে বললেন— আগামীকাল আচার্য মাজুর স্মরণ অনুষ্ঠান, আমি ভাবছি তিনি আদৌ আসবেন কি না ? শিষ্যদের মুখে কোনো কথা নেই। তাঁরা ভাবছেন উত্তর দেওয়া কতটা সমীচীন হবে অথবা যথার্থ উত্তর কী হতে পারে ! উত্তর দিলেন লিয়াংচিয়ে— যথার্থ সঙ্গ পেলে অবশ্যই তিনি আসবেন। এমন উত্তর শুনে ন্যানচুয়ান অবাক হয়ে গেলেন। লিয়াংচিয়েকে কাছে ডেকে তিনি বললেন— এই নবীন সন্ন্যাসীকে ঠিক মতো মাজাঘষা করলে একদিন রত্ন হয়ে উঠবে। প্রত্যুত্তরে লিয়াংচিয়ে বলেছিলেন— মাজাঘষা করলে আসল বস্তুটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে। এহেন প্রত্যুত্তর পেয়ে প্রাজ্ঞ আচার্য ন্যানচুয়ান মুগ্ধ হয়েছিলেন। মাজু-র আগমন সম্পর্কিত লিয়াংচিয়ে-এর মন্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ধর্মে মৃতব্যক্তির স্মরণে অনুষ্ঠানের প্রথা আছে। অনেকের জিজ্ঞাসা সত্যিই কী স্মরণ অনুষ্ঠানে মৃতদের উপস্থিতি সম্ভব ! জীবনানন্দ দাশ তাঁর সাতটি তারার তিমির কাব্যগ্রন্থের ১৯৪৬-৪৭ কবিতায় এমন জিজ্ঞাসার সুন্দর ও সন্তোষজনক উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলছেন —
মৃতেরা কোথাও নেই; আছে?
কোনো-কোনো অঘ্রাণের পথে পায়চারি-করা শান্ত মানুষের
হৃদয়ের পথে ছাড়া মৃতের কোথাও নেই বলে মনে হয়;
অর্থাৎ মানুষের হৃদয়ের পথ ছাড়া মৃতদের অস্তিত্ব আর কোথাও নেই। সোজা কথা হল জীবিতরা স্মরণ না-করলে মৃতদের পৃথিবীতে ফেরা অসম্ভব। লিয়াংচিয়ে এই সহজ সত্যটাকেই তুলে ধরেছেন তাঁর বক্তব্যে। মাজুকে কেউ সঙ্গ দিতে চাইলে অর্থাৎ আন্তরিকভাবে তাঁর স্মৃতিচারণ করলে তবেই তিনি আসবেন স্মরণ অনুষ্ঠানে।
ন্যানচুয়ানকে বিদায় জানিয়ে লিয়াংচিয়ে চললেন, আচার্য মাজু-র অন্য এক শিষ্য কুয়েই শান-এর কাছে। একদা জাতীয় শিক্ষক আচার্য নানইয়াং হাইজ্যাং (জাপানি, নানইয়ো এচচো : ৬৭৫-৭৭৫ খ্রিঃ) একটি সূত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, নির্জীব বস্তুরাও সতত ধর্ম প্রচার করে চলেছে। লিয়াংচিয়ে নানইয়াং-এর এই ভাষ্যের কথা শুনেছিলেন। কিন্তু বুঝে উঠতে পারেননি কীভাবে নির্জীব বস্তু সমূহ ধর্মের প্রতিফলন ঘটিয়ে চলেছে প্রতি নিয়ত ! তিনি কুয়েই শানকে ধরে বসলেন, বিষয়টা ভালো করে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য।
লিয়াংচিয়ে— আচার্য আমার একটা জিজ্ঞাসা আছে। জাতীয় শিক্ষক নানইয়াং বলেছিলেন দেয়াল, পাথর ইত্যাদি নির্জীব পদার্থও সর্বদা ধর্মের কথা বলে চলেছে। যদি একথা সত্য হয়, তাহলে তাদের ভাষ্য কারা শুনতে পান ?
কুয়েই শান— নানইয়াং সত্য বলেছিলেন। তবে নির্জীব বস্তুদের ধর্মোপদেশ বোঝার ক্ষমতা খুব কম লোকেরই আছে।
লিয়াংচিয়ে— আমি আপনার কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আমাকে আরও সহজ করে বলুন।
কুয়েই শান তাঁর হাতের ছড়িটিকে সোজাসুজি উপরে তুলে ধরলেন। লিয়াংচিয়ে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন— সত্যি বলতে কী আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি !
লিয়াংচিয়ে-র হতভম্ব দশা দেখে কুয়েই শান বললেন— আমার বাবা-মায়ের দেওয়া মুখে এর বেশি আর বোঝানো সম্ভব নয়। আপনি বরং আচার্য ইয়ানইয়েন তানশেং (জাপানি, উঙগান দোনজো : ৭৮০-৮৪১ খ্রিঃ)-এর কাছে যান। এ ব্যাপারে নিশ্চয় তিনি আপনাকে সাহায্য করতে পারবেন।
লিয়াংচিয়ে, কুয়েই শান-এর কথামতো চললেন আচার্য ইয়ানইয়েন-এর সঙ্গে দেখা করতে। ইয়ানইয়েন স্বাগত জানালেন নবীন সন্ন্যাসীকে। সৌজন্যমূলক আলাপচারিতার পরেই শুরু হল কথোপকথন।
লিয়াংচিয়ে— জাতীয় শিক্ষক আচার্য নানইয়াং বলেছিলেন দেয়াল, পাথর ইত্যাদি নির্জীব পদার্থও সর্বদা ধর্মের কথা বলে চলেছে। কারা তাঁদের ধর্মকথা শুনতে সক্ষম ?
ইয়ানইয়েন— নির্জীব পদার্থেরাই শুনতে পান।
লিয়াংচিয়ে— আপনি কি শুনতে পান ?
ইয়ানইয়েন— যদি আমি তাদের উপদেশ শুনতে পেতাম, তাহলে আপনি আমার কথা শুনতে পেতেন না।
লিয়াংচিয়ে— আমি কেন নির্জীবদের ধর্মোপদেশ শুনতে পাচ্ছি না ?
কুয়েই শান যেমনটা করেছিলেন, ইয়ানইয়েনও ঠিক তেমন করেই তাঁর হাতের ছড়িটি উপরে তুলে ধরলেন।
ইয়ানইয়েন— আপনি কি কিছু শুনতে পাচ্ছেন ?
লিয়াংচিয়ে— না। কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।
ইয়ানইয়েন— আপনি আমার উপদেশ শুনতে পাচ্ছেন না। তাহলে কীভাবে নির্জীবদের উপদেশ শুনতে পাবেন? আপনি কি অমিতাভ বুদ্ধ সূত্র পড়েছেন ? সেই সূত্রে বলা হয়েছে গাছ, বন, পাখি, ঝরনা সবাই বুদ্ধের নাম জপছে।
এই আশ্চর্য কথা শুনে লিয়াংচিয়ে-র বোধিচিত্ত জাগ্রত হয়। তিনি তাঁর এই জাগরণকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য একটি শ্লোক রচনা করেন। শ্লোকটি এইরকম—
অতি বিস্ময়কর আহা মহা বিস্ময়কর ।
নিষ্প্রাণেরাও ধর্মকথা শোনায় নিরন্তর।।
এখন জানি সেই সুবচন কর্ণে শোনার নয়।
চোখ দিয়ে তা শুনতে চাইলে তবেই শ্রুত হয়।।
লিয়াংচিয়ে-র কী এমন হল যে, তিনি বুঝে গেলেন নিষ্প্রাণেদের ধর্মকথার রহস্য ! এটা বুঝতে গেলে তথাকথিত ধর্মানুসারীদের একটি সার্বিক ভ্রান্তির বিষয়ে আলোকপাত করতে হয়। এই ভ্রান্তিটি হল, আধ্যাত্মিকতার উপর অলৌকিকতার আরোপ। ধর্মের আদিযুগে রূপক-প্রতীক বা ইঙ্গিতের মাধ্যমে অনেক গূঢ় তত্ত্বকথা বলা হয়েছিল। উত্তরসূরিরা সেই আলংকারিক প্রয়োগ না- বুঝে অন্ধের মতো এক জায়গায় স্থির থেকে কেবল বাইরের খোলসটাকে পালিশ করে গেছেন প্রাণপণ। পরম্পরিত ধারণার শিকার লিয়াংচিয়েও অলৌকিকতার মোহে পড়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন নির্জীব পদার্থেরা বোধহয় কথা বলতে পারে। তাদের সেই কথা তথা ধর্মবাণী কেবল সিদ্ধপুরুষই শুনতে পান ! তাই তিনি তেমন একজন অলৌকিক ক্ষমতাধর সিদ্ধপুরুষের সন্ধান করছিলেন। ইয়ানইয়েন যখন কুয়েই শান-এর মতো একইভাবে হাতের ছড়িটি উপরে তুলে ধরলেন, তখন তিনি কিছুটা অনুমান করলেন। পরে অমিতাভ বুদ্ধ সূত্র শুনে বিষয়টা যথাযথভাবে অনুধাবন করলেন। হস্তধৃত ছড়ি উপরে তুলে ধরার অর্থ জাগতিক বন্ধন ছিন্ন করে বোধি-জাগরণের পথে মাথা তুলে দাঁড়ানো। নির্জীব ছড়িটি লিয়াংচিয়েকে এই উপদেশই দিয়েছিল। কিন্তু প্রচলিত ধর্মজ্ঞান দ্বারা চালিত হয়ে তিনি ছড়িটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন তার কথা শোনার জন্য। পরে ইয়ানইয়েন যখন সূত্র উদ্ধৃত করে বললেন গাছ, বন, পাখি, ঝরনা সবাই বুদ্ধের নাম জপছে, তখন লিয়াংচিয়ে অলৌকিকতার মোহ ছিন্ন করে যুক্তিনিষ্ঠ হলেন। তিনি বুঝলেন বুদ্ধ এখানে শাক্যবংশীয় গৌতম নয়, বুদ্ধ এখানে প্রত্যেক বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তা। জগতের প্রতিটি বস্তুই তার অন্তর্নিহিত সত্তাকে বাইরের রূপ দিয়ে প্রতিভাত করছে। প্রতিটি বস্তুই তার এই বাহ্যিক রূপ দিয়ে আমাদের কিছু ধারণা বা শিক্ষা দিয়ে চলেছে। তখন তিনি উপলব্ধি করলেন নিষ্প্রাণেদের ধর্মকথা কানে শোনার নয় ; চোখে শোনার বিষয় অর্থাৎ তাদের পর্যবেক্ষণ করে বুঝে নিতে হয়। লিয়াংচিয়ে নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজেই লজ্জিত হন। বস্তুত এমনটাই ঘটে, পাখির পালকের মতো নির্ভার আধ্যাত্মিকতাকে আমরা গুরুভার গন্ধমাদন জ্ঞান করে আমৃত্যু অজ্ঞানতার দাসত্ব করি। বিষয়টা সহজে বোঝার জন্য আমরা সুনির্মল বসুর লেখা সবার আমি ছাত্র নামক চমৎকার ছড়াটির দ্বারস্থ হতে পারি। এই ছড়ায় কবি যথাক্রমে আকাশ, বাতাস, পাহাড়, খোলা-মাঠ, সূর্য, চন্দ্র, সাগর, নদী, মাটি, পাষাণ, ঝরনা ও শ্যাম বনানীর কাছে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন। ছড়াটির উপসংহারে তিনি বলেছেন—
এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়
পাঠ্য যে-সব পাতায় পাতায়,
শিখছি সে-সব কৌতূহলে
সন্দেহ নাই মাত্র।
এই ছড়াটির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে কেউ যদি পৃথিবীর বিরাট খাতা কোন জাদুঘরে রাখা আছে তা খুঁজতে বের হন, তার দশা হবে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া লিয়াংচিয়ে-এর মতো।
লিয়াংচিয়ে, বেশ কিছুকাল ইয়ানইয়েন-এর সঙ্গ করেন। একদা তিনি অন্য কোনো মঠে যাওয়ার জন্য মনস্থির করেন। তবে ঠিক কোন দিকে বা কোন মঠে যাবেন তা ভেবে ওঠেননি। পা যে দিকে চলবে সে দিকেই যাবেন, এরকম একটা ভাব তাঁর মনে। ইয়ানইয়েন-এর কাছে গেলেন বিদায় নিতে।
ইয়ানইয়েন— তা কোনদিকে যাওয়া হচ্ছে শুনি ?
লিয়াংচিয়ে— ভেবে দেখিনি।
ইয়ানইয়েন— হুনানের দিকে যাওয়ার ইচ্ছা আছে নাকি ?
লিয়াংচিয়ে— না।
ইয়ানইয়েন— নাকি বাড়ির দিকে যাওয়া ইচ্ছে ?
লিয়াংচিয়ে— না।
ইয়ানইয়েন— খুব তাড়াতাড়ি ফেরার ইচ্ছা আছে, নাকি ফিরতে দেরি হবে ?
লিয়াংচিয়ে— আপনার নতুন মঠ হওয়ার সময় ফিরব।
ইয়ানইয়েন— একবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর, পুনরায় দেখা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
লিয়াংচিয়ে— না-দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
কিছুটা বিরতি নিয়ে লিয়াংচিয়ে পুনরায় বলেন— ভবিষ্যতে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে আপনার কাছে আমি কী শিখেছি, তখন কী উত্তর দেব ?
ইয়ানইয়েন বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত করলেন, অতঃপর বললেন— এটুকু বললেই হবে।
তারপর কিছুক্ষণের বিরতি নিয়ে বললেন— এক মহান দায়িত্ব এখন আপনার মাথায়। বিষয়টা বিশেষ বিবেচনায় রাখবেন।
এইভাবে লিয়াংচিয়ে হয়ে ওঠেন আচার্য ইয়ানইয়েন-এর সুযোগ্য ধর্মসূরি। ফেরার পথে লিয়াংচিয়ে ইয়ানইয়েন-এর শেষ সংলাপটুকু নিয়ে ভাবতে থাকেন। পথে একটি স্রোত পার হওয়ার সময় জলে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে তিনি বোধি লাভ করেন। একটি পদ্যে তিনি তাঁর এই অভিজ্ঞতাকে ধরে রেখেছেন। পদ্যটি এইরকম—
খুঁজেছি যখন অন্যের দোরে দোরে,
পাইনি তাকে সরে গেছে বহু দূরে।
খোঁজ নিয়ে আজ নিজস্ব অন্দরে,
পাই তাকে আমি বিদেশ-বিভূঁই ঘুরে।
আমার থেকে সে আদৌ ভিন্ন নয়,
যদিও সে আর আমি এক নই মোটে।
যখন নিগূঢ় তত্ত্বটা জ্ঞাত হয়,
বুদ্ধ তখন অন্তরে জেগে ওঠে।
৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রায় বাহান্ন বছর বয়সে লিয়াংচিয়ে পোঁছান চিয়াংশি প্রদেশের কাও-আন নগরের শাও তুং পর্বতে। সেখানে তিনি অনুসারীদের নিয়ে একটি মঠ নির্মাণ করেন। ক্রমশ লিয়াংচিয়ে নামের পরিবর্তে তিনি শাও তুং বা শাও তুং লিয়াংচিয়ে নামে পরিচিত হন। তিনি অনুসারীদের নিয়ে বুদ্ধের অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুশীলন শুরু করেন। বিশেষত সম্যক সমাধির অন্তর্গত সম্যক স্মৃতিকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। সম্যক স্মৃতির মূল কথাই হল, মন ও দৈহিক অবস্থা সমূহের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ এবং আমাদের অস্তিত্ত্ব ও জগৎ সংসারের অস্তিত্ত্বের অনিত্যতাকে স্মৃতিতে ধারণ। লিয়াংচিয়ে কবিতাও লিখতেন। তিনি ক্রমানুবর্তী পাঁচটি কবিতার মাধ্যমে ধ্যান-অনুশীলনের পাঁচটি স্তর বা পর্যায়কে চিহ্নিত করেছেন।
প্রথম স্তর চেন চং পিয়েন । এই প্রাথমিক স্তরে বুদ্ধ-প্রকৃতি সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা জাগরিত হয়। সাধক ধ্যানে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
দ্বিতীয় স্তর পিয়েন চং চেন । এই স্তরে সাধক উপলব্ধি করেন তিনি জগৎ সংসারের সমস্ত কিছুর সঙ্গে এক ঐক্যের সূত্রে আবদ্ধ।
তৃতীয় স্তর চেন চং লাই । এই স্তরে সাধক শূন্যতাকে অনুধাবন করেন।
চতুর্থ স্তর পিয়েন চং চি । এই স্তরে সাধক আবার জাগতিক হয়ে ওঠেন। তিনি জগতের সমস্ত কিছুর মধ্যে নিজেকে খুঁজে পান। তবে কোনো বিকারই তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।
পঞ্চম স্তর চিয়েন চং তাও । এই স্তরে সাধক এক সাম্যদৃষ্টির অধিকারী হন। তাঁর কাছে জ্ঞান-অজ্ঞান, ভালো-মন্দ এসবের দ্বৈততা ঘুচে যায়। তিনি তখন স্বাধীন, নির্বিকার, নিরাসক্ত।
তাং আমলের অন্যান্য অনেক চ্যান-আচার্যের মতো লিয়াংচিয়ে-এর তিরোধান নিয়েও কিংবদন্তী আছে। লিয়াংচিয়ে তখন বাষট্টি বছর বয়স্ক। একদিন তিনি শিষ্যদের ডেকে তিরোধানের দিনটি নির্দিষ্ট করেন। নির্ধারিত দিনে মস্তক মুণ্ডন ও স্নানাদির পর তাঁকে নতুন চীবর পরিধান করানো হয়। উপবিষ্ট অবস্থায় তিনি প্রাণত্যাগ করেন। শিষ্যেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। লিয়াংচিয়ে চোখ খুলে সবাইকে কাঁদতে নিষেধ করেন। তারপর বলেন—
বুদ্ধ-পথের পথিক হয়ে যাঁরা অনিকেত জীবন বেছে নেন, তাঁদের এমন আচরণ অনভিপ্রেত। সমস্ত বস্তুই পরিবর্তিত বা লয়প্রাপ্ত হয়। দুঃখ করে লাভ কী !
এটাই ছিল তাঁর শেষ কথা।
লিয়াংচিয়ে-এর ধর্মসূরি পেন চি (জাপানি, সোজান হোনজাকু : ৮৪০-৯০১ খ্রিঃ)। তিনি ছিলেন বর্তমান চিনের ফুচিয়েন প্রদেশের পু-তিয়েন অঞ্চলের বাসিন্দা। উনিশ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করে ফুচৌ-এর লিং-শি পর্বতের এক মঠে গিয়ে ওঠেন। তেইশ বছর বয়সে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। লিয়াংচিয়ে-এর সঙ্গে পেন-চি-র প্রথম সাক্ষাতের কথোপকথনটি চ্যান-ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
লিয়াংচিয়ে— আপনার নাম কী ?
পেন-চি— আমার নাম পেন-চি।
লিয়াংচিয়ে— আপনি বুদ্ধ-প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু বলুন।
পেন-চি— আমি কোনো কথাই বলব না।
লিয়াংচিয়ে— কেন আপনি কথা বলবেন না ?
পেন-চি— তাহলে আমাকে আর কেউ পেন-চি (নামটির অর্থ প্রকৃত নীরব ) নামে ডাকবে না।
লিয়াংচিয়ে পেন-চি-র এই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে চমকিত হন।
পেন-চি, আচার্য লিয়াংচিয়ে-এর পঞ্চস্তরীয় সাধন-পর্যায়কে শক্তপোক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। এছাড়া তাঁর অন্য একটি উল্লেখযোগ্য কাজের সন্ধান পাওয়া যায় চ্যাননথিতে। তিনি তাং যুগের প্রাজ্ঞ কবি হানশান-এর পদ্যসংকলন হানশানশি-র অন্যতম সংকলক ও ভাষ্যকার। যদিও তাঁর এই সংকলনটি আবিষ্কৃত হয়নি। পেন-চি তাঁর নিজস্ব মঠ গড়ে তোলেন শাও-শান নামক পর্বতে। পর্বতের নামানুসারে তিনি শাও-শান বা শাও-শান পেন-চি নামে খ্যাত হন। তুং-শান লিয়াংচিয়ে এবং শাও-শান পেন-চি এই দুই আচার্যের নামের প্রথমাংশ জুড়ে শাও-তুং নামটি তৈরি হয়, যা নবগঠিত চ্যান সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করে।
পেন-চি-র মৃত্যু সম্পর্কে একটি চমকপ্রদ গল্প আছে। একদা পেন-চি, মঠের এক সন্ন্যাসীকে ডেকে বলেন— আপনি বলতে পারেন আজ কোন মাসের কত তারিখ ?
সন্ন্যাসী— আচার্য, আজ জুন মাসের পনেরো তারিখ।
পুনশ্চ পেন-চি বললেন— আগামীকাল আমি যাবজ্জীবনের জন্য তীর্থযাত্রায় বেরোব। মঠের সবাইকে বলে দেবেন।
পরের দিন পেন-চি দেহত্যাগ করেন তখন তাঁর বয়স হয়েছিল বাষট্টি বছর।
পেন-চি-র মৃত্যুর পর তাও-ইন, ফু-জিৎ, চিয়াং-শান প্রমুখের হাত ধরে শাও-তুং সম্প্রদায় সমগ্র চিনে ছড়িয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে আচার্য দোগেন জেনজি (১২০০-১২৫৩ খ্রিঃ) শাও-তুং সম্প্রদায়কে জাপানে বহন করে নিয়ে যান। লিয়াংচিয়ে (জাপানি নাম, সোজান) ও পেন-চি (জাপানি নাম তোজান ) — শাও-তুং সম্প্রদায়ের এই দুই প্রতিষ্ঠাতার জাপানি নামের প্রথমাংশ থেকে জাপানে এই সম্প্রদায় সোতো নামে পরিচিতি পায়। বর্তমান সময়ে প্রাণবন্ত চ্যান-সম্প্রদায়গুলির মধ্যে সোতো অন্যতম।
তথ্যঋণ :
1. ZEN BUDDHISM : A HISTORY INDIA AND CHI
2.ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EASTBY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.
3. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON.
4. HISTORY OF ZEN BY YU-HISIU KU; SPRINGER, SINGAPORE.
ছবি: বিধান দেব
লেখক পরিচিতি ।। জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৬, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবার মহকুমার ভগবানপুর (হরিণডাঙা) গ্রামে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখার সূত্রে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। লেখেন প্রবন্ধ ও গল্প ।
প্রকাশিত পুস্তক :
কাব্য পুস্তক : আমার আত্মার পায়ে বাঁধার ঘুঙুর, যাপনচিত্র, ২০১৯; সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে, সাহিত্যের বেলাভূমি ২০২০
প্রবন্ধ পুস্তক : জেন : রিপুতাড়িত মানবের নিকট সুসমাচার ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কলিকাতা লেটার প্রেস, ২০১৯
সম্পাদিত পত্রিকা : পাড়ি