বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২১

ল্যাপিস লাজুলি ।। সায়ন রায়



৫.

শীতের সর্পিল ফেনা বসন্ত-বারুদে তেতে লক্ষ লক্ষ শব্দের ভ্রূণ 

Sparse breaths, then none—

and it was done.

Listening and hugging hard,

between mouthings

of sweet next-to-nothings

into her ear—

pillow-talk-cum-prayer—

I never heard

the precise cadence

into silence

that argued the end.

Yet I knew it had happened. 

Ultimate calm.

[A Scattering/ Christopher Reid]

 

একটা উদ্ভট জামা গায়ে দিয়ে চলেছে একটা হাতকাটা বেড়াল।সকল বৃষ্টির দানাগুলো চোখের জলের মধু সঞ্চয় করে সুমিষ্ট মিছরি হয়ে উঠেছে। উপভোক্তার দল আয়েস করে চুষছে সেইসব মিছরির দানা।কেউ কেউ মিছরির ছুরিও ব্যবহার করছে নির্দ্বিধায়।হাটে বাজারে হাতির ছানা বিক্রি হচ্ছে কেজি দরে।খাইয়ে দাইয়ে কে কত পেটমোটা দানবাকৃতি হাতি বানাতে পারে, সেই নিয়ে চলছে এক অসম প্রতিযোগিতা। বহুদিন হলো নিকটবর্তী গ্রহের সাথে আমাদের চিঠি চালাচালি বন্ধ।কী এক হরতালে তাল কেটে গেছে সকল টেলিগ্রাফ তারের।সময় নিয়ে লোফালুফি খেলছে সার্কাসের বাঁদর।পাথরের দাঁত পরে দাঁত ক্যালাচ্ছে দশটা-পাঁচটার হুল্লোড়বাজ অফিসযাত্রীরা।তুষার ঝরছে।বেগুনি রঙের সেইসব তুষারে মিশে আছে সকল চুপ-কথা আর মনের গূঢ় ও গহীন আশ্চর্য। 

~~

গত শতাব্দীর সত্তর দশকের শেষ ও আশির দশকের গোড়ার দিকে ইংরেজি কবিতায় স্বল্পসময়ের জন্য এক নতুন ধরনের কবিতা রচনার সূচনা হয়েছিল, যা মার্সিয়ান পোয়েট্রি নামে পরিচিতি পায়।এই কবিতায় দৈনন্দিন ব্যাপারস্যাপার ও মানুষের আচরণ অদ্ভুত ভাবে বর্ণিত হত, যেন একজন মঙ্গলগ্রহের অধিবাসী এই পৃথিবীতে বেড়াতে এসেছেন এবং তার কাছে এই পৃথিবীর সবকিছুই মায় মানুষজনের কাজকর্ম দুর্বোধ্য ঠেকছে।জগৎ,সমাজ ও বস্তুসকলের প্রতি এক বিচ্ছিন্নতা (alienation)-কে প্রকাশ করেছিল এই কাব্যান্দোলন তথা এই আন্দোলনে অংশভাক্ কবিরা।এই আন্দোলনের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত দুজন কবি হলেন ক্রেগ রেন এবং ক্রিস্টোফার রিড।ক্রেগ রেন-এর 'A Martian Sends a Postcard Home' মার্সিয়ান পোয়েট্রির একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।এই কবিতায় একজন মার্সিয়ান অপর একজন মার্সিয়ানকে এই পৃথিবীর ব্যাপারস্যাপার অদ্ভুতভাবে বর্ণনা করছেন।তিনি বই-কে বলছেন 'ক্যাক্সটন' (প্রথম ইংরেজ মুদ্রকের নাম / তাঁর মুদ্রিত বই) এবং বই-কে বর্ণনা করছেন এইভাবে :

   mechanical birds with many wings

perch on the hand

cause the eyes to melt

or the body to shriek without pain

পরিচিতকে অপরিচিত করে তোলার এই ধারাটি উপন্যাসে নিয়ে আসেন মার্টিন অ্যামিস।১৯৮১ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘Other People : A Mystery Story' উপন্যাসে গল্পটি বর্ণিত হয় নায়কের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, যেখানে তিনি অ্যামনেসিয়া আক্রান্ত এবং মানব অভিজ্ঞতার সাধারণ ধারণাগুলিও তার স্মৃতিতে হারিয়ে গেছে। স্যুররিয়ালিজমের কাছাকাছি এই মার্সিয়ান পোয়েট্রির জন্ম হয় ষাটের দশকের এক্সপেরিমেন্টাল পোয়েট্রির পরিপ্রেক্ষিতে।যদিও তার ঋণ ছিল মেটাফিজিকাল পোয়েট্রি,অ্যাংলো স্যাক্সন রিডল ও ননসেন্স পোয়েট্রির কাছে।

~~

একটা ছোট কমলা রঙের নদী ধীরগতিতে নিজের মনে বয়ে চলেছে।আশ্চর্য উদাসীন।তাকে ডাকলেও দেয় না সাড়া।নদীর দুপারে দুজন মানুষ,চাল নেই চুলো নেই,কোথা থেকে যে এসে পড়েছে নিজেরাই জানে না।ছেঁড়া-ফাটা জামা,তাদের মুখাবয়ব ততোধিক জীর্ণ ও বিষণ্ণ।হয়তো নয়,কিন্তু মনে হচ্ছে একজন কালা, অপরজন অন্ধ।তারা নদীর দুপারে পরস্পরের অস্তিত্ব অনুভব করেছে।চারিদিকে ধূসর আর মরা প্রকৃতি।প্রাণের চিহ্নটুকু নেই।এই বিরান ভূমিতে দুপারে দুজন,মাঝে কমলা রঙের নদী।এক অস্ফুট গোঙানির মত শব্দ,অর্থহীন—বেরিয়ে আসছে তাদের মুখ থেকে : ব্যা ব্যা ব্যা—ক্রির ক্রির ক্রির—ট্রাম ট্রাম ট্রাম-ফট ফট ফট...

~~

১৯৫৩ সালের ৫ই জানুয়ারি প্যারিসের 'ব্যাবিলন থিয়েটারে' এক অচেনা আইরিশম্যানের লেখা নাটক মঞ্চস্থ হয়।নাম : En Attendant Godot'। স্যামুয়েল বেকেট ফরাসিতে লেখা তার এই নাটকটি পরে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং ১৯৫৫ সালে তা লন্ডনে মঞ্চস্থ হয়।১৯৫৬ সালে তা অভিনীত হয় আমেরিকায়।এই নাটকটি এতদিন পর্যন্ত প্রচলিত থিয়েটারের সমস্ত রীতিনীতিকে ভেঙে তছনছ করে দেয়।থিয়েটারে সূচিত হয় নতুন সম্ভাবনার পথ।অনেকে বলে থাকেন ইউরোপীয় থিয়েটারে তিনটি স্তম্ভ : শেক্সপীয়ার, ইবসেন, বেকেট।যাইহোক এই নতুন ধরনের নাটককে 'থিয়েটার অফ দ্য অ্যাবসার্ড ' আখ্যা দেওয়া হয়।নামটি দিয়েছিলেন সমালোচক মার্টিন এসলিন।যদিও এই নামটিতে বেকেট-এর আপত্তি ছিল।স্যামুয়েল বেকেট, আর্থার অ্যাডামভ, ইউজিন আয়নেস্কোর নাটককে এই নামে চিহ্নিত করলেন এসলিন।সার্ত্র এবং কামু চর্চিত এক্সিসটেনসিয়ালিজম-এর গভীর প্রভাব ছিল এই থিয়েটারে।এই থিয়েটারের মূল ফোকাস ছিল এমন এক অবস্থাকে চিত্রিত করা যখন মানব অস্তিত্ব তার অর্থ ও উদ্যেশ্য হারিয়ে ফেলেছে।মানুষে মানুষে সকলরকম যোগাযোগ ভেঙে পড়েছে।গঠনগত দিক থেকে এই নাটক বৃত্তাকার।নাটকটি শেষ হয় সেখানে, যেখানে নাটকটি শুরু হয়েছিল।সকল সংলাপ ও প্রতর্ক অসংগত ও অযৌক্তিক হয়ে ওঠে যার চূড়ান্ত পরিণতি নীরবতা। 'Nothing happens,nobody comes,nobody goes.It's awful !’ ‘ওয়েটিং ফর গোডো' নাটকের পাঁচটি চরিত্রের মধ্যে অন্যতম মুখ্য চরিত্র ইস্ট্রাগন-এর এই সংলাপটিতেই নাটকটির ভরকেন্দ্র বিধৃত রয়েছে।নাটকের আরেকটি চরিত্র লাকি, যে একজন ক্রীতদাস, যার  গলায় বাঁধা এক বিরাট দড়ি। যেটির অপর প্রান্তটি ধরে তার মালিক পোজো মঞ্চে প্রবেশ করে।প্রায় তিনপাতা জোড়া লাকি-র দীর্ঘ মনোলগটি গুরুগম্ভীর,দার্শনিক শব্দবন্ধ ও ততোধিক লঘু শব্দের মিশেলে এক ভাবউদ্রেককারী,অর্থহীন,করুণ ও নিষ্ফল আস্ফালন ছাড়া কিছুই নয়।যদিও 'ওয়েটিং ফর গোডো' নাটকে কাহিনি,চরিত্র,ক্রিয়া(action),মঞ্চ—সবকিছুতেই ন্যূনতমকে গ্রহণ করা হয়েছে।এই নাটকের পাহাড়প্রমাণ সাফল্যের পর বেকেট তার পরবর্তী নাটকগুলিতে আরো চূড়ান্ত পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। যেমন  'এন্ডগেম' (১৯৫৭) নাটকের তিনটি চরিত্রের দুজন ডাস্টবিনে বন্দী, অপরজন চাকালাগানো আর্মচেয়ারে বসে।'হ্যাপি ডেইস' (১৯৬১)-এ মূল নারী চরিত্র উইনি-কে প্রথমার্ধে দেখা যায় এক মাটির ঢিবির মধ্যে কোমর পর্যন্ত ডুবে আছে, শেষার্ধে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকতে দেখা যায় তাকে।'নট আই'(১৯৭২)-এ দেখানো হয় একজন মহিলার মুখটুকু।তার শরীরের বাকি অংশ ছায়ায় ঢাকা থাকে।তার দুটি নাটক 'অ্যাক্ট উইদাউট ওয়ার্ডস (১ ও ২)-তে কোন শব্দ নেই।মাইম ব্যবহৃত হয়।এরই চূড়ান্ত পরিণতি দেখা যায় 'ব্রেথ' (১৯৭০) নাটকে।এক মিনিট দৈর্ঘ্যের এই নাটকে নিঃশ্বাসের উত্থান পতনের শব্দ ও কান্নার ধ্বনির সঙ্গে নিরাভরণ মঞ্চে আলো বাড়ে ও কমে। বেকেট ১৯৬৯-এ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান।

~~

প্রকাণ্ড এক শব্দে ঘুম ভেঙে যায়।আকাশের বুক চিরে নেমে আসছে হাজার হাজার মশাল।দিগন্ত জোড়া বিস্তীর্ণ মাঠে এক কালো ঘোটকী দৌড়ে বেড়াচ্ছে প্রাণান্তকর। কান পাতলে শোনা যায় তার হ্রেষা।হাজার হাজার জোনাকি ফুটে আছে গাছে।ভামবেড়ালের চোখের ভাটিতে রুটি সেঁকছে এক বৃদ্ধা।মাংসের ঘ্রাণ ছড়াতে ছড়াতে প্রজাপতিদল বাগান-বিহারে।যৌনসুখানুভূতির স্বপ্নে কেঁপে কেঁপে উঠছে বৃদ্ধের রোম।রোম জ্বলছে,বেহালা বাজাতে বাজাতে ভাবোন্মাদ নিরো উলঙ্গ হয়ে নৃত্যের কথা ভাবছেন।মুঙখের ক্যানভাস থেকে নেমে এসে ভীত রমণী এই অবেলায় আকাশ ফাটিয়ে আর্তনাদ শুরু করলো।অজস্র সুতোর ঢেউ চরাচর জুড়ে। পাতলা বালির স্তর পর্দার মত লম্বালম্বি ঝুলছে। অর্ধ্বস্বচ্ছ। একটার পর একটা পর্দা ঠেলে যেতে যেতে শামুকের খোল,অন্ধকার।উল্টোদিকে বাজির নকশা,উড়ো খই, হাতেমতাই—ননসেন্স,ননসেন্স।এক মহাজাগতিক ননসেন্সের তরঙ্গায়িত ঢেউ আছড়ে পড়ছে ইথার সমুদ্রে।হাফ-পাগল,হাফ-উন্মাদ একজন দুজন তেজস্ক্রিয় ঠোঙায় ধরে রাখছে সেইসব মহাজাগতিকতার সামান্য বিদ্যুৎ। 

~~

দক্ষিণবঙ্গের একজন কবি, সদ্যপ্রয়াত।উত্তরবঙ্গের একজন সিনিয়র কবি।জীবিত, সুস্থ,সৃষ্টিশীল।প্রথমজন শম্ভু রক্ষিত। দ্বিতীয়জন বিজয় দে।এদের দুজনের কবিতায় পাচ্ছি মহাজাগতিক ননসেন্স-এর সুদূরপ্রসারী ব্যাপ্তি ও বিষাদ।সামান্য নমুনা : ‘ চাঁদের চোরা আলো চিবোতে চিবোতে মুখের পূর্বপাড়া /যত অস্ত যেন এখানেই/ হে প্রতিদিন নতুন নতুন দারিদ্রসীমারেখা/ তোমার ছায়ার নীচে থুতু একটি দুঃখ-শেখার স্কুল খুলেছে.....(চাঁদপুর/সকল বৃক্ষের চুমুক/বিজয় দে)। আরেকটি নমুনা : ‘তার আগে নাড়াচাড়া,যেমন সমস্ত উদাসীনতায় চিন্তার বিষয় ও / অনুসন্ধান প্রাণ যোগ করা যায় কি-না।দূরের কথা,উৎকীর্ণ বেগ বলতে/ যা বোঝায়।কম নয়,অসহ্য; সেথায় সংঘর্ষ বেধেছিল/প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, অন্য কেউ কোথায় রেখে যায়।বৃহৎ টান একরকম,হলুদ রং/ ফলাফল এক—পুরুষের বোধ,উপলব্ধি, জগৎ কল্পনা/ তারপর তোলাছবি,অষ্টম ভ্রাতা,মহাকাশ বিজয়ের যুগ মানুষের ভয়াবহত্ব... (নং-৩৭/ প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না / শম্ভু রক্ষিত)। 

~~

দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে, আগুন জ্বলছে। শীত করছে, ভীষণ শীত...


ছবি : বিধান দেব 


সায়ন রায়

জন্ম ১৯৭৭-এ। পেশা শিক্ষকতা।বিষয় ইংরেজি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'মহামানবের পোশাক' প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে 'কবিতাপাক্ষিক' থেকে।এখনও পর্যন্ত কবিতার বইয়ের সংখ্যা সাত। পেয়েছেন 'শব্দসিঁড়ি' পত্রিকা প্রদত্ত 'সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্মারক সম্মান'।সম্পাদনা করেন 'গুহালিপি' নামের একটি কবিতা বিষয়ক পত্রিকা। একমাত্র গদ্যের বই An Endless Journey : Revisiting Goutam Ghose Cinema।শখ : বইপড়া, ঘুরে বেড়ানো।

 

 

 

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন