রবিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২১

আবহবিকার ।। রাজদীপ রায়




 শমীপোকা ও অর্জুনের বিষাদযোগ 


লাল, রেকসিনে বাঁধাই ছিল বইটা। ঠাকুরঘরে ঢুকে নকুলদানা খেলে কেউ কিছু বলত না, কিন্তু এই বইটায় হাত দেওয়া যাবে না। কেন? এমন কী আছে সেই বইতে? পাতাগুলো হলদে হয়ে বেরিয়ে-বেরিয়ে এসেছে মলাট পেরিয়ে। তার ওপর সামান্যতম লোহাচুরের আস্তরণও পড়ে না; পড়বে কী করে? রোজ এই বই বাবা ওল্টায়, পাঠ করে ঠাকুরঘরে। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃতর পাশে এই বইটা রাখা থাকে তাকে। এই বইকে প্রথম দেখেছিলাম ঠাকুমার চলে যাওয়ার সময়। দিদি কান্নাগলায় ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিল, তারপর ঘুমচোখেই সেই মাঝরাতে দেখা একটি দৃশ্য আমার চোখে চিরকালীন: সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা ঠাকুমার শরীর—প্রায় নিথর; সবাই ঘিরে দাঁড়িয়ে, কেউ পাশে বসে। কেউ আঁচল দিয়ে ঢেকেছে মুখ, কারোর চোখ থেকে সমুদ্রের স্বাদ গড়িয়ে নামছে। বাবা কাঁদছে না, একমনে পড়ে যাচ্ছে একটা বই থেকে। ওই লাল রেকসিনে মোড়া বই, তখন অপেক্ষাকৃত নতুন ছিল—তাকে আবিষ্কার করেছিলাম। ভোরের দিকে ঠাকুমা চলে যায়। পরে জেনেছিলাম মৃত্যুপথযাত্রীকে এই বই থেকে পড়ে শোনালে তার মৃত্যু-পরবর্তী যাত্রাপথ মসৃণ ও মধুর হয়। আজ এত বছর পরেও ঠাকুমার সেই চলে যাবার দৃশ্য আমার মনে স্পষ্ট—সম্ভবত মৃত্যুর আগে ভুলব না। এর আগে মৃত্যু কখনো এত সুস্পষ্ট ও সাকার হয়নি। 

শমীপোকা থেকেই যে শমীচণ্ডী ঠাকুরের নাম, সে-কথা জানিয়েছিল কে, তা আর মনে নেই। তবে এই প্রসঙ্গে, দীর্ঘদিন ভুল নাম বয়ে বেড়ানোর গ্লানি রয়ে গেছে মনে। শমীচণ্ডী বিস্তর বিকৃতি পেয়ে হয়ে গিয়েছিল সৌম্যচণ্ডী। আজকেও লোকমুখে, হ্যাণ্ডবিল, স্থানীয় ক্যালেণ্ডারে এই বিকৃত নাম পাওয়া যাবে। আমার দাদু যখন কেষ্ট খাঁয়ের থেকে বাড়ি তৈরির জন্যে জমি কিনেছিলেন, তখন এই এলাকা ছিল জলাজমি পরিপূর্ণ। চুরি-ডাকাতিও হামেশাই হত। আর হ্যাঁ, ছিল বিস্তীর্ণ পানবরজ। এই পানবরজের বিস্তার মাকড়দহ, ডোমজুড়, রানিহাটি, জয়নগর, নারিট, ডিভূরশুট হয়ে সেই আমতা পর্যন্ত। পানে পোকা না-ধরে--এই মনস্কামনা থেকে চণ্ডীর এই স্থানীয় পুজো শুরু হয়। সেই পানবরজেরও মৃত্যু হয়ে গেছে আমার জন্মের আগে। জীবিকা বদলেছে। পানবরজের মাটি বুজিয়ে তৈরি হয়েছে লেদ-মেশিনের কারখানা। শুধু দেবী রয়ে গেছেন পুরোনো বটগাছের মতো--স্মৃতির ভারবাহী হয়ে—যাত্রিকের নির্ভরতায়। 

একদিন সেই বইকে চিনলাম। শ্রীগীতা, জগদীশচন্দ্র ঘোষের টীকা ও ব্যাখ্যা সমৃদ্ধ। সেই বই—নতুন--আমার জন্যে এনে বাবা বলেছিল, দেখিস, এখানে-ওখানে ফেলে রাখবি না। যত্নে রাখিস—ছিঁড়ে না-যায়! কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে যখন দুই প্রতিপক্ষ পাণ্ডব এবং কৌরব মুখোমুখি, তখন ছোটবেলা থেকে যাদের সংসর্গে বেড়ে উঠেছেন, সেইসব গুরুজন, আত্মজন, ভাইদের সামনে পেয়ে হঠাত্‍ বিমর্ষ হয়ে পড়ছে অর্জুন। তার আর যুদ্ধ করতে মন চাইছে না। এই যে কোনো নিশ্চিত কর্মের মুখোমুখি হয়ে আমাদের যে হঠাত্‍ মনে হয়, এত কার্যকারণ পেরিয়ে, শেষমেশ কী প্রয়োজন এই জয়ের? সেই কর্মের পেছনে কতটা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খল কাজ করে, আর কতটাই বা ব্যক্তির স্ব-ইচ্ছা? কাতর অর্জুন বলছেন: ‘স্বজন নিধনে, বলো, মঙ্গল কার কিবা হবে? / চাই না এ জয়, সুখ, রাজ্যপাট বাসনা করি না’। 

সেই দিনের কথা ভাবি, হুগলির কোনো প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে হাওড়ার বন্য জলাভূমিতে উঠে আসা বিস্ময়ে আপ্লুত কিশোর, পানবরজের ঝোপে বল কুড়তে এসে দেখছে, বল হাতে দেবী শমীচণ্ডী উঠে আসছেন জল থেকে। বলছেন, এখানেই  বাড়ি করতে হবে তোকে, থাকবি এখানে তুই। এরপর এই শেয়াল চড়ে-বেড়ানো ভূমিতে গড়ে উঠবে হাইস্কুল, পোস্ট-অফিস, শমীচণ্ডী-মন্দির, রেশনের দোকান। ছোট্ট জনপদ তার প্রসন্ন শরীর নিয়ে চলবে হেলেদুলে। কমলাময়ী মিষ্টান্ন ভান্ডারের পাশে কমল দর্জির দোকান। সেই কমল দর্জিকে শেষ কবে প্যান্ট পরতে দেখেছে ইছাপুরের লোকে, সে এক ভুলে-যাওয়ার বিষয়। কোমরের মাপ না-নিয়েই একের পর এক প্যান্ট তৈরি করা কমল দর্জি দোকানপাট গুটিয়ে কোথায় চলে গেল বৃদ্ধ বয়সে। শমীপোকার অভিশাপ এখনো শহরতলির ফুসফুসকে আক্রান্ত করে—কুরে কুরে খায়। জলাভূমি বুজিয়ে ক্রমশ ভিটে গড়ে উঠতে থাকে। টালির চালের দুটো মাত্র ঘর আর শ্রীরামপুরের মেয়ে আমার ঠাকুমা। ঠাকুমা যখন রাতে রান্না চাপাত, শেয়াল ডাকত অদূরে বাঁশঝাড় থেকে। রুটি করতে-করতে হঠাত্‍ ঠাকুমার মনে হল, একটা কালো মাথা সরে গেল জানলা থেকে। এমন তো কতবার হয়েছে। বেশি ঘরবাড়ি ছিল না এখানে। রাতের বেলায় প্রায়ই বিদ্যুত্‍ চলে গেলে তখন এইসব উঁকিঝুঁকি চলত। এসব থামাতে এমনকি পাড়ার ছেলেরা রাতপাহারা পর্যন্ত বসিয়েছে। তাদের উদ্যত সাবলের মধ্যিখান চিরে দেওয়াল বলতে কাস্তে-হাতুড়ি আর হাত। এই দুই দেওয়ালের পাশ দিয়ে যে-রাস্তা চলে গেছে ওই বড় পুকুর পর্যন্ত, সেখানেই বিপ্লবের বাড়ি। বিপ্লবদা টিউশনি করত, ভাল অঙ্কের টিচার। তার বাড়িতেও লাল বই ছিল, তবে তার প্রসঙ্গ আলাদা। 

গীতা পড়া মানে মহাভারতের কিনার ঘেঁষে চলা, প্রেক্ষাপটে যার যুদ্ধ, তার শুরু ঐরকম যুদ্ধবিরোধী ভূমিকা ভাবা যায় না। যুদ্ধ তো হবেই, অবশ্যম্ভাবী। ব্যক্তির দুঃখবোধকে উত্তীর্ণ করে কৃষ্ণের দার্শনিক, নৈর্ব্যক্তিক কথাবার্তা আবার বিষাদক্লিষ্ট অর্জুনকে গাণ্ডিব তুলে নিতে সাহায্য করবে। ফেরাবে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের বৃহত্তর স্বার্থে। তবু তার আগের ওই কষ্ট, প্রিয়জনদের বধ না-করতে-চাওয়ার মানবিক আকুতির তুলনা হয় না। কৃষ্ণ আত্মার নিত্যতার বুলি শুনিয়ে মাথা চিবচ্ছে অনিত্য অর্জুনের। বিবাদ তো সেই ক্ষমতা নিয়েই। কেউ পাবে, কেউ পাবে না। শুধু কিছু রক্তপাত হবে। যেন পৃথিবীকে শান্তিকামী রাখবার ট্যাক্স, এর বেশি কিছু না। ক্ষমতার জন্যে ব্যতিব্যস্ত হওয়া স্নেহ-প্রেম-বিরহ-ক্ষুধা-তৃপ্তি-যৌনতার মতোই স্বাভাবিক একটি বিষয়। সেই কারণে এ-নিয়ে সফল যুগান্তকারী মহাকাব্য সৃষ্টি হয়েছে। আর যারা তিল তিল করে বেঁচে থাকছে পোকামাকড়ের মতো? তাদের বুঝি মহাকাব্য নেই? পানবরজে ঢেকে-থাকা এই জলাভূমিতেই পরে একসময় জমি নিয়ে বিবাদ হয়েছে। খুন হয়েছে মানুষ। শীর্ণ পুকুরের পাড়ে উপুড় হয়ে পড়ে থেকেছে বছর বাইশের তাজা তরুণের মৃতদেহ। হাওড়ার শিল্পাঞ্চল বৃদ্ধি পেতে-পেতে এসে পৌঁছেছে ইছাপুর পর্যন্ত। শেফিল্ড শহরের অপরিসর গলিঘুঁজিতে সময় লেপে দিয়েছে বাম-কংগ্রেস রাজনীতি থেকে লোহাচুর-বাবরি নিয়ে বিস্তর মারামারি মায় খুনখুনি পর্যন্ত। কত-কত রাতের অজ্ঞাতে রাস্তায় রক্তের দাগ ধুয়ে নেমে গেছে ড্রেনে। পরের দিন ভোরবেলা দুধ আনতে বেরিয়ে হঠাত্‍ যদি চোখে পড়ে এই কালচে নদীর মরা সোঁতা—বুক শুকিয়ে আসে, হাত থেকে গাণ্ডিব ছিটকে পড়ে যায়। অপরিসর, নম্বর না থাকা রাস্তায় পুলিশের ভ্যান। এলাকায় অঘোষিত কারফিউ। এমনকি অজ্ঞাতে কেউ ছাদে উঠে পড়লেও ত্বরিতে নেমে যাবে সিঁড়ি বেয়ে। পাড়ার, কয়েক বাড়ির পরের ছেলেটাই যে মারা গেছে। মায়ের চাপা কান্নার কুয়াশা ভেদ করে সেই ছেলে বুঝি সাইকেল চালিয়ে,ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে আবার ছুটে যাচ্ছে ডুমুরজলা স্টেডিয়ামে। শহরতলির এমন সব অবান্তর স্বপ্ন আছে, অবান্তর দুঃখ। রাতের আকাশে নক্ষত্র ফুটে উঠলে--ছায়াপথে সেইসব অভিনীত হয়। 


কৃতজ্ঞতা: এই লেখায় উদ্ধৃত গীতার বঙ্গানুবাদ নেওয়া হয়েছে বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় প্রণীত 'মহাপয়ারামৃতগীতা' (ভাষালিপি) থেকে।


ছবি : বিধান দেব 

                                                           (ক্রমশ...)




 



1 টি মন্তব্য:

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...