রবিবার, ২৩ মে, ২০২১

ধারাবাহিক গদ্য ।। দীপক হালদার


 ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্যচর্চার ইতিবৃত্ত 



নয় .

ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্য চর্চার ইতিহাসে আরও কয়েকজনের অবদান সবিশেষ স্মরণীয় । এঁরা হলেন অরুণ ভট্টাচার্য, মিহিররঞ্জন মন্ডল, জ্যোতির্ময় নিয়োগী এবং শঙ্কর কুমার প্রামাণিক ।
অরুণ ভট্টাচার্য শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেও নেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন ভ্রমণকে।উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের  গুরুত্বপূর্ণ  দায়িত্ব  সামলেও অমায়িক এবং  সুভদ্র অরুণবাবু  পাহাড়- পর্বত অভিযান এবং  সেইসব অঞ্চলের মানুষের সমস্যাসঙ্কুল, সংগ্রামী জীবন যাপনের লড়াকু মনোভাবকে যেমন সম্মান জানাতেন তেমনই তাঁদেরকে বন্ধুত্বের 
 আত্মিক বন্ধনে জড়িয়ে নিয়েছিলেন।  ওইসব মানুষজনের জন্য তাঁর মনপ্রাণ সর্বদা উদ্বেগাকুল থাকত।হিমালয় পর্বতের  আশেপাশে তিনি ভ্রমণ করেছেন বহুবার ।মিশেছেন এলাকার মানুষজনের সঙ্গে ।তাঁদের  জীবন -সংগ্রামের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ ও ভালোবাসা অপরিসীম ।পাহাড়বাসী মানুষজনের সাথে তাঁর হৃদয়ের যোগ এতখানি  যে তাঁদের অভাব- অভিযোগে সদাসর্বদা অকাতরে  সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন।  অরুণবাবু তাঁর সুদীর্ঘকালের ভ্রমিষ্ণু জীবনের কাহিনী রচনা করেছেন ভ্রমণকাহিনী -পাঠকদের জন্য ।এ বিষয়ে ন'খানা গুরুত্বপূর্ণ  গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি।প্রতিটি গ্রন্থ উপযোগী ভ্রমণকাহিনী হিসেবে যেমন সুলিখিত তেমনই     সুখপাঠ্য ও । ওইসব গ্রন্থে পার্বত্য এলাকার সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং  পার্বত্য এলাকার গ্রামবাসী   মানুষদের কথা , চালচলন  বেশ সুন্দর করে বর্ণনা করেছেন লেখক ।তাঁদের আচার,আচরণ, সংস্কৃতি সামাজিকতা  সব কিছু, সমস্ত বিষয় সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন তাঁর সাধ্যমতো  । ডায়মন্ডহারবারে ভ্রমণকাহিনী রচয়িতা হিসেবে তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম ।গ্রন্থগুলি সুলিখিত যেমন, তেমনই অনুভবগম্যও।

মিহিররঞ্জন মন্ডল সরকারি কর্মচারী হিসেবে জীবন অতিবাহিত করলেও নেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন ক্যামেরার চোখ দিয়ে জীবন ও জগৎসংসারকে দেখা ।এ বিষয়ে তাঁর সমাদৃত ও বহুল প্রচারিত গ্রন্থ ' চিত্রসাংবাদিকতা ' ।পরবর্তীকালে তিনি গল্প লেখা এবং বিদেশি গল্পের অনুবাদ কর্মে মনোনিবেশ করেন। 'কিলিমাঞ্জারোর তুষার'  নামে হেমিংওয়ের গল্পের একটি অনুবাদ গ্রন্থও আছে তাঁর ।সাময়িক পত্রিকায় তাঁর কিছু কিছু অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে । 
     
 শঙ্কর কুমার প্রামাণিক ও সরকারি কর্মচারী হিসেবে জীবন শুরু করেন ।পরবর্তীকালে তিনি  মৎসজীবী মানুষ এবং তাঁদের জীবন জীবিকা নিয়ে গবেষণা করেছেন । পরে তাঁর অনুসন্ধান বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ধাবিত হয় ।বাঙলা ইংরেজি মিলিয়ে এখনো  পর্যন্ত ছ'ছখানা গবেষণাধর্মী গ্রন্থের জনক শংকরবাবু ।ওসবের মধ্যে কাঁকড়ামারাদের জীবন ,জঙ্গলে মধু সংগ্রহকারী মানুষদের জীবনকাহিনী নিয়ে
 রচিত গ্রন্থও রয়েছে।
       জ্যোতির্ময় নিয়োগী পেশাগত দিক দিয়ে শিক্ষকতাকে গ্রহণ করেছিলেন ।কিন্তু নাটক দেখা, নাটকে অভিনয় করা এবং নাটক নির্দেশনাসহ নাটক মঞ্চস্থ করানোর মধ্যে তিনি আনন্দের রসদ খুঁজে পান।এসবই একসময় তাঁর মধ্যে নাটক রচনার বীজ বপন করে ।তাই তাঁর হাত ধরেই ডায়মন্ডহারবার শহরের  জন্মের প্রায় একশ ছিয়াত্তর বছর পরে  একজন নাট্যকারকে পেল ।জ্যোতির্ময়বাবুর প্রকাশিত গ্রন্থের নাম  'একাঙ্কগুচ্ছ নাটক'। 
মোট ন'খানা নাটকের সংকলন গ্রন্থ এটি।
           এর আগে ধনবেড়িয়া গ্রামের সরোজ কুমার দাস  নাটক রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন ।যদিও তাঁর কোনো মুদ্রিত নাটকের বই ছিলনা।অবশ্য তাঁর রচিত নাটকসমূহ মঞ্চসফল নাটক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল । সেইসব নাটকের পান্ডুলিপি এখন কোথায় কিভাবে আছে কে জানে ।
                  সরোজবাবু ছাড়া ডায়মন্ডহারবারের নুনগোলার বাসিন্দা শৈলেশ্বর মিত্রও শিশুদের উপযোগী কিছু নাটক রচনা করলেও তাঁর কোনো মুদ্রিত গ্রন্থ নেই ।
            শূন্য দশকে কবি অরুণ পাঠক ছাড়া  বর্তমানে  চোখের সামনে তেমন নতুন কোনো সম্ভাবনা মাথা তুলে না দাঁড়ালেও দুটি তরুণ মুখ আশার সঞ্চার করে ।
এঁদের একজন হলেন সৈকত ঘোষ অন্যজন দিলীপ কুমার প্রামাণিক ।যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্র সৈকতের বাড়ি ডায়মন্ডহারবারের নিকটবর্তী হটুগঞ্জের পার্শ্ববর্তী একতারা অঞ্চলে ।একটি কবিতার বইও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর, পরবর্তীকালে সৈকত লোকজীবনে লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন তথ্য আহরণে ব্রতী হয়।সাধুসঙ্গ, বাউলের আখড়ায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন।এছাড়া দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার আঞ্চলিক সংস্কৃতির সন্ধানও করতে থাকেন।বিদেশি কবিদের কবিতা অনুবাদও করতে দেখা যায় তাঁকে  । বর্তমানে তিনি একটি টি ভি চ্যানেলের সংবাদ সংগ্রহ কর্মে লিপ্ত বলে জানা যায় ।আশা করতেই পারি, অচিরেই তিনি তাঁর যথার্থ এবং সঠিক  অভিমুখ খুঁজে পাবেন ।
                   দিলীপ কুমার প্রামাণিক বেশ কিছুদিন ধরে কবিতা লিখে চলেছেন ।কয়েকটি কাব্যগ্রন্থের জনক কবি দিলীপ কুমারের কবিতা কয়েকটি সংকলন গ্রন্থেও স্থান করে নিয়েছে ।


ছবি ।। বিধান দেব 

1 টি মন্তব্য: