নেক্রপলিস : পলকে স্বচ্ছ জলের উপর জেগে ওঠা ছায়ায় নিজেকে চিনতে শেখায়, চারপাশকেও.
শূন্য দশকেই তাঁর স্বরের সাথে পরিচিত হয়েছেন পাঠক. গড়ে তুলেছেন নিজস্ব হাঁটার পথ. স্বতন্ত্র উচ্চারণ. পারিবারিক আবহে সাহিত্য. আর তা যখন কবির শ্বাসের সাথে জড়িয়ে যায়, সৃষ্টি হয় ঘোর. ঘোরাচ্ছন্ন কবি পাপড়ি গুহ নিয়োগী. প্রান্তে বসে উদযাপন করছেন প্রান্তিকতা. আর চোখে চোখ রেখে চেয়ারের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন প্রশ্ন. সম্প্রতি আবারও পড়ছিলাম কবি পাপড়ির পঞ্চম কবিতাবই নেক্রপলিস. বাকি বইগুলোতে যে স্বর, এই বইতেও তা স্পষ্ট. সেই স্বরই চিনিয়ে দেয় ঘোরের উৎসমুখ. ঘোরাচ্ছন্ন হন পাঠক. সোজাসাপ্টা ভাষা. যেন আজকের কথা কবি আজকেই বলবেন. এবং আজকের ভাষায়. ভাষায় কোন ছুৎমার্গ নেই. আবার তার ব্যবহার সম্পর্কেও সচেতন. তীব্র সচেতন.
আসলে কোন কবির উচ্চারণই একটা সময় পর আর ব্যক্তিগত থাকে না. একক থাকে না. তখন সবটাই কোরাস. আর সেই সুর, সমষ্টির সুর যখন মিলেমিশে এক, তখন অজস্র উৎসমুখ এক হয়ে যায়. স্বতন্ত্রতা দাঁড়িয়ে যায় প্রশ্নচিহ্নের মুখে. কিন্তু কবি পাপড়ির এই বইটি প্রমাণ করে, সমষ্টির সুর হয়েও স্বতন্ত্র থাকা যায়. জেন ওয়াইয়ের ভাষা বলে আদৌ আলাদা কি কিছু হয়? সবটাই বৃত্তাকার ঘোরে. নেক্রপলিসে তা স্পষ্ট. আর কবির অন্যান্য কবিতাবইয়ের পাশেও এই বইটি নিজস্ব স্বরে উজ্জ্বল. তার অন্যতম কারণ, সামাজিক অবস্থানে নারীর অবস্থা, সম্পূর্ণ নিজস্ব আলো অন্ধকারের গল্প নয়, সোজা সাপটাভাবে তীক্ষ্ণ ভাষায় চারপাশের প্রতিটি বস্তু/ বস্তু নয় এমন সব কিছুকেই প্রশ্নচিহ্ন বিস্ময়ের মাঝে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন সাবলীল ভাবে, যা পাঠককে ঋদ্ধ করবে. ভাষা থেকে দর্শন, সাহস থেকে উচ্চারণ... নেক্রোপলিস আসলে সমাজের অসুস্থ বাতাবরণের বিপরীতে, তার সাথে জড়িয়ে থাকা চেয়ার গদি মঞ্চ মাইক আলো ঝাণ্ডা জার্সি পতাকা রং উৎসব উদযাপন... এসবের মাত্রা জ্ঞানহীনতার বিপরীতে গর্জে ওঠার নাম. কখনো মনে হয়, সমস্ত ভুলকে সপাটে চড় দিচ্ছেনে কবি. কখনো মনে হয়, অস্বচ্ছতার প্রতিটি একক বিন্দুকে.
সর্বমোট একান্নটি কবিতা. এক সুতোয় বাধা কিছু সত্যি. যা পলকে আয়নার মুখোমুখি করে. পলকে স্বচ্ছ জলের উপর জেগে ওঠা ছায়ায় নিজেকে চিনতে শেখায়. চারপাশকেও. আসলে কবিতা একান্নটি নেই. কবিতা একটিই. যার একান্নটি পর্ব. প্রতি পর্বের মাঝে যে পৃষ্ঠা ওল্টানোর শব্দ, সেগুলোও কবিতা. কখনো কবিতার মতো. সশব্দ উচ্চারণের পর যে চুপশব্দ, সেও তো কবিতাই.
কবি লিখছেন,
• 'এই নেক্রপলিসে মরে গেছি নাকি বেঁচে আছি বুঝতে পারি না/.../ কোন রঙের উপর মন্দির l মসজিদ লিখব, কে বলে দেবে/ শুধুই শূন্যতা... অতৃপ্ত যৌবনছিপি/ এসব জল হাহাকারের পর কঠিন বরফে পরিণত হয়'
• 'আপনি দূরে লোভ ছিটিয়ে রাখেন/ তারপর জনগণের দল নেড়ি কুত্তা হয়ে যায়/ মৃত্যু পর্যন্ত বিষাক্ত কাঁটার লালা, ভয়ঙ্কর/ আপনি মর্গে দাঁড়িয়েও ক্যামোফ্লেজ ধারণে ওস্তাদ'
• 'বমি পায় l দীর্ঘশ্বাসে পা ডুবিয়ে/ পাখিদের জীবন দেখি/ স্নান শেষে/ আমারই গায়ে ধূপের গন্ধ/ অথচ, দীর্ঘজীবন/ আগুন I জল I নদী I শ্মশান পাশাপাশি রেখেছি'
• 'নেক্রপলিসে মরা মাছ ভেসে ওঠে/ ইঁদুরের গলিতে বাড়ে মাংসের দোকান'
• 'ধর্ষিতার জামায় পতাকার রং/ আর আপনি মাংস চিবোচ্ছেন/ যাহান্নাম ভালো, না আপনার পা-চাটা/.../ আচ্ছা, যদি আমরা আপনাকে বেজম্মা বলি/ আপনি কি রাগ করবেন?'
• 'দেশের ভেতর দাবার বোর্ড ঢুকে পড়ে/ হাসতে, হাসাতে, খেলার ঘুঁটি হয়ে যাই'
• 'আলমারি খুলে চমকে যাই/ সারি সারি ইচ্ছের মৃতদেহ/.../ বুকের ভেতর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে, কফিনে বসে/ ফুসফুসের অসুখ কিনছি'
• 'যে মেয়েটি নেক্রপলিসকে ভালোবেসেছিল/ শেষ বেলায় পোশাক খুলে রোদ হয়ে যায়'
• 'নেক্রপলিস আর কিছু নয়/ মাটি হচ্ছে ইট/ গাছেরা আসবাব/ আর আমি তুমি আমরা বোকাচোদা'
• 'মানসিক উৎকণ্ঠার রক্তচাষ করে উলঙ্গ শাসক'
• 'গর্ত বিক্রি হয় না, নীরবে পুড়ে যায়/ রাক্ষুসে খিদে ঈশ্বরকেই মানায়/ ভয় নেই বাঘিনী পরি প্রতিটি গর্তের মূল্য ধরে দেবে/ ভ্রমণের আনন্দ বেড়ে যাবে বহুগুণ/... / প্রতিটি গর্ত আসলে আমাদের দেশ'
• 'সম্পর্কের গর্তে চিতা জ্বলছে দেশে/ খুনি আজ ঈশ্বরের প্রতিনিধি'
• 'ওরা উচ্চস্বরে ধর্ম বাজাচ্ছে বারুদ ঘেঁটে/ অবরোধ I ধর্মঘট/ মদ মাংসে নারকীয় উল্লাস/ বমি পায়'
• 'প্রত্যক্ষদর্শী ভয়ের ভেতর দাঁড়িয়ে/ নিজের মৃতদেহের সাথে নিজস্বী তুলছে'
• 'এখনও শিরদাঁড়ার ওপর হাত রাখতে পারি/ কুয়োর সামনে বসে কবিতা পড়ি/ ধর্ষকের কাছে গিয়ে রাষ্ট্রের কথা জানতে চাই'
• 'ইদানীং সমস্ত দৃশ্য দাঁতমুখ চেপে/ ভালো আছি, দেখাতে পারি ম্যাজিক/ আদতে আমরা জিভহীন জনতা'
• 'রং পাল্টে আপনি পাল্টেছেন তো?/... / লোকে জানুক আপনি প্রত্যেকবার প্রতারক'
• 'ক্ষমতার গর্ভে জন্ম আপনার/ বলতে শুনেছি/ ধর্ম ছাড়া রাজনীতি হয় না/ রাজনীতি ছাড়া ধর্ম/... / গ্যালারিতে বসে দেখছেন মোরগ লড়াই/... / আর আমরা ভোদাই জনগণ/ হাততালির ভেতর ব্লেড হেঁটে/ ডিটেনশন ক্যাম্পের দিকে যাচ্ছি'
• 'জেনে গেছি/ মাথা নীচু করে শাসকের সামনে দাঁড়াতে হয়'
আর শেষ কবিতাটি তুলে দিলাম সম্পূর্ণ.
নেক্রপলিস একান্ন
এই নেক্রপলিসে, মুখোশের মিছিল পেরিয়ে
শুয়োরের বাচ্চা হতে চায় কয়েকজন...
ইতস্তত ছেলেটি বলে, কুত্তার বাচ্চা হব
তাও মানুষ আর না
ওয়াক-থু করে বুড়ো একের পর এক গ্লাস আর্তনাদ পান করে
বলে, বাঞ্চোৎ মানুষের বাচ্চারাই রাজনীতি করে
উপরেশকুন চিল হাসতে থাকে...
তীব্র ব্যথা নিয়ে হঠাৎ মাঝবয়েসি ছেলেটি বলে ওঠে
বাল, মঞ্চও বিক্রি হয় যৌবনবতী চাঁদের হাতে
নৌকা বেয়ে পরিত্রাণহীন মা
কচ্ছপের মতো বয়ে বেড়ায় মানুষ হওয়ার জ্বালা
পাঠক, বিস্ময় বিস্ময় এবং বিস্ময়পর্ব. স্বাভাবিক সাহস ও বোধ. এরপর শুরু হল জারণ. বৃত্ত বৃত্ত করে সময় এগিয়ে যায়. আর এই উচ্চারণ. কালকে বিদীর্ণ করে গেঁথে যায় হৃদয়ের পুরু, কঠিন ও খসখসে দেওয়ালে. সামান্য পাঠক হিসেবে বারবার নত হয়েছি কবিতার কাছে. না কিছু চমকপ্রদ পঙক্তিতে নয়, ফিনিশিং টাচে নয়, গ্ল্যামারে নয়. কবিতায়. কবিতার সমস্ত জার্নিতে.
বইটির ভূমিকা লিখেছেন স্বপন রঞ্জন হালদার. তাঁর অক্ষর কবিতার আত্মার কাছে নিয়ে যায়. যদিও এ কথা বলতেই হয়, কবি পাপড়ি গুহ নিয়োগীর পাঠকদের খানিকটা বড় শ্বাস নিয়ে এ জার্নিতে সংযুক্ত হতে হবে. বৈভাষিক এর সুন্দর, ঝকঝকে প্রোডাকশন, অদ্বয় চৌধুরীর অসাধারণ প্রচ্ছদ... সব মিলিয়ে নেক্রপলিস অবশ্যই সংগ্রহে রাখার মতো. যা ভাবাবে পাঠের আগে. পরে তো অবশ্যই.
নেক্রপলিস
পাপড়ি গুহ নিয়োগী
প্রচ্ছদ- অদ্বয় চৌধুরী
ক্যালিগ্রাফি- নবেন্দু সেনগুপ্ত
বৈভাষিক
120 টাকা


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন