শনিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২১

কাব্যগ্রন্থ আলোচনা : দেবজ্যোতি রায়



'পূর্ণ ও শূন্যের এক মিলিত কোরাস' 



মগ্ন অনুভূতিকে আশ্রয় করে কবিতা যখন গহন পথের যাত্রী, পাঠককেও তন্বিষ্ঠ মন নিয়ে পৌঁছতে হয় কবিতার কাছে। এমনই নির্জন, শান্ত, অন্তর্লীন পথের যাত্রী 'তরঙ্গ ও ইশারা', সায়ন রায়ের তৃতীয় কবিতার বই। প্রকাশ কাল ২০১২। এই সময়ের তরুণ কবিদের মধ্যে বিশিষ্ট নাম সায়ন রায়। 'তরঙ্গ ও ইশারা'-র পূর্বসূরী 'মহামানবের পোশাক' (২০০০), 'মুহূর্তের পাশে সমগ্র' (২০০৯) এবং উত্তরসূরী 'রভস' (২০১৭), 'লুকোনো জলের দাগ'(২০১৭), 'সকল ধূসর চিহ্ন'(২০১৯)। 'তরঙ্গ ও ইশারা'-য় সায়নের মন ও মনন ঐশী অনুভবে আপ্লুত। সন্ধান করছে রূপের মাঝে অরূপ। যে ৪০টি কবিতা 'তরঙ্গ ও ইশারা'-য় সংকলিত,তারা আলাদা শিরোনাম বর্জিত, কেবল সংখ্যাচিহ্নিত। প্রতিটি টুকরো কবিতার মধ্যে ভাবগত ঐক্য রয়েছে, সূক্ষ্ম যোগসূত্র গড়ে তুলেছে অখণ্ড দীর্ঘকবিতা—যাতে চেতনার বিচিত্রমুখী প্রসারণ আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রচিত হয় এক আলোকিত ক্যানভাসের সামগ্রিকতা।অতীন্দ্রিয় উন্মোচনের বয়ান। আদি প্রকৃতির 'জল মাটি শিলা' এবং অন্তহীন সময়স্পন্দন কবিতাগুলির মৌল উপাদান। যাপিত জীবনের দৈনন্দিনতার বাইরে বেরিয়ে এসে জীবনজিজ্ঞাসা, ভোরের কুয়াশায়, গোধূলি আলোছায়ায় দেখতে পায় আত্মপ্রতিকৃতি। সায়ন রায়ের কবিতার ভাবতরঙ্গ ইশারাময় এবং ক্রম-উত্তরণের 'বোধিদৃষ্টি' কবির অভীষ্ট। নিবিড় শুভবোধ এবং আনন্দের পথে একা একা ভেসে যাওয়া তাঁকে প্রাণিত করে। কবিতার ভেতর প্রবাহিত আধ্যাত্মিক চেতনার স্রোত। এই আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচরণের সম্পর্ক নেই। আমার ভেতরে স্থিত 'আমি'-কে আবিষ্কার করাই এখানে আধ্যাত্মিক অভিনিবেশের গন্তব্য। স্তব্ধতার দিকে, শুদ্ধতার দিকে যেতে চায় তাঁর কবিতা—

      দুঃখ থেকে সমাধি পেরিয়ে 

      আশু আনন্দের পথে ধীরে 

      আত্মার ঐ ক্রম উত্তরণ 

      যে আনন্দে স্মিত মনে অনন্ত পদ্মেরা 

      ফুটে থাকে। নিবিড় নিভৃতে 

       অপ্রকাশ্য চুপ-কথা গাঢ় অনুভবে 

       একা একা ভেসে যাওয়া

                                  রবীন্দ্রসংগীতে।

                                 —৩৫ সংখ্যক কবিতা



'তরঙ্গ ও ইশারা'-য় সায়ন রায় কোনও ন্যারেটিভ রচনা করেননি। বিমূর্ত অনুভবের আলোয় জ্বালিয়ে রেখেছেন আত্মদীপ। সত্তার গভীরে যে সংগীতের অনুরণন চলছে তা 'পূর্ণ ও শূন্যের এক মিলিত কোরাস'। রূপ ও অরূপের লীলা, অস্তিত্বের বেলাভূমির ওপর গড়িয়ে যাওয়া ঢেউয়ের মতো যুগপৎ স্পন্দনশীল ও স্পর্শাতীত। 'নিত্যানন্দ' নামের সঙ্গে যুক্ত বাংলার বৈষ্ণব ধর্ম, বৈষ্ণব সাধনা ও তত্ত্ব। চৈতন্যদেবের সঙ্গে তাঁর নাম বৈষ্ণব পরিমণ্ডলে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত। অন্য অর্থে, 'নিত্যানন্দ' নিত্য জ্ঞানময় ও  সুখস্বরূপ ব্রহ্ম। আনন্দবিশিষ্ট পরম সত্তার উদ্ভাসন। 'সচ্চিদানন্দ'— শব্দের প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই 'তরঙ্গ ও ইশারা'-য়। সৎ (নিত্য), চিৎ ( জ্ঞান) এবং আনন্দ (দিব্য সুখ)—এই  ত্রিবিধ চেতনার সমন্বয়ে উন্মীলিত হয় 'অনির্বচনীয়'। 'তৈত্তিরীয়োপনিষদ্'-এর ষষ্ঠ অনুবাকে বলা হয়েছে—' আনন্দাদ্ব্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। আনন্দেন জাতানি জীবন্তি '। আনন্দ থেকেই জীবনের সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ। আবার আনন্দ অভিমুখে প্রতিগমন করে আনন্দেই বিলীন হয় জীবনপ্রবাহ। আনন্দ-বেদনা-বিরহ-মাধুর্য পুষ্পিত হয় চেতনায়। ফুল ফোটে, ফুল ঝরে পড়ে। বেদনার ফল পক্ব হয় চৈতন্যের মাধুর্যে।অধরার জন্য নিবেদিত এক আজীবনের প্রতীক্ষার কথা বলেন কবি—

      আমিও নিত্যানন্দ খুঁজি, নিত্যানন্দ দ্বার 

      ফুলের ফসলে ভরা সোনার সংসার

      বিরহ বিধুর মায়া সেই স্বর্ণজাল 

      প্রেম পূজা প্রতিপাদ্য রূপের কাঙাল

      রূপ অরূপেই মজে পুষ্পিত অধরা

      দিশা বিদিশায় লীন কাঙ্ক্ষিত সুদূর

      অনির্বচনীয় আর অপ্রকাশ্য ব্যথা

      বেদনার ফলগুলি পক্ব সুমধুর।

                                     —২৮ সংখ্যক কবিতা



২৭ সংখ্যক কবিতায় জেনবাদের অনুষঙ্গ। 'ধ্যান ' থেকে 'জেন' শব্দ ব্যুৎপন্ন। জেনবাদ কী? এর উত্তর মৌনতা, সত্যবোধ, বোধিদৃষ্টি অর্জন। বীতশোক ভট্টাচার্যের মতে 'জেন এক অনুত্তর যোগ। এ যেন চিরপ্রশ্নের এক বেদীর চিরনির্বাক হয়ে থাকা'। সায়ন শেষ চরণে ব্যবহার করলেন— 'নিদিধ্যাসন' শব্দটি, যার অর্থ একান্ত মনে দেহজ্ঞানরহিত হয়ে চিন্তা, একনিষ্ঠ ধ্যান। নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে প্রতর্কহীন অনুভবে প্রবেশ করতে চাইছেন কবি—

        ফুরিয়ে যাওয়া গ্রহের ধুলো যত্ন করে রাখেন

        দশদিকেতেই মনোনিবেশ ঘুমে জাগরণে 

        হঠাৎ হঠাৎ বায়ুর প্রকোপ এমন চন্দ্রাহত

        সত্য দ্রষ্টা, কবি তিনি অবিশ্বাস সন্দেহ

        মেজাজটা যেই ঠাণ্ডা বরফ জেন-এর মতো হয়

         প্রতর্ক আর পাল্টা আঘাত মিহিন হয়ে আসে

         বাস্তব তো বাস্তবিকই একটি প্রতিচ্ছবি 

         সজল হাসি কী প্রশান্তি নিদিধ্যাসন হলে।

                                         —২৭ সংখ্যক কবিতা

এমন গভীর ভাবনা দলবৃত্তের আধারে প্রকাশ করে সায়ন মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। বাস্তব তো বাস্তবিক অর্থে একটি প্রতিচ্ছবি মাত্র। মুহূর্তের দর্পণ, বিলীয়মানতাই তার পরিণাম। সময়বিহীন সময়ঘড়ির কাঁটায় আপতিত মৃত নক্ষত্রের আলো, প্রয়াণচিহ্ন।


গ্রিক পুরাণের চরিত্র সিসিফাসের দণ্ডিত জীবনকথায়, নিয়তি ও পরাজয়ের বিরুদ্ধে মানুষের অবিরত সংগ্রাম রূপক হয়ে পুনরাবৃত্ত হয়েছে শিল্পে, সাহিত্যে। সিসিফাস একটা পাথরখণ্ড পাহাড়শীর্ষে তোলার জন্য অন্তহীন চেষ্টা করে চলেছেন। চূড়ার কাছাকাছি যতবার তোলা হয়, ততবারই অধোগমনের টানে নীচের দিকে নেমে আসে পাথরখণ্ড। সিসিফাসের কাহিনিকে নতুন ডাইমেনশন দিলেন আলব্যের কামু, তাঁর বিখ্যাত সন্দর্ভ  'The myth of Sisyphus'-এ। পরাজয়, নিয়তি, জীবনের অর্থহীনতা ও অন্তর্দ্বন্দ্বের গাঢ় ভাষ্য লিখলেন কামু। কামুর দর্শন চিন্তায় আত্মহত্যা, হতাশা ও বিপ্রতীপের যে সূত্র ও বিশ্লেষণ রয়েছে তাকে কবিতার পরিসরে ডিকোড করতে চেয়েছেন সায়ন রায়। জীবনের চেতনাতরঙ্গে মিশে থাকে জাদু ও গরল। সায়ন সন্ধান করছেন বিকল্প আত্মপরিচয়—

        পাহাড়ের তলদেশে কামু ও তার স্বপ্ন সিসিফাস

        প্রাচীন এ বোঝাটুকু মেনে নেয় সরস হাসিতে

        সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে ধরাচূড়া পার্বত্য অতল

        পড়ে থাকে ব্যথাহরা নরম মসৃণ এক জল।

                                           —৩ সংখ্যক কবিতা

কামুর বহুমাত্রিক জটিলতা ও জীবনকেন্দ্রিক প্রশ্ন এবং গ্রিক পুরাণের অনুষঙ্গ সায়নের কবিতায় জীবনবোধের ইশারাময় প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল। 




'তরঙ্গ ও ইশারা'-র পাঠ অভিজ্ঞতায় ক্রমশ খুলে যায় অধিচেতনার বাতায়ন। কবি যেন জীবনের 'মায়াবী জাদুর এক রূপলোক থেকে টুপ করে তুলে নেন দৈব এক ফল'। এই ফলের অনুষঙ্গে মনে পড়ে জীবনের অমেয় মাধুর্য ও জীবনরসিকের আত্মউৎসারণের কথা। অস্তিত্বের চারপাশে বেজে চলেছে অন্তহীন সুর, সুরসপ্তক ধারণ করেছে মুক্তির আনন্দ—

      তুচ্ছাতিতুচ্ছ কণা সুরের আলোকে

      ক্ষণে ক্ষণে বেজে ওঠে

                                  সুধা সুরলোকে।

                                         —৬ সংখ্যক কবিতা



সৃষ্টির আদি রহস্যের গহনে পৌঁছতে চান কবি।অনন্ত জলের ভেতর একদিন প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল। এই জল প্রকৃতির শিরায় শিরায়, মেঘলোকে, মাতৃজঠরে। আগুন ও জল  বিশ্বলোকের অগ্রগতি ও প্রাণের উৎস। আদি কবি স্তব রচনা করেছিলেন আগুন ও জলের। গায়ত্রী ছন্দে ঋকবেদ-সংহিতার প্রথম স্তোত্র নিবেদিত আগুনের উদ্দেশ্যে—

অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্ হোতারং রত্নধাতমম্।।১

সায়ন লিখলেন—'এসো হে পবিত্র অগ্নি মাতৃজঠরের মধ্যে মিশে/ মায়াবী তন্তুজ বোনো বুনে চলো আরক্তিম ফল'। 'তরঙ্গ ও ইশারা' এক অর্থে আলোর সংগীত। অন্তর্লীন অনুভূতির সংলাপ। একই সঙ্গে আত্মগত ও 'আত্মহারা'। দূর নক্ষত্রের সংকেতে যে অনিশ্চয়তা থাকে তাকে গ্রহণ করেছে কবিতা। কোনও চমক সৃষ্টির অভিপ্রায় নেই কোনও কবিতা খণ্ডে। শব্দ ও নৈঃশব্দ্যের মধ্যবর্তী ভুবনে বিশ্বাস, প্রেম, মায়া, হাহাকার এমন এক ছায়াপথ নির্মাণ করেছে যেখানে 'রস ও রসিক' সমীভূত। কবীরের দোঁহা, ওমর খৈয়ামের রুবাইৎ কবিতার পরিধি বিস্তৃত করে। সায়ন একটি আশ্চর্য কবিতা লিখেছেন নারীকে কেন্দ্র করে ' এক বিশিষ্ট চেতনার '-র উন্মীলন থেকে—

নারী কোনো দৈববস্তু নাকি অন্যভাবে 

দূরতম দৃষ্টি এক বিশিষ্ট চেতনা 

উদ্ বায়ী শরীর ঘিরে আবিল পুলক

পরতে পরতে মেঘ ছড়ায় সুঘ্রাণ 

ঋষি যা পায়নি খুঁজে নিঃস্ব সিন্ধুতটে 

গভীর গোপনে থিতু নিজস্ব নির্বাণ।

                                     —১০ সংখ্যক কবিতা

'তরঙ্গ ও ইশারা'—শান্ত, ঋদ্ধ ও ধ্রুব চেতনার প্রেক্ষাপটে রচনা করে কেন্দ্র ও পরিধির সেতু। ললিত করুণ স্তব। সময়ের কণ্ঠস্বর মিশে যায় দূরাগত সংগীতে। কারুবাসনার স্বপ্নে জেগে থাকেন কবি—

     অন্তর্লীন রক্তপাতে আহত মণীষা 

     ভেসে যায় কবি,

                      তার কবিতাজিজ্ঞাসা।

                                   —২১ সংখ্যক কবিতা


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন