শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ধারাবাহিক গদ্য। । অভিজিৎ দাশগুপ্ত


 

সাধনপর্বের নির্জনতা 


ভোর হল। বললেন , ' নদী থেকে স্নান করে আসি'।
পাশের ঘরেই ছিল মেয়ে, সেও কিছু জানলো না ।
জলে নামলেন আর পরক্ষণে মাঠ বৃক্ষ পাখি জনপদ কোনদিকে কিছু নেই , জল শুধু জল শুধু জল ...
                                                               সেই জলে  
শুয়ে পড়লেন শক্তি , চিৎসাঁতারে ভাসবেন বলে...

নাভিতে এবার একটি পদ্ম জেগে উঠল তার সব কটি            
                                                      পাপড়ি খুলে ধরে।
আকাশও একপাত্র মদ বিনাবাক্যে তৎক্ষণাৎ ঢেলে  
                                                দিল পদ্মের ভেতরে! 
                                             ( ' শক্তি চট্টোপাধ্যায় ' )

এই কবিতাটি যদি এপিটাফ  হয় , তাহলে এর মধ্যে সত্যের অংশই বেশি । ব্যক্তিগত সম্পর্ক যেখানে ধ্বজাধারী হয়ে ওঠে মৃত ব্যক্তির মূল্যায়নে , সেখানে জয় গোস্বামীর  উচ্চারণ যথার্থ , স্বকীয় এবং প্রতীকীও  ।  তাঁদের পরিচয় সময়ের হিসেবে দীর্ঘ। অপ্রত্যক্ষ এবং প্রত্যক্ষ । প্রথমে কবিতা , পরে কবি। একই পত্রিকা অফিসে কাজের সূত্রে  কাছাকাছি আসা। ফলে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে যদি কেউ প্রকৃতই চিনে থাকেন  তবে সে নামটা অবশ্যই জয় গোস্বামী।

জ্যেষ্ঠ এই কবির  অনুভূতিমালা গ্রহণের ক্ষমতা তো সকলের ছিল না , অথবা যাঁদের ছিল তাঁরাও নিজস্ব প্রয়োজনে অথবা অপ্রয়োজনে তাঁকে ব্যবহার করেছেন। তাৎক্ষণিক কথাবার্তার আড়ালে গুলিয়ে দিয়েছেন প্রকৃত সত্য বা সত্তাটিকে । জয় গোস্বামী  সে পথের পথিক নন । তিনি কখনও তা হতেও চান নি। শক্তির কবিতায় যে উত্তরণের মার্গটি রয়েছে , তাকেই খুঁড়ে গেছেন অনুসন্ধিৎসু হৃদয়ে।

মৃত্যুর দিনটিকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে কবিতাটি । শক্তির চলে যাওয়ার দিনটির সঙ্গে কখনোই তাকে মেলানো যাবে না । যাওয়া উচিত নয় । কবিতায় কখনো সেটি হয়  না । ভোরবেলায় জলে নেমেছেন শক্তি । স্নান করবেন । তাঁর মেয়ে জানতে পারেনি বাবার এই একা চলে যাওয়ার মুহূর্তকে । প্রসঙ্গত বলি, শান্তিনিকেতনে কবির  মৃত্যুর সময় তাঁর কন্যা উপস্থিত ছিলেন । এটুকুই , হ্যাঁ  কন্যার এই অবস্থানটুকুই  এ কবিতায় প্রত্যক্ষ ।  বাকি ছটি পংক্তি ঈশ্বর - উচ্চারিত।

জলে নামবার পর মাঠ বৃক্ষ পাখি জনপদ সব ডুবে গেল কোন এক কালচক্রে ।  সৃষ্টির আদিতে পৌঁছে গেলাম আমরা ।  কবি নিয়ে চলেছেন আমাদের ।   'কোনদিকে কিছু নেই , জল শুধু জল শুধু জল ...'।সেই অনন্ত সলিল শুধু ভাসিয়ে রাখলো আমাদের প্রিয় কবিকে । যেভাবে পুরাণে কথিত নারায়ণ ( যার অর্থ --- যিনি জলের উপর শয়ন করেন ) ক্ষীরোদ সাগরে  শায়িত  ছিলেন । এই অবস্থাতেই তিনি সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য জগত ।  শক্তিও কি ওই  অনন্তনাগ সদৃশ তরঙ্গায়িত জলে শুয়ে শেষ কবিতাটি মনে মনে উচ্চারণ করেছিলেন ? আমরা জানি না ।  তবু জানি, তাঁর চিকচিক করে ওঠা চোখ শব্দের কিছু-না-কিছু সংকেত প্রেরণ করেছিল উত্তরপুরুষের উদ্দেশ্যে।     'নাভিতে এবার একটি পদ্ম জেগে উঠলো তার সবকটি পাপড়ি  খুলে ধরে '। এও তো সৃষ্টি । নারায়ণের চোদ্দটি জগৎ তৈরির মতোই শতদল জন্ম নিল কবির শিল্পকর্মে। হ্যাঁ , এখানে আরেকটিও প্রত্যক্ষ বিষয় এসেছে । সেটি মদ । এ তাঁর জীবনবেদ। কিন্তু অনুজ কবি সেই মদের ভেতর ঢেলে দিয়েছেন সৃষ্টির অপার রহস্য । যিনি প্রকৃত শিল্পী , তিনি প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে এই মদ পান করেন। এ মদের স্বাদ বা গন্ধ যিনি শিল্পী নন, তার অধরাই থেকে যাবে চিরকাল । কবির শিল্পীসত্তা বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত করে পৌঁছে যায় অন্য এক অভিমুখে । যেখানে শাশ্বত বিচ্ছুরিত আলো এসে পড়ে হৃদয়ে।

জন্মের মুহূর্তে সেই ' মদ ' কবি গ্রহণ করেছিলেন। নাভিপদ্মের ভেতরে আকাশ মদ ঢেলে দিচ্ছে , এই যদি হয় ভাবনা , তবে তা আরো আরো  পশ্চাতে টেনে নেবে আমাদের। সে হলো মাতৃগর্ভ । সেখানেই তৈরি হয়েছে কবির  প্রথম চেতনা ।  মনোজগতের কোষগুলো পরিপুষ্ট হয়েছে একটি একটি করে । মৃত্যু আর জন্ম , জন্ম আর মৃত্যু --- দুইই  এক সুতোয় বাঁধা পড়ে গেছে কবিতাটিতে । যতবার পড়ি ,  ততবার কবি শক্তির আসল চেহারাটি  সীমাবদ্ধ কুয়ো থেকে চিৎ সাঁতারে  ভেসে ওঠে অনন্ত জলে। 




বৃষ্টির পুনর্জন্মকালে নেমেছে ধারাস্নান
ত্রিভুবন উদ্ভিদের মতো শান্ত হতে চায় ,
বিদায় যুদ্ধজয় , বলো, বিদায় মলিনতা ,
আমার , তোমার , তার  সব রক্তরেখাগুলি
দেখো , সচল হয়ে শরীর থেকে নেমে যাচ্ছে ;
নিয়ে চলে যাও , মেঘরাজ , সব রক্তিমতা
এই নির্ঘোষ থেকে লুটিয়ে পড়েছে রাগিনী ,
আমি পুত্র , আজ দিগম্বর , দিব্যস্নানরত ,
একটি কূট প্রশ্নে  পথরোধ করি তোমার ,
এত হরিদ্বর্ণ কেন ফেলে গেলে জগতে !
                         ( ' নঙপোহ্  , শিলঙের পথ ' )
আগে একটা গল্প বলে নি । সে গল্পের প্রধান চরিত্র শরতের শিলং ।  পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা উতরে গেল। সেদিনের মতো আশ্রয় দেশজ কুটিরে ।  তরুলতা সদৃশ নির্মেদ এক নারী এসে বুঝিয়ে  গেল থাকবার নিয়ম-নীতিগুলো । নিজের পরিবার - সন্তান নিয়ে কর্মহীন কয়েকটি দিন কাটাবো বলে সত্বর আশ্রয় নিলাম আমি।

রাত্রি কেটে গিয়ে ভোর হলো ।  একা বাইরে বেরিয়ে এলাম ।  চোখের সামনে এতক্ষণ কৌতূহলের যে পর্দাটি ছিল , তা সেই সূর্য না ওঠা ভোরে কেউ যেন সরিয়ে দিলে ।  শুধু সরিয়েই  দিলো না , কানে কানে  এসে বলে গেল , আমি এসেছি । এই সবুজ আর বৃষ্টির আলো-আঁধারি আমার সমস্ত শরীরে । যদি চোখ থাকে তবে তুমি এখানেই খুঁজে পাবে বেদ উপনিষদ পুরাণ থেকে শুরু করে লোকসাহিত্য ।

তার বলা কথাগুলো অনুরণিত হয়ে ওঠে মগজে । আহা সবুজ বলে সবুজ ! অমোঘ এক বার্তা যেন অনবরত সে পাঠিয়ে চলেছে তীক্ষ্ণ উচ্চারণে । কেন তীক্ষ্ণ বললাম ! তার কারণ আছে। শিলংয়ের বৃষ্টিধোয়া সবুজ প্রকৃতি অন্য কারো সঙ্গে মেলে না যে। সে অনেকটা এই পৃথিবীর মতোই । জিয়র্ড। পথে পথে এগিয়ে গেছি , অথচ  পাহাড়ের সচ্ছল সংসারে তার এতটুকু হেলদোল নেই । সবুজের চাষ হয় এখানে ।  আর বৃষ্টি । ' বরিষধারামাঝে ' গানটির সার্থকতা এখানে  এলে টের পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ তো এসেছিলেন শিলং পর্বতে। তাহলে কি...

কোনও প্রশ্নেরই উত্তর মিলছে না যেন। অথবা উত্তরের কাছাকাছি গিয়ে কেমন এক অনীহা তৈরি হয় মনে । থাক না ! আমি তো অন্য এক উদ্দেশ্য নিয়ে বসেছি । তার অনুভূতিমালা সাজানোই কাজ  আমার। 'এত হরিদ্বর্ণ কেন ফেলে গেলে জগতে ' --- কে বলছেন ? কবি গৌতম বসু ।  কবিতাটি পড়তে পড়তে এর অন্য কোনো অর্থ আছে কিনা একবারের জন্য  মনে হয়নি আমার ।  চিন্তায় আসেনি আলংকারিক অথবা রস বিশেষজ্ঞদের কথাও।  ঈশ্বর বিষয়ক ভাবনাটিও ক্লিশে মনে হয়েছে ।  ভালো কবিতা পড়ার সুখস্মৃতি  নিয়ে সম্মোহিতের মত শুধু পড়ে গেছি  কবিতাটি ( ' নঙপোহ্ , শিলংয়ের পথে ' ) ।  হ্যাঁ শুধুই পড়ে গেছি।

বৃষ্টিভেজা এবং বৃষ্টিস্নান সেই সকাল-দুপুর-বিকেল পথে পথে কাটিয়ে এলাম আমরা । আর ঘর ও প্রান্তরকে এক করে  অচেনা সেই মার্গে আমি খুঁজে পেলাম কবিতার নিবিড় দুটি পংক্তি ---

" নিয়ে চলে যাও ,  মেঘরাজ , সব রক্তিমতা
  এই নির্ঘোষ থেকে লুটিয়ে পড়েছে রাগিণী।"

সত্যি ! দিব্যস্নানরতা সেইসব পাহাড়-নদী-প্রান্তর- বনভূমি শুভেচ্ছা বিনিময়ের মত শুধু ডেকে গেছে আমাকে । যেমন গৌতম বসু শুনেছিলেন অন্তর্লীন সেই ভাষা ।  সে ভাষাই আমারও দীর্ঘ করেছে অনুভব। এই কবিতার শব্দে এমন এক অন্তর্দ্যুতি আছে ,  যার নেশায়  পাঠক পৌঁছে যান ধারাস্নানে। বৃষ্টির পুনর্জন্মকালে  একমাত্র , হ্যাঁ সে ই পারে ত্রিপাদ দুঃখকে দূর করতে ।  কবিতা প্রাণবায়ু প্রতিবাদী হয়েও কত মহতী!

আমার দ্বিতীয় সকাল শুধু জিজ্ঞেস করে ---
' এত হরিদ্বর্ণ কেন ফেলে গেলে জগতে ! '
        
                                                                           ক্রমশ


ছবি:  বিধান দেব 
 
         



 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন