রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

সম্পাদকের কথা


 


সারা পৃথিবীতে আজ মৃত্যুর মিছিল চলেছে। আমরা সামাজিক সুস্থিতিসম্পন্ন মানুষেরা হয়তো সেই চিত্রটি যথাযথ বুঝতে পারছি না। কবি জীবনানন্দ লিখেছিলেন " কালিদহে কখন যে ঝড়/ কমলের নাল ভাঙে---- ছিঁড়ে ফেলে গাঙচিল শালিখের প্রাণ/ জানি নাকো;"
কিংবা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া সেই অমর গান---" কোথায় কখন কবে কোন তারা ঝরে গেল কে তার খবর রাখে।" আসলে মৃত্যু ঠিক কেমন আমরা মৃত্যুর আগে তা কেউই জানি না। কবি জয় গোস্বামীর সেই অমোঘ পঙক্তি "মৃত্যু সোনার পাথর বাটি"। মৃত্যুর সঙ্গে উদাসীনতার একটা সম্পর্ক আছে। আমরা নিজের মৃত্যু সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি উদাসীন। অথচ আমরা সকলেই মৃত্যুভয়ে ভীত। জীবনের সেই অজানা অতিথির রূপ কেমন আমরা কেউই জানি না। আর তাই আমরা মৃত্যুর নামে পাশ ফিরে শুই। মৃত্যুর মহত্ত্ব উপলব্ধি করে অনেক মনীষী তাকে শুদ্ধচিত্তে গ্রহণ করে তা অতিক্রম করার কথা বলেছেন। কিন্তু মৃত্যু যখন মড়কে পরিণত হয় তখন তাকে উপেক্ষা করে সাদরে বরণ করা কাপুরুষতার নামান্তর। পৃথিবী জুড়ে বহু সেলিব্রিটির মৃত্যু হচ্ছে। সেই সঙ্গে ঝরে যাচ্ছে নাম গোত্রহীন বহু অসহায় মানুষ। তাদের দুঃখে সহানুভূতি জানানোর কোনও সহনাগরিক নেই। এই সুমহান নীল আকাশের নিচে আমাদের অস্তিত্ব নামক একটা ভাবনা আছে। সে অস্তিত্ব এই ক্ষুদ্র প্রাণের থেকে অনেক বড়। সে জন্যই যা দেখা যায় তাকে গুরুত্ব দিলেও না-দেখা অস্তিত্বের অনেক খানি আমাদের অগোচরে আমাদের খেলিয়ে যায়। অস্তিত্ব আসলে বেঁচে থাকা আর বেড়ে ওঠার বোধ যাকে খুব কম মানুষই উপলব্ধি করতে পারে। মানুষ জন্মগতভাবেই চেতনাপ্রবণ। আর সেই চেতনাকে চৈতন্যে পরিণত করতে পারলেই কেল্লা ফতে। যে মানুষ যত টুকু চৈতন্যপ্রবণ সেই মানুষ ততখানি সার্থক। বাকি মৃত্যুটুকু সবার জন্য এক। দরিদ্র -ধনী, উচ্চ -নীচ সকলেই সমভাবে শায়িত সেখানে। কিন্তু মৃত্যুকেও আটকে দেওয়া যায় সেই অবিরল চৈতন্যধারায়। যখন তা হয়ে ওঠে "শ্যাম সমান"। যার পরম্পরা মানব সভ্যতাকে মারী ও মৃত্যুর কুচক্ষু এড়িয়ে আজ অবধি টেনে এনেছে। কীর্তিমান মানুষের পাশাপাশি অসংখ্য সাধারণ মানুষ যাদের শ্রম ও সদগুণে আমরা পরোক্ষে পূর্ণ হয়ে উঠেছি ----এখনও পর্যন্ত যারা বিদায় নিলেন আমার নত মাথা সেই ঋণের আরোগ্যের দিকে ঝুঁকে রইল।


চিত্র ঋণ: অনিরুদ্ধ মান্না

শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০

গদ্য : রাজীব ঘোষাল

 




মনের ভ্রমে মাটি দিয়ে 


মানুষের মন বড়ই চঞ্চল। কেবল অন্ন বস্ত্র বাসস্থানে মানুষের মন ভরে না। আর ভরে না বলেই যুগ যুগ ধরে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করেছে। সভ্যতার বিবর্তন আসলে মানুষের নিজেকে খুঁজে পাওয়ার ইতিহাস।কখনো সে আগুনের আবিষ্কার করেছে তো কখনো সে শিখে নিয়েছে চাষের কৌশল। শিখেছে বীজের সংরক্ষণ।চাকা আবিষ্কার। অস্ত্রের ব্যবহার সেই পাথর লাঠি দিয়ে শুরু করে কুড়ুল তলোয়ার পেরিয়ে বন্দুক কামান ট্যাঙ্ক মিশাইল সভ্যতায় পৌঁছে গেছে মানুষ। কিন্তু এত সব করেও মানুষের মনের খিদে মেটেনি।  আর তাই আমরা 
খুঁজে পেয়েছি ভীমভেটকার গুহাচিত্র। খুঁজে পেয়েছি অজন্তা গুহাচিত্র। আর পেয়েছি সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ব্রাহ্মী খরোষ্ঠী হায়রোগ্লিফিক সহ অদ্ভুত বৈচিত্রময় সব লিপি। সে সব লিপির যত না আবিষ্কৃত হয়েছে অনাবিষ্কৃত থেকে গেছে তার চেয়েও বেশি। সারা পৃথিবী জুড়ে কত কত পাহাড়ের গায়ে যে মানুষ খোদাই করেছে ইতিহাস ! 

আসলে শিল্প মানুষের মনের চাহিদা মেটায়। না বলা কথার ভেতর মনের মাধুরী মিশিয়ে সে গড়ে তোলে অবয়ব। কথার ফুলঝুরি। এই শিল্প হয়ে ওঠা কথাই কখনো হয়েছে নতুন আবিষ্কারের দিশারি তো কখনো কথায় বুনে তোলা কাব্য মানুষকে উড়ালের স্বপ্ন দিয়েছে। পৌত্তলিকতা এবং বিমূর্তা ধারণা দুটির কোনোটিই ভুল নয়। আসলে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের চিন্তার ব্যপ্তি ভিন্ন। কেউ পুতুলকে বিমূর্ত করে তোলেন আবার কেউ বিমূর্ত ধারণাটিকে মূর্তির রূপ দেন। আমরা বেদের দিকে তাকালে দেখতে পাই পঞ্চভূতের পূজার চিন্তাধারাটিকে। এ তো আসলে বিমূর্ত রূপেরই পূজা। অগ্নি বায়ু আকাশ জল মাটি সমস্তটাই বিমূর্ত আবার মূর্তও। অথবা শিবের যে শিলা রূপে আরাধনা একেও তো বিমূর্তই বলতে হয়। গণ্ডকী নদী থেকে পাওয়া শালগ্রাম শিলাও কি বিমূর্ত নয় ! কোনো একটি গাছের নিচে বনদেবীর আরাধনাকেও তো বিমূর্তই বলতে হয়। আমরা কেউই সেই বনদেবীকে দেখিনি কোনোদিন। অথবা কার্তিক সরস্বতী দুর্গা লক্ষ্মী নারায়ণের যে মূর্তি তার ভেতরেও বিমূর্ততা প্রবহমাণ। আর সেজন্যই কখনো দুর্গার দশহাত কল্পনা করতে পারি। নীল সরস্বতীর কথা ভাবতে পারি। ভাবতে পারি ব্রহ্মা চতুরানন। ভাবতে পারি গণেশের মুখখানি হাতির। প্রাচীন মিশরীয় দেবদেবীদেরও দেখি কারোর মুখে গরুর অবয়ব কারো বা সিংহীর।  এসবই আসলে শিল্পের বিভিন্ন রূপ। 

(১৩২২ শ্রাবণ) সাহিত্যের খেলা প্রবন্ধে শ্রী প্রমথ চৌধুরী বলেছেনঃ " কবির সৃষ্টিও এই বিশ্ব সৃষ্টির অনুরূপ,সে সৃজনের মূলে কোনো অভাব দূর করবার অভিপ্রায় নেই-- সে সৃষ্টির মূল অন্তরাত্মার স্ফূর্তি এবং তার ফুল আনন্দ। এককথায় সাহিত্য সৃষ্টি জীবাত্মার লীলামাত্র, এবং সে লীলা বিশ্বলীলার অন্তর্ভূত।" তিনি খেলা শব্দটি লীলা শব্দের সঙ্গে অভিন্ন অর্থে ব্যবহার করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেনঃ " খেলার বৃত্তি আর প্রয়োজন সাধনের বৃত্তি মূলে একই সেইজন্যে খেলার মধ্যে জীবন যাত্রার নকল এসে পড়ে। কুকুরের জীবনযাত্রায় যে লড়াইয়ের প্রয়োজন আছে , দুই কুকুরের খেলার মধ্যে তারই নকল দেখতে পাই।" রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে সাহিত্যে জীবন ব্যবসায়ের নকল আমরা করে থাকি একথায় তাঁর সায় নেই। এ হল বিশুদ্ধ আনন্দ রূপের প্রকাশ।

তবে সবসময়ই যে শিল্পে বিশুদ্ধ আনন্দ রূপেরই প্রকাশ ঘটে তেমনটা না-ও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে আমরা যদি লাস্ট সাপার ছবিটির কথাই ধরি একে তো আর আনন্দ রূপ বলা চলে না, গোইয়ার ছবিতে আমরা দেখি বীভৎস রসের ছড়াছড়ি, সালভাদোর দালির ছবিতেও কিছু কিছু বীভৎসতা লক্ষ করা যায়। প্রকাশ কর্মকারের আঁকা কিছু ছবিতেও এই বীভৎসতা ফুটে উঠতে দেখা যায় অথবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "দুই বিঘা জমি" কবিতাটিকেও কি আনন্দ রূপ বলবো! আবার আল মাহমুদের সোনালি কাবিন কাব্যগ্রন্থের সব লেখাতেই অংশত আনন্দ রূপের প্রকাশ। কবি অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের "শাক্ত চতুর্দশপদী" কাব্যগ্রন্থের ত্রিশ সংখ্যক কবিতায় পাই " তোমাতে ব্যাপৃত হবে, খড় মাটি কাঠামোর চেয়ে / আরো দূর রূপ ছেনে, শ্রীময়ীর সুঠাম গড়নে/ তুমি কি আসিবে মা গো, ঝাঁপি ভরা সুখস্বপ্ন সনে "। এখানেও মূর্ত বিমূর্তর মিশেলে গড়ে ওঠে এক অদ্বিতীয়া রূপ। ভাবতে অবাকই লাগে কালো কালী রূপের আরাধনার কথা ঘোর অমাবস্যার রাতেই ভাবা হয়েছে। নিচে শুয়ে শ্বেতশুভ্র ভোলানাথ। এ এক অনুপম মূর্তি বিমূর্ত কাঠামোর ভেতর। তাই তো সাধক রামপ্রসাদ গেয়েছেন " মনের ভ্রমে মাটি দিয়ে মায়ের মূর্তি গড়াতে চাই। " আসলে শিল্প ব্যাপারটাই মনের ভেতরে গড়ে ওঠা এক অনির্বচনীয় আদল। যার কোনো ব্যাখ্যাই হয় না। কেবল রস আস্বাদন হয়।

গদ্য : শিমুল আজাদ


 কবিতা এবং অভিজ্ঞতা




নাগরিক বৃত্তি কবিতার জন্য প্রবল অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়। ধ্র“পদী শিল্প ও সাহিত্যের বিকাশে নগর বা সভ্যতা প্রধান ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ ও তার পেশার কেন্দ্রগত অবস্থান থেকে এসব যেমন সমৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি নীরবে নিভৃতে এসেছে রুচি, রঙ, গন্ধের, পছন্দের পরিবর্তন। ‘একটি নগর জীবনে সময়কালে যে অস্থিরতা অনুভব করা যায় সে অস্থিরতা অন্যত্র কোথাও অনুভব করা যায় না’। আর সমগ্র সৃষ্টিশীলতার মূলে রয়েছে এ অস্থিরতা। অস্থিরতা যাতনা বিশেষ, যাতনা চিন্তাকে গভীর করে। ভাবনাকে স্থিমিত। কার্যকালকে করে প্রলম্বিত। নাগরিক জীবন কবিদের শিল্পীদের জন্য অভিজ্ঞতার। এ অভিজ্ঞতা যেমনিভাবে তাঁকে বাস্তবমুখী করে তেমনি তাঁকে করে তোলে সচেতন। সে অস্থিরতার চোখে আবিষ্কার করে ধূসরতা। আহত হয় আবেগকে উসকাতে। ব্যথিত বিস্মে জীবন তাকে উপলব্ধি করায়। কল্পনার মৌলসম্পদ ভেঙে এই অস্থির জটিল ক্লেদ পংকিলতায় কবি ছোটেন প্রকৃতি উদ্ধারে। কবি লেখেন: 


‘কিছু দূরে গ্রাম গুচ্ছগ্রাম ধারণার গ্রাম

এই শহরের বিচিত্র আলো-আঁধারে

পথকলি ফুটতে চাইছে

একজন প্রাক্তন স্বৈরশাসক

স্বপ্ন দেখেছিল পথকলি ফুল

গ্রামের সবুজ-সম্ভার।’ 


ফেলে আসা পথ, মাঠ, নদী, আর আত্মীয়ের বন্ধন ক্ষতের মাত্রাকে করে প্রকট। নৈঃসঙ্গতা লেগে থাকে জানযটে, ব্যাপক জনগোষ্ঠীর ভিড়ে, বিচিত্র পেশার দরবারি হাঁকে, পণ্যের সহজলভ্যতায়, অর্থের প্রাসঙ্গিকতায়, কড়কড়ে রোদে। বাস্তবতা অতিমাত্রিক উন্নাসিক হয়। ব্যক্তি বহু বিষয়ে সম্পৃক্ত হন সজ্ঞানে নয় অজ্ঞানে। দশদিক থেকে তার ঘাড়ে হুড়মুড় করে আসেÑএসব আয়োজন, আকর্ষণ। ঘটনা-দুর্ঘটনা। চাকার ঘর্ঘর, মেশিনের কড়কড় আন্দোলনের উত্তাপ, মিডিয়ার ভূত-প্রেত।


সংস্কৃতির তোড়-জোড় তো আছেই। ‘শতফুল বিকশিত হোক’ এমনটি নয় অযোগ্যতাও যোগ্যতা পায় যোগ্যদের শক্তির অভাবে। এ শক্তি কেবল পৃষ্ঠপোষকতার দৌলতে নয় অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অবস্থানও বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাই অস্থিরতা আসে ধাক্কা খায় বোধে। নীতিগত প্রশ্নের উত্তরে দাঁড়াতে আর পড়ে যেতে পিছনে পড়াটা কিন্তু কোনো না কোনোভাবে ঘটে এই জীবনে সামনে-পিছনে করতে করতে চরিত্রের দৃঢ়তা, জন্মের অভিজ্ঞতা শাণিত হয়। অভিজ্ঞতার জন্য নাগরিক জীবনকে প্রাধান্য দেয়ার অর্থ এই যে, সব শ্রেণীর লোকের ভিড় এখানে জমে। প্রত্যেকে সভ্যতার মধ্যে ও সাহসের দিকে যে বাসনা তা বহন করেÑএ তারই ফল। সংস্কৃতি সৃষ্টি পায়, কর্মের বিভিন্ন ভাষার বিস্তারও লক্ষ্য করা যায়। আর যেখানে নগর নেই প্রকৃতি তার আপন স্বভাবে অভ্যস্থ, সেখানে যে কবি বা শিল্পী বাস করেন তাঁর পক্ষে বাস্তব জীবনের, সমাজ, সভ্যতার সূত্র থাকে সামান্য। প্রকৃতি তাঁকে ও সব বিষয় থেকে নির্জলা আকাশে, সবুজের, চূড়ান্ত অধিষ্ঠানে রাখে। ব্যবহারিক, বাস্তবিক টানা-পোড়ন তাঁর সাহিত্যে, শিল্পে আসার, দাঁড়াবার অবকাশ পায় না। যা জীবনের অসম্পূর্ণ চিত্রেরই সামিল। জীবনচর্চার বিকাশের প্রশ্নে ব্যাপক মানুষের দৈনন্দিন মানসিক সমস্যা ও সম্ভাবনা আগ্রহের অপ্রকাশ, চিন্তার, আবেগের অনুভূতির কাছে পৌঁছানো -শিল্পের সাহিত্যের প্রধান লক্ষ্য বলে ধরে নেয়া যায়। তাই অভিজ্ঞতার জন্য নগর বা নাগরিক বৃত্তি প্রধান। অভিজ্ঞতার বহু পথ বা অসিম দরোজায়-নাগরিকতা বিশেষ উপযোগ নিয়ে আছে। 


যশোর নগর ধাম


রাণা চট্টোপাধ্যায় 


তোমার নগরে কি আছে নতুন জানাবে?

সেখানে কি গাছে-গাছে পাখি ডাকে, 

ভোরে শোনা যায় ‘জবাকুসুম সঙ্কাশন’ 

স্ত্রোত্রে এষার আজান?


সেখানে কি কপোতাক্ষ তীরে সন্ধ্যার সময়

কিশোরীরা ‘খেজুর পাতার নূপুর পড়ে পায়’

সেখানে কি দুঃখ-কষ্টগুলি আমার শহরের মতন?

শ্রমিকেরা শ্রম দিয়ে দু’বেলা অন্ন পারে না জোটাতে

হাড়-হাভাতের মতো ভয়ঙ্কর শীতে গাড়ীবারান্দার নিচে

শুয়ে থাকে চটমুড়ি শিশু ও কুকুর?

কৃষকের ধান লুট করে নিয়ে যায় মহাজন

আমারি রক্তে বোনা ঝড়-জল-হিমানী সম্পাতে! 


তোমার নগর ঠিক কি রকম শিমুল আজাদ?

পথে ভিড়, ফুটপাতে পসারীর দল পেতেছে

সাগরে শয্যা শিশিরের ভয় নেই আর। 

রেললাইনের পাশে বস্তিতে আঁধার?

সেখানে কবিরা কি কফিঘরে বসে-বসে স্বপ্ন বোনে

ঘাম-রক্ত ঝরিয়ে লিটল ম্যাগাজিন করে জনে-জনে? 

সেখানে কি প্রেমিকেরা প্রেমিকার জন্য পাগল পরাণ

প্রেমিকারা রাজহংসীর মতো 

অহঙ্কারী গ্রীবা তুলে ধাবমান অভিমানে

স্বর্গের হুরী পরী হয়!


জানাবে কি এই সব শিমূল-পলাশে কবে বিয়ে! 

তোমার নগরে আমি কোনো দিন যাই নি শিমুল

যাব কিনা তাও জানা নেই

দু'শো কিলোমিটারের মত দূরে থাকো

আমাদের বর্দ্ধমান আসানসোল কিংবা পুরুলিয়া বাঁকুড়া

অথচ তিন হাজার কিলোমিটার দূরের কোচিন

কন্যাকুমারিকা, শ্রীনগর, দিল্লী মাদ্রাজ বারবার গেছি

যাই নি তোমার বাড়ি মধুসূদনের পিতৃভূমি

কপোতাক্ষ তীরে যশোর নগর ধাম

প্রতাপাদিত্য নাম মহারাজ বঙ্গজ কায়স্থ

 হায়রে বাংলাভাগ পাসপোর্ট ভিসা নিয়ে

 দু’জনার দু’টি দেশে বাস তো। 


কবিতার বক্তব্যই বলে দিচ্ছে কবিতার দৌঁড়, স্বপ্ন, বিশ্বাসের কথা। সময়ের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে মানুষের অবস্থানের কৃতকর্মের নানা সংগতি এবং অসংগতির কথা। কবিতাটি শেষ পর্যন্ত মানবিক আবেদন নিয়ে জাগরিত। জীবনকে বর্ণিল করে তোলার এক নিগুঢ় প্রচেষ্টা এবং আকাক্সক্ষার রঙ, গন্ধ বের হয়ে আসছে। রাষ্ট্র, সমাজ, দেশ, কালের উর্ধ্বে উঠে জীবনের জয়গান, হৃদয়ের সতেজ স্পর্শ ও সবুজতাকে খুব সহজেই প্রকাশ করে বলতে চাইছে ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক আমি তোমাদেরই লোক’। 


সঙ্গপ্রিয়তা মানুষের স্বভাব এবং আত্মার প্রাণ স্বরূপ, জীবনকে টুকরো টুকরো করে সীমানার প্রাচীর দিয়ে নানা বাঁধা। নিষেধ সৃষ্টি করে মানুষ যে সভ্যতার সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে এবং তার জন্য আপ্রাণ কর্ম করে যাচ্ছে তা যে কত বড় ভুল কত বড় অসাড়তা, অন্তঃসার শূন্যতা! কবি সেই অসাড়তার বিরুদ্ধে সজ্ঞানে জাগ্রত। প্রাণে-প্রাণে মিল এবং সঙ্গলিপ্সা; আকাক্সক্ষার মধ্য দিয়ে দেশব্যথা জানাচ্ছে। জীবনের নানা চিত্রের অবস্থানের দৌঁড় দিতে দিতে জীবন বাস্তবতার চিত্রময়তা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে কবির প্রাণ জানান দিচ্ছে হৃদয়ে সুবজ অরণ্যকে। যে অরণ্যতে কেবলই শান্তি কেবলই সুখ কেবলই উৎসব। এই উৎসবের সলতেটাকে চিরন্তন করে জ্বালিয়ে রাখতে চাই এগিয়ে আসাটা। ধৈর্য এবং সহিষ্ণুতা ত্যাগ এবং তিতিক্ষা। একই ভাষার একই মানচিত্রের অতীত টানে আমাদের দশা সত্যি সত্যি সংকুচিত দুমড়ে মুছড়ে তছনছ হচ্ছি, যীশুর ক্রুশবিদ্ধ অনুভবে পৌঁছাচ্ছি। কিন্তু উপায়হীন সত্তার ক্রন্দন ছাড়া আজ আর কিছু নেই। জানি না এই ভাষাবোধ, সংস্কৃতিবোধের ভিতর আগামীতে কোনো সংযোগ ঘটবে কী না! ভাষার একত্রীকরণের পস্পরের প্রেমে, ধ্যানে তা পূনর্মিলনের পথ সৃষ্টি করতে পারবে কী না! আমাদের জানা নেই। তবে যদি প্রচেষ্টা থাকে প্রাণের, যদি চেতনা থাকে মিলনের, যদি সাধনা থাকে কর্মের, যদি স্বপ্ন থাকে জীবনের তবে নিশ্চিত বিরহের কাল অভিসারের তোড়ে যাবে ভেসে। ইতিহাসের পথ ধরে কবিতার ঘুর্ণায়নে সব কিছু একাকার হয়ে যাবে। মিলনে মিলনে ঘটে যাবে বিপ্ল¬ব। ঘটে যাবে আনন্দের নির্ভেজাল উৎসব। সহমর্মে, সহবন্ধনে, সহআচারে জীবন সৌরভময় হবে একদিন। এক ভাষাভাষি বিচ্ছিন্নতার দীর্ঘ বেদনাকে সরিয়ে আনন্দকে সাথে নিয়ে হাঁটবে, বাঁচবে জীবনের  পূর্ণাঙ্গ স্বরূপকে নিয়ে। খণ্ডতার যন্ত্রণা প্রকৃতই অসহ্য। বিচ্ছিন্নতা প্রকৃতই ধ্বংসের ধ্বজাধারী। 


কবিতাকে নিয়ে চলাটা একটা ভীষণ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তেমনি দায়িত্ববোধ উসকে ওঠে সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে। শিল্পের প্রতিটি স্তরই বুঝি এমন। কবিতাকে বুকে ধারণ করে নীরবে সশব্দে উচ্চারিত হবার অস্তিত্বকে শ্রদ্ধা না করে পারা যায় না। কবির প্রচেষ্টার কাছে জগতের সমস্ত প্রচেষ্টা ম্ল¬ান হয়। এ সত্য সহজেই আবিষ্কার করতে পারেন সংবেদনশীল পাঠক। সংবেদনশীলতার গুরুত্ব শিল্পের প্রধান পথ ও অবস্থানের অনস্বীকার্যতা। সংবেদনশীল চিত্তই পারে কবিতার প্রতিটি অংশের মেলবন্ধনের মাধ্যমে একটি সুর ঘটিয়ে দিতে।  একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামোর অলি-গলিতে প্রবেশ করে প্রকৃত অবস্থান, আনন্দ, দুঃখ এবং দর্শনটি খোঁজ জেনে নিতে। কবিতা এমন একজন সংবেদনশীল পাঠকের প্রত্যাশায় থাকে। কবি ও তাঁর কবিতার নির্মিতির মুহূর্তে সে সব পাঠকের কথা ভেবে লিখে চলেন এবং পৌঁছান আশ্চর্য জগতে। সে জগতে পৌঁছানোর জন্য অপেক্ষার প্রয়োজন পড়ে। ধৈর্যের চরম পরীক্ষা কবি ও পাঠককে দিতে হয়। এ সত্যকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। লক্ষ্য নেই কবিতার পথ হাঁটা কালে। দূর থেকে দূরে যত দূরেই কবি যাক না চলে! একটা সময় তাকে ফিরে আসতে হয় কোলাহলে। একটা সময় কবিকে যেতে হয় নির্জনে, নির্বাসনে। কবির উপস্থিতি সর্বসময় কাম্য নয়। কবিতার প্রসঙ্গও সব সময়ের জন্য জরুরী নয়। এই মাত্রাজ্ঞান না থাকলে লোকালয় দুমড়ে মুছড়ে পড়ে। নির্জনতা দারুণ সংকটে ভেঙে চুরে যায়। তাই সচেতনতা, সচেতনতার বিকল্প কোনো পথ আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। মাত্রাজ্ঞানের ধারণাই সচেতনতার প্রধান গুণ বা অংশ। কবিতা সচেতনতার প্রকাশে মাত্রা জ্ঞানের উপলব্ধিতে সমস্ত কিছুর মধ্যে এক অর্থময়তা আনয়ন করে। আর অর্থময়তা যাবতীয় স্থূলতা, বদ্ধতা, ক্লেদাক্ততাকে নিঃশব্দে গুড়িয়ে পৌঁছে দেয় সমৃদ্ধির জোয়ারে। মানব সভ্যতার ক্রম পরিণতিতে কবি ও কবিতার ভূমিকা সর্বাগ্রে দৃষ্টি রেখে চলেছে। সর্বাগ্রে নানা সংকটে সমাধানের উপায় সৃষ্টি করে গেছে আপন বৈভবে, ঋদ্ধতায়। শুধু তাই নয় কবিতা দূরকে কাছে এবং কাছকে দূরে, সামান্যকে অসামান্যে, অসামান্যকে সামন্যতায় পৌঁছে সবকিছু এলোমেলো করে! দেয়। তাই কবিতা নীরব বিপ্লবের অংশী। কখনো বা স-শব্দের মহিমা হয়ে আশ্রিত হয়ে আছে জীবনের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে, শাখা- প্রশাখায়।



শিমুল সমীক্ষা

শামীম আরা লীনা


এই বসন্তে আপনি কেমন আছেন শিমুল?

জীর্ণ শীতের হিমেল উত্তুরে হাওয়ায়,

মাঝে গিয়েছে জানিÑপাতা ঝরা শীর্ণ সময়।

ন্যাড়া ডাল-পালা নিয়ে কাঠ ফাটা রোদ্দুরে

বড় নিঃসঙ্গ কেটেছে আপনার নিষ্ফলা দিন।

এখন দক্ষিণা হাওয়ায়-

বসন্তের উপচে পড়া যৌবন;

আপনার রক্তে ছোটায় লাল টগবগে ঘোড়ার

দুরন্ত দস্যিপনা।


আপনার হৃদয়ের লোহিত সাগরের স্নান করে

পুস্পিত শাখা-প্রশাখারা-

আকাশের প্রতœতত্ত্ব কপালে এঁকেছে,

গোলাপী ঠোঁটের চুম্বন রেখা।

আপনাকে ঘিরে পাখির পালকের মত

উড়ছে শুভ্র, তুলো; যেন আকাশের হৃদয় জুড়ে

বৃষ্টির স্বপ্নমাখা তুলোট মেঘের গুঁড়ো।

আপনাকে ছুঁয়ে এই বসন্তের রঙ্গিন হলিখেলা।

আপনাকে ছুঁয়ে শৈল্পিক না'য়ে স্বপ্নের পালতোলা।


পৃথিবীর চোখে চোখ রেখে সত্যি বলুনতো,

এই বসন্তে আপনি কেমন আছেন শিমুল? 


কবির চোখে কবি, ব্যাপারটি সামান্য নয়। দূর থেকে, অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেও বুঝে ওঠা যায় না! পরস্পরের মধ্যে পরস্পরের কী গভীর উষ্ণতা, কী গভীর টান ঘটে যেতে পারে। আবার এও এক সত্য ‘কবির বিরুদ্ধে কবি’ সর্বাগ্রে জাগ্রত। তারপরও উদ্ধৃত কবিতার কবি যে স্বপ্ন সম্ভাবনা এবং শ্রদ্ধাকে অংকিত করে গেলেন তা সামান্য নয়, অসামান্যর যাবতীয় আয়োজনকে সাথে নিয়ে  তাঁর চেতনা, হৃদয়ের স্পন্দনকে এক মহাকালীক অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। শণাক্ত করে গেছে একটি সত্ত্বার অনিবার্য পরিচর্যাকে। ধন্যবাদ কবি ও কবিতা। যে যে পথের হোক, মতের হোক পরস্পরের প্রতি পরস্পরের শ্রদ্ধাবোধ ভালবাসা থাকলে জীবনের কোনো ক্ষতি নেই বরঞ্চ লাভই  আছে। সমগোত্রীয়দের একটি মন্তব্য, একটি গল্প অনেক মূল্যবান হয় ভিন্ন শ্রেণীর কাছে। কবিরা সাধারণত সবকিছুকেই নিরাসক্ত চোখে দেখেন ফলে একটা ঋজু ভঙি, দাঢ্য অবস্থান অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। সমাজবদ্ধ ক্ষুদ্র জীবেরা প্রত্যহ চায় কামনা করে একজন কবির গর্ব অহংকারকে টানা হেঁচড়া করতে। তাই একজন প্রকৃত কবিকে গড়ে উঠতে অনেক অনেক কাল, অভিজ্ঞতা, অসাড়তা, তিক্ততা, নগ্নতা, স্থূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হয়। আর এই সব বাঁধা বিঘœ পেরিয়ে নিজেকে পূর্ণাঙ্গ অবস্থানে পৌঁছানোর কাজটি সহজ নয় খুবই কঠিন। সেই কঠিন পথকে ভালবেসে বুকে আগলে প্রতিকূল সব কিছুকে অতিক্রম করার ধৈর্য, সাহস, শক্তি এবং অবকাশ সবার চরিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না। 


কবিতার পথ মসৃণ নয় কঠিন। কবির উপস্থিতি কাম্য নয় সমাজের, কবির বেঁচে থাকা কাম্য নয় রাজনীতির, কবির চেতনার বিকাশ লক্ষ্য নয় রাষ্ট্রের। কবির চিন্তা গ্রহণযোগ্য নয় দার্শনিকের। কবির বিশ্বাস ধারণযোগ্য নয় রাজনৈতিকের। তদুপরি কবির জন্ম হয়। সমাজ পরিবর্তন পায়। চিন্তার জন্ম হয়, প্রগতি এগিয়ে চলে। কবি কবিতা লেখেন মাথা উঁচু করে হাঁটেন। বেঁচে থাকেন নিজের সময়ে। দুঃখ পান, আঘাতে জর্জরিত হন, সমাজের কাছে হন হেয় প্রতিপন্ন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হন অবাঞ্চিত। তারপরও সব কিছুর শেষে কবিতা টিকে থাকে। সব কিছুর ভিতর দিয়ে সৃষ্টি হয় নতুন যুগের। সবকিছুর ভিড় ঠেলে কবি এগিয়ে আসেন আত্মার নিকটে। সাহসের যোগান দেন নানা সংকটে। বিশ্বাসকে জাগিয়ে তোলেন অভিজ্ঞতায়। দুর্যোগকে চিহ্নিত করেন প্রজ্ঞায়। রুচি ও বিশ্বাসকে দেন পাল্টে আপন মাধুর্যে। অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলেন কার্যে। দুর্যোগকে সরিয়ে হাঁটেন কৌশলে, শক্তিতে,  স্তব্ধতাকে, গুড়িয়ে তুলে আনেন নান্দনিক গতিময়তা। দুঃখ-যন্ত্রণাকে গলা টিপে মারেন আপন বিলাসে। জয় হোক কবির। জয় হোক কবিতার। 


ছবি:  বিধান দেব 


                                                                    


ধারাবাহিক গদ্য : দীপক হালদার

 





ডায়মন্ড হারবারের সাহিত্যচর্চার ইতিবৃত্ত 






তিন .

গতি নিত্য প্রবহমান ।কখনো তা দ্রুতগামী আবার কখনো বা তার গতি মন্থর, শ্লথ।সাহিত্যচর্চার ধারায়ও এর প্রতিচ্ছবি বিদ্যমান ।

পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধির তিরোধানের পর তাঁর কনিষ্ঠপুত্র বলাইচাঁদ হালদার দীর্ঘদিনধরে ডায়মন্ডহারবার হিতৈষী সম্পাদনা ও প্রকাশনার কাজে যুক্ত ছিলেন ।সাতের দশকেও ডায়মন্ডহারবারেরপুরাতন বাজার এলাকায় ডায়মন্ডহারবার হাইস্কুলের নিকটবর্তী হিতৈষী প্রেস থেকে ডায়মন্ডহারবার হিতৈষী প্রকাশিত হতে দেখা গেছে ।কিন্তু বলাইবাবুর  প্রয়াণের পর ডায়মন্ডহারবার হিতৈষীর প্রকাশ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ।

পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধির জ্যেষ্ঠপুত্র হরিপদ হালদার ডায়মন্ডহারবার হিতৈষীর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন না বলে জানা যায় ।

তবে তিনি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে 'সেবক' নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করতেন ।তাঁর পরলোক গমনের সাথে সাথে সেবকের প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়।

            এরপর ঊনিশ শ তেষট্টি খ্রিস্টাব্দে ডায়মন্ডহারবারে জন্ম গ্রহণ করে আরও একটি সংবাদ- সাহিত্য পত্রিকা, নাম 'দখিনা '।সম্পাদনা করতেন গননাথ মন্ডল।সাতের দশক থেকে আটের দশকে আসার পথে তার গতিপথ মাঝে মাঝে রুদ্ধ ও মন্থর হয়েছে।কালের নিয়মে একসময় তা ও বন্ধ হয়ে যায় নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ।যদিও এর বেশ কিছুদিন আগে গননাথবাবু পরলোকগামী হয়েছেন।তবে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র শ্রীমান দীপক মন্ডল বহুদিন ধরে পত্রিকার প্রকাশ সচল রেখেছিলেন ।দখিনার বিশেষ বিশেষ সাহিত্যসংখ্যা যাঁদের লেখায় ভরে উঠত তাঁরা হলেন----- শিবপ্রসাদ হালদার, সরোজ দাস, শিশির দাস,সত্যেশ্বর চট্টোপাধ্যায়, ইন্দ্রজিৎ পুরকায়স্থ প্রমুখ ।কোনোকোনো সময় এই প্রতিবেদকের কবিতা, গল্প ও স্থান পেত সেখানে ।এসব ছাড়াও থাকত কবি সামসুল হকের কবিতা, অরুণ বসুর কবিতা ইত্যাদি ।

      ঊনিশ শ পঁয়ষট্টি খ্রিস্টাব্দ নাগাদ আত্মপ্রকাশ করে আরও একটি সংবাদ সাহিত্য পত্রিকা ফুটপাত ।সম্পাদক অজয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত পত্রিকাটি মোটামুটি নিয়মিত ব্যবধানে প্রকাশিত হত।ওই পত্রিকায় উপরোক্ত লেখককূল ছাড়া দেখা যেত হরেন্দ্রনাথ বসুমল্লিক, অচ্যুত হালদার, অমিট রে ছদ্মনামের আড়ালে অজিত মন্ডল,ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়, বলরাম বাহাদুর, অমিতাভ দত্ত, সুব্রত ভুঁইয়া, রফিক উল ইসলাম প্রমুখের রচনা ।।দীর্ঘ অর্ধশতক পেরিয়েও ফুটপাত অজয়বাবুর জ্যেষ্ঠপুত্রশ্রীমান কিংশুক ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়ে চলেছিল মূলতঃ সংবাদ পাক্ষিক হিসেবে ।বর্তমানে ফুটপাতের প্রকাশ চোখে পড়েনা।

            ঊনিশ শ আটষট্টি সাল নাগাদ ডায়মন্ডহারবার থেকে পুরোপুরি সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হয় 'বন্দর'।সম্পাদক অচ্যুত হালদার ।পূর্বে উল্লিখিত লেখকগণ ছাড়া বন্দর পত্রিকায় পূর্ণেন্দু ভরদ্বাজ, নির্মলেন্দু গৌতম, কবি ওয়াজেদ আলির লেখাও প্রকাশিত হত।


অচ্যুত হালদার সম্পাদিত বন্দর ডায়মন্ড হারবার থেকে প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা, যাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ সাহিত্য পত্রিকা বলা যেতে পারে ।সম্পাদক অচ্যুত হালদার শিশু সাহিত্যিক হিসেবে কলকাতার বিভিন্ন কাগজে গল্প, রম্যরচনা লিখে ধীরে ধীরে পরিচিতি লাভ করছেন ।কলকাতা থেকে প্রতিষ্ঠিত লেখকদের লেখা সংগ্রহ করে বন্দর পত্রিকায় প্রকাশ করতেন ।

         এসময়ে ডায়মন্ডহারবারে একটি বিশেষ ঘটনা বেশ উদ্দীপনার সৃষ্টি করে ।সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে নগন্য বলে মনে হলেও ওই ঘটনা কিশোর তরুণ সাহিত্য সেবীদের উৎসাহিত করেছিল।তা হলো, ডায়মন্ডহারবারের নুনগোলা পূজা কমিটির শিউলি নামের শারদ স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ ।যতদূর জানা যায় প্রখ্যাত গান্ধীবাদী নেতা,মন্ত্রী এবং পরবর্তীতে সর্বোদয় আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ চারুচন্দ্র ভান্ডারীর পুত্র বিমল ভান্ডারীর উদ্যোগে ও ব্যবস্থাপনায় শিউলি প্রকাশিত হয়।ওই সময়কালে চারুবাবু সপরিবারে নুনগোলায় বসবাস করতেন ।বিমল ভান্ডারী ভালো কবিতা লিখতেন বলে জানা যায় ।মূলতঃ বিজ্ঞাপন জোগাড় স্মারকগ্রন্থের উদ্দেশ্য হলেও এলাকায় বিশেষ সাড়া পড়ে গিয়েছিল ।শিউলিতে নবীন কলমনবিশদের সাথে প্রবীণদের লেখাও যত্নসহকারে ছাপা হতো।বিমল ভান্ডারী ছাড়া শৈলেশ্বর মিত্র,কামদেব শাসমল, অরুণ বসু,অমিতাভ দত্ত, সুব্রত ভুঁইয়া, বলরাম বাহাদুর প্রমুখের লেখাও প্রকাশিত হতো । এই প্রতিবেদকের লেখাও স্থান পেত সেখানে ।নুনগোলা পূজা কমিটি তাদের পঁচাত্তর ও একশো বছরে যে স্মারকগ্রন্থ দুটি প্রকাশ করেছেন, তা অবশ্যই সংগ্রহযোগ্য ।ডায়মন্ডহারবারের পুরনো দিনের অনেক কথা, স্মৃতিচারণা সংখ্যা দুটিকে উজ্জ্বল ক'রে তুলেছে।ওই সমস্ত সংখ্যায় কলকাতার বিখ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক কবিদের রচনার পাশাপাশি ডায়মন্ডহারবারের প্রতিষ্ঠিত কবি সাহিত্যিকদের লেখাও প্রকাশিত হয়েছে । ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়, অমিতাভ দত্ত, রফিক উল ইসলাম প্রমুখের রচনা ওখানে বিশেষ মর্যাদায় প্রকাশিত । ওর পরেপরেই ডায়মন্ডহারবারের অন্যান্য পুজো কমিটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ শুরু করে ।

একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা এই যে ছয়ের দশকের অনেকটা সময় ডায়মন্ডহারবারের গার্লস স্কুল রোডের একটি বাড়িতে বসবাস করতেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায় । তাঁর অনেক বিখ্যাত গল্প ও উপন্যাস এখানে বসেই রচিত  হয়েছে ব'লে জানা যায় ।

ঊনিশ শ সত্তর খ্রিস্টাব্দে ডায়মন্ডহারবার থেকে প্রকাশিত হয় আরও একটি পত্রিকা ।অমল মাইতির সম্পাদনায় আত্মপ্রকাশ করে সংবাদ পাক্ষিক হীরক বার্তা পত্রিকা ।ঊনিশ শ পঁচাত্তর সালে ফলতা থানার শিবানীপুর থেকে তপন কান্তি মন্ডলের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় দেশ আমার মাটি আমার পত্রিকা । সাহিত্য ও সংবাদ পরিবেশন এ পত্রিকার বৈশিষ্ট্য । কাছাকাছি সময়ে ডায়মন্ডহারবারের লেনিন নগর থেকে অজিত বসুর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় জনতীর্থ নামের পাক্ষিক সংবাদ পত্র । ডায়মন্ডহারবার থেকে এসময় প্রকাশিত হয় ভিন্নধর্মী আরও একটি সংবাদ- সাহিত্য পত্রিকা । পত্রিকার নাম বহ্নিবার্তা ।সম্পাদক জগদীশ প্রামাণিক ও শেখর বেরা।

ঊনিশ শ পঁচাত্তর খ্রিস্টাব্দ ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এক সময় । নেহরু যুব কেন্দ্রের আধিকারিক হয়ে ডায়মন্ডহারবারে পা রাখলেন কবি বাসুদেব দেব ।এক সুন্দর সকালে যুগান্তর ও অমৃতবাজার পত্রিকার সাংবাদিক অনল মন্ডল আমাকে নিয়ে হাজির হলেন স্থানীয় নিউটাউন সংলগ্ন তাঁর অফিসে। প্রথম আলাপে তিনি টেনে নিলেন আমাকে তাঁর গভীর অন্তরপ্রদেশে, আশ্রয় দিলেন।আশ্বাস দিলেন সময় পেলেই যেন তাঁর কাছে যাই নির্দ্বিধভাবে। সেই আশ্বাস সাহসী ক'রে তুলেছিল সকাল সন্ধ্যে যখন তখন তাঁর কাছে যেতে । ধীরে ধীরে সুব্রত ভুঁইয়া ও বলরাম বাহাদুরের সাথে পরিচয় ঘটে তাঁর । সুব্রত, বলরামদের সাথে আমিও তখন যুক্ত অর্কেস্ট্রা নামক পত্রিকা সম্পাদনার কাজে । যদিও তার আগে এইমুহূর্ত নামের একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করতাম আমরা অর্থাৎ সুব্রত, বলরাম ও আমি। ওখানে আশিস ঘোষও বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন । লিখতেন ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়, শংকর প্রামাণিকসহ আরও অনেকে । কিন্তু রেজিস্ট্রেশনের সমস্যা দেখা দেওয়ায় পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায় । শুরু হয় অর্কেস্ট্রা পত্রিকার পদযাত্রা ।

প্রসঙ্গত একটি কথা বলা খুব জরুরী, নইলে সত্যের অপলাপ হবে । এই মুহূর্ত পত্রিকা প্রকাশের মূল উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন সুব্রত ভুঁইয়া এবং বলরাম বাহাদুর । ওঁরাই ওঁদের বদান্যতা দিয়ে আমাকে এই মূহুর্ত র সঙ্গী করে নেন । পরবর্তীতে অর্কেস্ট্রা প্রকাশের সময় অবশ্য আমি ওঁদের সঙ্গেই ছিলাম । কবিতা ও শিল্প- সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকার শোভন মুদ্রণ পারিপাট্যের দিকে প্রখর নজর রাখতেন বলরাম বাহাদুর । বলরাম বাহাদুরের শিল্পশোভন নান্দনিক দৃষ্টি, সুব্রত ভুঁইয়ার সতর্ক পর্যবক্ষেণ ও অনুমোদনে পত্রিকার রচনাসমূহের নির্বাচন নির্নিত হতো । অর্কেস্ট্রার খ্যাতি তখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও বিশেষ সাড়া ফেলেছিল । আমেরিকা থেকে অমিয় চক্রবর্তী, ফ্রান্স থেকে লোকনাথ ভট্টাচার্য এবং তাঁর সহধর্মিণী ফ্রাঁস ভট্টাচার্য, জার্মানি থেকে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত পত্রিকার মান ও রুচি বিচার করে প্রায় নিয়মিত লেখা পাঠাতেন। একবার অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর দ্বারা অনুরুদ্ধ হয়ে বেলজিয়ামের এক কবি  ওয়ের্নার ল্যাম্বারসি তাঁর ভারত ভ্রমণের অঙ্গ হিসেবে ডায়মন্ডহারবারকে বিশেষভাবে রেখেছিলেন । সেই সূত্রে তিনি অর্কেস্ট্রার সম্পাদকমণ্ডলীর সাথে দেখা করতে ডায়মন্ডহারবার এস ডি ও অফিসে আসেন । অন্যতম সম্পাদক বলরাম বাহাদুরের ঠিকানা দেওয়া ছিল ওই এস ডি ও অফিস । ল্যাম্বারসি ওখানে বলরামের সাথে সাক্ষাৎ করেন । দীর্ঘ আলাপ- আলোচনার পর তিনি তিন সম্পাদকের কবিতার অনুবাদ প্রার্থনা করেন, তাঁর কথায় বলরাম সম্মতি জানানোয় তিনি খুশি হয়ে বেলজিয়ামের কবিদের একগুচ্ছ কবিতা পাঠানোর কথা জানান পরবর্তী কালে আমাদের কবিতা তাঁর ঠিকানায় বেলজিয়ামে পাঠানো হয়। তিনিও যথাসময়ে বেলজিয়ান কবিদের কবিতার একটি গুচ্ছ আমাদের কাছে পাঠান। ফিরে গিয়ে কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর কাছে ডায়মন্ডহারবার ভ্রমণ ও সম্পাদকের সাথে দেখা  সাক্ষাতের কথা জানালে অলোকরঞ্জন দারুণ খুশি হয়ে অর্কেস্ট্রাকে পত্র লেখেন।

যেসমস্ত বেলজিয়ান কবিদের নিয়ে অর্কেস্ট্রার anthology of Belgian poets প্রকাশিত হয়েছিল তাঁদের নামগুলো হলো যথাক্রমে------


1.Francoise Delcarte

2. HonsJaspozed

3.William Ciff

4.Lambesy Werner 

5.Christian Hubin

6.Michel Joiret

7.SergeMeurant 

8.Andersen( Christan Erwin)

9.Michel Duprez 

10.Yves Namuz

11.Lue Dellisse 

12.Daniel E. Bruycker 

13.Lodomez Gactan 

14.Francis Dannemark

15.Michel Gilles 

16.Jacqves  Cels

------------------------------------

Collected by  : WERNER  LAMBERSY

এসব ছাড়াও অর্কেস্ট্রাতে লিখতেন প্রখ্যাত শিল্প সমালোচক সন্দীপ সরকার, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, অরুণ বসু, শ্যামলকান্তি দাশ,রতনতনু ঘাঁটি,মদনমোহন বৈতালিক,অনুরাধা মহাপাত্র, শোভন মহাপাত্র প্রমুখ । ওঁরা ছাড়া বাসুদেব দেব, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, সামসুল হক ও লিখতেন অর্কেস্ট্রার পাতায়। সেসময়ের প্রতিষ্ঠিত কবি প্রাবন্ধিকদের রচনা প্রকাশ করে অর্কেস্ট্রা তখন অনেকের নজর কেড়েছিল। ওঁদের সাথে সাথে সম্পাদক তিন জনের লেখাও থাকত অর্কেস্ট্রার পাতায়। থাকত কবি  রফিক উল ইসলামের লেখাও।


অর্কেস্ট্রা কয়েক বছর পরে প্রয়োজনীয় অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায় । এ সময় উমাকান্ত ঘোড়ুই ও  শক্তি রায় প্রকাশ করেন ইজেল নামের কবিতা পত্রিকা ।তাও কয়েকটি সংখ্যার পর বন্ধ হয়ে যায় । এক সময় কবি রফিক উল ইসলাম সম্পাদনাসহ প্রকাশ করলেন গ্রামনগর নামে কবিতা ও কবিতা বিষয়ক পত্রিকা।


                                                                         ক্রমশ


ছবি:  বিধান দেব 



ধারাবাহিক গদ্য : অভিজিৎ দাশগুপ্ত

 




সাধনপর্বের নির্জনতা


৫.

বঞ্চনা
সিংহদ্বার খুলে গেছে ,  ভেতরে দেখি শুধুই শূন্যতা
হা হা করছে অন্ধকার
কেউ নেই , কোনো রহস্যও না
যেন বালক বয়সের হাওয়া ঘুরে যায়
দু 'একটা শুকনো পাতার শব্দ ----
কেউ নেই ? আমি চেঁচিয়ে উঠি
প্রতিধ্বনি আসে , কেউ নেই, নেই , নেই ---
আমার তীব্র অভিমান হয়
এ কি এক ধরনের বঞ্চনা নয় ?
যদি কেউ না থাকবে , তবে দ্বার কেন বন্ধ ছিল ?
কেন প্রতীক্ষায় ছিলাম এতদিন!

আমি মাক্সবাদে বিশ্বাসী , আবার অবিশ্বাসের মেঘও  ঘন হয়ে ওঠে কখনো-সখনো । সে সময় বিশেষের  ফল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ' বঞ্চনা '  কবিতাটি আমাকে আরো একবার অতীত বিশ্বাসের ভূমিতে নিয়ে দাঁড় করালো । ' কেন প্রতীক্ষায় ছিলাম এতদিন '!  কবি বিস্মিত ।  আমরাও কি বিস্মিত! কেউ কেউ । নচেৎ কেউ না । ইতিহাসের গতি অনুধাবনের শক্তি  আমাদের আছে । কবিও তার  বাইরে নন। তখন প্রশ্ন করে মন , সত্যিই তো এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা কার জন্য । অথবা কিসের জন্য । যদি এমনটা হত প্রতীক্ষার  শেষে ওই সিংহদুয়ার শুধু খুলেই যাবে না ,  সঙ্গে সঙ্গে তার অভ্যন্তরের ঐশ্বর্য রাশি রাশি ছড়িয়ে পড়বে আদিগন্ত । তা কিন্তু হয় নি। আমাদের স্বপ্নগুলি আশাগুলি শুধু পুরোনো আসবাবের মত ভেঙে খানখান হয় ।  ' হা হা করছে অন্ধকার '। অন্ধকারের তীব্রতা যন্ত্রণার মত । ' হা হা' শব্দে চিরকালের সেই  বঞ্চনার ইতিহাস , মানুষের ব্যথার মেহফিল ---- শ্রেষ্ঠ কিছু  শব্দেই ধরে রেখেছেন কবি ।

মনে করুন ' পথের পাঁচালি ' র অপুকে ।  কল্পনায় সে একবার কুরুক্ষেত্র যুদ্ধভূমিতে ,  আবার পর মুহূর্তে মেঘের  ওপারের জীবন সম্বন্ধে কৌতূহলী । শৈশবের সেই জিজ্ঞাসাই  তৈরি করে দেয় ভবিষ্যতের দিক। দুর্ভিক্ষ দাঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যা কবির  কাছে কল্পনাটুকু ছিল ।  কিন্তু তাতে ছিল না  মহাভারতের বীর যোদ্ধা বা অচেনা পৃথিবীর হাতছানি ।  অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের মতো  শান্তিও যাচ্ঞা  করেছিল শৈশব । পুনর্বাসনের দুরন্ত ইতিহাস ছাপিয়ে একটু ভালো থাকার মত বিষয়টি সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে । কিন্তু ...

কিন্তু এই কবিতায় কি পাওয়া যেত , তা থেকেও কী কী  পাওয়া যায়নি , সেই স্বপ্নভঙ্গের ছবি বড় হয়ে উঠেছে । নৈর্বক্তিক জীবন নয় , মেরুদন্ড সোজা রেখে বেঁচে থাকার কথাই কবি ভেবেছেন । তার ভেতর একটু স্বপ্ন একটু আশা ... এই আর কি। বেশি কিছু নয় । অথচ রাষ্ট্রব্যবস্থা সেটুকুও দিতে কার্পণ্য করে । ' এ  কি এক ধরনের বঞ্চনা নয় ? ' হ্যাঁ বঞ্চনা। শৈশবের বঞ্চনা - ব্যক্তি মানবের বঞ্চনা ।  জীবনব্যাপী সাধনার বঞ্চনা । অর্থাৎ একটা সিংহদ্বার অনেকগুলি বিষয়ের  প্রতীক হয়ে উঠতে থাকে।

আত্মা বশীভূত হয়েও  যেটুকু প্রতিবাদ জমা  থাকে শ্রমিকের দুটি হাতে ,  সেটাই কোনোদিন মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ওপরে ওঠে ।  লাল হয়ে যায় যে কোন ঋতুর  আকাশ।

কবিতাটি পড়তে পড়তে  থমকে যেতে হয় । এক নিঃশ্বাসে শেষ হয়েও সেই না-জ্বলা আগুন টের পাই। যাকে আগলে রেখেছে ভীতু অস্থির না হওয়া এক প্রাণ ।  অপ্রতিরোধ্য হতে চেয়েও চেতনা ফুসমন্তর।
বিন্দু হতে হতে ...

বিশ্বাসে দুটি হাত বাড়িয়েছি । যদি আরো একবার হাড়গোড় থেকে মুখ বাড়ায় মানুষের ভগবান! একমুঠো লাল রঙের স্বপ্নে ।

৬.

আজ মাংস
সারা শরীরের মধ্যে একমাত্র জেগে আছে নাক। ডেকচিতে টগবগ ফুটছে লোভ আর লালা
' একটু চাখো তো দেখি '  বলার আগেই
তিনটি জিভের  মত বেরিয়ে এসেছে তিনটি ডিশ,
আজ সাড়ে তিনশো মাংস ---
মাংসের প্রথম রবিবার।

বিলুর বরাদ্দ চার টুকরো।
ওর পর্শু ফাইনাল ।
নীলু তিন।
মেটুলির পীস্  মা- মণির ।
আলু আর একটুকরো  চর্বির সুবাদে
বাপের দুচোখ জুড়ে মহাপ্রসাদের পুণ্য ,
রক্তমাখা রং ও গর্দান ।
সাড়ে তিনশো  মাংস ভোজবাজি হয়ে উবে গেলে আলুহীন মাংসহীন
এক বাটি ঝোল খেয়ে উঠে যান গণেশজননী ।

রসুন-পেঁয়াজে, ভাজা মসলার ম ম গন্ধে
দু-তিন আউন্স স্বাস্থ্য বেড়ে গেছে গেরস্তবাড়ির। কার্ণিশে নরম রোদে বলবান কাক ।
দেড়খানা  নোনাধরা ঘর
                 আজ পুরোপুরি শান্তিনিকেতন ।

মায়ের কথা মনে পড়ে গেল । অথবা দিদিমা। জীবনের প্রবহমানতাকে সচল রেখে এগিয়ে যাওয়াই ছিল  তাঁদের ধর্ম । প্রসন্নতা শব্দটি ঠিক কতটা গভীর , তা বুঝতে জানতে এমন মা-দিদিমাদের কাছে এসে দাঁড়াতে হয় । আর কে না জানে সে কথা । অমিতাভ দাশগুপ্ত এই কবিতায় এক শুদ্ধ আত্মাকে  ধরতে চেয়েছেন । ইচ্ছে থাকলেই যে সব ক্ষেত্রে  তা সম্ভব হয় , তা তো নয়।  অনেক মুহূর্ত থাকে যখন কবিতা আর শব্দ বাক্য
রীতিতে  নিজেকে আবদ্ধ রাখতে চায় না । সে তখন মেধাবী যাত্রা থেকে সরে এসে এলো চুলে উঠোনে বা বাড়ির ছোট্ট ছাদটুকুতে দাঁড়ায় ।  কী এক বুনো তেলের গন্ধে  নির্ভার হয়ে ওঠে পংক্তিমালা।

৫০' , ৬০' , ৭০' এমনকি আশির দশকের চেনা ছবি উঠে এসেছে ' আজ মাংস ' কবিতাটিতে । উদ্বাস্তু সমস্যায় জর্জরিত বাঙালির  কাছে দৈবানুগ্রহের মতো ছিল সাড়ে তিনশো  মাংসের হাড়- মজ্জা। দেড় খানা নোনা ধরা  ঘরেই জীবন যুদ্ধের সঙ্গী ছিলেন একদিন আমাদের বাবা জ্যাঠা  কাকারা । এ কথা শুনেছি  আমার বড় পিসি সন্ধ্যা চক্রবর্তীর মুখে। সেখানে সিঁড়ির নিচে নতুন সংসার সাজিয়ে স্বপ্ন বুনে ছিলেন  আমার ঠাকুমা ।

কবিতাটিতে যে মাকে পাচ্ছি তিনি  যেন দুর্গার-ই  প্রতিরূপ । দশ হাতে সামলান সংসার । কেউ কিছু অসুবিধা বুঝতে পারেনা । অথবা সামান্য সমস্যা দেখা দিলেই ' এক বাটি ঝোল ' খাওয়ার মতো করে তিনি সামলে নেন সব ।  গৃহস্থবাড়ির এই চেনা ছবি কিন্তু আরো চেনা হয়ে ওঠে  যখন দেখি শীলিত এক জীবনের দিকে এগিয়ে চলেছে সংসার । সংহত জীবন সমাজকে  জড়িয়ে থাকে । স্পর্শগ্রাহ্য করে রাখে মনুষ্যেতরকেও। জীবনের উৎস থেকে কেউ বিচ্ছিন্ন নয় । কাক তাই দুপুরের নরম রোদে কার্ণিশে অপেক্ষারত । অথবা অপেক্ষার অবসানের পর বিশ্রামে লীন।

আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল । কতবার দেখেছি ওই ঝোল- আলুর গল্প । হয়তো কিছু অন্যরকম ।  তবু জীবনের খোঁজে নেমে ওই একই ঝর্ণাধারা দেখি সর্বত্র ।  কবিতার দেহাত্মা বহিরঙ্গে- অন্তরঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তাতে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের ' সোনার মুকুট '  মাথায় দিয়ে বসে আছেন আমাদের  গণেশ জননীরা।
              
  
                               
  

ধারাবাহিক গদ্য : অরিন্দম রায়

 


                   ভিনদেশি তারা


পিটার ব্যাকোস্কি

তিনি বিশ্বাস করেন ত্রুবাদুরের ঐতিহ্যে। তিনি চান তাঁর কবিতাগুলি পাঠকের বা শ্রোতার সামনে পরীক্ষা দিক, সেই পাঠক অথবা শ্রোতা যাঁরা তাঁর কবিতা আগে পড়েননি বা শোনেননি। তিনি ছুটে বেড়ান অস্ট্রেলিয়ার একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কখনও তিনি তাসমানিয়ায় আবার কয়েকমাসের ব্যবধানেই তিনি পৌঁছে যান মেলবোর্নে। তিনি চান নতুন নতুন শ্রোতা তাঁর কবিতা শুনুক। ভ্রমণ তাঁকে কবিতা উপহার দেয় , দেয় কাঙ্ক্ষিত বিস্তার এবং বৈচিত্র্য। তাই তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা , ইউরোপ আর অস্ট্রেলিয়ায়। তাঁর জন্ম হয়েছিল নির্ধারিত সময়ের আগে, হৃৎপিন্ডে একটা ফুটো নিয়ে। দুটো মেজর হার্ট অপারেশন হয়েছে তাঁর। কোনো সন্দেহ নেই তাঁর প্রথম কবিতার বইয়ের নাম হবে ‘ থান্ডার রোড, থান্ডার হার্ট’ , যেটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। টেক্সাসের পথে যেতে যেতেই প্রথম কবিতা লেখা। প্রথম পর্বের লেখায় আমেরিকান বিট কবিদের প্রভাব স্পষ্ট। অ্যালেন গিন্সবার্গ , জ্যাক কেরুয়াক , চার্লস বুকোস্কির লেখার ছাপ ছিল তাঁর প্রথম বইয়ে। ক্রমশ তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজস্বতা। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ইন দ্য হিউম্যান নাইট’-এর জন্য ১৯৯৬ সালে পেয়েছেন ভিক্টোরিয়ান প্রিমিয়ার’স লিটারারি পুরস্কার। দীর্ঘ কবিতা লিখতে যেমন স্বচ্ছন্দ তেমনই ছোট কবিতাতেও তাঁর দক্ষতা চোখে পড়ার মতন। ২০১৭ সাল অবধি প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৯টি। লিখে চলেছেন পিটার ব্যাকোস্কি। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের বাসিন্দা এই কবির কবিতা অনূদিত হয়েছে আরবি, ফরাসি, মান্দারিন , স্প্যানিশ, জার্মানি ভাষায়। তিনি বিশ্বাস করেন সাধারণ শব্দের মাধ্যমেই অসাধারণ কিছু ব্যক্ত করা যায়। পিটার ব্যাকোস্কি চান তাঁর কবিতা সকলের কাছে পৌঁছক।   

 

যে দিনগুলির মহড়া দেওয়া হয় নি

যা আমরা

বুঝতে পারি না,

মেনে নিতে পারি না

অথবা মেটাতে পারি না

ঘরের ভিতরে আমাদের ক্রমশ সংকুচিত করে

অথবা

আমরা খুঁজেই চলি

আয়নার ভিতরে,

ডিকশনারির পাতায়

আর মদের তলানির মধ্যে,

পাখিদের উড়াল লক্ষ্য করি

আর ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো দেখি,

পৃথিবীর অন্য মানুষগুলো

হয় ক্ষত জড়ো করে

অথবা গতিবেগ ।

 

ছাতাগুলো  

১০৮ দিন ধরে

বৃষ্টি হয় নি ।

 

ছাতাগুলো

গোল হয়ে বসে

তাস পেটাচ্ছে/খেলছে।

 

কেউ কেউ

ট্যাক্সি চালানো শুরু করেছে।

 

কেউ আবার

জড়িয়ে পড়েছে

ড্রাগ পাচারের কারবারে।

 

কেউ কেউ

ধর্মপ্রচারক হয়ে

বলে বেড়াচ্ছে

পৃথিবীর শেষদিন আসন্ন,

দিনক্ষণ ঠিকঠাক বলতে না পারলেও

পৃথিবী কীভাবে ধবংস হবে

সে ব্যাপারে তারা একমত,

 

একটা বিশাল বন্যায়।

কথা বলার সময়

ব্যাকুল হয়ে

তারা আকশের দিকে তাকায়

এমন এক আকাঙ্ক্ষা  

যা ভয়ানক ছোঁয়াচে।

 

এমন অহংকার থেকে দূরে

যখন একজন ব্যক্তি পুরুষ্টু গোঁফ গজিয়ে ফেলে ,

তার ভুরুদুটি তার কানের ভিতরে লুকিয়ে পড়তে চায়। 

 

ভেবে দেখুন

গাছের তলায়

আপনি বিশ্রাম নিতে পারেন ,

কিন্তু

কুঠারের ছায়ার নীচে

পারেন না । 

 

পুরুষরা

কেউ কেউ চিন্তিত থাকে টাক পড়ে যাবে ভেবে ,

অন্যদের দুঃশ্চিন্তায় টাক পড়ে যায়।

 

তা-ই স্বভাবজাত যা প্রকৃতি করায়

হয় কচ্ছপেরা দীর্ঘদিন বাঁচে কারণ তারা তাড়াহুড়ো করে না

অথবা তারা তাড়াহুড়ো করে না বলেই দীর্ঘদিন বাঁচে    

ধারাবাহিক গদ্য : চন্দন মিত্র

 



জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন               গল্পের অমায়িক ভুবন

                                           

হুইনেং-এর আখ্যান অথবা এক অকুলীন নিরক্ষরের                                     আত্মান্বেষণ   


তৃতীয় প্রহরের রাত, ঘুমে ডুবে আছে ডংশান মঠ। তরতাজা তরুণ সন্ন্যাসী মুদিত চোখে কম্বলের উপর পদ্মাসনে বসে, আজ ঘুমের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে যাবে আচার্য হং-জেনের   সঙ্গে দেখা করতে। স্থান, উত্তর চিনের হুয়াংমেই প্রদেশের চিচোউ পরগনার পূর্ব ফেংমাও পর্বতের চ্যানমঠ।  সময়, সপ্তম শতকের শেষ দশক। হুইনেং আজ বিকাল থেকে স্মৃতিতাড়িত হয়ে পড়েছে। সে কখনও যা   ভাবেনি আজ তাই হয়েছে। আচার্য হং-জেন কিনা স্বয়ং তার কাছে পৌঁছে গেছেন। হুইনেং তখন     প্রতিদিনের  মতো মাড়াই-ঘরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চলেছে। সে কাজ ফেলে তাড়াতাড়ি আচার্যের সামনে প্রণত হয়। আচার্য দেখলেন তরুণ হুইনেং কোমরের সঙ্গে একটা পাথরের চাঙর বেঁধে রেখেছে। তিনি   আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইলেন—  হুইনেং কোমরে পাথর বেঁধে রেখেছ কেন ?     

—ঢেঁকিতে পাড় দেওয়ার মতো যথেষ্ট ওজন আমার নেই তাই।       

—শরীরী-যন্ত্রণা উপেক্ষা করে এমন কর্তব্যনিষ্ঠা আমি আগে দেখিনি। কতদিন থেকে তুমি এমনটা করছ ? 

—প্রথম দিন থেকে।

—তা তো প্রায় আট মাস হল। 

—হ্যাঁ আচার্য।

আচার্য এবার চালের পাত্র থেকে একমুঠো চাল তুলে নিলেন। হুইনেংকে দেখিয়ে বললেন, এগুলো কি  প্রস্তুত হয়ে গেছে?

—না প্রভু, ঝাড়াই-বাছাই করে তুঁষ ও কাঁকড় থেকে চাল বেছে নিতে হবে।  

—হ্যাঁ ঠিকই বলেছ, ঝাড়াই-বাছাই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আজ রাত তৃতীয় প্রহরের সময় তুমি আমার সঙ্গে দেখা কোরো।


        হুইনেং দক্ষিণ দেশের লোক। সেখানে তখনও বুদ্ধের দর্শন পৌঁছায়নি। বাল্যকালে বাবা মারা যাওয়ায় সে পড়াশোনার সুযোগ পায়নি। জঙ্গল থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে বিক্রির মাধ্যমে সংসার চালাত। একদিন সে একটি দোকানে কাঠের দাম নিতে গিয়ে জনৈক খরিদ্দারের কণ্ঠে উচ্চারিত আশ্চর্য এক ধ্বনিমালা শুনতে পায়। হুইনেং-এর সমস্ত সত্তা জুড়ে সেই অপূর্ব ধ্বনিমালা অনুরণিত হতে থাকে। সে  যে একজন অকুলীন, নিরক্ষর কাঠুরে তা আর তার মনে থাকে না। ধ্বনিগুচ্ছের অসামান্য বিন্যাস ও উদাত্ত উচ্চারণের মাদকতায় সে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।  

হুইনেং হতভম্বের মতো জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁ ভাই এসব তুমি কোথায় শিখেছ ? 

আগন্তুক বলে, হুয়াংমেই প্রদেশের চিচোউ পরগনার পূর্ব ফেংমাও পর্বতের ডংশান মঠে। সেখানকার আচার্য পঞ্চম জেনগুরু হুং-জেন এই ‘চিং কাং চিং’( Diamond Sutra )আবৃত্তি করেন, আমি তাঁর মুখ থেকে শুনে মুখস্থ করেছি। আমি তাঁর অনুগামীদের বলতে শুনেছি এই সূত্র আবৃত্তির মাধ্যমে নিজের প্রকৃতি যথার্থভাবে চেনা যায়, এমনকি বুদ্ধ হয়ে ওঠাও সম্ভব। হুইনেংকে কে আর আটকায়। এক অদম্য উন্মাদনা তার ভেতরে মাথা চাড়া দিয়েছে। তাকে জেনগুরু হুং-জেন-এর পাদপদ্মে আশ্রয় নিতেই হবে। মায়ের  গ্রাসাচ্ছদনের যথাসম্ভব ব্যবস্থা করে হুইনেং যাত্রা করল। পুত্রের আত্মিক উন্নয়নের পথে বাধা হলেন না মা। প্রায় ৮০০ কিমি দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে হুইনেং অবশেষে পৌঁছে যায় কামনার মোক্ষধামে। 

         হুইনেং-এর আজ খুব মনে পড়ছে আচার্যের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের কথা। হুং-জেন তাঁর মঠে প্রবেশাধিকার দেওয়ার আগে যাচাই করে নেন, পরখ করে নেন স্বরূপ-সন্ধানের আকুতি। অনেকেই তাঁর চোখা চোখা বাক্যবাণের সামনে পড়ে পালাতে পথ পায় না। হুইনেং এখনও পরম যত্নে আচার্যের সঙ্গে তার কথোপকথনটি স্মৃতিতে ধরে রেখেছে।বাক্যগুলি এখনও তাদের হীরকদ্যুতি হারায়নি।  

হুং-জেন— কোথা থেকে আসা হচ্ছে ? আমাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কী হাসিল করার জন্য এই পার্বত্য মঠে আসা হয়েছে শুনি ?  

হুইনেং— আমি শিংচৌ এর লিংনান অঞ্চলের একজন সাধারণ ব্যক্তি,আপনার একান্ত অনুগত। আমি সমস্ত যাত্রাপথ জুড়ে আপনাকে স্মরণ করে বুদ্ধ হয়ে ওঠার কথাই ভেবেছি। আমার একান্ত ইচ্ছা এটাই।

হুং-জেন— কিন্তু লিংনানের মানুষেরা তো বর্বর প্রকৃতির, তাদের পক্ষে বুদ্ধত্ব অর্জন কীভাবে সম্ভব ? 

হুইনেং— মানুষ দক্ষিণের হোক বা উত্তরের তার সঙ্গে তাদের বুদ্ধ প্রকৃতির কোনো সম্পর্কই নেই। এই বর্বর আর আপনি একই প্রাণশক্তির অধিকারী, তাহলে বুদ্ধপ্রকৃতি কীভাবে পৃথক হতে পারে ?   

কথোপকথন এমন বুদ্ধিদীপ্ত ও মনোগ্রাহী হয়ে উঠছিল যে আচার্যের অনুগামীরা ক্রমশ ভিড় জমাচ্ছিলেন। আচার্য তার ক্ষুরধার মেধার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হলেন। তবে তাকে মঠের নবিশ হিসাবে গ্রহণ না-করে শস্য-মাড়াই-ঘরের দায়িত্ব দিলেন। ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে ধান ভানানোই তার কাজ। সে নিরক্ষর, বর্বর দখনো জাতির অকুলীন ব্যক্তি। মঠে তার কোনো  সম্মান নেই, প্রচলিত ব্যাকরণ অনুযায়ী থাকার কথাও নয়। এমনকি মঠের নবীন সন্ন্যাসীরাও তার সঙ্গে  এমন আচরণ করে যেন সে ভিনগ্রহী অনুপ্রবেশকারী।   

       ষাটোত্তীর্ণ হং-জেন মনস্থির করেই ফেলেছেন এবার অনুগামীদের মধ্যে থেকে ষষ্ঠ আচার্য নির্বাচনের  কাজটা তিনি সেরেই ফেলবেন। তিনি ঘোষণা করলেন মঠের প্রত্যেকে যেন বুদ্ধ-প্রকৃতি সম্পর্কিত নিজস্ব  ধারণাকে একটি শ্লোক হিসাবে লিপিবদ্ধ করে তাঁর কাছে জমা দেয়, সেরা শ্লোক রচয়িতাকে তিনি পরম্পরিত চীবর ও ভাণ্ড দ্বারা ষষ্ঠ আচার্যের পদে বরণ করে নেবেন। ষষ্ঠ আচার্যের পদে কে বসবেন তা মঠের কারও অজানা নয়। শেনজিউ ছাড়া ওই গুরুভার কে বহন করবে! সে যেমন বয়োজ্যেষ্ঠ, তেমন প্রাজ্ঞ। ফলে শেনজিউ ছাড়া কেউই কোনো শ্লোক লিখল না। কিন্তু সংকোচবশত শেনজিউ সেই শ্লোকটি আচার্যের হাতে না-দিয়ে রাতের অন্ধকারে মঠের দক্ষিণ দিকের দেয়ালে সাঁটিয়ে দিল। ভোরবেলা আচার্য হং-জেন, শিল্পী লু-চেনকে   সঙ্গে নিয়ে ধ্যানকক্ষের দক্ষিণ দিকের দেয়ালের কাছে পৌঁছালেন। আগে থেকেই ঠিক ছিল ওইদিকের দেয়ালে ‘লঙ্কাবতার সূত্র’ থেকে কিছু আখ্যানের ছবি আঁকবেন লু-চেন। সম্ভবত এই কারণেই শেনজিউ  শ্লোক টাঙানোর জন্য দক্ষিণ দিকের দেয়াল বেছে নিয়ে ছিল। হঠাৎ আচার্যের চোখ পড়ল শ্লোকের উপর।তিনি লু-চেনকে বিদায় দিয়ে অনুগামীদের ডেকে নিলেন। শ্লোকটি ঘিরে সবাই ভিড় জমাল। আচার্য  শ্লোকটির সামনে ধূপ জ্বেলে দিয়ে নিবিষ্ট মনে পাঠ করলেন— 

                             দেহই বোধিবৃক্ষ   

                             মন উজ্জ্বল আরশি 

                             নিত্য প্রযত্ন দাও  

                             না-হয় ধূলিমলিন 

আচার্য সবাইকে শ্লোকটি মুখস্থ করতে বললেন। আরও বললেন এই শ্লোকটি তাদের বুদ্ধ-প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে যাবে। শেনজিউ-এর তখন সেখানে থাকার কথা নয়, সে দূর থেকে সমস্তটাই পর্যবেক্ষণ করছিল। বিদায় নেওয়ার সময় আচার্য বলে গেলেন শেনজিউ যেন রাতে তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করে। শেনজিউ এই আহ্বানের অপেক্ষায় ছিল। যথাসময়েই সে আচার্যের কক্ষে পৌঁছে যায়।

আচার্য বলেন, শ্লোকটি তুমি লিখেছ?

শেনজিউ— হ্যাঁ। তবে আমি ষষ্ঠ আচার্যের পদলাভের উদ্দেশ্যে শ্লোকটি লিখিনি, সে যোগ্যতাও আমার  নেই। আমি আসলে দেখতে চেয়েছি আমি যৎসামান্য প্রজ্ঞা অর্জন করতে পেরেছি কি না ?   

আচার্য— শ্লোকটি জানিয়ে দিচ্ছে তুমি এখনও প্রজ্ঞার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছ, ভিতরে প্রবেশ করতে পারনি। বরং কয়েকদিন পরে তুমি আরও একটি শ্লোক লিখে আমাকে দেখিয়ো।    

          দিন দুই কেটে গেছে শেনজিউ একটি পঙক্তিও আর লিখে উঠতে পারেনি। হুইনেং এসব কিছুই  জানে না। একজন বালক শিক্ষার্থী শ্লোকটি উচ্চারণ করতে করতে মাড়াই-ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। হুইনেং তার কাছে শ্লোকটি সম্পর্কে জানতে চায়। সে ষষ্ঠ আচার্য নির্বাচনের জন্য শ্লোক প্রতিযোগিতা,ধ্যানকক্ষের দক্ষিণ দিকের দেয়ালে শেনজিউ-এর লিখিত শ্লোক ইত্যাদি সম্পর্কিত সবকিছু আনুপূর্বিক জানিয়ে দেয়। হুইনেং আটমাস মঠে থাকলেও মাড়াই-ঘরের বাইরে বেরোনোর অবকাশ পায়নি।  সারাক্ষণ কেবল কোমরে পাথর বেঁধে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চলে। সে শ্লোকটি একবার নিজের চোখে দেখে নিতে চায়। কিন্তু ধ্যানকক্ষের দক্ষিণ দিকের দেয়াল কোথায় তা সে জানে না। বালকটি হুইনেংকে সঙ্গে করে  নিয়ে যায় শ্লোক-দেয়ালের সামনে। সে শ্লোকটির সামনে অবনত হয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। হুইনেং পড়তে জানে না, তার অনুরোধে মঠের অন্যতম তত্ত্বাবধায়ক ঝাং রিয়াং  শ্লোকটি পড়ে শোনায় । হুইনেং বলে বুদ্ধ-প্রকৃতি নিয়ে আমার নিজের বানানো একটি শ্লোক আছে; কিন্তু আমি তো লিখতে পারি না। ঝাং রিয়াংই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসেন। হুইনেং বলে যায়—

                            বোধি কোনো বৃক্ষই নয়

                            নেই উজ্জ্বল আরশি কোথাও  

                            বুদ্ধ-প্রকৃতি চির বিশুদ্ধ 

                            ধূলিমলিন হবে কীরূপে ?    

শ্লোক শুনে উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলী বিস্মিত হয়, তারা তো বুদ্ধ-প্রকৃতিকে এমন সহজ অথচ গভীর দৃষ্টিতে দেখেনি। লেখা শেষ করে ঝাং রিয়াং শ্লোকটি ধ্যানকক্ষের পশ্চিমদিকের দেয়ালে টাঙিয়ে দেন। আচার্য সেই পথে যাচ্ছিলেন, তিনি শ্লোকটি পড়ে বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, যাচ্ছেতাই লেখা। তারপর পাদুকা দিয়ে ঘষে ঘষে হরফগুলি মুছে ফেললেন। সবাই বুঝল আচার্য এমন অশ্রদ্ধা দেখিয়েছেন মানে লেখাটি গুরুত্বহীন,  নিছক হেঁয়ালি ছাড়া কিছুই নয়। 

        তৃতীয় প্রহরের রাত, ঘুমে ডুবে আছে ডংশান মঠ। হুইনেং আচার্যের কক্ষে প্রবেশ করলেন। আচার্য তার প্রতীক্ষাতেই ছিলেন। তিনি কালক্ষেপ না-করে ‘চিং কাং চিং’ সূত্র উচ্চারণের মাধ্যমে হুইনেংকে ষষ্ঠ আচার্য হিসাবে বরণ করে নিলেন।অতঃপর আচার্য তার হাতে চীবর ও ভিক্ষাভাণ্ড তুলে দিয়ে বললেন, এই  চীবর ও ভাণ্ড প্রথম আচার্য বোধিধর্মের হাত থেকে আচার্য-পরম্পরায় আমার হাতে এসেছিল, আজ  তোমার হাতে তুলে দিলাম। তুমিও যথাসময়ে যোগ্য কারও হাতে এই স্মারক তুলে দেবে। এখন তোমাকে বিদায় নিতে হবে নচেৎ তুমি বিপদে পড়বে। তুমি দক্ষিণদেশের অকুলীন নিরক্ষর, মঠের অধিকাংশই তোমাকে মানতে চাইবে না। তোমার কাছ থেকে চীবর ও ভাণ্ড ছিনিয়ে নিতে চাইবে। 

হুইনেং জানায়, সে রাতের অন্ধকারে পার্বত্য পথের গতিপ্রকৃতি ঠিক করতে পারবে না। আচার্য হুং-জেন   তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যান। হুইনেং তাঁর প্রযত্নে পার্বত্য পথের জটিলতা কাটিয়ে নিরাপদে নদীতীরে পৌঁছে যায়। আচার্য তাকে নৌকায় চাপিয়ে নদী পার করে দেন। বিদায় নেবার সময় হুইনেংকে তিনি উপদেশ দেন, যেন সে দক্ষিণ দেশে গিয়ে ধর্মপ্রচার করে, অবশ্য তার আগে সে যেন তিনবছর আত্মগোপন করে থাকে।  

            মাস দুই পরে হুইনেং পৌঁছায় দা-উ পর্বতের পাকদণ্ডীতে। একদিন সে দ্যাখে ডংশান মঠের কয়েকশ ভিক্ষু তাকে ধাওয়া করে আসছে। হুইমিং-চেন নামের জনৈক ভিক্ষু হুইনেংকে ধরে ফেলে। হুইমিং  প্রথম জীবনে সেনাবাহিনীতে ছিল। সে বেশ ক্ষিপ্র ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির। সে হুইনেং এর হাত থেকে চীবর ও ভাণ্ড ছিনিয়ে নিতে চায়। হুইনেং বলে, ধর্মের ব্যাপারে জোরাজুরি ঠিক নয়। তুমি যদি সত্যিই চীবর ও ভাণ্ড গ্রহণ করতে চাও তাহলে আমি এই পাথরের উপরে রাখলাম তুমি তুলে নাও। সত্যিসত্যিই হুইনেং চীবর ও ভাণ্ড একটি পাথর খণ্ডের উপর নামিয়ে রাখে। হুইমিং-এর আর তর সয় না, সে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু ওই পর্যন্ত, সজোরে টানাটানি করেও সে চীবর বা ভাণ্ড পাথর থেকে ওঠাতে পারে না। পারবে বা কীকরে! এতটা পথ অতিক্রম করতে গিয়ে সে প্রায় সমস্ত শারীরিক শক্তি খুইয়ে ফেলেছে। বাকি থাকে মানসিক শক্তি; কিন্তু তাও আর অবশিষ্ট নেই। তার মন জানে ওই চীবর ও ভাণ্ড মহা পবিত্র, আর হুইনেং  তা পেয়েছে পঞ্চম আচার্যের কাছ থেকে সুতরাং সে এখন ষষ্ঠ আচার্য। হুইমিং অনধিকারী, সে  কোনোভাবেই ওই পবিত্র জিনিস গ্রহণ করতে পারে না। যদিও তা করে থাকে তার ফল শুভ হবে না।   ফলত, হুইমিং  ভিতর থেকে  সাড়া পায়নি, বরং বাধা পেয়েছে। মন যদি না-চলে, মনের মালিক বা  মালকিনকে তো থমকে দাঁড়াতেই হবে। এমন ঘটনা তো আমাদের দেশেও ঘটতে দেখি। দেবদেবীর অলংকার হাতে ধরে চোর মন্দিরে বসে আছে। এদিকে ভোর হয়ে এল চোর কিন্তু পালাতে পারছে না, তার পা চলছে না। আসলে তার মনের অন্দরে থাকা সংস্কার-লতা তার পায়ে বেড়ি হয়ে জড়িয়ে ধরেছে। হুইমিং আছড়ে পড়ে হুইনেং- এর পায়ে। বলে, প্রভু, আমি এসব নিতে আসিনি, এসবে আপনার অধিকার। আমাকে আপনি আত্মজ্ঞানের পথে এগিয়ে দিন। হুইনেং বলে, যদি তাই চাও তাহলে উঠে বসো, মনটাকে সমস্ত চিন্তা থেকে মুক্ত করো। বাধ্যছেলের মতো হুইমিং নিশ্চল হয়ে বসে পড়ে। কয়েক মুহূর্ত পরে হুইনেং এক অপার্থিব ধ্বনিমূর্ছনায় উচ্চারণ করে— ‘ ভালো বা মন্দ নিয়ে মাথা ঘামিও না। ভাবো তুমি আসলে কে ? কোথায় তোমার সেই আদি মুখ যা তোমার বাবা-মায়ের জন্মের আগেও ছিল ?  

                    

তথ্যসূত্র : 

১. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EAST

BY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.

 ২. THE PLATFORM SUTRA OF THE SIXTH PATRIARCH BY JOHN R. MC RAE; NUMATA CENTER FOR BUDDHIST TRANSLATION AND REASEARCH, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.

৩. THE PLATFORM SUTRA : THE ZEN TEACHING OF HUINENG BY RED PINE ; COUNTERPOINT, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.

৪. TRANSMISSION AND ENLIGHTENMENT IN CHAN BUDDHISM SEEN THROUGH THE PLATFORM SUTRA BY MORTEN SCHLUTTER ; TAIPEI CHUNG – HWA INSTITUTE OF BUDDHIST  STUDIES.      



ছবি:  বিধান দেব                                      


    



             


অনুবাদ কবিতা: বাসুদেব দাস

 





নিবেদন দাস পাটোয়ারী 


         অদাহ্য



একটা মোমবাতি জ্বলছিল

ঘরটাতে অন্ধকার ছাড়া 

অন্য কেউ থেকে থাকলেও 

জানি না 


অন্ধকার নাকি আলোর সমানুপাতিক

কথাটা বুঝতে পারলাম না 

ঘরটাতে অন্ধকার জ্বলছিল 

গলছিল

টোপ টোপ করে খসে পড়ছিল 

অন্ধকারের মণি 

জ্বলতে না জানা একটা রাত 

বামাতে না পারার মতো কাঁধে 

বাসা নিয়েছিল 


চাঁদকেও লুকোতে পেরেছি

অন্ধকারকে পারিনি 

অন্ধকারে ফুল ফুটে 

রাতের না লেখা গল্প চেনে 


দিনের অন্ধকার আমাকে আঘাত করে

আমার বোবা মুখ দিয়ে শব্দ বের হয় না 

শেফালি ঝরে পড়া সময়ে 

অন্ধকারের বকুল ফোটে 

গন্ধ ঘিরে ধরে 

জীর্ণ কুটিরের উঠোন 


দোঘোরাত হলদে বৃষ্টি 

পদুলির বাঁশের চাঙে

পূইশাঁকের গুটি 


মনের কলং 

শুকোয় ধীরে ধীরে 

বাসার পায়রাগুলি কলরব করে না 


মোমবাতিটা নিভে যায় 

অন্ধকার নিভে যায় না 


জ্বললেই 

ছাই হয়ে যায় না 

সবকিছু 

টীকাঃ দোঘোরাত-দুটি ঘরের মাঝখানের সংকীর্ণ জায়গা। 


          ননস্টপ

পাঁচ টাকায় ছয়টা কলম 

পাঁচটা কিনলে একটা ফ্রি 

কলম নিন দাদা কলম 

ছেলেমেয়েদের জন্য নিন 

ননস্টপ কলম 

সকাল ছয়টার আগে 

আদাবাড়ি পৌছে যায় সে 

হাতে কাঁধে সবখানেই কলম 


প্রথম বাসটা সাড়ে ছয়টায় ছাড়ে 

মঙ্গলদৈ হয়ে তেজপুর 

প্রতিটি যাত্রীর শার্টের পকেটে 

তার চোখ 

একটাই আশা 

পকেটে একটা কলম না থাকুক 

আদাবাড়িতে সারাদিনে অগণন বাসের 

আসা যাওয়া 

অলেখ যাত্রী 

কলম থাকা কলম না থাকা 


আজ দশ বছর কলমের সঙ্গে 

বন্ধুত্ব করেও 

‘ক’অক্ষরের কোণটাও সে আঁকতে পারে না 

রোজই বিক্রি করছে কলম 

সন্ধ্যেবেলা রান্নার জন্য চাল কিনেছে

তার সঙ্গে

আঁক-বাঁক করার জন্য একটা খাতা 

ক্রেতাকে ননস্টপ লেখার 

প্রমাণ দেখানোর জন্য 


দিনটাকে কবর দিয়ে 

বাড়ি ফেরে সে  

পড়ার টেবিলে থাকা 

ছেলে-মেয়েদের 

প্রায়ই বলে 

কখনও কলম বিক্রি করবি না 

যত পারবি কিনবি 

কিন্তু বিক্রি করবি না

ওরাও বোধহয় কিছু একটা বোঝে 

এবং 

মাথা নাড়ায়  





নিবেদন দাস পাটোয়ারী -১৯৭০ সনে অসমের কামরূপ জেলার হাজোর বাহানা গ্রামে নিবেদন দাস পাটোয়ারী জন্মগ্রহণ করেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে অসমের সিভিল সার্ভিসের পদস্থ অফিসার হিসেবে কর্মরত।১৯৯৪ সনে প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।


অনুবাদ কবিতা: শৌভিক দে সরকার

 



চার্লস সিমিক -এর কবিতা



সরল মানুষদের গণহত্যা 


তাও সাম্রাজ্যের শেষদিকের কবিদের

এসব লেখা ছাড়া আর কিছু করার ছিল নাঃ

“পশ্চিমের পাহাড়ের পেছনে সূর্য অস্ত যাচ্ছে...

ঝড়ে উড়ে যাওয়া ঘোড়াগুলো মেঘের ভেতর চরে বেড়াচ্ছে।”


আমারও কিছু করার ছিল না

মাথার ওপর একটা কাককে ঘুরপাক খেতে দেখেও আনন্দ হচ্ছিল

থম মেরে থাকা আকাশের নীচে

একা, ঘাসের ওপর শুয়ে হাত পা মেলে দিলাম আমি 


শুধুমাত্র হাওয়া শব্দ করছিল,

আমার পাশে বইটার পাতাগুলো খসখস করে উল্টে দিচ্ছিল 

একবার সামনে একবার পেছনে

হারামি কাকটাকে পড়ানোর কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছিল হাওয়া

 


খবরের কাগজ কেটে বানানো পুতুল 


একটা পরিবারের মতো হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে চারজন

আজকের কাগজে যুদ্ধের খবর ছিল

আর প্রেসিডেন্টের ছবির পাশেই 

কফির বিজ্ঞাপন, যাকে স্বর্গীয় কফি বলে সবাই


রোজি সোনা, কিছুক্ষন ধরে রাখো তো ওদের  

আর একটু উঁচুতে তুলে ধরো

হাওয়ায় দুলতে থাকুক পুতুলগুলো, একটু নাচুক

তোমার বুড়ো দাদু- ঠাকুমা ওদের দেখে হাসুক


হাতের ছুরি,কাঁটা চামচ হাতেই ধরা থাকুক

কাগজের কালি তোমার হাতে লেগে যাবে

তারপর যখন তাড়াহুড়ো করে চোখদুটো ঢাকতে যাবে তুমি

তোমার মুখেও লেগে যাবে ওই কালি 

 


কসাইখানার মাছি 


সন্ধ্যাবেলা হলেই ওরা রক্ত মাখা পায়ে 

আমার স্কুলের বইয়ের পৃষ্ঠার ওপর দৌড়োদৌড়ি করত 

চোখ বন্ধ করলেই আমি সামনের রাস্তার

গাছগুলোর কথা শুনতে পেতাম,

গরমকালকে মন খারাপ করে বিদায় জানাত গাছগুলো 


জানালার নীচে বসে কেউ একজন পুরনো কথাবার্তা আওড়াত

বোকা, বুড়িয়ে যাওয়া গরুগুলো হঠাৎ করে থমকে যেত

কিছু একটা সন্দেহ করত

আর ভারি চপারটা তখনই ওদের ঘাড়ের ওপর নেমে আসত    


ভূতুড়ে ইঁদুরের নাচ 


“তুর্কিস্থানে,তুর্কি আবহাওয়ায় ” 

           – ডব্লিউ. স্টিভেন্স 


প্রেসিডেন্ট নিজের মনেই হেসে উঠলেন, তিনি যুদ্ধ ভালোবাসেন

আর সামনেই একটা যুদ্ধ এগিয়ে আসছে

প্রতিদিন সরকারি দপ্তর আর টিভির স্টুডিওগুলোতে

একটু একটু করে খুশির পারা চড়ছে

দুরের দেশগুলোতে বোমা ফেলছে আমাদের সেনারা


মর্গগুলো ঘষে ঘষে পরিষ্কার করা হচ্ছে,কয়েকদিনের মধ্যেই 

মুখ কালো করে অল্প বয়সী ছেলেরা লাইন দিয়ে শুয়ে থাকবে

লোকজন এরমধ্যেই খুশির ফোয়ারা ছোটাচ্ছে মুখে 

সুরেলা পাখির ছদ্মবেশ, আগাম যুদ্ধ আর বিজয় নিয়ে

মিথ্যার বুলি আউড়ে যাচ্ছে সারাদিন 


কালো জামাকাপড় পরা শার্প শুটাররা ছাদের ওপর থেকে

ম্যালের মধ্যে সন্দেহজনক পায়রাগুলোকে তন্নতন্ন করে খুঁজছে

কয়েকজন অন্ধ মানুষ হাওয়ায় তাদের লাঠিগুলো দোলাচ্ছে

ছোট স্কার্ট পরা, আঁটোসাঁটো চেহারার মেয়েরা 

তাদের পার্সের ভেতর লাইটার খোঁজার জন্য তলিয়ে যাচ্ছে 


 

     

চার্লস সিমিকঃ সমকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম কবি চার্লস সিমিকের জন্ম ১৯৩৮ সালে যুগোস্লাভিয়ার বেলগ্রেড শহরে। ষোল বছর বয়সে তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমেরিকায় চলে এসেছিলেন। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ,‘হোয়াট দা গ্রাস সেইস’।‘নাইট পিকনিক’, ‘হোটেল ইনসোম্যানিয়া’, ‘আনএন্ডিং ব্লুজ’ তাঁর বিখ্যত কাব্যগ্রন্থ। ১৯৯০ সালে ‘ দা ওয়ার্ল্ড ডাজ নট এন্ড’-এর জন্য পুলিৎজার পুরষ্কার পেয়েছেন সিমিক। এছাড়া গ্রিফিন ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি প্রাইজ, ওয়ালস স্টিভেনস অ্যাওয়ার্ড- এর মতো পুরষ্কার পেয়েছেন তিনি। ইউনিভার্সিটি অফ নিউ হ্যাম্পশায়ারে দীর্ঘদিন অধ্যাপনার পাশাপাশি ‘প্যারিস রিভিউ’ পত্রিকার কবিতা বিভাগটি সম্পাদনা করেছেন তিনি।  



  


বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

ছোটগল্প: অনিন্দিতা গোস্বামী

 




                                       যাত্রা 



                বাসটা থামতেই বিনতা গলা তুলে বলল, ছেলের মা কই? তখন লোকজন হুড়মুড় করে নামছে দরজা দিয়ে, কেউ তার কথা তত আমল করল না। এদিকে বিনতার একটু নামা দরকার, প্রকৃতির ডাক তাছাড়া চোখে মুখে একটু জল দেবার ও ছিল। অথচ বাচ্চাটা এমন ভাবে তার কোলে লেপ্টে ঘুমচ্ছে যে সে উঠে দেখতেও পাচ্ছে না চারধার। দেখতে দেখতে সবাই প্রায় নেমে গেল বাস থেকে। পাদানিতে দুপা রেখে বাসের ভেতরে মুখ ঝুঁকিয়ে সুব্রত ডাকল বিনতাকে, কি হলো? নেমে এসো, চা-টা খাবে না না কি! বিনতা বলল, আরে নামব তো, কিন্তু এই যে বাচ্চাটা। 

সুব্রত দরজার ওখান থেকেই বলল, বাচ্চা! কার বাচ্চা, কিসের বাচ্চা?

বিনতা বিরক্তি নিয়ে বলল, কিসের বাচ্চা আবার, মানুষের বাচ্চা, বাসের মধ্যে কি বাঘের বাচ্চা আসবে!

সুব্রত বলল, তা তোমার কাছে এলো কি করে?

 বিনতা বলল, কি করে আবার। ভিড়ের মধ্যে বাচ্চা কোলে নিয়ে মা-টা দাঁড়াতে পারছিল না, টাল খেয়ে খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল তাই হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে আমি কোলে নিলাম।

সুব্রত বলল, তা বেশ করেছ। এখন বাচ্চাটাকে কোলে করেই নীচে নেমে এসো, বাসের ভেতরে তো এখন আর কেউ নেই। মা নীচে নেমে গিয়েছে বোধহয়। বাচ্চা তখন ডান হাতের বুড়ো আঙুল মুখের মধ্যে পুরে বাঁ হাতে বিনতার আঁচল জড়িয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে। বিনতা তাকে কোলে নিয়েই বাস থেকে নামল। এই বার সুব্রত চেঁচালো, এই বাচ্চাটা কার ? কেউ কোনো সারা শব্দ দিল না। অনেকেই তখন বাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছে আর যারা আবার বাসে উঠবে তারা সকলেই চা খেতে কিম্বা বাথরুমে যেতে ব্যস্ত।

             সদর শহর থেকে করিমপুর দীর্ঘ পথ। তেহট্টের কাছে এসে বাসটা অনেক্ষণ দাঁড়ায়। বেশির ভাগ লোকই নেমে যায় সেখানে। যারা থাকে তারাও নেমে একটু হাত পা ছড়ায়, চা বিস্‌কুট খায়। কেউ কেউ টিফিন খায়। চোখে মুখে জল দেয়, বাথরুম যায়, ড্রাইভার কন্ডাকটর ও কিছুক্ষন মুক্ত বায়ু সেবন করে তারপর বাস ফের স্টার্ট দেয়।

            বাচ্চাটা ততক্ষণে ঘুম ভেঙে এ্যাঁ এ্যাঁ করে চেঁচিয়ে উঠেছে। বিনতা দুবার ও ও করে ঝাঁকি দিতেই আবার চুপ, বিনতার কাঁধের ওপর মাথা দিয়ে পজিশন নিয়েছে। এবার বিরিক্ত লাগছে বিনতার, আচ্ছা মা তো, বাচ্চাকে তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেল কোথায়? ইতি উতি চোখ দিয়ে খুঁজে কোথাওতো দেখতে পাচ্ছে না মা-টাকে। দুকাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে সুব্রত এদিক ওদিক ঘুরতে লাগল আর বলতে লাগল বাচ্চাটা কার দাদা, বাচ্চাটা?

              কিছুক্ষণের মধ্যেই খবরটা চাউর হয়ে গেল চারিদিকে। লোকজন এসে জটলা করে দাঁড়ালো বিনতাকে ঘিরে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন। দিদি বাচ্চাটাকে আপনি কখন কোলে নিলেন? কেমন দেখতে ছিল মা-টাকে? কিন্তু এখানে তো কোন ওরকম দেখতে মেয়ে নেই। ও আর এখন নেই বুঝলেন। আপনাকে বাচ্চা ধরিয়ে দিয়ে কেটে পড়েছে। দুনম্বরীতে ছেয়ে গেছে দেশটা একেবারে। অবৈধ বাচ্চা হয়ত। কি করবেন এখন? নিয়ে যান দিদি, আপনাকে বাচ্চাটা খুব ভালোবেসে ফেলেছে মনে হচ্ছে।

             তিন্নি এতক্ষণ চুপটি করে বসে ছিল মায়ের পাশে। আর মাঝে মাঝে বাচ্চাটার ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটো নিয়ে খেলা করছিল। এই প্রস্তাব শুনে সে যার পর নাই খুশি হয়ে উঠল। হ্যাঁ মা হ্যাঁ ভাইটাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে চল, আমি ওর সঙ্গে খেলব। আঃ তিন্নি একটু চুপ করে বসবি বলে ধমকে উঠল বিনতা। সুব্রত বলল তোমাকে হাজার বার বলেছি যেখানে সেখানে দয়া দেখাতে যাবে না। নাও এখন ঠেলা সামলাও। এতক্ষণে এগিয়ে এসেছে বাসের কন্ডাকটর আর ড্রাইভার ও। কি হয়েছে দাদা? যান যান সবাই গিয়ে বাসে উঠুন আমরা আগে শুনি কি হয়েছে ব্যাপারটা।

            বিনতা যখন বলছিল ব্যাপারটা তখন একটু দূরে পিছনে হাত দিয়ে ঘন ঘন পায়চারি করছিল সুব্রত। এখন কোথাকার জল কোথায় গড়াবে কে জানে। শেষ পর্যন্ত বাচ্চাটা তার ঘাড়েই না চাপে। যত রাগ গিয়ে পড়ছিল বিনতার ওপর আর তার মায়ের ওপর। মায়ের জন্যই সদল বলে বছরে দুবার করে বাড়ি আসতে হয়, না হলে এই গন্ড গ্রামে মোটেও তার এখন আসতে ইচ্ছে করে না। মহালয়া পড়ার আগের থেকেই মায়ের ঘন ঘন ফোন, কিরে তোরা কবে আসবি? আসব আসব, দাঁড়াও ছুটি ছাটা পড়তে দাও, মাকে ঠেকায় সে কোন রকমে। আসলে দেবী পক্ষের শুরুতেই মায়ের উঠোনে মাটির উনুনে চাপে বিশাল কড়াই। জ্বাল পরে গুড়ে, হাতের পাকে শুরু হয় মায়ের মোয়া বানানো, মুড়ির মোয়া, চিড়ের মোয়া। নারকোল গাছ ঝুড়ে খাটের তলায় ডাই করা হয়  নারকোল, এরপর হবে নাড়ু। ঐ অত নারকোল কোরা, ছেঁই করা, মার লোকের দরকার। একা বড় বউ আর মায়ে পেরে ওঠে না। মেজ বউ তো থাকে আমেরিকা। তার তো আর আসা সম্ভব নয় অতএব বেঁড়ে বেটা কে ধর। বিনতাকে ভালো বলতে হবে, সে কোনদিনই এসবে আপত্তি করে না তারই বরং বিরক্তি লাগে। তবু সে যায় কারন অত জমি জমা বাড়ি একা বড়দার হাতে ছেড়ে দিলে পরে আর ভাগের ছিটে ফোটাও জুটবে না। এমনিতেই বড়দা গ্রামে থাকার জন্য দেখভাল ওই তো করে সব। কিন্তু দিন দিন যাত্রা পথটা অসহ্য হয়ে উঠছে। গাড়ি করে যাওয়াও পোষায় না। বড্ড দর হাঁকে ড্রাইভার গুলো।

             যদিও এই ভিড় এড়াতে সে আগে ভাগে পৌঁছে গিয়েছিল বাস স্ট্যান্ডে। তথাপি যখন বাসটা এলো বউ বাচ্চা নিয়ে হুড়োহুড়ি করে উঠতে গিয়ে সে খানিকটা পিছিয়ে গেল ফলত দুজনে বসার জায়গা পেল দুই প্রান্তে, বিনতা মেয়েকে নিয়ে বসল বাসের মাঝামাঝি একটা সিটে আর সে বসল ড্রাইভারের পাশে লম্বা সিটটায়। দুজনে একসঙ্গে বসতে পেলে আজ এই কান্ডটা হতো না।

              কন্ডাকটর বলল চিন্তা করবেন না দাদা, আগে সব লোকজন নামিয়ে নি তারপর বাস নিয়ে সোজা ঢুকিয়ে দেবো থানায়, সেখানেই যা হবার হবে। তবে জানেন তো দাদা কে চোর সে তো বলা যায় না, কে জানে আপনারাই হয়তো ছেলেটাকে চুরি করে পালাচ্ছিলেন এখন ধরা পরে উল্টো গাইছেন। ছেলে ধরায় ভরে গেছে দেশটা। এদের কথা বার্তায় কান মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে সুব্রতর। বিনতাও থম মেরে রয়েছে। ঘন ঘন বিড়িতে টান দিচ্ছিল ড্রাইভার, মুখ ঘুরিয়ে বলল এই সব লাফরা আমার ভালো লাগে না, বহুৎ ক্যাচাল করেন আপনারা জানেন তো দাদা। কোথায় ভাবলাম বাড়ি গিয়ে চান করে খেয়ে দেয়ে ঘুম দেবো না এখন চলো থানায়।

              কন্ডাকটরের ধমকানি শুনে একটা লোকও তাদের ছেড়ে বাসে ওঠেনি। সবার প্রবল আগ্রহ বাচ্চাটা আর বিনতাকে ঘিরে। অনেকে সন্দেহের চোখেও তাকাচ্ছে তাদের দিকে। একজন বলল হাসপাতালে তো আজকাল এসব কেস লেগেই আছে। বাচ্চা বিইয়ে ভোর রাতে চুপে চাপে কেটে পড়ে হাসপাতাল থেকে। আর একজন বলল, মানুষ আর কুত্তা কুকুর সব সমান হয়ে গেছে বুঝলেন না। 

অন্য জন বলল, নানা কুকুরের দোষ দেবেন না, কুকুর কখনো বাচ্চাকে ছেড়ে পালায় না। দড়ির মতো চেহারা নিয়েও এক সঙ্গে পাঁচ খানা বাচ্চাকে দুধ দেয়, কি বলো মাষ্টার, বলে লোকটি আর একটি লোকের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়ল।

মাষ্টার বলল তা আর কি হবে বলো, ওদের তো আর বৈধ অবৈধ নেই। তবে অন্ধকার আরো গভীর হতে পারে। রাতের অন্ধকারে কত মেয়ে ধর্ষিত হয়ে যায়। সন্তানের জন্ম তো অমন বিপদের থেকেও হতে পারে কহিনুর।

কহিনুর বললেন তা যা বলেছ মাষ্টার। তুমি হলো গিয়ে শিক্ষিত মানুষ, কত রকম বুদ্ধির জাল তোমার মাথায়। সত্যিই তো এই কথাটা মাথায় আসে নি। দিদি, যে আপনার কোলে বাচ্চা দিল তার চেহারাটা কেমন ছিলো? বিনতার মুখে এসে গিয়েছিল ধর্ষনের প্রসঙ্গ উঠতেই আপনার চেহারার কথা মনে হলো কেনো? কোনো কিছু মিলিয়ে দেখবেন নাকি? কিন্তু সে এখন কাদায় পড়া বাঘিনী, তাই সে সেসব কিছু না বলে বলল, ঐ রোগা পাতলা অল্প বয়সী, আমি ভালো করে তাকিয়েও দেখিনি, আমি বাচ্চাটাকেই দেখছিলাম, বাসের ঝাকুনিতে বাচ্চার মাথাটা যদি ঠুকে যায় তাই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। মা-টা বার বার হুমড়ি খেয়ে পড়ছিলো তো।

                  ড্রাইভার বিড়ির শেষ অংশটুকু ছুঁড়ে ফেলে হাঁক দিল, ব্যাস ব্যাস অনেক হয়েছে এবার সবাই গাড়িতে উঠুন। সবাই মুতে ফিরেছে? জগা গিয়ে টিনে দুটো চাপর লাগা আর হরেনটা একবার জোরে মেরে দিয়ে আয়। দিদি ওঠেন, যান, বাসের ভেতরে গিয়ে বসেন। বিনতা বলল, কিন্তু এখনো অতক্ষণ, বাচ্চাটার যদি খিদে পেয়ে যায়? যদি কাঁদতে আরম্ভ করে? ড্রাইভার প্রায় ভেংচে উঠে বলল, তা এখন তো আমি ওর জন্য ফিডিং বোতলের ব্যবস্থা করতে পারব না। সুব্রত বলল আমি একটা মেরী বিস্কুটের প্যাকেট কিনে নিয়েছি প্রয়োজন হলে জলে ভিজিয়ে একটু একটু করে মুখে দিতে হবে। বিনতা কৃতজ্ঞ চিত্তে সুব্রতর দিকে তাকালো, দেখো এতক্ষণ এত রাগ করছিল এখন আবার নিজেই বাচ্চাটার খাবার ব্যবস্থা করেছে। বাচ্চাটাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেলে মন্দ হয় না। তার তো একটা মেয়ে আর এই ছেলে, একসঙ্গে বড়ো হবে। এই চিন্তা মনে আসতেই ছেলেটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল বিনতা, কোলে উঠে থেকে কেমন লেপ্টে আছে দেখো। মায়া কাড়া।

                যাত্রীরা একজন একজন করে উঠতে আরম্ভ করলো বাসে। এখন ভিড় বেশ পাতলা। বেশির ভাগ লোকই এই পর্যন্তই আসে। বিনতাও গুটি গুটি পা বাড়ালো বাসের দিকে। মনে তার এক রাশ দুশ্চিন্তা। গলা শুকিয়ে আসছে। কি জানি কি অপেক্ষা করে আছে তাদের সামনে। পুলিসের হাতে পড়লে বাচ্চাটারই বা কি হবে কে জানে। ফালতু ফালতু সে কি একটা ঝামেলায় জড়ালো। ড্রাইভার চলে গিয়েছে তার নির্দিষ্ট সিটে। বিনতা পাদানিতে পা দিতে যাবে শুনলো বাসের ভেতর থেকে চেঁচা মেচি, এই মেয়ে এই ওঠো, দেখো কেমন ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাচ্ছে, অর্ধেক শরীর ঢুকে গিয়েছে সামনের সিটের নীচে। দূর থেকে ভালো করে দেখাই যাচ্ছে না।বিনতা দ্রুত উঠে এলো বাসের ভেতরে। ভিড় জমা হয়ে গিয়েছে একদম পিছনের সিটে জানলার কোণে। সে মেয়ে উঠে বসেছে ধড়মড় করে, আমার মনা কই?

মনা কই? সমস্বরে বলে উঠল সবাই, বাচ্চা তোমার?

- হ্যাঁ আমার মনা, তোমরা ভিড় করছ কেন্‌? এডা কোন ইস্‌টপেজ?

সবাই তাকে এই মারে তো সেই মারে, সারা দুনিয়া তোলপার হয়ে গেল আর তুমি অন্যের কোলে বাচ্চা দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমচ্ছ? 

এগিয়ে গেল বিনতা, বলল, এই তো বাচ্চার মা, তা তুমি সিট পাবার পর আমার কাছ থেকে বাচ্চা চেয়ে নাওনি কেন? বাপরে কি ঘুম তোমার, কোনদিকে হুঁস নেই!

মেয়েটি বাচ্চার দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, কি করব, রাজ্যের ঘুম যে আমার মাথায়। খুব ঘুমাই পড়ছিলাম। থ্যাঙ্কু মাসি। কি করব কও, শাউড়ি রাত দুপুর পর্যন্ত বিড়ি বান্দায়, মনা কান্দে, বুকের দুধ পায়না তো, তারপর মনার বাপের হুজ্জুতি। কতকাল রাতে ভালো কইরা ঘুমাইনা। হেই জন্যই তো মামা বাড়ি যাইতাছি, ঘুমাইবার লগে।

                  কতটুকু মাত্র বয়স, আহারে সতেরো কিম্বা আঠারো হবে, অপুষ্টির ছাপ সারা শরীরে, নিদ্রাহীনতার কালি চোখের কোণে। মাতৃত্বের বোধই আসেনি ওর ভালো করে। 

বিনতা বলে হয়েছে, খুব হয়েছে, এবার বাচ্চা ধর। বাচ্চাকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে নিজের জায়গায় এসে বসে বিনতা। ঘঁ ঘঁ করে ভারী ইঞ্জিন স্টার্ট দেয় বাসের। চাকা গড়ায়। বুকের ভেতরটা টন টন করে বিনতার, সেটা বাচ্চাটার জন্য নাকি তার মায়ের জন্য নাকি গোটা ভারত বর্ষের জন্য তা ঠিক সে বুঝতে পারে না।



ছবি: তমিজ মল্লিক


                                                                                                                           

  


ছোটগল্প: আফরোজা সোমা


                                      ঘ্রাণ



এই মাঝরাতে রাফসানার এমন লাগতে শুরু করবে এটা কি রাফসানাও জানতো! এমন আচম্বিতে! এভাবে এসে-ও আঁকরে ধরতে পারে আকুলতা! অথচ গত সাড়ে তিন বছরে তো রাফসানা প্রায় মানিয়েই নিয়েছে নিজেকে। অপেক্ষাকে এখন আর তার অপেক্ষা মনে হয় না। থেকে-থেকে হঠাত করেই বুকের ভেতর খালি হয়ে যায় না। হঠাত করেই বুক ধর-ফড় করতে-করতে শরীর কাঁপতে শুরু করে না বা কাঁদতে-কাঁদতে হঠাতই জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে না সোফায় বা বিছানায় বা মেঝেতে। শ্বশুড়বাড়ির লোকজন, মায়ের বাড়ির লোকজন রাফসানাকে সামলাতে প্রথম দেড়টা বছর কী কষ্টই না করেছেন। 

তাদের সকলের চেষ্টা কাজে লেগেছে। রাফসানা শারীরিকভাবে সুস্থ্যই থেকেছে। তার গর্ভের শিশু পৃথিবীতে এসেছে। সেই শিশুর এখন তিন বছর বয়স। দেখতে সে অবিকল হয়েছে বাবার মতন। বাবার দেয়া নামেই তার নাম হয়েছে ‘মেঘমঞ্জুরী’। মেঘমঞ্জুরী ‘বাবা বাবা’ বলে ডাকে। দেয়ালে বাঁধানো বাবার বড় ছবির দিকে তাকিয়ে হাসে। আঙুল তুলে দেখিয়ে বলে, ‘বাবা’! মেঘমঞ্জুরির সাথে হাসে রাফসানা। সেও বলে, ‘বাবা! বাবা আসবে! আর মাত্র ক’দিন। বাবা আসবে’। 

আসবে। আসবে। আরাফাত আসবে। এই আশায় কতইনা প্রহর গুণেছে রাফসানা! কিন্তু একে একে সাড়ে তিন বছর গেলো। আরাফাত আজো আসেনি। তার এই না আসার সাথেও তো মানিয়েই নিয়েছিল রাফসানা। কিন্তু আজ এই মাঝরাতে হঠাত কী হলো আবার!

স্বপ্নের মধ্যে রাফসানা খুব তীব্রভাবে আরাফাতের গায়ের গন্ধ পেলো। গায়ের গন্ধ মানে, প্রতিদিন সকালে উঠে শেভ করে আরাফাত মুখে মাখতো অ্যাডিডাস-এর আফটার শেভিং লোশান। আরাফাত যখন শেভ করতো বাথরুমের দরজা সাধারণত ভেতর থেকে আটকাতো না। দরজা সামান্য ফাঁকা হয়ে থাকতো। ফলে, শেভিং শেষে আফটার শেভ লোশান মাখার সময় সিটকিনি না-আটকানো দরজার ফাঁক গলে অ্যাডিডাসের মৃদু্ সুগন্ধে ঘর ভরে যেতো। 

বিবাহিত জীবনের টানা প্রায় দুই বছর ধরে এই গন্ধটা পেতে পেতে কখন যে অ্যাডিডাসের এই আফটার শেভিং লোশানের গন্ধটাই আরাফাতের গন্ধ হয়ে রাফসানার মগজে ঠাঁই করে নিয়েছে তা সে নিজেও জানতো না। একদিন আড়ং-এ বাজার করতে গিয়ে হঠাত একটা চেনা গন্ধ পেয়ে ‘এখানে আরাফাত কোথ্থেকে এলো’ ভাবতে ভাবতে রাফসানা চকিতে ঘাড় ঘুড়িয়ে পেছনে তাকায়। কিন্তু পেছনে তাকিয়ে দেখে, আরাফাত নয়। প্রায় আরাফাতের বয়সই আরেকটা লোক; ক্লিন-শেভড; গায়ে একটা ফুল হাতা সাদা শার্ট; হাতে একটা ট্রলি নিয়ে বাজার করছেন ভদ্রলোক। কিন্তু লোকটা রাফসানার একেবারে পেছনে থাকায় গন্ধটা খুব তীব্রভাবে পেয়েছিল। 

এরপর থেকেই রাফসানা খেয়াল করেছে, কোথাও অ্যাডিডাসের এই গন্ধটা পেলেই তার মনে হয়, আশাপাশে কোথাও আরাফাত আছে। যদিও সে জানে যে, আরাফাত এখানে নেই। যদিও সে জানে যে, আরাফাত হাসপাতালে এবং যার গা থেকে গন্ধটা আসছে তিনি অন্য কেউ। কিন্তু তবু এই গন্ধটা পাওয়ামাত্রই  আরাফাতের কথাই রাফসানার মনে আসে। আসবেই। এইক্ষেত্রে কোনোভাবেই সে নিজের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে না। ফলে, বাজারে বা রাস্তায় বা কোনো অনুষ্ঠানে হঠাত কখনো এই গন্ধটা পেয়ে গেলে রাফসানা তখন হয়তো আরাফাতকে ফোন দেয়। ঘটনাটা বলে। দুই এক মিনিট গল্প করে। মাঝে মাঝে কিছু খুনসুটিও করে দু’জন।  

একবার শিল্পকলায় নাটক দেখতে গিয়ে তো রাফসানার খুব সমস্যা হলো। একটা লোকের গা থেকে আসছে আরাফাতের গন্ধ। লোকটা বসেছেও রাফসানার ঠিক বামপাশের সিটেই। কিন্তু এই গন্ধ পাওয়ার পর থেকে সে কিছুতেই আর স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছে না। এই গন্ধে তার কেমন একটা ইলিউশান হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আরাফাতই বুঝি পাশে বসে আছে। কিন্তু সে জানে যে, এখানে আরাফাত নেই। তবু, মাথার মধ্যে ঘুরছে, যেনো আরাফাত আছে। পাশেই। তাই, এই গন্ধটাকে পাশ কাটানোর জন্য নাকের মধ্যে ভালো করে ওড়নাটা প্যাঁচিয়ে দিয়েছে রাফসানা। তবুও অস্বস্তিটা যায়নি।

নাটকের বিরতিতে সে আরাফাতকে ফোন দেয়। ঘটনাটা বলে। সবকথা শুনে আরাফাত জিজ্ঞেস করে, পাশের লোকটা কি মোটামুটি হ্যান্ডসাম? রাফসানা বলে, হ্যাঁ। কেন? তখন আরাফাত বলে, তাহলে বিরতি শেষে আবার যখন নাটক শুরু হবে, তখন তুমি ওই পাশের লোকটার হাত ধরে ফেলো। কারণ নাটক শুরু হলে যখন সব বাতি নিভিয়ে দেবে তখন তো আর কারো মুখ দেখা যাবে না। ফলে, তুমি ভাববে আমিই বসে আছি পাশে। বলেই একটা খুব দুষ্টু হাসি শুরু করেছিল আরাফাত। 

সেদিন যে রাফসানার কী রাগ হয়েছিল। বলার মতন নয়। এরকম একটা কথা বলা যায়! আরেকটা লোকের হাত কি আরাফাতের হাত! সে কি কেবল যে কোনো একটা মানুষের হাত ধরে বসে থাকতে চেয়েছে নাকি! আরাফাতের গায়ের গন্ধ আর আরেকটা লোকের গায়ের গন্ধ কি এক হলো! আর গন্ধ এক হলেই কি সেই লোকটা আরাফাত হয়ে গেলো নাকি! এই নিয়ে রাতে বাসায় ফিরেও রাফসানার অভিমান যায়নি। তখন অভিমান কাটাতে আরাফাত এমনি-এমনিই মুখে একটু আফটার শেভিং লোশন মেখে এসে রাফসানাকে জড়িয়ে ধরেছিল। গভীর করে চুমু দিয়ে অভিমান ভাঙিয়ে বলেছিল, তোমার স্মৃতির মধ্যে আমি আর ওই গন্ধটা একাকার হয়ে গেছে। তাই, এই গন্ধের থেকে আমাকে বা আমার থেকে এই গন্ধটাকে আলাদা করতে তোমার অসুবিধা হয়।  

এই ঘটনার পর থেকে রাফসানা এই গন্ধটার ব্যাপারে খুবই সাবধান। আরাফাত সঙ্গে না থাকা অবস্থায় কোথাও এই গন্ধটা পেলে সে চেষ্টা করে এটাকে এড়িয়ে যেতে। কারণ এই গন্ধটা পাওয়া মানেই খুব তীব্রভাবে আরাফাতের কথা মনে ঘুর-ঘুর করে; অনিচ্ছাতেই। সকালে প্রায় প্রতিদিনই বের হয়ে যাবার সময় আরাফাত চুমু খেয়ে যেতো। সেসময় সদ্য মাখা অ্যাডিডাসের গন্ধ লেগে থাকতো রাফসানার গালে। এই গন্ধটাই অনেক্ষন সঙ্গ দিতো রাফসানাকে। ফলে, রাস্তাঘাটে অচেনা লোকের গায়ে এই গন্ধটা পেতে তার একদমই ভালো লাগে না। বরং সমস্যা হয়।   

যেদিন ভোরে একটা সাদা মাইক্রোবাস এসে বাসা থেকে আরাফাতকে তুলে নিয়ে গেলো সেদিন সেই মাইক্রোবাসের মুখোশে ঢাকা লোকদের একজন বলেছিল, চিন্তার কিছু নেই। সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসবে। কিন্তু আরাফাতকে কেন নিয়ে যাচ্ছে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, যারা নিয়ে যাচ্ছে তারা কারা— এসব কোনো প্রশ্নের উত্তর তারা দেয়নি। শুধু বলেছিল, আমরা আইনের লোক। সন্ধ্যার মধ্যেই উনি ফিরে আসবেন।   

আরাফাত ডাক্তার। নিউরো স্পেশালিস্ট। কাজ করে একটা বেসকারি হাসপাতালে। রাজনীতির সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তাহলে ওকে কেন আইনের লোকেরা নিয়ে গেলো! এই নিয়ে সবাই ধন্ধে। রাফসানার শ্বশুড়, ভাসুর, দেবর, ননাস সবাই। সবাই যে যার মতন চেষ্টা করেছে খবর নিতে। কিন্তু রাফসানার মনে হয়েছিল, আরাফাত তো আর রাজনীতি-টিতি করে না। হয়তো কোথাও কিছু একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। ফলে, চিন্তার কিছু নেই। যেহেতু ওরা বলেছে সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসবে, তাহলে তো আসবেই। 

আরাফাত সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসবে ভেবে রাফসানা সেদিন দুপুরে আরাফাতের পছন্দের পাবদা মাছের ঝোল রেঁধেছিল। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়েছে। ভোর হয়েছে। আরেক সন্ধ্যা এসেছে। গেছে। এরকম করে পেরিয়ে গেছে কয়েকশ’ সন্ধ্যা। আরাফাত আসেনি।   

কত বড় বড় লোক দিয়ে খবর নেয়া হলো! এমনকি রাফসানার এক নন্দাই যার ভাই কি-না সরকারের উচ্চপদে কাজ করেন তিনিও ভেতর থেকে খবর জানার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ভেতর থেকেও খবর মিললো, আরাফাতকে আইনের কেউ তুলে নেয়নি। আইনের লোকের হাতে সে নেই। 

তাহলে আরাফাত কোথায়! থানা-পুলিশ-ডিবিতে কত ধর্না দিয়ে যাচ্ছেন রাফসানার শ্বশুড় ডাক্তার ফজলে এলাহী। কিন্তু আরাফাতের দেখা নেই। উকিল, পুলিশ বারবার জিজ্ঞেস করে তাদের কোনো পারিবারিক শত্রুতা আছে কি-না। জমিজমা নিয়ে কোনো গণ্ডগোল আছে কি-না। কিন্তু তাদের তো কোনো বিশেষ শত্রুও কেউ নেই। জমিজমা নিয়েও কোনো বিরোধ হয়নি কখনো কারো সাথে। নিকট অতীতে কারো সাথে কোনো ঝামেলাও হয়নি কোনো। অনেক ভাবতে ভাবতে রাফসানার মনে আসে শুধু যে, রাফসানার বিয়ের আগে-আগে তাকে বিয়ে করানোর জন্য তাদের বাড়ীতে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন স্থানীয় এমপি। এমপির ছেলে নাকি রাফসানাকে একটা অনুষ্ঠানে দেখে খুব পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু রাফসানার পরিবার থেকে খুব বিনয়ের সঙ্গে যখন জানানো হয়েছিল যে, মেয়ের বিয়ে ইতোমধ্যেই ঠিক হয়ে গেছে; সামনের মাসেই আকত্ তখন বিয়ে ভেঙে দিতে এমপি সাহেব সামান্য আভাস দিয়ে ছিলেন বটে। কিন্তু বিয়ের কথা-বার্তা পারিবারিকভাবে ঠিকঠাক হবার পর মেয়ে-ছেলে পরস্পরকে পছন্দ করে গত দুই মাস ধরে মেলা-মেশা করছে জেনে এমপি সাহেব আর কোনো আপত্তি তোলেননি। ওই প্রস্তাবের ওখানেই ইতি। ওটা নিয়ে আর কোনো কথা-বার্তা বা ঝামেলা কিছু হয়নি। এছাড়া এলাকার আর কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথেও তাদের বিশেষ যোগাযোগ নেই। তাহলে, আরাফাতকে কারা তুলে নিয়ে গেলো? কারা গুম করলো? কেন নিলো? কেউ এই উত্তর দিতে পারে না। আইনের লোকেরা শুধু বলছেন, তারা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। কিন্তু নেই। আরাফাত নেই। কয়েকশ’ দিন গেছে। আরাফাত ফেরেনি।

আরাফাতের সেই না থাকার প্রাথমিক দিনগুলো রাফসানা এখন মনেও করতে চায় না। সে কী বিভৎস একেকটা দিন। আরাফাতকে দেখতে না পেয়ে ছয় মাসের গর্ভবতী রাফসানার তখন মাঝে মাঝেই মনে হতো ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়তে বা ফ্যানে ঝুলে যেতে। আরাফাত যখন শেভ করে বেরিয়ে যেতো প্রতিটা সকালে ঘড়ির কাঁটায় সেই সময়টা বাজলেই মনে হতো, এই বুঝি এক্ষুনি আরাফাত বাথরুম থেকে বেরোবে। ওর সুবাসে ভরে যাবে ঘর। হয়তো আরাফাতকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরবে রাফসানা। অথবা হয়তো রাফসানাকে জড়িয়ে ধরে নাকের মধ্যে আলতো করে নাক ঘষে দেবে আরাফাত। 

কিন্তু আরাফাত আসেনি। কয়েশ’ দিন গেছে। যে শিশু ছয় মাসের গর্ভে ছিল। তার জন্ম হয়েছে। কিন্তু আরাফাত আসেনি। আরাফাতের না আসার প্রায় বছর খানেক হবে তখন। তখন একদিন নিজেকে আর সামলাতে না পেরে রাতের বেলায় অ্যাডিডাসের আফটার শেভিং লোশানের বোতলের মুখটা খুলে নাকের সামনে ধরে রাখে রাফসানা! সেই রাতে হয়তো ওই গন্ধটাই ওকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। নইলে হয়তো কয়েকমাসের মেয়ে মেঘমঞ্জুরীকে রেখেই সে ঝুলে যেতো ফ্যানে। 

তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিতে শিখেছে সে। মেঘমঞ্জুরীর নামটাও আরাফাতের দেয়া। আরাফাত বলেছিল মেয়ে হলে নাম রাখবে মেঘমঞ্জুরী। মেঘমঞ্জুরি দেখতেও হয়েছে একেবারেই আরাফাতের মতন। তার দিকে তাকিয়েই দিনগুলো যাচ্ছিলো রাফসানার। কিন্তু আজ হঠাত কী হলো তার! 

এই মাঝরাতে কেন স্বপ্নের মধ্যে এতো তীব্রভাবে পেলো আরাফাতের ঘ্রাণ! মনে হলো, বাথরুমের দরজা খানিকটা ফাঁকা রেখে শেভ করছে আরাফাত। দরজার ফাঁকা দিয়ে সুগন্ধ বেরিয়ে এসে ভরে গেছে ঘর।  তারপর বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে টাওয়েলটা হ্যাঙ্গারে রেখেই রাফসানার গলা জড়িয়ে ধরে নাকে নাক ঘষে দিয়েছে আরাফাত। আরাফাতের গাল থেকে আসা সেই গন্ধ লম্বা দম দিয়ে টেনে নিচ্ছে রাফসানা। এমনো হয়! স্বপ্নের মধ্যে কি কেউ কখনো গন্ধ-ও পায় নাকি! 

এই গন্ধে রাফসানার ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম ভেঙে সে-কী বুক বিদীর্ণ করা কান্না! বোবা কান্না! সশব্দে কাঁদলে মেয়ের ঘুম ভেঙে যাবে। পাশের রুমে থাকা অসুস্থ্য শ্বাশুড়ির পাতলা ঘুম ভেঙে যাবে। তখন তিনিও হয়তো কাঁদতে শুরু করবেন। তাই, নিঃশব্দে গুঙিয়ে-গুঙিয়ে কাঁদে রাফসানা। ভাবে, কোথায় আছে আরাফাত! কেমন আছে! কেন তাকে নিয়ে গেলো কেউ! কেন! কেন কেউ তাকে খুঁজে পায় না!

রাফসানার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আরাফাতের ফিরে না আসার সেই প্রথম দিনগুলোর মতনই তার বুক ধড়-ফড় করছে। বুক ধড়-ফড় করার শব্দ রাফসানা শুনতে পাচ্ছে নিজের কানেই। নিজেকে আর সামলাতে পারছে না। মনে হচ্ছে, চিৎকার করে আকাশ কাঁপিয়ে যদি কাঁদতে পারতো। যদি ডাকতে পারতো আরাফাতের নাম ধরে! কিন্তু সে চিৎকার করে না। মেয়ে জেগে গেলে তাকে সামলানো মুস্কিল; শুাশুড়ী জেগে গিয়ে সে-ও কান্না জুড়ে দিলে তাকে সামলানো মুস্কিল। 

বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে কাঁদতে-কাঁদতে সে অস্ফুটে বারবার বলতে থাকে আরাফাতের নাম। আরাফাত! আরাফাত! জপতে-জপতে একটা সময়ে তার যেনো জ্ঞান লুপ্ত হয়। কান্নায় ফুলে যাওয়া লাল টকটকে দুই চোখ নিয়ে বেহুশের মতন সে ঢুকে বাথরুমে। ঘোরগ্রস্থের মতন আফটার শেভিং লোশনের বোতলটা হাতে নিয়ে ঘরের মধ্যে এসে সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। তারপর বোতলের মুখটা খুলে ধরে রাখে নাকের সামনে। এমন সময় চকিতে রাফসানার মনে হয়, সাড়ে তিন বছর ধরে অবব্যাহৃত পড়ে থাকা এই আধ-বোতল লোশান ঢেলে দেবে নাকি সে তার গলার ভেতর! যেই ভাবা সেই কাজ করতে গিয়েও আর হয় না। বোতল থেকে একটু লোশান ডান হাতের আঙুলে নিয়ে রাফসান তার গালে, নাকে, গলায় মেখে দেয়। আর তার চোখ দিয়ে ঝরতে থাকে অশ্রু।    

____________________