কবিতা এবং অভিজ্ঞতা
নাগরিক বৃত্তি কবিতার জন্য প্রবল অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়। ধ্র“পদী শিল্প ও সাহিত্যের বিকাশে নগর বা সভ্যতা প্রধান ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ ও তার পেশার কেন্দ্রগত অবস্থান থেকে এসব যেমন সমৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি নীরবে নিভৃতে এসেছে রুচি, রঙ, গন্ধের, পছন্দের পরিবর্তন। ‘একটি নগর জীবনে সময়কালে যে অস্থিরতা অনুভব করা যায় সে অস্থিরতা অন্যত্র কোথাও অনুভব করা যায় না’। আর সমগ্র সৃষ্টিশীলতার মূলে রয়েছে এ অস্থিরতা। অস্থিরতা যাতনা বিশেষ, যাতনা চিন্তাকে গভীর করে। ভাবনাকে স্থিমিত। কার্যকালকে করে প্রলম্বিত। নাগরিক জীবন কবিদের শিল্পীদের জন্য অভিজ্ঞতার। এ অভিজ্ঞতা যেমনিভাবে তাঁকে বাস্তবমুখী করে তেমনি তাঁকে করে তোলে সচেতন। সে অস্থিরতার চোখে আবিষ্কার করে ধূসরতা। আহত হয় আবেগকে উসকাতে। ব্যথিত বিস্মে জীবন তাকে উপলব্ধি করায়। কল্পনার মৌলসম্পদ ভেঙে এই অস্থির জটিল ক্লেদ পংকিলতায় কবি ছোটেন প্রকৃতি উদ্ধারে। কবি লেখেন:
‘কিছু দূরে গ্রাম গুচ্ছগ্রাম ধারণার গ্রাম
এই শহরের বিচিত্র আলো-আঁধারে
পথকলি ফুটতে চাইছে
একজন প্রাক্তন স্বৈরশাসক
স্বপ্ন দেখেছিল পথকলি ফুল
গ্রামের সবুজ-সম্ভার।’
ফেলে আসা পথ, মাঠ, নদী, আর আত্মীয়ের বন্ধন ক্ষতের মাত্রাকে করে প্রকট। নৈঃসঙ্গতা লেগে থাকে জানযটে, ব্যাপক জনগোষ্ঠীর ভিড়ে, বিচিত্র পেশার দরবারি হাঁকে, পণ্যের সহজলভ্যতায়, অর্থের প্রাসঙ্গিকতায়, কড়কড়ে রোদে। বাস্তবতা অতিমাত্রিক উন্নাসিক হয়। ব্যক্তি বহু বিষয়ে সম্পৃক্ত হন সজ্ঞানে নয় অজ্ঞানে। দশদিক থেকে তার ঘাড়ে হুড়মুড় করে আসেÑএসব আয়োজন, আকর্ষণ। ঘটনা-দুর্ঘটনা। চাকার ঘর্ঘর, মেশিনের কড়কড় আন্দোলনের উত্তাপ, মিডিয়ার ভূত-প্রেত।
সংস্কৃতির তোড়-জোড় তো আছেই। ‘শতফুল বিকশিত হোক’ এমনটি নয় অযোগ্যতাও যোগ্যতা পায় যোগ্যদের শক্তির অভাবে। এ শক্তি কেবল পৃষ্ঠপোষকতার দৌলতে নয় অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অবস্থানও বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাই অস্থিরতা আসে ধাক্কা খায় বোধে। নীতিগত প্রশ্নের উত্তরে দাঁড়াতে আর পড়ে যেতে পিছনে পড়াটা কিন্তু কোনো না কোনোভাবে ঘটে এই জীবনে সামনে-পিছনে করতে করতে চরিত্রের দৃঢ়তা, জন্মের অভিজ্ঞতা শাণিত হয়। অভিজ্ঞতার জন্য নাগরিক জীবনকে প্রাধান্য দেয়ার অর্থ এই যে, সব শ্রেণীর লোকের ভিড় এখানে জমে। প্রত্যেকে সভ্যতার মধ্যে ও সাহসের দিকে যে বাসনা তা বহন করেÑএ তারই ফল। সংস্কৃতি সৃষ্টি পায়, কর্মের বিভিন্ন ভাষার বিস্তারও লক্ষ্য করা যায়। আর যেখানে নগর নেই প্রকৃতি তার আপন স্বভাবে অভ্যস্থ, সেখানে যে কবি বা শিল্পী বাস করেন তাঁর পক্ষে বাস্তব জীবনের, সমাজ, সভ্যতার সূত্র থাকে সামান্য। প্রকৃতি তাঁকে ও সব বিষয় থেকে নির্জলা আকাশে, সবুজের, চূড়ান্ত অধিষ্ঠানে রাখে। ব্যবহারিক, বাস্তবিক টানা-পোড়ন তাঁর সাহিত্যে, শিল্পে আসার, দাঁড়াবার অবকাশ পায় না। যা জীবনের অসম্পূর্ণ চিত্রেরই সামিল। জীবনচর্চার বিকাশের প্রশ্নে ব্যাপক মানুষের দৈনন্দিন মানসিক সমস্যা ও সম্ভাবনা আগ্রহের অপ্রকাশ, চিন্তার, আবেগের অনুভূতির কাছে পৌঁছানো -শিল্পের সাহিত্যের প্রধান লক্ষ্য বলে ধরে নেয়া যায়। তাই অভিজ্ঞতার জন্য নগর বা নাগরিক বৃত্তি প্রধান। অভিজ্ঞতার বহু পথ বা অসিম দরোজায়-নাগরিকতা বিশেষ উপযোগ নিয়ে আছে।
যশোর নগর ধাম
রাণা চট্টোপাধ্যায়
তোমার নগরে কি আছে নতুন জানাবে?
সেখানে কি গাছে-গাছে পাখি ডাকে,
ভোরে শোনা যায় ‘জবাকুসুম সঙ্কাশন’
স্ত্রোত্রে এষার আজান?
সেখানে কি কপোতাক্ষ তীরে সন্ধ্যার সময়
কিশোরীরা ‘খেজুর পাতার নূপুর পড়ে পায়’
সেখানে কি দুঃখ-কষ্টগুলি আমার শহরের মতন?
শ্রমিকেরা শ্রম দিয়ে দু’বেলা অন্ন পারে না জোটাতে
হাড়-হাভাতের মতো ভয়ঙ্কর শীতে গাড়ীবারান্দার নিচে
শুয়ে থাকে চটমুড়ি শিশু ও কুকুর?
কৃষকের ধান লুট করে নিয়ে যায় মহাজন
আমারি রক্তে বোনা ঝড়-জল-হিমানী সম্পাতে!
তোমার নগর ঠিক কি রকম শিমুল আজাদ?
পথে ভিড়, ফুটপাতে পসারীর দল পেতেছে
সাগরে শয্যা শিশিরের ভয় নেই আর।
রেললাইনের পাশে বস্তিতে আঁধার?
সেখানে কবিরা কি কফিঘরে বসে-বসে স্বপ্ন বোনে
ঘাম-রক্ত ঝরিয়ে লিটল ম্যাগাজিন করে জনে-জনে?
সেখানে কি প্রেমিকেরা প্রেমিকার জন্য পাগল পরাণ
প্রেমিকারা রাজহংসীর মতো
অহঙ্কারী গ্রীবা তুলে ধাবমান অভিমানে
স্বর্গের হুরী পরী হয়!
জানাবে কি এই সব শিমূল-পলাশে কবে বিয়ে!
তোমার নগরে আমি কোনো দিন যাই নি শিমুল
যাব কিনা তাও জানা নেই
দু'শো কিলোমিটারের মত দূরে থাকো
আমাদের বর্দ্ধমান আসানসোল কিংবা পুরুলিয়া বাঁকুড়া
অথচ তিন হাজার কিলোমিটার দূরের কোচিন
কন্যাকুমারিকা, শ্রীনগর, দিল্লী মাদ্রাজ বারবার গেছি
যাই নি তোমার বাড়ি মধুসূদনের পিতৃভূমি
কপোতাক্ষ তীরে যশোর নগর ধাম
প্রতাপাদিত্য নাম মহারাজ বঙ্গজ কায়স্থ
হায়রে বাংলাভাগ পাসপোর্ট ভিসা নিয়ে
দু’জনার দু’টি দেশে বাস তো।
কবিতার বক্তব্যই বলে দিচ্ছে কবিতার দৌঁড়, স্বপ্ন, বিশ্বাসের কথা। সময়ের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে মানুষের অবস্থানের কৃতকর্মের নানা সংগতি এবং অসংগতির কথা। কবিতাটি শেষ পর্যন্ত মানবিক আবেদন নিয়ে জাগরিত। জীবনকে বর্ণিল করে তোলার এক নিগুঢ় প্রচেষ্টা এবং আকাক্সক্ষার রঙ, গন্ধ বের হয়ে আসছে। রাষ্ট্র, সমাজ, দেশ, কালের উর্ধ্বে উঠে জীবনের জয়গান, হৃদয়ের সতেজ স্পর্শ ও সবুজতাকে খুব সহজেই প্রকাশ করে বলতে চাইছে ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক আমি তোমাদেরই লোক’।
সঙ্গপ্রিয়তা মানুষের স্বভাব এবং আত্মার প্রাণ স্বরূপ, জীবনকে টুকরো টুকরো করে সীমানার প্রাচীর দিয়ে নানা বাঁধা। নিষেধ সৃষ্টি করে মানুষ যে সভ্যতার সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে এবং তার জন্য আপ্রাণ কর্ম করে যাচ্ছে তা যে কত বড় ভুল কত বড় অসাড়তা, অন্তঃসার শূন্যতা! কবি সেই অসাড়তার বিরুদ্ধে সজ্ঞানে জাগ্রত। প্রাণে-প্রাণে মিল এবং সঙ্গলিপ্সা; আকাক্সক্ষার মধ্য দিয়ে দেশব্যথা জানাচ্ছে। জীবনের নানা চিত্রের অবস্থানের দৌঁড় দিতে দিতে জীবন বাস্তবতার চিত্রময়তা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে কবির প্রাণ জানান দিচ্ছে হৃদয়ে সুবজ অরণ্যকে। যে অরণ্যতে কেবলই শান্তি কেবলই সুখ কেবলই উৎসব। এই উৎসবের সলতেটাকে চিরন্তন করে জ্বালিয়ে রাখতে চাই এগিয়ে আসাটা। ধৈর্য এবং সহিষ্ণুতা ত্যাগ এবং তিতিক্ষা। একই ভাষার একই মানচিত্রের অতীত টানে আমাদের দশা সত্যি সত্যি সংকুচিত দুমড়ে মুছড়ে তছনছ হচ্ছি, যীশুর ক্রুশবিদ্ধ অনুভবে পৌঁছাচ্ছি। কিন্তু উপায়হীন সত্তার ক্রন্দন ছাড়া আজ আর কিছু নেই। জানি না এই ভাষাবোধ, সংস্কৃতিবোধের ভিতর আগামীতে কোনো সংযোগ ঘটবে কী না! ভাষার একত্রীকরণের পস্পরের প্রেমে, ধ্যানে তা পূনর্মিলনের পথ সৃষ্টি করতে পারবে কী না! আমাদের জানা নেই। তবে যদি প্রচেষ্টা থাকে প্রাণের, যদি চেতনা থাকে মিলনের, যদি সাধনা থাকে কর্মের, যদি স্বপ্ন থাকে জীবনের তবে নিশ্চিত বিরহের কাল অভিসারের তোড়ে যাবে ভেসে। ইতিহাসের পথ ধরে কবিতার ঘুর্ণায়নে সব কিছু একাকার হয়ে যাবে। মিলনে মিলনে ঘটে যাবে বিপ্ল¬ব। ঘটে যাবে আনন্দের নির্ভেজাল উৎসব। সহমর্মে, সহবন্ধনে, সহআচারে জীবন সৌরভময় হবে একদিন। এক ভাষাভাষি বিচ্ছিন্নতার দীর্ঘ বেদনাকে সরিয়ে আনন্দকে সাথে নিয়ে হাঁটবে, বাঁচবে জীবনের পূর্ণাঙ্গ স্বরূপকে নিয়ে। খণ্ডতার যন্ত্রণা প্রকৃতই অসহ্য। বিচ্ছিন্নতা প্রকৃতই ধ্বংসের ধ্বজাধারী।
কবিতাকে নিয়ে চলাটা একটা ভীষণ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তেমনি দায়িত্ববোধ উসকে ওঠে সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে। শিল্পের প্রতিটি স্তরই বুঝি এমন। কবিতাকে বুকে ধারণ করে নীরবে সশব্দে উচ্চারিত হবার অস্তিত্বকে শ্রদ্ধা না করে পারা যায় না। কবির প্রচেষ্টার কাছে জগতের সমস্ত প্রচেষ্টা ম্ল¬ান হয়। এ সত্য সহজেই আবিষ্কার করতে পারেন সংবেদনশীল পাঠক। সংবেদনশীলতার গুরুত্ব শিল্পের প্রধান পথ ও অবস্থানের অনস্বীকার্যতা। সংবেদনশীল চিত্তই পারে কবিতার প্রতিটি অংশের মেলবন্ধনের মাধ্যমে একটি সুর ঘটিয়ে দিতে। একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামোর অলি-গলিতে প্রবেশ করে প্রকৃত অবস্থান, আনন্দ, দুঃখ এবং দর্শনটি খোঁজ জেনে নিতে। কবিতা এমন একজন সংবেদনশীল পাঠকের প্রত্যাশায় থাকে। কবি ও তাঁর কবিতার নির্মিতির মুহূর্তে সে সব পাঠকের কথা ভেবে লিখে চলেন এবং পৌঁছান আশ্চর্য জগতে। সে জগতে পৌঁছানোর জন্য অপেক্ষার প্রয়োজন পড়ে। ধৈর্যের চরম পরীক্ষা কবি ও পাঠককে দিতে হয়। এ সত্যকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। লক্ষ্য নেই কবিতার পথ হাঁটা কালে। দূর থেকে দূরে যত দূরেই কবি যাক না চলে! একটা সময় তাকে ফিরে আসতে হয় কোলাহলে। একটা সময় কবিকে যেতে হয় নির্জনে, নির্বাসনে। কবির উপস্থিতি সর্বসময় কাম্য নয়। কবিতার প্রসঙ্গও সব সময়ের জন্য জরুরী নয়। এই মাত্রাজ্ঞান না থাকলে লোকালয় দুমড়ে মুছড়ে পড়ে। নির্জনতা দারুণ সংকটে ভেঙে চুরে যায়। তাই সচেতনতা, সচেতনতার বিকল্প কোনো পথ আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। মাত্রাজ্ঞানের ধারণাই সচেতনতার প্রধান গুণ বা অংশ। কবিতা সচেতনতার প্রকাশে মাত্রা জ্ঞানের উপলব্ধিতে সমস্ত কিছুর মধ্যে এক অর্থময়তা আনয়ন করে। আর অর্থময়তা যাবতীয় স্থূলতা, বদ্ধতা, ক্লেদাক্ততাকে নিঃশব্দে গুড়িয়ে পৌঁছে দেয় সমৃদ্ধির জোয়ারে। মানব সভ্যতার ক্রম পরিণতিতে কবি ও কবিতার ভূমিকা সর্বাগ্রে দৃষ্টি রেখে চলেছে। সর্বাগ্রে নানা সংকটে সমাধানের উপায় সৃষ্টি করে গেছে আপন বৈভবে, ঋদ্ধতায়। শুধু তাই নয় কবিতা দূরকে কাছে এবং কাছকে দূরে, সামান্যকে অসামান্যে, অসামান্যকে সামন্যতায় পৌঁছে সবকিছু এলোমেলো করে! দেয়। তাই কবিতা নীরব বিপ্লবের অংশী। কখনো বা স-শব্দের মহিমা হয়ে আশ্রিত হয়ে আছে জীবনের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে, শাখা- প্রশাখায়।
শিমুল সমীক্ষা
শামীম আরা লীনা
এই বসন্তে আপনি কেমন আছেন শিমুল?
জীর্ণ শীতের হিমেল উত্তুরে হাওয়ায়,
মাঝে গিয়েছে জানিÑপাতা ঝরা শীর্ণ সময়।
ন্যাড়া ডাল-পালা নিয়ে কাঠ ফাটা রোদ্দুরে
বড় নিঃসঙ্গ কেটেছে আপনার নিষ্ফলা দিন।
এখন দক্ষিণা হাওয়ায়-
বসন্তের উপচে পড়া যৌবন;
আপনার রক্তে ছোটায় লাল টগবগে ঘোড়ার
দুরন্ত দস্যিপনা।
আপনার হৃদয়ের লোহিত সাগরের স্নান করে
পুস্পিত শাখা-প্রশাখারা-
আকাশের প্রতœতত্ত্ব কপালে এঁকেছে,
গোলাপী ঠোঁটের চুম্বন রেখা।
আপনাকে ঘিরে পাখির পালকের মত
উড়ছে শুভ্র, তুলো; যেন আকাশের হৃদয় জুড়ে
বৃষ্টির স্বপ্নমাখা তুলোট মেঘের গুঁড়ো।
আপনাকে ছুঁয়ে এই বসন্তের রঙ্গিন হলিখেলা।
আপনাকে ছুঁয়ে শৈল্পিক না'য়ে স্বপ্নের পালতোলা।
পৃথিবীর চোখে চোখ রেখে সত্যি বলুনতো,
এই বসন্তে আপনি কেমন আছেন শিমুল?
কবির চোখে কবি, ব্যাপারটি সামান্য নয়। দূর থেকে, অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেও বুঝে ওঠা যায় না! পরস্পরের মধ্যে পরস্পরের কী গভীর উষ্ণতা, কী গভীর টান ঘটে যেতে পারে। আবার এও এক সত্য ‘কবির বিরুদ্ধে কবি’ সর্বাগ্রে জাগ্রত। তারপরও উদ্ধৃত কবিতার কবি যে স্বপ্ন সম্ভাবনা এবং শ্রদ্ধাকে অংকিত করে গেলেন তা সামান্য নয়, অসামান্যর যাবতীয় আয়োজনকে সাথে নিয়ে তাঁর চেতনা, হৃদয়ের স্পন্দনকে এক মহাকালীক অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। শণাক্ত করে গেছে একটি সত্ত্বার অনিবার্য পরিচর্যাকে। ধন্যবাদ কবি ও কবিতা। যে যে পথের হোক, মতের হোক পরস্পরের প্রতি পরস্পরের শ্রদ্ধাবোধ ভালবাসা থাকলে জীবনের কোনো ক্ষতি নেই বরঞ্চ লাভই আছে। সমগোত্রীয়দের একটি মন্তব্য, একটি গল্প অনেক মূল্যবান হয় ভিন্ন শ্রেণীর কাছে। কবিরা সাধারণত সবকিছুকেই নিরাসক্ত চোখে দেখেন ফলে একটা ঋজু ভঙি, দাঢ্য অবস্থান অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। সমাজবদ্ধ ক্ষুদ্র জীবেরা প্রত্যহ চায় কামনা করে একজন কবির গর্ব অহংকারকে টানা হেঁচড়া করতে। তাই একজন প্রকৃত কবিকে গড়ে উঠতে অনেক অনেক কাল, অভিজ্ঞতা, অসাড়তা, তিক্ততা, নগ্নতা, স্থূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হয়। আর এই সব বাঁধা বিঘœ পেরিয়ে নিজেকে পূর্ণাঙ্গ অবস্থানে পৌঁছানোর কাজটি সহজ নয় খুবই কঠিন। সেই কঠিন পথকে ভালবেসে বুকে আগলে প্রতিকূল সব কিছুকে অতিক্রম করার ধৈর্য, সাহস, শক্তি এবং অবকাশ সবার চরিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না।
কবিতার পথ মসৃণ নয় কঠিন। কবির উপস্থিতি কাম্য নয় সমাজের, কবির বেঁচে থাকা কাম্য নয় রাজনীতির, কবির চেতনার বিকাশ লক্ষ্য নয় রাষ্ট্রের। কবির চিন্তা গ্রহণযোগ্য নয় দার্শনিকের। কবির বিশ্বাস ধারণযোগ্য নয় রাজনৈতিকের। তদুপরি কবির জন্ম হয়। সমাজ পরিবর্তন পায়। চিন্তার জন্ম হয়, প্রগতি এগিয়ে চলে। কবি কবিতা লেখেন মাথা উঁচু করে হাঁটেন। বেঁচে থাকেন নিজের সময়ে। দুঃখ পান, আঘাতে জর্জরিত হন, সমাজের কাছে হন হেয় প্রতিপন্ন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হন অবাঞ্চিত। তারপরও সব কিছুর শেষে কবিতা টিকে থাকে। সব কিছুর ভিতর দিয়ে সৃষ্টি হয় নতুন যুগের। সবকিছুর ভিড় ঠেলে কবি এগিয়ে আসেন আত্মার নিকটে। সাহসের যোগান দেন নানা সংকটে। বিশ্বাসকে জাগিয়ে তোলেন অভিজ্ঞতায়। দুর্যোগকে চিহ্নিত করেন প্রজ্ঞায়। রুচি ও বিশ্বাসকে দেন পাল্টে আপন মাধুর্যে। অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলেন কার্যে। দুর্যোগকে সরিয়ে হাঁটেন কৌশলে, শক্তিতে, স্তব্ধতাকে, গুড়িয়ে তুলে আনেন নান্দনিক গতিময়তা। দুঃখ-যন্ত্রণাকে গলা টিপে মারেন আপন বিলাসে। জয় হোক কবির। জয় হোক কবিতার।
ছবি: বিধান দেব